, মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জিয়াউর রহমান হাঁ বললে অন্যরা সমস্বরে বলে ওঠেন হাঁ

  • প্রকাশের সময় : ১০:৫৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬
  • ২২ পড়া হয়েছে
অনলাইন শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬:
জিয়াউর রহমান হাঁ বললে অন্যরা সমস্বরে বলে ওঠেন হাঁ এবং ….
প্রেসিডেন্ট আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের কেবিনেট সভায় জেনারেল জিয়াউর রহমান হাঁ বললে অন্যরা সমস্বরে হাঁ বলতেন এবং উপস্থাপিত প্রস্তাব কেন গ্রহণ করা দরকার তার সমর্থনে যুক্তি তুলে ধরতেন; এবং না বললে অন্যরাও না বলতেন এবং তার যৌক্তিকতা কি তা ব্যাখ্যা করতেন।
এক ত্রান্তিলগ্নে বাংলাদেশ সূপ্রীম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি সায়েম ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বরের মেজর জেনেরেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত ক্যুএর পর প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোস্তাক আহমেদের স্থলাভিশিক্ত হন।
কেন তিনি প্রেসিডেন্টের পদ ত্যাগ করেছিলেন আমার সাথে একান্ত সাক্ষাতকারে তিনি তাঁর আজিমপুরের বাসায় একথা বলেন। তখন ক্ষমতার কয়েক দফা পট পরিবর্তনের পর জেনারেল এইচ এম এরশাদ বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে বন্দুকের মুখে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হয়েছেন।
বিচারপতি সায়েম কিছুতেই সাক্ষাতকারে বক্তব্য দেবেন না। তিনি আমাকে বলেন সত্যিকারের যারা প্রেসিডেন্ট ছিলেন তাদের সাক্ষাতকার নেন, কাজে লাগবে। আমি তার বায়োডেটা চাইলে তাও দেবেননা বলে জানান। কিছুটা অপ্রস্তুত আমি বললাম, স্যার আপনি না দিলেও আমি আপনার জীবন ব্রিত্তান্ত ঠিকই পেয়ে যাব। কারণ আপনার বায়োডেটা সরকারিভাবে সংরক্ষিত আছে। তা ছাড়া পত্রপ্ত্রিকায়ও ছাপা হয়েছে।
একথা শোনার পর তাঁর নেতিবাচক অভিব্যক্তির কিছুটা পরিবর্তন হল। প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে খন্দকার মোস্তাক আহমেদের কাছ থেকে তিনি ক্ষমতা গ্রহন করেন। জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রথমে উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং পরে প্রধান সমরিক আইন প্রশাসক হিসেবে জাষ্টিস সায়েমের কেবিনেটের সদস্য ছিলেন।
বিচারপতি সায়েম বলেন, কেবিনেটে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে যখন এই অবস্থা তখন নাম মাত্র প্রেসিডেন্ট থাকার কি মানে হয়? তার পরও তিনি তার ব্যাপারে আলোচনায় সময় ব্যয় না করে দেশের স্বার্থ কিভাবে রক্ষা করা যায় সেদিকে মনোনিবেশের উপদেশ দেন। জাষ্টিস সায়েমের পদত্যাগের পর জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহন করেন।
এই সহজ সরল প্রকৃতির বিচারপতি কিন্তু ন্যায় নীতির ব্যাপারে ছিলেন আপসহীন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেবার দিন তিনি জাতির উদ্দেশ্যে একটি ভাষণ দেন। সেই ভাষণ রেকর্ডিংএর আগে তার ড্রাফট নিজে পড়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন করেন। লিখিত ভাষণের একটা প্যারা মার্ক করে তিনি বলেন, এইটুকু পড়া যাবেনা। ভাষ্যমতে উপস্থিত কর্ণেল সাফায়াত জামিল বলে ওঠেন স্যার, আপনাকে এটা পড়তে হবে। এই কথা উচ্চারণের পর জাষ্টিস সায়েম তাঁর চশমা ্টেবিলে নামিয়ে রেখে জবাব দেন, ‘তাহলে আপনিই প্রেসিডেন্ট হয়ে যান।’ অবস্থা বেগতিক দেখে জেনারেল খালেদ মোশাররফ বলেন, স্যার আপনি যা বলেন তা-ই হবে।
তখনকার প্রধান তথ্য কর্মকর্তা (পিআইও) শামসুল হুদা জানান, ভাষণের যে অংশটি জাষ্টিস সায়েম বাদ দেন সে অংশে লেখা ছিল, খন্দকার মোস্তাক আহমেদ তার আত্মীয় স্বজন নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করেন। বিচারে নির্দিষ্ট হবার আগে একজন বিচারপতি কিছুতেই এটা বলতে পারেন না।
তবে সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তার কোন অনুরাগ ছিলনা। তিনি আলাপ চারিতার এক পর্যায়ে বলেন, আল্লাহর কাছে অনেক শুকরিয়া, বাকসালের প্রেসিডেন্টকে শপথ বাক্য পাঠ করাতে হয়নি তার।
তার সাক্ষাতকার নিয়ে ব্যস্ত না হয়ে দেশের কাজ করার তাগিদ দেয়ার এক পর্যায়ে তিনি বাসার লাইব্রেরীতে যান এবং এক পৃষ্ঠার টাইপ করা একটা কাগজ নিয়ে এসে আমাকে দেখান। তিনি বলেন, এটি ভারতের প্রথম প্রধান মন্ত্রী পন্ডিত জওয়াহেরলাল নেহেরুর লেখা চিঠির কপি, যা পাঠানো হয়েছিল কুমিল্লার কংগ্রেস নেতা আশ্রাফ উদ্দিন চৌধূরীর কাছে। এটা লেখা হয়েছিল আশ্রাফ উদ্দিন চৌধূরির এক পত্রের জবাবে। চৌধূরি পন্ডিত জওয়াহেরলাল নেহেরুকে প্রশ্ন করেন তিনি কেন বাংলার বিভক্তি মেনে নিলেন। জবাবটা ছিল এ রকম। ‘আমরা বিভক্তি মেনেছি এজন্য যে খুব শীঘ্রই পুনরায় আবার একত্রিত হব। পূর্ব বঙ্গের মানুষ রাজধানী কোলকাতার উপর অর্থনৈতিক ভাবে এতই নির্ভরশীল যে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তারা পশ্চিম বঙ্গের সাথে আবার একীভূত হবার দাবি জানাবে।‘ জাষ্টিস সায়েম বলেন এসব ব্যাপারে কিছু লেখালেখি করেন। আমার জীবন নিয়ে লিখে কি কাজ হবে?
এই চিঠি তখনও খুব একটা জন সমক্ষে আসেনি। এখন অবশ্য তা অনেক গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হয়েছে।

