, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
গণভবনের ভিডিও ধারণসহ রেকিকরা হয় শাইখ সিরাজের নেতৃত্বে রাহুল-মমতারা মিছিল করে যাবেন সুপ্রিম কোর্টে,মিছিলে গোটা ভারত হাঁটবে। সোমবার দিল্লি পুলিশ পরীক্ষায় রোটন তাঁর বাবার চেহলাম আয়োজনে ও বাধা ফজলে করিম চৌধুরী! আমাদের বিড়ি টানা,হাতাকাটা জামা পরার উপর যতক্ষণ না আক্রমণ আসবে ততোক্ষণ ? এই মানুষ এভাবে পচে গেল কেন? অবশেষে ডিপ স্টেট এবং ইউনূস ও খলিল সাহেবদের সাকসেস! রোটন ভাইয়ের জানাজা পড়তে যাওয়া মুসল্লীদের মসজিদ থেকে বের করে, নির্মম নির্যাতন করেছে বিএনপির ক্যাডাররা!! জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম মুসলিম সভাপতি — বদরুদ্দীন তৈয়বজী পাকিস্তানপন্থী খাঁটি মুসলমান ইনকিলাব মঞ্চ বাবা-মায়ের কাছ থেকে যা শিখেছি ত্রপা মজুমদার

দুর্নীতি দমনে জেনারেলদের পর পর ‘গুম’! ৫২% অফিসার গায়েব করে কেন নিজের ফৌজেরই ‘কোমর ভাঙছেন’ জিনপিং?

  • প্রকাশের সময় : ০৮:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬
  • ৪২ পড়া হয়েছে
অনলাইন সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬

চিনের ‘পিপল্‌স লিবারেশন আর্মি’র (পিএলএ) একের পর এক অফিসারকে বরখাস্ত ও গায়েব করছেন চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। কিন্তু কেন? নেপথ্যে রয়েছে কোন রহস্য?

প্রথমে গলওয়ান সংঘাতের ‘মূল চক্রী’। তার পর সামরিক বাহিনীর মাথায় থাকা ‘সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশন’-এর জোড়া অফিসার। হঠাৎই এক এক করে লালফৌজের শীর্ষ কমান্ডারদের ছেঁটে ফেলছে চিন। শুধু তা-ই নয়, চাকরি খোয়ানোর পাশাপাশি বেমালুম গায়েব হয়ে যাচ্ছেন অনেকে। কথায় অবাধ্য হওয়াতেই কি গুম করা হচ্ছে? না কি কুর্সি আঁকড়ে থাকতে ‘পথের কাঁটা’ সরাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং? ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে ড্রাগনভূমির ফৌজের রহস্য।
ঝাও জ়ঙ্গকি, ঝ্যাং ইউশিয়া এবং লিউ ঝেনলি। সংবাদসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের অগস্টের শেষ সপ্তাহে ‘পিপ্‌লস লিবারেশন আর্মি’ বা পিএলএ-র এই তিন শীর্ষ অফিসারকে ‘তাড়িয়ে’ দেন প্রেসিডেন্ট শি। এর কারণ অবশ্য স্পষ্ট করেনি বেজিং। এঁদের মধ্যে প্রথম জন ডোকলাম এবং গলওয়ান সংঘাতের ‘মাস্টারমাইন্ড’। ভারতীয় ফৌজকে ‘শিক্ষা’ দিতে গিয়ে এ বার নিজেই প্যাঁচে পড়লেন তিনি।

এই ঘটনার পর পিএলএ-কে নিয়ে প্রকাশ্যে আসে মার্কিন গবেষণা সংস্থা (পড়ুন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক) ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ়’-এর একটি রিপোর্ট। তাদের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে লালফৌজের শতাধিক উচ্চপদস্থ অফিসারকে বরখাস্ত করেছেন জিনপিং। তাঁদের বড় অংশই বর্তমানে নিখোঁজ। সব মিলিয়ে সংখ্যাটা ১০১ বা তার আশপাশে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ওই প্রতিষ্ঠান।

