, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
গণভবনের ভিডিও ধারণসহ রেকিকরা হয় শাইখ সিরাজের নেতৃত্বে রাহুল-মমতারা মিছিল করে যাবেন সুপ্রিম কোর্টে,মিছিলে গোটা ভারত হাঁটবে। সোমবার দিল্লি পুলিশ পরীক্ষায় রোটন তাঁর বাবার চেহলাম আয়োজনে ও বাধা ফজলে করিম চৌধুরী! আমাদের বিড়ি টানা,হাতাকাটা জামা পরার উপর যতক্ষণ না আক্রমণ আসবে ততোক্ষণ ? এই মানুষ এভাবে পচে গেল কেন? অবশেষে ডিপ স্টেট এবং ইউনূস ও খলিল সাহেবদের সাকসেস! রোটন ভাইয়ের জানাজা পড়তে যাওয়া মুসল্লীদের মসজিদ থেকে বের করে, নির্মম নির্যাতন করেছে বিএনপির ক্যাডাররা!! জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম মুসলিম সভাপতি — বদরুদ্দীন তৈয়বজী পাকিস্তানপন্থী খাঁটি মুসলমান ইনকিলাব মঞ্চ বাবা-মায়ের কাছ থেকে যা শিখেছি ত্রপা মজুমদার

#শেখ রেহানা: ছায়ারও একটি জীবন ছিল

  • প্রকাশের সময় : ১২:৫০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৩০ পড়া হয়েছে

অনলাইন শুক্রবার ২৫সেপ্টেম্বর ২০২৬

#শেখ রেহানা: ছায়ারও একটি জীবন ছিল
(বিগত এক মাস ধরে আমি ছোট আপা, শেখ রেহানার পথ ধরে হাঁটার চেষ্টা করছি। খুঁজে দেখেছি, কীভাবে এক বিশাল ছায়ার নিচে আরেকটি ছায়া হয়ে একটি কিশোরী ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠেছিল, কীভাবে পিতা, পরিবার, দেশ ও ইতিহাসের দুঃস্বপ্ন পেরিয়ে সে নিজের মতো করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছিল। তাঁকে বুঝতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত গল্পের আশ্রয় নিতে হলো। কারণ জীবনের সব কথা সরাসরি বলা যায় না, সব সত্য উচ্চারণেরও প্রয়োজন হয় না। কিছু কথা ফাঁকা রাখতে হয়, কিছু শূন্যতা রেখে দিতে হয় কবিতার মতো, যাতে পাঠক সেই নীরবতার ভেতর নিজের ভাবনা, নিজের প্রশ্ন, নিজের অনুভূতিটুকু বসিয়ে নিতে পারেন।
এই গল্পের নায়িকা পাদপ্রদীপের খুব কাছেই ছিলেন, অথচ কেন যেন তাঁর নিজের মুখটি আলোয় পুরোপুরি ফুটে উঠল না। চারপাশের আলো যত বড় হয়েছে, তাঁর ছায়াটিও তত দীর্ঘ হয়েছে। সেই ছায়ার ভেতর থেকে একজন মানুষকে খুঁজে পাওয়ার এই চেষ্টা।)
লন্ডনের শীতের সন্ধ্যা খুব তাড়াতাড়ি নামে। বিকেল শেষ হওয়ার আগেই জানালার কাচে অন্ধকার জমে ওঠে। বাইরে বৃষ্টি হলে মনে হয়, শহরটা যেন নিজের মুখ মুছে ফেলছে। রাস্তার আলো ভেজা ফুটপাতে পড়ে, গাড়ির চাকা সেই আলোকে কেটে কেটে নিয়ে যায় অন্য কোথাও। শেখ রেহানা জানালার পাশে বসে ছিলেন। টেবিলের ওপর তিনটি জিনিস। একটি পুরোনো ছবি। একটি আদালতের কাগজ। আর মেয়ের একটি ছবি। ছবিতে মেয়েটি হাসছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে। মুখে আত্মবিশ্বাসের হাসি। সেই হাসি দেখে একজন মা একই সঙ্গে গর্বিতও হতে পারেন, আবার ভয়ও পেতে পারেন। রেহানা ছবিটা হাতে তুলে নিলেন। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর খুব আস্তে বললেন, “তুই তো আমার জন্য রাজনীতিতে আসিসনি।” ঘরে কেউ ছিল না। তবু কথাটা যেন কারও কাছে বলা। ছবিটা নামিয়ে তিনি আদালতের কাগজটা হাতে নিলেন। নিজের নামটি চোখে পড়ল। Sheikh Rehana. নামটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তাঁর মনে হলো, এই নামটির চারপাশে কতগুলো অন্য নাম এসে দাঁড়িয়ে আছে। বঙ্গবন্ধুর মেয়ে। শেখ হাসিনার বোন। টিউলিপ সিদ্দিকের মা। কোথাও শুধু শেখ রেহানা নেই। একজন মানুষ নেই। একটি মেয়ের নিজের জীবন নেই। তিনি চোখ বন্ধ করলেন। আর তখন তাঁর বয়স কমে গেল। বহু বছর কমে গেল। তিনি আবার সেই মেয়েটি হয়ে গেলেন, যে জানত না, একটি রাতের পর পৃথিবী আর কখনো আগের মতো থাকবে না।