Mostafa Kamal Majumder

 

জনপ্রিয়

জিয়াউর রহমান হাঁ বললে অন্যরা সমস্বরে বলে ওঠেন হাঁ

প্রকাশের সময় : ১০:৫৪ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬
অনলাইন শুক্রবার, ১৪ আগস্ট ২০২৬:
জিয়াউর রহমান হাঁ বললে অন্যরা সমস্বরে বলে ওঠেন হাঁ এবং ….
প্রেসিডেন্ট আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের কেবিনেট সভায় জেনারেল জিয়াউর রহমান হাঁ বললে অন্যরা সমস্বরে হাঁ বলতেন এবং উপস্থাপিত প্রস্তাব কেন গ্রহণ করা দরকার তার সমর্থনে যুক্তি তুলে ধরতেন; এবং না বললে অন্যরাও না বলতেন এবং তার যৌক্তিকতা কি তা ব্যাখ্যা করতেন।
এক ত্রান্তিলগ্নে বাংলাদেশ সূপ্রীম কোর্টের সাবেক প্রধান বিচারপতি সায়েম ১৯৭৫ সালের ৩রা নভেম্বরের মেজর জেনেরেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সংঘটিত ক্যুএর পর প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোস্তাক আহমেদের স্থলাভিশিক্ত হন।
কেন তিনি প্রেসিডেন্টের পদ ত্যাগ করেছিলেন আমার সাথে একান্ত সাক্ষাতকারে তিনি তাঁর আজিমপুরের বাসায় একথা বলেন। তখন ক্ষমতার কয়েক দফা পট পরিবর্তনের পর জেনারেল এইচ এম এরশাদ বিচারপতি আবদুস সাত্তারকে বন্দুকের মুখে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হয়েছেন।
বিচারপতি সায়েম কিছুতেই সাক্ষাতকারে বক্তব্য দেবেন না। তিনি আমাকে বলেন সত্যিকারের যারা প্রেসিডেন্ট ছিলেন তাদের সাক্ষাতকার নেন, কাজে লাগবে। আমি তার বায়োডেটা চাইলে তাও দেবেননা বলে জানান। কিছুটা অপ্রস্তুত আমি বললাম, স্যার আপনি না দিলেও আমি আপনার জীবন ব্রিত্তান্ত ঠিকই পেয়ে যাব। কারণ আপনার বায়োডেটা সরকারিভাবে সংরক্ষিত আছে। তা ছাড়া পত্রপ্ত্রিকায়ও ছাপা হয়েছে।
একথা শোনার পর তাঁর নেতিবাচক অভিব্যক্তির কিছুটা পরিবর্তন হল। প্রেসিডেন্ট ও প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে খন্দকার মোস্তাক আহমেদের কাছ থেকে তিনি ক্ষমতা গ্রহন করেন। জেনারেল জিয়াউর রহমান প্রথমে উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক এবং পরে প্রধান সমরিক আইন প্রশাসক হিসেবে জাষ্টিস সায়েমের কেবিনেটের সদস্য ছিলেন।
বিচারপতি সায়েম বলেন, কেবিনেটে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষেত্রে যখন এই অবস্থা তখন নাম মাত্র প্রেসিডেন্ট থাকার কি মানে হয়? তার পরও তিনি তার ব্যাপারে আলোচনায় সময় ব্যয় না করে দেশের স্বার্থ কিভাবে রক্ষা করা যায় সেদিকে মনোনিবেশের উপদেশ দেন। জাষ্টিস সায়েমের পদত্যাগের পর জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির পদ গ্রহন করেন।