মার্কিন থিঙ্ক ট্যাঙ্কটির দাবি, শি সরকারের এ-হেন পদক্ষেপে চিনা লালফৌজে দেখা গিয়েছে নেতৃত্বের সঙ্কট। কারণ, এর জেরে আচমকা ৫২ শতাংশ শীর্ষ অফিসারকে হারিয়ে ফেলেছে পিএলএ। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, সংশ্লিষ্ট পদগুলিতে রাতারাতি কাউকে নিয়োগও করছে না বেজিং। ফলে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হলে ড্রাগন যে সমস্যার মুখে পড়তে পারে, তা বলাই বাহুল্য।

উল্লেখ্য, চৈনিক সৈন্যবাহিনীর কাঠামো অন্যান্য দেশগুলির মতো নয়। বেজিঙের লালফৌজ সেখানকার একমাত্র রাজনৈতিক দল ‘কমিউনিস্ট পার্টি অফ চায়না’ বা সিপিসি-র সামরিক শাখা। পিএলএ পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রণ করে থাকে সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশন। সিপিসির কেন্দ্রীয় কমিটির অধীনে কাজ করতে হয় তাদের। সেই কমিটির মাথায় আবার রয়েছে পলিটব্যুরো, যার নেতৃত্ব দেন দলেরই জেনারেল সেক্রেটারি।

  • বর্তমানে জেনারেল সেক্রেটারি এবং সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের চেয়ারম্যান— দুই গুরুত্বপূর্ণ পদেই রয়েছেন প্রেসিডেন্ট শি। এ বছরের জুলাইয়ে একটি দলীয় সমাবেশে লালফৌজের অভ্যন্তরের দুর্নীতি পুরোপুরি সাফ করার কথা বলতে শোনা যায় তাঁকে। তার পরই প্রায় একসঙ্গে অপসারিত হন জেনারেল পদমর্যাদার তিন অফিসার। এঁদের মধ্যে দু’জন সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের সদস্যও ছিলেন।

সংবাদসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, গত ২৬ অগস্ট সিপিসি-র রাজনৈতিক উপদেষ্টামণ্ডলী বা ‘চাইনিজ পিপল্‌স পলিটিক্যাল কনসালটেটিভ কনফারেন্স’ থেকে অপসারিত হন ঝাও। তাঁকে আরও দু’টি পদ থেকে সরিয়েছেন শি। তাঁর বিরুদ্ধে কোনও দুর্নীতির তদন্ত শুরু হয়েছে কি না, তা অবশ্য জানা যায়নি। বরখাস্ত হওয়ার পর থেকে তাঁকে প্রকাশ্যে দেখাও যাচ্ছে না বলে উঠেছে অভিযোগ।

২০১৬ সালে জেনারেল ঝাওকে পশ্চিমাঞ্চলীয় থিয়েটার কমান্ডের মাথায় বসান শি। কৌশলগত দিক থেকে তিব্বত এবং শিনজ়িয়ান প্রদেশ এর আওতাভুক্ত। তা ছাড়া ভারত লাগোয়া সীমান্ত সুরক্ষায় দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছিল তাঁকে। কিন্তু পদপ্রাপ্তির মাত্র এক বছরের মধ্যেই ডোকলামে ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে সংঘাত জড়ান তিনি। তাতে আন্তর্জাতিক মহলে চাপে পড়ে যায় বেজিং।

ভারত, চিন ও ভুটানের সংযোগস্থলে ডোকলামের অবস্থান। এর খুব কাছেই রয়েছে উত্তরবঙ্গের অত্যন্ত সংবেদনশীল শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেন্‌স নেক’। মুরগির গলার মতো দেখতে ওই এলাকাটির সঙ্গে জুড়ে আছে উত্তর-পূর্বের সব ক’টি রাজ্য। তাই জায়গাটার সামরিক গুরুত্ব অপরিসীম। এ-হেন ডোকলামে ২০১৭ সালের জুনে একটি কাঁচা রাস্তার সম্প্রসারণ শুরু করে পিএলএ। সূত্রের খবর, এর নির্দেশ দিয়েছিলেন জেনারেল ঝাও।

সংশ্লিষ্ট উপত্যকা নিয়ে চিন ও ভুটানের মধ্যে আবার সীমান্ত বিবাদ রয়েছে। বেজিঙের দাবি গোটা এলাকা তিব্বতের অংশ। অন্য দিকে, ডোকলামকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে বরাবর জানিয়ে এসেছে থিম্পু। পিএলএ সেখানে কাঁচা রাস্তা সম্প্রসারণ শুরু করতেই এতে হস্তক্ষেপ করে ভারতীয় সেনা। ফলে দু’পক্ষের মধ্যে বাধে হাতাহাতি। ওই সময় পাথর ছোড়াছুড়িতে আহত হন দু’দিকেরই বেশ কয়েক জন সৈনিক।