১৩ সেপ্টেম্বর। ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতাল। শেখ মুজিবুর রহমান ও ফজিলাতুন নেছা মুজিবের সংসারে একটি মেয়ে জন্ম নিল। নাম শেখ রেহানা। তিনি পাঁচ সন্তানের মধ্যে চতুর্থ, বড় বোন শেখ হাসিনা, বড় ভাই শেখ কামাল ও শেখ জামালের পরে এবং ছোট ভাই শেখ রাসেলের আগে। জন্মস্থান ও জন্মতারিখ নিয়ে কিছু প্রকাশিত সূত্রে সাল নিয়ে অমিল আছে, তবে মিটফোর্ড হাসপাতালে তাঁর জন্মের তথ্য একাধিক সূত্রে এসেছে। যে পরিবারে তিনি জন্মেছিলেন, সেই পরিবার সাধারণ কোনো পরিবার ছিল না। বাবা ছিলেন রাজনীতির মানুষ। রাজনীতি তখনও তাঁর কাছে শুধু ক্ষমতার সিঁড়ি নয়, বাঙালির অধিকার ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। জেল তাঁর জীবনের অপরিচিত কোনো শব্দ ছিল না। মা ছিলেন সংসারের কেন্দ্র। স্বামী জেলে গেলে সন্তানদের সামলানো, অর্থের সংকট সামলানো, আত্মীয়স্বজনের কাছে ছুটে যাওয়া, আবার স্বামী বেরিয়ে এলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে সংসারের ভারসাম্য তৈরি করা, এসবই তাঁর জীবনের অংশ ছিল। রেহানার শৈশব তাই অন্য অনেক শিশুর শৈশবের মতো ছিল না। তবু শিশু তো রাজনীতি বোঝে না। সে বাবাকে বাবা হিসেবেই চেনে। মাকে মা হিসেবে। ভাইকে ভাই হিসেবে। বড় বোনকে এমন একজন মানুষ হিসেবে, যার সঙ্গে ঝগড়া করা যায়, আবার কিছুক্ষণ পর একই বিছানায় বসে গল্পও করা যায়। ধানমন্ডির বাড়ির ভেতরে তখন ইতিহাসের চেয়ে বড় ছিল সংসার। সকালে কে আগে উঠবে। কে কার জিনিস নিয়ে গেছে। রাসেল কেন খেতে চাইছে না। কামাল গান করছে। জামাল কী করছে। মা ডাকছেন। বাবা ব্যস্ত। এই ছোট ছোট ঘটনাগুলোই ছিল তাদের পৃথিবী।
তারপর দেশ বদলাল। ১৯৭১ এ যুদ্ধ এলো। পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে পরিবারটি ধানমন্ডির বাড়িতে গৃহবন্দি ছিল। রেহানা তখন কিশোরী। বাইরে যুদ্ধ, ভেতরে আতঙ্ক। একটি কিশোরী মেয়ের কাছে স্বাধীনতা তখন কোনো রাজনৈতিক তত্ত্ব নয়। স্বাধীনতা মানে বাবা আবার বাইরে যাবেন। মা আর ভয় পাবেন না। বাড়ির চারপাশে বন্দুক থাকবে না। ভাইয়েরা স্বাভাবিকভাবে খেলতে পারবে। তারপর দেশ স্বাধীন হলো। বাড়িতে আবার আলো ফিরল। কিন্তু রেহানা তখনও জানতেন না, ইতিহাস তার জন্য আরও একটি রাত রেখে দিয়েছে।
১৯৭৫ সালের জুলাই। দুই বোন জার্মানিতে। শেখ হাসিনার স্বামী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া তখন সেখানে কর্মরত। বোনের সঙ্গে দেখা করতে শেখ রেহানাও গিয়েছিলেন। বিদায়ের সেই ছবিটি যদি কখনো খুব মন দিয়ে দেখা যায়, সেখানে কোনো মৃত্যুর পূর্বাভাস নেই। বাবা আছেন। মা আছেন। তিন ভাই আছেন। দুই ভাবী আছেন। দুই মেয়ে বিদেশে যাচ্ছে। একটি পরিবার জানে না, সেটিই তাদের শেষ পূর্ণ মিলন। পরে শেখ হাসিনা স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, সেদিন তাঁর বাবা-মা, তিন ভাই এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা সবাই বিদায় জানাতে এসেছিলেন। কোনো বিদায়ের মধ্যে ভবিষ্যৎ লেখা থাকে না। মানুষ বিদায় নেয় এই বিশ্বাসে যে ফিরে আসবে। রেহানাও নিশ্চয়ই সেই বিশ্বাসেই গিয়েছিলেন। ১৪ আগস্ট তিনি বাবাকে চিঠি লিখলেন। ছোট ভাই রাসেলের কথাও লিখলেন। জার্মানির প্রকৃতি কেমন, তারা কী দেখেছেন, সেইসব সাধারণ কথা। রাসেল যেন ঠিকমতো খায়, বিশ্রাম নেয়, নিজের যত্ন নেয়, সেই কথাও ছিল। চিঠির সঙ্গে কিছু পোস্টকার্ডও পাঠিয়েছিলেন। চিঠিটি তখনও পথে। ঢাকার ধানমন্ডিতে আরেকটি রাত নামছিল। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫।
ভোরের ঢাকা। সেনা সদস্যরা ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে হামলা চালাল। শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হলেন। নিহত হলেন শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব। শেখ কামাল। শেখ জামাল। শেখ রাসেল। সুলতানা কামাল। রোজী জামাল। শেখ নাসেরসহ পরিবারের আরও সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনও সেই হত্যাকাণ্ডে নিহত হন। দুই বোন বেঁচে গেলেন। কারণ তাঁরা তখন দেশের বাইরে। এই বেঁচে যাওয়ার মধ্যে কোনো আনন্দ ছিল না। ছিল একটি অদ্ভুত শূন্যতা। যে মানুষগুলোকে আগের দিন পর্যন্ত ফোন করা যেত, তাদের আর কেউ ফোন ধরবে না। যে মাকে বলা যেত, “মা, আমি এসেছি”, তিনি আর দরজা খুলবেন না। যে ছোট ভাইকে বলা যেত, “রাসেল, খেয়েছিস?”, সে আর কোনোদিন উত্তর দেবে না।
