
·অনলাইন শুক্রবার০৪সেপ্টেম্বর ২০২৬
মোহাম্মদ আব্দুল জলিল ছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এমন এক বর্ণিল ব্যক্তিত্ব, যাকে একবাক্যে কেবল ‘রাজনীতিবিদ’ বললে তার বহুমাত্রিক প্রভাবকে কিছুটা আড়ালই করা হয়। চারবারের সংসদ সদস্য, দুই মেয়াদের বাণিজ্যমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক—এসব পরিচয়ের বাইরেও তিনি ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম মাঠপর্যায়ের সংগঠক। ‘নওগাঁর জলিল’ কিংবা বঙ্গবন্ধু প্রদত্ত ‘উত্তরাঞ্চলের জেনারেল’—যে নামেই তাকে ডাকা হোক না কেন, তার সামগ্রিক জীবন ছিল একাধারে অসামান্য সংগঠন ক্ষমতা, দেশপ্রেম এবং নানামুখী রাজনৈতিক টানাপোড়েনের এক বাস্তব আলেখ্য।
১৯৩৯ সালের ২১ জানুয়ারি তৎকালীন নওগাঁ মহকুমার চকপ্রাণ গ্রামে জন্ম নেন আব্দুল জলিল। ব্যবসায়ী ফয়েজউদ্দিন আহমেদ এবং জারিনা ফায়েজের এই সন্তান পারিবারিক ঐতিহ্যগতভাবেই একটি সুপরিচিত মুসলিম পরিবারে বেড়ে ওঠেন। স্থানীয় প্রাথমিক পাঠ শেষে নওগাঁ কে.ডি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৫৭ সালে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করেন। এরপর রাজশাহী কলেজ পার হয়ে ১৯৬০ সালে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখান থেকে ১৯৬৩ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স এবং ১৯৬৪ সালে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন।
উচ্চতর আইনি শিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি লন্ডনের মর্যাদাপূর্ণ লিঙ্কনস ইনে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৬৯ সালে যখন পুরো দেশ বঙ্গবন্ধুর স্বাধিকার আন্দোলনের উত্তালে কাঁপছে, তখন ব্যারিস্টারি পড়ার মোহ ত্যাগ করে তিনি দেশে ফিরে আসেন। প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি সম্পন্ন করার চেয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ গঠনে অংশ নেওয়াকেই তিনি শ্রেয় মনে করেছিলেন।
১৯৭১ সালের মার্চে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঘোষণার পর সমগ্র উত্তরাঞ্চলে মুক্তিযুদ্ধের যে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন আব্দুল জলিল। ২৬ মার্চের পর পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রতিরোধ গড়ে তোলার পাশাপাশি তিনি ভারতে গিয়ে শরণার্থী ও মুক্তিযোদ্ধাদের পুনর্বাসন ও প্রশিক্ষণে আত্মনিয়োগ করেন। বালুরঘাট, বাঙ্গালীপুর, মধুপুর, কামাড়পাড়া ও প্যারিলাতে তিনি একাধিক ট্রেনি ক্যাম্প স্থাপন ও পরিচালনা করেছিলেন। এসব ক্যাম্প থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হাজার হাজার যোদ্ধা নওগাঁ, জয়পুরহাট, দিনাজপুর, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা অঞ্চলের রণাঙ্গনে শত্রু প্রতিরোধে নামেন।
স্বাধীনতার পর তার এই অদম্য সামরিক ও সাংগঠনিক দক্ষতাকে স্মরণ করেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাকে ‘উত্তরাঞ্চলের জেনারেল’ উপাধিতে ভূষিত করেন। মুক্তিযুদ্ধের এই গৌরবোজ্জ্বল স্মারক হিসেবেই পরবর্তীতে তার একক প্রচেষ্টায় নওগাঁয় গড়ে ওঠে ৭১ ফুট উঁচু ‘বিজয় মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতিস্তম্ভ’।
ছাত্র রাজনীতির মধ্য দিয়ে ১৯৫০-এর দশকের শেষভাগে জলিলের রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ বলয়ের মানুষ হিসেবে তিনি দ্রুতই দলের মধ্যে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেন। ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাজশাহী-৮ (বর্তমানে নওগাঁ সদর) আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৭৫ সালে বাকশাল গঠিত হলে তাকে নওগাঁর গভর্নরের দায়িত্ব প্রদান করা হয়।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ট্র্যাজেডির পর সামরিক জান্তা তাকে গ্রেফতার করে। দীর্ঘ চার বছর কারারুদ্ধ থাকার পর ১৯৭৯ সালে মুক্তি পেয়ে তিনি পুনরায় দলের পুনর্গঠনে হাত দেন। ১৯৮১ সালে আওয়ামী লীগের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, ১৯৮৩ সালে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং ১৯৯৩ সালে দলের সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী পর্ষদ প্রেসিডিয়ামে অন্তর্ভুক্ত হন। ১৯৮০-এর দশকে এরশাদবিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তিনি অন্যতম মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। বিশেষ করে ওই সময়ে বিবিসি বাংলা ও ভয়েস অফ আমেরিকায় আওয়ামী লীগের শক্তিশালী মুখপাত্র হিসেবে তিনি পরিচিতি পান। স্থানীয় রাজনীতিতেও তার প্রভাব ছিল একচ্ছত্র; ১৯৮৪ ও ১৯৮৮ সালে পরপর দুবার নওগাঁ পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৬ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপের দায়িত্বও পালন করেন।