এই ঘটনার পর ডোকলাম কব্জা করতে সেনা সমাবেশ করেন ঝাও। পাল্টা বিশাল বাহিনী নিয়ে সেখানে হাজির হন ভারতীয় কমান্ডাররাও। ফলে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ে দু’পক্ষের সেনা। টানা ৭২ দিন চলে সেই অচলাবস্থা। শেষে পিছু হটে পিএলএ। তার পর থেকেই ‘অপমানের’ শোধ তোলার ফিকির খুঁজতে থাকেন পশ্চিমাঞ্চলীয় থিয়েটার কমান্ডের মাথায় থাকা বেজিঙের ওই জেনারেল।

২০২০ সালে ভারতের সঙ্গে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করার সুযোগ পেয়ে যান ঝাও। পূর্ব লাদাখের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি (লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল) বরাবর বেশ কিছু অস্থায়ী সামরিক পরিকাঠামো গড়ে তোলে এ দেশের বাহিনী। আপত্তি জানায় পিএলএ। তখনই নয়াদিল্লির ফৌজকে ‘চরম শিক্ষা’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন লালফৌজের ওই কমান্ডার। সেইমতো চৈনিক সৈনিকদের আদেশও দেন তিনি।

এর পর জেনারেল ঝাওয়ের নির্দেশে গলওয়ান উপত্যকায় মোতায়েন ভারতীয় সেনার উপর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে পিএলএ-র একটি দল। কাঁটাতার জড়ানো বিশেষ এক ধরনের ডান্ডা ও ছুরি নিয়ে হামলা করে তারা। সেই আক্রমণে প্রাণ হারান কর্নেল বি সন্তোষ বাবু-সহ মোট ২০ জন সৈনিক। এর পরই পাল্টা প্রত্যাঘাত শানায় এ দেশের ফৌজ। সূত্রের খবর, তাতে মৃত্যু হয় ৩৫-৪০ জনের। যদিও সরকারি ভাবে তা কখনওই স্বীকার করেনি বেজিং।

গলওয়ানকাণ্ডের পর পিএলএ-র ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে ইউএস নিউজ় অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড নামের একটি গণমাধ্যম সংস্থা। সেখানে বলা হয়, সংঘর্ষের সময় চিনা সৈনিকদের বেশ কয়েক জনকে পাহাড়ের উপর থেকে নদীতে ছুড়ে ফেলে দেয় ভারতীয় ফৌজ। পরবর্তী কালে একই কথা বলতে শোনা যায় রাশিয়ার সংবাদমাধ্যম তাসকে। তারা জানায়, গলওয়ান নদীতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে বেজিঙের ৪৫ জন সেনার।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের দাবি, ভারতের সামনে চিনের সামরিক সক্ষমতাকে তুলে ধরতেই গলওয়ানে হামলার নির্দেশ দিয়ে বসেন জেনারেল ঝাও। এতে ফল যে হিতে বিপরীত হতে পারে, তা এক বারও ভাবেননি তিনি। ওই ঘটনার পর ডোকলামের কায়দায় খুব দ্রুত পূর্ব লাদাখের বিস্তীর্ণ এলাকায় সেনা সমাবেশ করে বেজিং। সমপরিমাণ ফৌজ মোতায়েন করে পাল্টা যুদ্ধের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়ে ফেলে দিল্লিও।

ভারতের সঙ্গে এই সীমান্ত সংঘাতের প্রভাবে ক্ষতবিক্ষত হয় চিনের বৈদেশিক বাণিজ্য। ফলে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে পূর্বাঞ্চলীয় থিয়েটার কমান্ড থেকে জেনারেল ঝাওকে সরাতে বাধ্য হন প্রেসিডেন্ট শি। ওই সময় প্রায় অবসরের বয়সে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি। বাহিনী থেকে সরিয়ে তাঁকে দলের রাজনৈতিক উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য করেন জিনপিং। বলা বাহুল্য, তা ছিল বেশ নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত।