বহু বছর পর ১৯৮৩ সালের একটি সাক্ষাৎকারে শেখ রেহানা সেই রাতের কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন, তাঁর মনে হয়েছিল, ১৫ আগস্ট তাঁর জীবনটিও নিয়ে নেওয়া হলে ভালো হতো। তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, রাসেলের দোষ কী ছিল, তাঁর মায়ের দোষ কী ছিল। তিনি নিজেকে বলেছিলেন অনাথ, অসহায়। একই সাক্ষাৎকারে তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার দাবি করেন। এই একটি শব্দ তাঁর জীবনের গভীরে গিয়ে বসে আছে। অসহায়। কিন্তু পৃথিবী তাঁকে অসহায় থাকার সুযোগও দেয়নি। বেঁচে থাকার জন্য মানুষকে কখনো কখনো নিজের শোককে পাশে সরিয়ে রাখতে হয়। শোক পরে করা যাবে। এখন বাঁচতে হবে।
১৯৭৫-এর পর দুই বোন আর দেশে ফিরতে পারলেন না। বাংলাদেশে তখন তাঁদের পরিবারের ওপর নেমে এসেছে রাজনৈতিক ও আইনি অন্ধকার। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর হত্যাকারীদের দায়মুক্তি দেওয়ার জন্য ইনডেমনিটি ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। দুই বোনের দেশে ফেরার সুযোগও দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল। তাঁরা ১৯৮১ সালে দেশে ফেরেন। কিন্তু তার আগে রেহানার সামনে ছিল আরেকটি বাস্তবতা। লন্ডন। ১৯৭৬ সালে তিনি সেখানে যান।
সে সময় লন্ডনের কিলবার্নে তাঁর জীবন ছিল নিরাপত্তাহীন। বহু বছর পরে তাঁর নিজের কথায় জানা যায়, তিনি সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চাকরি খুঁজতেন। থাকার জায়গা ছিল না। খাবারের নিশ্চয়তা ছিল না। কোথায় যাবেন, কী করবেন, তিনি জানতেন না। ১৯৭৭ সালে কিলবার্নেই ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিকের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।
এখানে ইতিহাসের সঙ্গে মানুষের জীবনের একটি নির্মম পার্থক্য আছে। বাংলাদেশে তখন কেউ তাঁকে দেখছে বঙ্গবন্ধুর মেয়ে হিসেবে। কেউ দেখছে শহীদের পরিবারের সন্তান হিসেবে। কেউ হয়তো ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হিসেবে। কিন্তু কিলবার্নের একটি রাস্তায় চাকরি খুঁজতে থাকা তরুণীটির কাছে তখন কোনো উপাধির দাম ছিল না। তার দরকার ছিল একটি ঘর। কিছু খাবার। একটি নিরাপদ আগামীকাল। মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের পরেও জীবন তার ছোট ছোট দাবি নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়।
শোক করার সময় নেই। কারণ ঘর দরকার। খাবার দরকার। সন্তান হবে। সংসার হবে। জীবন চলবে। একজন মৃত বাবার মেয়ে তখন জীবিত পৃথিবীর কাছে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। এভাবেই মানুষ বেঁচে থাকে। বড় কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে নয়। কখনো শুধু পরের সকাল পর্যন্ত পৌঁছে গিয়ে।
১৯৭৯ সালে শেখ রেহানা আবার প্রকাশ্যে সামনে এলেন। স্টকহোমে তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার দাবিতে একটি সম্মেলন ও বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। সেখানে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের দাবি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার চেষ্টা হয়। সমসাময়িক স্মৃতিচারণ ও পরবর্তী গবেষণামূলক প্রতিবেদনে ১০ মে ১৯৭৯ স্টকহোমে তাঁর অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ আছে। এই ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রেহানাকে শুধু একটি ঘরের ভেতর কাঁদতে থাকা নারী হিসেবে দেখলে তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়। তিনি চুপ ছিলেন না। তিনি বিচার চেয়েছিলেন। তিনি তাঁর বাবার হত্যার কথা বলেছেন। কিন্তু তাঁর রাজনীতি কখনো বোনের রাজনীতির মতো প্রকাশ্য ও কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠেনি। দুই বোনের জীবন তখন ধীরে ধীরে আলাদা পথে হাঁটছে। একজনের সামনে বাংলাদেশ। অন্যজনের সামনে লন্ডন। একজনের সামনে মিছিল, দল, নির্বাচন, রাষ্ট্র। অন্যজনের সামনে সংসার, সন্তান, পরিবার, স্মৃতি। কিন্তু তাদের মাঝখানে একটি অদৃশ্য সুতো টানটান হয়ে রইল। রক্তের সুতো। শোকের সুতো। ইতিহাসের সুতো।