১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে ১৯৯৮ সালে তাকে টেকনোক্র্যাট কোটায় বাণিজ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়। ২০০১ ও ২০০৮ সালের নির্বাচনেও তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। এর মধ্যে ২০০২ সালের ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিত ১৯তম কাউন্সিলে তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং ২০০৯ সাল পর্যন্ত এই পদে আসীন থাকেন।
কেবল দলীয় রাজনীতির মাঠেই নয়, দেশের অর্থনীতি ও ব্যাংকিং খাতেও আব্দুল জলিল নিজের স্পষ্ট ছাপ রেখে গেছেন। ১৯৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত মার্কেন্টাইল ব্যাংক লিমিটেডের মূল উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ছিলেন তিনি। পরবর্তীকালে ২০০২ এবং ২০০৯ সালেও তিনি ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। দেশের তৎকালীন উদীয়মান বেসরকারি ব্যাংকিং খাতকে সুসংগঠিত করতে তার এই ভূমিকা প্রশংসিত হয়।
দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে বিতর্কও জলিলের পিছু ছাড়েনি। ২০০৪ সালে তৎকালীন বিএনপি-জোট সরকার পতনের লক্ষ্য নিয়ে তিনি বহুল আলোচিত ‘ট্রাম্প কার্ড’ ও ‘৩০ এপ্রিলের ডেডলাইন’ ঘোষণা করেন। রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ এই কৌশলটি শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয় এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সরকারের পতন না ঘটায় দলের ভেতরে ও বাইরে তার কৌশলগত পরিপক্কতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
পরবর্তীকালে ২০০৭-০৮ সালের সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় তাকে আটক করা হয়। কারাগারে অবস্থানকালে তৎকালীন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনাকে নিয়ে তার কিছু বিতর্কিত মন্তব্য গণমাধ্যমে এলে রাজনৈতিকভাবে তিনি ব্যাকফুটে চলে যান। যদিও মুক্ত হওয়ার পর তিনি দাবি করেছিলেন, তৎকালীন গোয়েন্দা সংস্থার মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের মুখে ওই বক্তব্য আদায় করা হয়েছিল। এই ঘটনার জের ধরে ২০০৯ সালের কাউন্সিলের ঠিক আগে তিনি সাধারণ সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করলেও প্রবীণ এই নেতাকে আর মন্ত্রিসভায় ফিরিয়ে আনা হয়নি—যা তাকে জীবন সায়াহ্নে অনেকটাই কোণঠাসা ও বিষণ্ণ করে তুলেছিল।
জীবনসায়াহ্নে কিডনি ও জটিল হৃদরোগসহ নানা শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন আব্দুল জলিল। তিনবার তার বাইপাস সার্জারি হয়েছিল। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে নওগাঁয় থাকাকালে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লে প্রথমে তাকে ঢাকায় এবং পরবর্তীতে ২৬ ফেব্রুয়ারি সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। মার্চে তার সফল হৃৎপিণ্ডের অস্ত্রোপচার হলেও ডায়ালাইসিসজনিত জটিলতায় তার অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বিকল হতে শুরু করে। চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে ২০১৩ সালের ৬ মার্চ বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ৭৪ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এই জননেতা।
তাকে তার জন্মমাটি নওগাঁর চকপ্রাণ গ্রামের পারিবারিক কবরস্থানে সমাহিত করা হয়। মৃত্যুকালে তিনি দুই স্ত্রী, দুই কন্যা ও দুই পুত্র রেখে যান। তার জ্যেষ্ঠ পুত্র ব্যারিস্টার নিজাম উদ্দিন জলিল জন বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহন করে নওগাঁ সদর আসন থেকেই পরবর্তীতে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন, মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বৈরাচারবিরোধী সংগ্রামের ইতিবৃত্তে ‘নওগাঁর জলিল’ এমন এক নাম, যাকে বাদ দিয়ে উত্তরাঞ্চলের আধুনিক রাজনৈতিক ইতিহাস রচনা প্রায় অসম্ভব।
Mahmudul Hasan Jahid’s Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।





