জেনারেল ঝাওকে বাদ দিলে ‘সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশন’-এর পদ খুইয়েছেন জেনারেল পদমর্যাদার ঝ্যাং ইউশিয়া এবং লিউ ঝেনলি। এঁদের মধ্যে প্রথম জন ছিলেন কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান। আর সংগঠনটির জয়েন্ট স্টাফ দফতরের চিফ অফ স্টাফের দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন লিউ। দুর্নীতির অভিযোগে এঁদের সরানো হয়েছে বলে সূত্র মারফত মিলেছে খবর। তবে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি জিনপিং প্রশাসন।

২০১২ সাল থেকে চিন জুড়ে সরকারি মহলে দুর্নীতি দমন অভিযান চালাচ্ছে প্রেসিডেন্ট শি-র প্রশাসন। নিশানায় রয়েছে সামরিক বাহিনীও। অনেকেই একে বেজিঙের ‘শুদ্ধিকরণ’ অভিযান বলে উল্লেখ করছেন। ফলে পিএলএ কমান্ডারদের চাকরি খোয়ানো মোটেই নতুন ঘটনা নয়। তবে, একসঙ্গে তিন জনের অপসারণের নেপথ্যে অন্য কারণ ব্যাখ্যা করেছে পর্যবেক্ষক মহল।

সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, গলওয়ান ও ডোকলামের ঘটনায় জিনপিংকে একেবারেই খুশি করতে পারেননি ঝাও। এর মাধ্যমে ভারতকে পুরোপুরি বেকায়দায় ফেলার ইচ্ছে ছিল তাঁর। যদিও বাস্তবে তা হয়নি। উল্টে আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় পূর্ব লাদাখের সংঘর্ষে চার জন সৈনিকের মৃত্যুর কথা স্বীকার করে নেয় চিন। ফলে ভেঙে গিয়েছে বেজিঙের ‘সুপার পাওয়ার’ তকমা।

দ্বিতীয়ত, একদলীয় শাসনে থাকা চিনে যখন-তখন ক্ষমতার ভরকেন্দ্র পাল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তাই সেনা অভ্যুত্থানের আশঙ্কায় এই ধরনের পদক্ষেপ করছেন প্রেসিডেন্ট শি। সাত সদস্যের সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনে বর্তমানে তিনি ছাড়া রয়েছেন আর মাত্র এক জন। ফলে আগামী দিনে সীমান্তে আগ্রাসী মনোভাব দেখানো বেজিঙের পক্ষে কঠিন হতে চলেছে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

আনন্দবাজার ডট কম

জনপ্রিয়

গণভবনের ভিডিও ধারণসহ রেকিকরা হয় শাইখ সিরাজের নেতৃত্বে

দুর্নীতি দমনে জেনারেলদের পর পর ‘গুম’! ৫২% অফিসার গায়েব করে কেন নিজের ফৌজেরই ‘কোমর ভাঙছেন’ জিনপিং?

প্রকাশের সময় : ০৮:৫০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬
অনলাইন সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬

চিনের ‘পিপল্‌স লিবারেশন আর্মি’র (পিএলএ) একের পর এক অফিসারকে বরখাস্ত ও গায়েব করছেন চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। কিন্তু কেন? নেপথ্যে রয়েছে কোন রহস্য?

প্রথমে গলওয়ান সংঘাতের ‘মূল চক্রী’। তার পর সামরিক বাহিনীর মাথায় থাকা ‘সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশন’-এর জোড়া অফিসার। হঠাৎই এক এক করে লালফৌজের শীর্ষ কমান্ডারদের ছেঁটে ফেলছে চিন। শুধু তা-ই নয়, চাকরি খোয়ানোর পাশাপাশি বেমালুম গায়েব হয়ে যাচ্ছেন অনেকে। কথায় অবাধ্য হওয়াতেই কি গুম করা হচ্ছে? না কি কুর্সি আঁকড়ে থাকতে ‘পথের কাঁটা’ সরাচ্ছেন প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং? ক্রমশ ঘনীভূত হচ্ছে ড্রাগনভূমির ফৌজের রহস্য।
ঝাও জ়ঙ্গকি, ঝ্যাং ইউশিয়া এবং লিউ ঝেনলি। সংবাদসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের অগস্টের শেষ সপ্তাহে ‘পিপ্‌লস লিবারেশন আর্মি’ বা পিএলএ-র এই তিন শীর্ষ অফিসারকে ‘তাড়িয়ে’ দেন প্রেসিডেন্ট শি। এর কারণ অবশ্য স্পষ্ট করেনি বেজিং। এঁদের মধ্যে প্রথম জন ডোকলাম এবং গলওয়ান সংঘাতের ‘মাস্টারমাইন্ড’। ভারতীয় ফৌজকে ‘শিক্ষা’ দিতে গিয়ে এ বার নিজেই প্যাঁচে পড়লেন তিনি।