১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলেন। ১৭ মে। দীর্ঘ নির্বাসনের পর। তারপর বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস নতুন দিকে বাঁক নিল। শেখ হাসিনা ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মুখ হয়ে উঠলেন। বোনের জীবন যত বড় হতে থাকল, রেহানার নিজের পরিচয় ততই একটি অদ্ভুত সমস্যায় পড়ল। তিনি ছিলেন না প্রধানমন্ত্রী। ছিলেন না মন্ত্রী। ছিলেন না সংসদ সদস্য। কোনো সরকারি পদে ছিলেন না। তবু তিনি শেখ হাসিনার বোন। এই পরিচয়টি কখনো তাঁর কাছ থেকে আলাদা হলো না। মানুষের চোখে তিনি নিজে যতটা, তার চেয়ে বেশি হয়ে উঠলেন অন্য একজনের সঙ্গে সম্পর্ক। এটাই ছায়ার সমস্যা। ছায়া কখনো একা হাঁটে না। আলো যেদিকে যায়, সে সেদিকেই যায়। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে রেহানার নামও বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক আলোচনায় এসেছে। তাঁকে শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ পারিবারিক ও রাজনৈতিক পরিসরের মানুষ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু তাঁর নিজের কোনো সাংবিধানিক পদ ছিল না। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ক্ষমতার পাশে থাকা আর ক্ষমতার পদে থাকা এক জিনিস নয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের চোখে দুটির দূরত্ব অনেক সময় থাকে না। আর এখানেই রেহানার জীবনের ট্র্যাজেডি আরও জটিল হয়ে ওঠে। তিনি যদি কিছু বলেন, মানুষ ভাবতে পারে তিনি ক্ষমতার পক্ষ থেকে বলছেন। তিনি যদি চুপ থাকেন, মানুষ ভাবতে পারে তাঁর বলার কিছু নেই। তিনি যদি বোনের পাশে থাকেন, বলা যায় তিনি ক্ষমতার অংশ। তিনি যদি দূরে থাকেন, প্রশ্ন উঠতে পারে কেন দূরে। নিজের মত কী? নিজের সিদ্ধান্ত কী? নিজের জীবন কোথায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ইতিহাস খুব কমই খোঁজে।
তারপর এল সন্তানদের জীবন। মেয়ে টিউলিপ। মা তাঁকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন। এটা টিউলিপ নিজেই পরে বলেছেন। কারণ তিনি তাঁর মায়ের জীবন দেখেছিলেন। রাজনীতি তাঁর মায়ের পরিবার কেড়ে নিয়েছে। বাবাকে কেড়ে নিয়েছে। মাকে কেড়ে নিয়েছে। ভাইদের কেড়ে নিয়েছে। দেশ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। লন্ডনের রাস্তায় কাজ খুঁজতে বাধ্য করেছে। তাই মেয়ে যখন রাজনীতির দিকে হাঁটতে চাইল, একজন মা হয়তো নিজের অতীতের দিকে তাকিয়েছিলেন। বলেছিলেন, এই পথটা নয়। অন্য কোনো পথ বেছে নে। কিন্তু সন্তানকে নিজের ভয়ের ভেতরে সারাজীবন আটকে রাখা যায় না। টিউলিপ নিজের পথ বেছে নিলেন। ২০১৫ সালে তিনি প্রথম ব্রিটিশ এমপি নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি নতুন সীমানার Hampstead and Highgate আসন থেকে আবার নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি ব্রিটিশ হাউস অব কমন্সের সদস্য। ২০২৪ সালের পর তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় আরও বড় হলো। তিনি ব্রিটিশ সরকারের অর্থনৈতিক সচিবের দায়িত্ব পেলেন। ৯ জুলাই ২০২৪ থেকে ১৪ জানুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত তিনি Economic Secretary to the Treasury ছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতি তাঁকে ছাড়ল না। কখনোই পুরোপুরি ছাড়েনি। কারণ একজন ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ হয়েও তাঁর পারিবারিক পরিচয় বাংলাদেশের সঙ্গে বাঁধা। তাঁর মা শেখ রেহানা। তাঁর খালা শেখ হাসিনা। তাঁর নানা শেখ মুজিবুর রহমান। যে দেশ তাঁর জন্মভূমি নয়, সেই দেশের রাজনীতিও একসময় তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অংশ হয়ে গেল।