এই সহজ সরল প্রকৃতির বিচারপতি কিন্তু ন্যায় নীতির ব্যাপারে ছিলেন আপসহীন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেবার দিন তিনি জাতির উদ্দেশ্যে একটি ভাষণ দেন। সেই ভাষণ রেকর্ডিংএর আগে তার ড্রাফট নিজে পড়ে প্রয়োজনীয় সংশোধন করেন। লিখিত ভাষণের একটা প্যারা মার্ক করে তিনি বলেন, এইটুকু পড়া যাবেনা। ভাষ্যমতে উপস্থিত কর্ণেল সাফায়াত জামিল বলে ওঠেন স্যার, আপনাকে এটা পড়তে হবে। এই কথা উচ্চারণের পর জাষ্টিস সায়েম তাঁর চশমা ্টেবিলে নামিয়ে রেখে জবাব দেন, ‘তাহলে আপনিই প্রেসিডেন্ট হয়ে যান।’ অবস্থা বেগতিক দেখে জেনারেল খালেদ মোশাররফ বলেন, স্যার আপনি যা বলেন তা-ই হবে।
তখনকার প্রধান তথ্য কর্মকর্তা (পিআইও) শামসুল হুদা জানান, ভাষণের যে অংশটি জাষ্টিস সায়েম বাদ দেন সে অংশে লেখা ছিল, খন্দকার মোস্তাক আহমেদ তার আত্মীয় স্বজন নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান ও তার পরিবারের সদস্যদের হত্যা করেন। বিচারে নির্দিষ্ট হবার আগে একজন বিচারপতি কিছুতেই এটা বলতে পারেন না।
তবে সাবেক রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি তার কোন অনুরাগ ছিলনা। তিনি আলাপ চারিতার এক পর্যায়ে বলেন, আল্লাহর কাছে অনেক শুকরিয়া, বাকসালের প্রেসিডেন্টকে শপথ বাক্য পাঠ করাতে হয়নি তার।
তার সাক্ষাতকার নিয়ে ব্যস্ত না হয়ে দেশের কাজ করার তাগিদ দেয়ার এক পর্যায়ে তিনি বাসার লাইব্রেরীতে যান এবং এক পৃষ্ঠার টাইপ করা একটা কাগজ নিয়ে এসে আমাকে দেখান। তিনি বলেন, এটি ভারতের প্রথম প্রধান মন্ত্রী পন্ডিত জওয়াহেরলাল নেহেরুর লেখা চিঠির কপি, যা পাঠানো হয়েছিল কুমিল্লার কংগ্রেস নেতা আশ্রাফ উদ্দিন চৌধূরীর কাছে। এটা লেখা হয়েছিল আশ্রাফ উদ্দিন চৌধূরির এক পত্রের জবাবে। চৌধূরি পন্ডিত জওয়াহেরলাল নেহেরুকে প্রশ্ন করেন তিনি কেন বাংলার বিভক্তি মেনে নিলেন। জবাবটা ছিল এ রকম। ‘আমরা বিভক্তি মেনেছি এজন্য যে খুব শীঘ্রই পুনরায় আবার একত্রিত হব। পূর্ব বঙ্গের মানুষ রাজধানী কোলকাতার উপর অর্থনৈতিক ভাবে এতই নির্ভরশীল যে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তারা পশ্চিম বঙ্গের সাথে আবার একীভূত হবার দাবি জানাবে।‘ জাষ্টিস সায়েম বলেন এসব ব্যাপারে কিছু লেখালেখি করেন। আমার জীবন নিয়ে লিখে কি কাজ হবে?
এই চিঠি তখনও খুব একটা জন সমক্ষে আসেনি। এখন অবশ্য তা অনেক গ্রন্থে লিপিবদ্ধ হয়েছে।

Mostafa Kamal Majumder