এই ঘটনার পর পিএলএ-কে নিয়ে প্রকাশ্যে আসে মার্কিন গবেষণা সংস্থা (পড়ুন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক) ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ়’-এর একটি রিপোর্ট। তাদের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে লালফৌজের শতাধিক উচ্চপদস্থ অফিসারকে বরখাস্ত করেছেন জিনপিং। তাঁদের বড় অংশই বর্তমানে নিখোঁজ। সব মিলিয়ে সংখ্যাটা ১০১ বা তার আশপাশে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ওই প্রতিষ্ঠান।

মার্কিন থিঙ্ক ট্যাঙ্কটির দাবি, শি সরকারের এ-হেন পদক্ষেপে চিনা লালফৌজে দেখা গিয়েছে নেতৃত্বের সঙ্কট। কারণ, এর জেরে আচমকা ৫২ শতাংশ শীর্ষ অফিসারকে হারিয়ে ফেলেছে পিএলএ। তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হল, সংশ্লিষ্ট পদগুলিতে রাতারাতি কাউকে নিয়োগও করছে না বেজিং। ফলে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হলে ড্রাগন যে সমস্যার মুখে পড়তে পারে, তা বলাই বাহুল্য।

উল্লেখ্য, চৈনিক সৈন্যবাহিনীর কাঠামো অন্যান্য দেশগুলির মতো নয়। বেজিঙের লালফৌজ সেখানকার একমাত্র রাজনৈতিক দল ‘কমিউনিস্ট পার্টি অফ চায়না’ বা সিপিসি-র সামরিক শাখা। পিএলএ পরিচালনা এবং নিয়ন্ত্রণ করে থাকে সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশন। সিপিসির কেন্দ্রীয় কমিটির অধীনে কাজ করতে হয় তাদের। সেই কমিটির মাথায় আবার রয়েছে পলিটব্যুরো, যার নেতৃত্ব দেন দলেরই জেনারেল সেক্রেটারি।

  • বর্তমানে জেনারেল সেক্রেটারি এবং সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের চেয়ারম্যান— দুই গুরুত্বপূর্ণ পদেই রয়েছেন প্রেসিডেন্ট শি। এ বছরের জুলাইয়ে একটি দলীয় সমাবেশে লালফৌজের অভ্যন্তরের দুর্নীতি পুরোপুরি সাফ করার কথা বলতে শোনা যায় তাঁকে। তার পরই প্রায় একসঙ্গে অপসারিত হন জেনারেল পদমর্যাদার তিন অফিসার। এঁদের মধ্যে দু’জন সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনের সদস্যও ছিলেন।

সংবাদসংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, গত ২৬ অগস্ট সিপিসি-র রাজনৈতিক উপদেষ্টামণ্ডলী বা ‘চাইনিজ পিপল্‌স পলিটিক্যাল কনসালটেটিভ কনফারেন্স’ থেকে অপসারিত হন ঝাও। তাঁকে আরও দু’টি পদ থেকে সরিয়েছেন শি। তাঁর বিরুদ্ধে কোনও দুর্নীতির তদন্ত শুরু হয়েছে কি না, তা অবশ্য জানা যায়নি। বরখাস্ত হওয়ার পর থেকে তাঁকে প্রকাশ্যে দেখাও যাচ্ছে না বলে উঠেছে অভিযোগ।

২০১৬ সালে জেনারেল ঝাওকে পশ্চিমাঞ্চলীয় থিয়েটার কমান্ডের মাথায় বসান শি। কৌশলগত দিক থেকে তিব্বত এবং শিনজ়িয়ান প্রদেশ এর আওতাভুক্ত। তা ছাড়া ভারত লাগোয়া সীমান্ত সুরক্ষায় দায়িত্বও পালন করতে হচ্ছিল তাঁকে। কিন্তু পদপ্রাপ্তির মাত্র এক বছরের মধ্যেই ডোকলামে ভারতীয় বাহিনীর সঙ্গে সংঘাত জড়ান তিনি। তাতে আন্তর্জাতিক মহলে চাপে পড়ে যায় বেজিং।