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে টিউলিপ সিদ্দিকের ওপর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে ব্রিটেনে প্রশ্ন উঠতে থাকে। তিনি নিজেই যুক্তরাজ্যের Independent Adviser on Ministerial Standards-এর কাছে বিষয়টি পাঠান। তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে Ministerial Code ভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং তাঁর আর্থিক সম্পদ অবৈধ উৎস থেকে এসেছে, এমন প্রমাণও উপদেষ্টা পাননি। তবে সম্পত্তি-সংক্রান্ত কিছু বিষয়ে পুরোনো নথির সীমাবদ্ধতার কারণে সব প্রশ্নের সম্পূর্ণ নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব হয়নি। টিউলিপ ১৪ জানুয়ারি ২০২৫ মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। একজন মা হিসেবে রেহানা তখন কী অনুভব করেছিলেন, তার নির্ভরযোগ্য কোনো ব্যক্তিগত বর্ণনা আমাদের হাতে নেই। গল্পকার এখানে অনুমান করতে পারে। কিন্তু ইতিহাসের নামে অনুমানকে সত্য বলা যায় না। তাই আমরা শুধু ভাবতে পারি। একজন মা নিজের জীবনের যে ইতিহাস থেকে মেয়েকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন, সেই ইতিহাসই যদি একদিন মেয়ের দরজায় গিয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই মায়ের ভেতরে কী হয়? তিনি কি আবার ১৯৭৫ দেখতে পান? একজন বাবা হারানোর রাত? একটি পরিবার হারানোর রাত? নাকি তিনি শুধু মেয়ের মুখ দেখেন? একজন মা তখন রাজনীতির ভাষা বোঝেন না। তিনি শুধু সন্তানের মুখ বোঝেন।
তারপর বাংলাদেশে আবার বড় পরিবর্তন এল। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়েন এবং দেশ ত্যাগ করেন। তারপর তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা শুরু হয়। শেখ রেহানার বিরুদ্ধেও দুর্নীতির মামলা হয়। এবার তাঁর নাম শুধু রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হিসেবে নয়, একটি ফৌজদারি মামলার আসামি হিসেবেও সংবাদপত্রে ফিরে এল। ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দ-সংক্রান্ত একটি মামলায় শেখ রেহানাকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেয়। একই মামলায় শেখ হাসিনাকে পাঁচ বছর এবং টিউলিপ সিদ্দিককে দুই বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনজনকেই এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়। মামলাটি তাঁদের অনুপস্থিতিতে পরিচালিত হয়েছিল। আদালত শেখ রেহানার নামে বরাদ্দ হওয়া ১০ কাঠা প্লট বাতিলেরও নির্দেশ দেয়।
এই জায়গায় একজন গল্পকারের কলম খুব সাবধানে চলা উচিত। কারণ সহানুভূতি আর খালাস এক জিনিস নয়। একজন মানুষের শৈশবের দুঃখ তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে মুছে দেয় না। আবার কোনো মামলার রায়ও তাঁর পুরো জীবনকে ব্যাখ্যা করে না। একজন মানুষ একই সঙ্গে নিজের জীবনের শিকার হতে পারেন, আবার নিজের জীবনের কিছু সিদ্ধান্তের জন্য জবাবদিহিও করতে পারেন।
মানুষ এত সরল নয়। সাহিত্যও হওয়া উচিত নয়। রেহানার প্রতি সহানুভূতি মানে তাঁর জীবনের সব রাজনৈতিক বা আইনি প্রশ্নকে অস্বীকার করা নয়। সহানুভূতি মানে শুধু এইটুকু দেখা যে, একজন মানুষও তাঁর নিজের গল্পের মধ্যে একটি মানুষ ছিলেন।
রেহানা আবার মেয়ের ছবির দিকে তাকালেন। টিউলিপ। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য। নিজের রাজনৈতিক জীবন আছে। নিজের সংসদ আছে। নিজের নির্বাচনী এলাকা আছে। নিজের ভোটার আছে। নিজের বক্তৃতা আছে। নিজের ভুলও আছে, নিজের সাফল্যও আছে। কিন্তু তার পেছনে আরও কয়েকটি নাম দাঁড়িয়ে আছে। শেখ মুজিবুর রহমান। শেখ হাসিনা। শেখ রেহানা। একজন মানুষ নিজের নামের আগে যত নাম বহন করে, নিজের জন্য জায়গা তত ছোট হয়ে যায়। রেহানা এই কষ্টটি বুঝবেন না, তা কীভাবে সম্ভব? তিনি নিজেই তো সারাজীবন অন্য নামের পাশে দাঁড়িয়ে থেকেছেন। প্রথমে বাবার মেয়ে। তারপর বোনের বোন। তারপর মেয়ের মা। মাঝখানে কোথাও একটি নারী ছিল। তার নিজের কিছু স্বপ্ন ছিল কি? আমরা জানি না। সে কী হতে চেয়েছিল? জানি না। সে কি কোনোদিন চেয়েছিল, এমন একটি জীবন যেখানে কেউ তাকে চিনবে না? জানি না। ইতিহাস এই প্রশ্নগুলো সংরক্ষণ করেনি। ইতিহাস সাধারণত বিজয়ীদের তারিখ সংরক্ষণ করে। পরাজিতদের কান্না নয়। ক্ষমতাবানদের বক্তৃতা সংরক্ষণ করে। একজন নারীর অসম্পূর্ণ স্বপ্ন নয়।
সেদিন রাতে রেহানা আয়নার সামনে দাঁড়ালেন। বয়সের রেখাগুলো মুখে গভীর হয়েছে। চোখের চারপাশে সময় বসে আছে। তিনি আয়নায় তাকিয়ে হঠাৎ ভাবলেন, ছোটবেলায় তিনি কী হতে চেয়েছিলেন? কেউ কি তাঁকে কখনো সেই প্রশ্ন করেছিল? তিনি কি নিজের জন্য কোনো জীবন কল্পনা করেছিলেন? কোনো পেশা? কোনো শহর? কোনো এমন ঘর, যেখানে দরজায় তাঁর বাবার নাম থাকবে না, বোনের নাম থাকবে না, মেয়ের নাম থাকবে না? যেখানে তিনি শুধু রেহানা? তিনি উত্তর পেলেন না। শুধু মনে হলো, জীবনে তাঁর সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা কোনো পদ না পাওয়া নয়। কোনো ক্ষমতা না পাওয়া নয়। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় না পাওয়াও নয়। তাঁর অপূর্ণতা আরও সাধারণ। তিনি হয়তো নিজের মতো করে বাঁচার যথেষ্ট সময় পাননি। একজন মানুষের জীবনে নিজের মতো করে বাঁচার সময়টুকুই তো সবচেয়ে মূল্যবান। কেউ সেটা কেড়ে নিলে মানুষ বাইরে থেকে যত সফলই দেখাক, ভেতরে কোথাও একটি ঘর খালি থাকে। রেহানার সেই ঘরটি হয়তো আজও খালি।
তিনি আবার টেবিলের কাছে এলেন। পুরোনো ছবিটা তুলে নিলেন। ছবিতে বাবা। কাছেই মা। ভাইয়েরা। ছোট্ট রাসেল। আর তিনি। ছবির সবাই যেন জীবিত। ছবির ভেতর কেউ জানে না সামনে কী আসছে। কেউ জানে না, কয়েক বছরের মধ্যে এই ছবিটি জীবনের চেয়ে বড় হয়ে যাবে। তিনি ছবিটা বুকে চেপে ধরলেন। তারপর মেয়ের ছবির দিকে তাকালেন। দুটি ছবি। একটিতে তাঁর অতীত। অন্যটিতে তাঁর ভবিষ্যৎ। মাঝখানে তিনি নিজে। একটি সেতুর মতো। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন নাম, স্মৃতি, রক্ত, শোক, গর্ব, অভিযোগ, সন্দেহ এবং ভালোবাসা। কিন্তু সেতুর নিজের কোনো গন্তব্য থাকে না। সে শুধু অন্যদের পার করে দেয়।
বাইরে তখন বৃষ্টি থেমে গেছে। রাস্তায় পানি জমে আছে। আলো এসে সেই পানিতে পড়েছে। রেহানা জানালার সামনে দাঁড়ালেন। কাচে তাঁর প্রতিবিম্ব দেখা গেল। তিনি একটু নড়লেন। প্রতিবিম্বও নড়ল। কিন্তু তার পেছনে আরেকটি অন্ধকার আকৃতি। ছায়া। তিনি অনেকক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। হঠাৎ তাঁর মনে হলো, এতদিন তিনি যে ছায়াটাকে নিজের বলে ভেবেছেন, সেটি আসলে তাঁর নিজের নয়। সেটা বাবার ছায়া। তারপর বোনের। তারপর মেয়ের। তাঁর নিজের ছায়াটা কোথায়? তিনি জানেন না। হয়তো কোনোদিন জানতেও পারবেন না। তবু তিনি জানালাটা খুললেন। ঠান্ডা বাতাস ঘরে ঢুকে পড়ল। তিনি চোখ বন্ধ করলেন। অনেক মৃত্যু পেরিয়ে। অনেক নির্বাসন পেরিয়ে। অনেক বছর বোনের পাশে থেকেও নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করতে না পারার ভার পেরিয়ে। অনেক অভিযোগ পেরিয়ে। অনেক সন্দেহ পেরিয়ে। একজন মানুষ তখনও বেঁচে আছেন। এটাই হয়তো তাঁর জীবনের সবচেয়ে সাধারণ অথচ সবচেয়ে কঠিন অর্জন। তিনি বেঁচে আছেন। সবকিছুর পরেও। বাবাকে হারিয়ে। মাকে হারিয়ে। ভাইদের হারিয়ে। দেশ থেকে দূরে থেকে। লন্ডনের রাস্তায় কাজ খুঁজে। সংসার করে। সন্তান বড় করে। বোনের রাজনৈতিক জীবনের বিশাল ছায়ার নিচে নিজের আলাদা জীবনটাকে যতটুকু সম্ভব বাঁচিয়ে রেখে। তারপর সেই একই রাজনীতির ঢেউ যখন তাঁর মেয়ের দরজায় গিয়ে আঘাত করল, তখন আবার তিনি একজন মা হয়ে দাঁড়ালেন। এই জায়গায় এসে তাঁর জীবনের ট্র্যাজেডি সবচেয়ে সম্পূর্ণ হয়। যে নারী নিজের মেয়েকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত তাঁর মেয়ের জীবনেও বাংলাদেশের রাজনীতি ঢুকে পড়ল। ইতিহাস যেন তাঁকে বলল, তুমি যেখানেই যাও, আমি তোমার সঙ্গে যাব।
হয়তো শেখ রেহানার প্রতি সহানুভূতির সবচেয়ে বড় কারণ তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় নয়। বরং তাঁর জীবনের সেই অংশ, যেখানে তিনি অন্য সবার মতো একজন সাধারণ মানুষ হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পারেননি। তিনি কোনোদিন নিজের বাবার মৃত্যুকে অতিক্রম করতে পারেননি। কেউ পারে কি? তিনি নিজের মাকে ভুলতে পারেননি। কেউ পারে কি? তিনি রাসেলের কথা ভুলতে পারেননি। কেউ পারে কি? তিনি দেশ থেকে দূরে গিয়েও দেশকে ছাড়তে পারেননি। তিনি বোনের জীবন থেকে আলাদা হতে চাইলেও বোনের জীবন তাঁকে ছাড়েনি। তিনি নিজের মেয়েকে নিজের অতীত থেকে বাঁচাতে চাইলেও অতীত মেয়ের জীবনেও পৌঁছে গেল। একজন মানুষ কতবার নতুন করে জীবন শুরু করতে পারে? রেহানা হয়তো বহুবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রতিবারই পেছন থেকে কোনো একটি নাম এসে তাঁকে ধরে ফেলেছে। বাবা। বোন। দেশ। মেয়ে। ইতিহাস।