ভারত, চিন ও ভুটানের সংযোগস্থলে ডোকলামের অবস্থান। এর খুব কাছেই রয়েছে উত্তরবঙ্গের অত্যন্ত সংবেদনশীল শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেন্‌স নেক’। মুরগির গলার মতো দেখতে ওই এলাকাটির সঙ্গে জুড়ে আছে উত্তর-পূর্বের সব ক’টি রাজ্য। তাই জায়গাটার সামরিক গুরুত্ব অপরিসীম। এ-হেন ডোকলামে ২০১৭ সালের জুনে একটি কাঁচা রাস্তার সম্প্রসারণ শুরু করে পিএলএ। সূত্রের খবর, এর নির্দেশ দিয়েছিলেন জেনারেল ঝাও।

সংশ্লিষ্ট উপত্যকা নিয়ে চিন ও ভুটানের মধ্যে আবার সীমান্ত বিবাদ রয়েছে। বেজিঙের দাবি গোটা এলাকা তিব্বতের অংশ। অন্য দিকে, ডোকলামকে নিজেদের অবিচ্ছেদ্য অংশ বলে বরাবর জানিয়ে এসেছে থিম্পু। পিএলএ সেখানে কাঁচা রাস্তা সম্প্রসারণ শুরু করতেই এতে হস্তক্ষেপ করে ভারতীয় সেনা। ফলে দু’পক্ষের মধ্যে বাধে হাতাহাতি। ওই সময় পাথর ছোড়াছুড়িতে আহত হন দু’দিকেরই বেশ কয়েক জন সৈনিক।

এই ঘটনার পর ডোকলাম কব্জা করতে সেনা সমাবেশ করেন ঝাও। পাল্টা বিশাল বাহিনী নিয়ে সেখানে হাজির হন ভারতীয় কমান্ডাররাও। ফলে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে পড়ে দু’পক্ষের সেনা। টানা ৭২ দিন চলে সেই অচলাবস্থা। শেষে পিছু হটে পিএলএ। তার পর থেকেই ‘অপমানের’ শোধ তোলার ফিকির খুঁজতে থাকেন পশ্চিমাঞ্চলীয় থিয়েটার কমান্ডের মাথায় থাকা বেজিঙের ওই জেনারেল।

২০২০ সালে ভারতের সঙ্গে পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া করার সুযোগ পেয়ে যান ঝাও। পূর্ব লাদাখের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা বা এলএসি (লাইন অফ অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোল) বরাবর বেশ কিছু অস্থায়ী সামরিক পরিকাঠামো গড়ে তোলে এ দেশের বাহিনী। আপত্তি জানায় পিএলএ। তখনই নয়াদিল্লির ফৌজকে ‘চরম শিক্ষা’ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন লালফৌজের ওই কমান্ডার। সেইমতো চৈনিক সৈনিকদের আদেশও দেন তিনি।

এর পর জেনারেল ঝাওয়ের নির্দেশে গলওয়ান উপত্যকায় মোতায়েন ভারতীয় সেনার উপর অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে পিএলএ-র একটি দল। কাঁটাতার জড়ানো বিশেষ এক ধরনের ডান্ডা ও ছুরি নিয়ে হামলা করে তারা। সেই আক্রমণে প্রাণ হারান কর্নেল বি সন্তোষ বাবু-সহ মোট ২০ জন সৈনিক। এর পরই পাল্টা প্রত্যাঘাত শানায় এ দেশের ফৌজ। সূত্রের খবর, তাতে মৃত্যু হয় ৩৫-৪০ জনের। যদিও সরকারি ভাবে তা কখনওই স্বীকার করেনি বেজিং।

গলওয়ানকাণ্ডের পর পিএলএ-র ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে ইউএস নিউজ় অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড নামের একটি গণমাধ্যম সংস্থা। সেখানে বলা হয়, সংঘর্ষের সময় চিনা সৈনিকদের বেশ কয়েক জনকে পাহাড়ের উপর থেকে নদীতে ছুড়ে ফেলে দেয় ভারতীয় ফৌজ। পরবর্তী কালে একই কথা বলতে শোনা যায় রাশিয়ার সংবাদমাধ্যম তাসকে। তারা জানায়, গলওয়ান নদীতে ডুবে মৃত্যু হয়েছে বেজিঙের ৪৫ জন সেনার।

প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের দাবি, ভারতের সামনে চিনের সামরিক সক্ষমতাকে তুলে ধরতেই গলওয়ানে হামলার নির্দেশ দিয়ে বসেন জেনারেল ঝাও। এতে ফল যে হিতে বিপরীত হতে পারে, তা এক বারও ভাবেননি তিনি। ওই ঘটনার পর ডোকলামের কায়দায় খুব দ্রুত পূর্ব লাদাখের বিস্তীর্ণ এলাকায় সেনা সমাবেশ করে বেজিং। সমপরিমাণ ফৌজ মোতায়েন করে পাল্টা যুদ্ধের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়ে ফেলে দিল্লিও।

ভারতের সঙ্গে এই সীমান্ত সংঘাতের প্রভাবে ক্ষতবিক্ষত হয় চিনের বৈদেশিক বাণিজ্য। ফলে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে পূর্বাঞ্চলীয় থিয়েটার কমান্ড থেকে জেনারেল ঝাওকে সরাতে বাধ্য হন প্রেসিডেন্ট শি। ওই সময় প্রায় অবসরের বয়সে পৌঁছে গিয়েছিলেন তিনি। বাহিনী থেকে সরিয়ে তাঁকে দলের রাজনৈতিক উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য করেন জিনপিং। বলা বাহুল্য, তা ছিল বেশ নজিরবিহীন সিদ্ধান্ত।

জেনারেল ঝাওকে বাদ দিলে ‘সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশন’-এর পদ খুইয়েছেন জেনারেল পদমর্যাদার ঝ্যাং ইউশিয়া এবং লিউ ঝেনলি। এঁদের মধ্যে প্রথম জন ছিলেন কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান। আর সংগঠনটির জয়েন্ট স্টাফ দফতরের চিফ অফ স্টাফের দায়িত্ব সামলাচ্ছিলেন লিউ। দুর্নীতির অভিযোগে এঁদের সরানো হয়েছে বলে সূত্র মারফত মিলেছে খবর। তবে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি জিনপিং প্রশাসন।

২০১২ সাল থেকে চিন জুড়ে সরকারি মহলে দুর্নীতি দমন অভিযান চালাচ্ছে প্রেসিডেন্ট শি-র প্রশাসন। নিশানায় রয়েছে সামরিক বাহিনীও। অনেকেই একে বেজিঙের ‘শুদ্ধিকরণ’ অভিযান বলে উল্লেখ করছেন। ফলে পিএলএ কমান্ডারদের চাকরি খোয়ানো মোটেই নতুন ঘটনা নয়। তবে, একসঙ্গে তিন জনের অপসারণের নেপথ্যে অন্য কারণ ব্যাখ্যা করেছে পর্যবেক্ষক মহল।

সামরিক বিশ্লেষকদের একাংশের দাবি, গলওয়ান ও ডোকলামের ঘটনায় জিনপিংকে একেবারেই খুশি করতে পারেননি ঝাও। এর মাধ্যমে ভারতকে পুরোপুরি বেকায়দায় ফেলার ইচ্ছে ছিল তাঁর। যদিও বাস্তবে তা হয়নি। উল্টে আন্তর্জাতিক চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় পূর্ব লাদাখের সংঘর্ষে চার জন সৈনিকের মৃত্যুর কথা স্বীকার করে নেয় চিন। ফলে ভেঙে গিয়েছে বেজিঙের ‘সুপার পাওয়ার’ তকমা।

দ্বিতীয়ত, একদলীয় শাসনে থাকা চিনে যখন-তখন ক্ষমতার ভরকেন্দ্র পাল্টে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। তাই সেনা অভ্যুত্থানের আশঙ্কায় এই ধরনের পদক্ষেপ করছেন প্রেসিডেন্ট শি। সাত সদস্যের সেন্ট্রাল মিলিটারি কমিশনে বর্তমানে তিনি ছাড়া রয়েছেন আর মাত্র এক জন। ফলে আগামী দিনে সীমান্তে আগ্রাসী মনোভাব দেখানো বেজিঙের পক্ষে কঠিন হতে চলেছে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

আনন্দবাজার ডট কম