রাত আরও গভীর হলো। রেহানা জানালার সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন। লন্ডনের রাস্তা ধীরে ধীরে ফাঁকা হচ্ছে। দূরে একটি বাস চলে গেল। ভেজা রাস্তায় তার আলো কিছুক্ষণ রয়ে গেল। তারপর মিলিয়ে গেল। রেহানা জানালা বন্ধ করলেন। পুরোনো ছবিটা তুলে রাখলেন। আদালতের কাগজটা ভাঁজ করলেন। মেয়ের ছবিটা শেষবারের মতো দেখলেন। তারপর ছবিটা বুকে চেপে ধরলেন। একজন মা তখন রাজনীতির ভাষা বোঝেন না। তিনি শুধু সন্তানের মুখ বোঝেন। তিনি জানেন না ইতিহাস তাঁর পরিবারকে কী নামে ডাকবে। তিনি জানেন না মানুষ তাঁকে কী চোখে দেখবে। তিনি জানেন না ভবিষ্যৎ তাঁর জন্য কী লিখে রেখেছে তিনি শুধু জানেন, জীবন যতবার তাঁকে মাটিতে ফেলেছে, ততবার কোনোভাবে তিনি উঠে দাঁড়িয়েছেন হয়তো এটাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য। তিনি ক্ষমতার মানুষ কি না, ইতিহাস তার বিচার করবে। তিনি কোনো সিদ্ধান্তে কতটা জড়িত ছিলেন, আদালত তার বিচার করবে। তিনি বোনের কতটা কাছাকাছি ছিলেন, রাজনৈতিক ইতিহাস তার হিসাব রাখবে। কিন্তু একজন মেয়ে হিসেবে, একজন বোন হিসেবে, একজন মা হিসেবে, একজন মানুষ হিসেবে তাঁর ভেতরের যে দীর্ঘ শোক, তার কোনো আদালত নেই।
সেই শোকের কোনো রায় নেই। সেই শোকের কোনো সাজা নেই। শুধু একটি দীর্ঘ জীবন আছে। আর সেই জীবনের শেষে দাঁড়িয়ে একজন নারী নিজের ছায়াকে খুঁজছেন। হয়তো তিনি কোনোদিন নিজের ছায়াকে পুরোপুরি খুঁজে পাবেন না। হয়তো সেটি তাঁর বাবার ছায়ার নিচে চাপা পড়ে থাকবে। হয়তো বোনের ছায়া তাকে ঢেকে রাখবে। হয়তো মেয়ের ভবিষ্যৎ আবার সেই ছায়াকে অন্যদিকে নিয়ে যাবে। তবু কোনো এক গভীর রাতে, যখন সব শব্দ থেমে যাবে, তখন তিনি হয়তো নিজের ভেতর থেকে একটি খুব ছোট্ট কণ্ঠ শুনতে পাবেন।
কেউ বলছে, “আমি তো শুধু রেহানা হতে চেয়েছিলাম।” এই কথাটির কোনো রাজনৈতিক অর্থ নেই। কোনো দল নেই। কোনো পক্ষ নেই। কোনো স্লোগান নেই। আছে শুধু একজন মানুষের অসম্পূর্ণ জীবনের দীর্ঘশ্বাস। আর তখন হয়তো বোঝা যাবে, ছায়া শুধু আলোর অভাব নয়। ছায়ারও একটি জীবন থাকে। কেউ তাকে দেখে না। কেউ তার নাম ধরে ডাকে না। কেউ তার জন্য আলাদা করে ইতিহাস লেখে না। তবু সে সারাজীবন পাশে থাকে। নিঃশব্দে। অবিচলভাবে। একজন মানুষের মতো। শেখ রেহানার মতো।

আবু মকসুদ Abu Maksud’s Post

মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।

জনপ্রিয়

গণভবনের ভিডিও ধারণসহ রেকিকরা হয় শাইখ সিরাজের নেতৃত্বে

#শেখ রেহানা: ছায়ারও একটি জীবন ছিল

প্রকাশের সময় : ১২:৫০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

অনলাইন শুক্রবার ২৫সেপ্টেম্বর ২০২৬

#শেখ রেহানা: ছায়ারও একটি জীবন ছিল
(বিগত এক মাস ধরে আমি ছোট আপা, শেখ রেহানার পথ ধরে হাঁটার চেষ্টা করছি। খুঁজে দেখেছি, কীভাবে এক বিশাল ছায়ার নিচে আরেকটি ছায়া হয়ে একটি কিশোরী ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠেছিল, কীভাবে পিতা, পরিবার, দেশ ও ইতিহাসের দুঃস্বপ্ন পেরিয়ে সে নিজের মতো করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছিল। তাঁকে বুঝতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত গল্পের আশ্রয় নিতে হলো। কারণ জীবনের সব কথা সরাসরি বলা যায় না, সব সত্য উচ্চারণেরও প্রয়োজন হয় না। কিছু কথা ফাঁকা রাখতে হয়, কিছু শূন্যতা রেখে দিতে হয় কবিতার মতো, যাতে পাঠক সেই নীরবতার ভেতর নিজের ভাবনা, নিজের প্রশ্ন, নিজের অনুভূতিটুকু বসিয়ে নিতে পারেন।
এই গল্পের নায়িকা পাদপ্রদীপের খুব কাছেই ছিলেন, অথচ কেন যেন তাঁর নিজের মুখটি আলোয় পুরোপুরি ফুটে উঠল না। চারপাশের আলো যত বড় হয়েছে, তাঁর ছায়াটিও তত দীর্ঘ হয়েছে। সেই ছায়ার ভেতর থেকে একজন মানুষকে খুঁজে পাওয়ার এই চেষ্টা।)
লন্ডনের শীতের সন্ধ্যা খুব তাড়াতাড়ি নামে। বিকেল শেষ হওয়ার আগেই জানালার কাচে অন্ধকার জমে ওঠে। বাইরে বৃষ্টি হলে মনে হয়, শহরটা যেন নিজের মুখ মুছে ফেলছে। রাস্তার আলো ভেজা ফুটপাতে পড়ে, গাড়ির চাকা সেই আলোকে কেটে কেটে নিয়ে যায় অন্য কোথাও। শেখ রেহানা জানালার পাশে বসে ছিলেন। টেবিলের ওপর তিনটি জিনিস। একটি পুরোনো ছবি। একটি আদালতের কাগজ। আর মেয়ের একটি ছবি। ছবিতে মেয়েটি হাসছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সামনে দাঁড়িয়ে। মুখে আত্মবিশ্বাসের হাসি। সেই হাসি দেখে একজন মা একই সঙ্গে গর্বিতও হতে পারেন, আবার ভয়ও পেতে পারেন। রেহানা ছবিটা হাতে তুলে নিলেন। অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। তারপর খুব আস্তে বললেন, “তুই তো আমার জন্য রাজনীতিতে আসিসনি।” ঘরে কেউ ছিল না। তবু কথাটা যেন কারও কাছে বলা। ছবিটা নামিয়ে তিনি আদালতের কাগজটা হাতে নিলেন। নিজের নামটি চোখে পড়ল। Sheikh Rehana. নামটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে তাঁর মনে হলো, এই নামটির চারপাশে কতগুলো অন্য নাম এসে দাঁড়িয়ে আছে। বঙ্গবন্ধুর মেয়ে। শেখ হাসিনার বোন। টিউলিপ সিদ্দিকের মা। কোথাও শুধু শেখ রেহানা নেই। একজন মানুষ নেই। একটি মেয়ের নিজের জীবন নেই। তিনি চোখ বন্ধ করলেন। আর তখন তাঁর বয়স কমে গেল। বহু বছর কমে গেল। তিনি আবার সেই মেয়েটি হয়ে গেলেন, যে জানত না, একটি রাতের পর পৃথিবী আর কখনো আগের মতো থাকবে না।
১৩ সেপ্টেম্বর। ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতাল। শেখ মুজিবুর রহমান ও ফজিলাতুন নেছা মুজিবের সংসারে একটি মেয়ে জন্ম নিল। নাম শেখ রেহানা। তিনি পাঁচ সন্তানের মধ্যে চতুর্থ, বড় বোন শেখ হাসিনা, বড় ভাই শেখ কামাল ও শেখ জামালের পরে এবং ছোট ভাই শেখ রাসেলের আগে। জন্মস্থান ও জন্মতারিখ নিয়ে কিছু প্রকাশিত সূত্রে সাল নিয়ে অমিল আছে, তবে মিটফোর্ড হাসপাতালে তাঁর জন্মের তথ্য একাধিক সূত্রে এসেছে। যে পরিবারে তিনি জন্মেছিলেন, সেই পরিবার সাধারণ কোনো পরিবার ছিল না। বাবা ছিলেন রাজনীতির মানুষ। রাজনীতি তখনও তাঁর কাছে শুধু ক্ষমতার সিঁড়ি নয়, বাঙালির অধিকার ও আত্মপরিচয়ের প্রশ্ন। জেল তাঁর জীবনের অপরিচিত কোনো শব্দ ছিল না। মা ছিলেন সংসারের কেন্দ্র। স্বামী জেলে গেলে সন্তানদের সামলানো, অর্থের সংকট সামলানো, আত্মীয়স্বজনের কাছে ছুটে যাওয়া, আবার স্বামী বেরিয়ে এলে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে সংসারের ভারসাম্য তৈরি করা, এসবই তাঁর জীবনের অংশ ছিল। রেহানার শৈশব তাই অন্য অনেক শিশুর শৈশবের মতো ছিল না। তবু শিশু তো রাজনীতি বোঝে না। সে বাবাকে বাবা হিসেবেই চেনে। মাকে মা হিসেবে। ভাইকে ভাই হিসেবে। বড় বোনকে এমন একজন মানুষ হিসেবে, যার সঙ্গে ঝগড়া করা যায়, আবার কিছুক্ষণ পর একই বিছানায় বসে গল্পও করা যায়। ধানমন্ডির বাড়ির ভেতরে তখন ইতিহাসের চেয়ে বড় ছিল সংসার। সকালে কে আগে উঠবে। কে কার জিনিস নিয়ে গেছে। রাসেল কেন খেতে চাইছে না। কামাল গান করছে। জামাল কী করছে। মা ডাকছেন। বাবা ব্যস্ত। এই ছোট ছোট ঘটনাগুলোই ছিল তাদের পৃথিবী।
তারপর দেশ বদলাল। ১৯৭১ এ যুদ্ধ এলো। পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে পরিবারটি ধানমন্ডির বাড়িতে গৃহবন্দি ছিল। রেহানা তখন কিশোরী। বাইরে যুদ্ধ, ভেতরে আতঙ্ক। একটি কিশোরী মেয়ের কাছে স্বাধীনতা তখন কোনো রাজনৈতিক তত্ত্ব নয়। স্বাধীনতা মানে বাবা আবার বাইরে যাবেন। মা আর ভয় পাবেন না। বাড়ির চারপাশে বন্দুক থাকবে না। ভাইয়েরা স্বাভাবিকভাবে খেলতে পারবে। তারপর দেশ স্বাধীন হলো। বাড়িতে আবার আলো ফিরল। কিন্তু রেহানা তখনও জানতেন না, ইতিহাস তার জন্য আরও একটি রাত রেখে দিয়েছে।
১৯৭৫ সালের জুলাই। দুই বোন জার্মানিতে। শেখ হাসিনার স্বামী ড. এম এ ওয়াজেদ মিয়া তখন সেখানে কর্মরত। বোনের সঙ্গে দেখা করতে শেখ রেহানাও গিয়েছিলেন। বিদায়ের সেই ছবিটি যদি কখনো খুব মন দিয়ে দেখা যায়, সেখানে কোনো মৃত্যুর পূর্বাভাস নেই। বাবা আছেন। মা আছেন। তিন ভাই আছেন। দুই ভাবী আছেন। দুই মেয়ে বিদেশে যাচ্ছে। একটি পরিবার জানে না, সেটিই তাদের শেষ পূর্ণ মিলন। পরে শেখ হাসিনা স্মৃতিচারণ করে বলেছেন, সেদিন তাঁর বাবা-মা, তিন ভাই এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা সবাই বিদায় জানাতে এসেছিলেন। কোনো বিদায়ের মধ্যে ভবিষ্যৎ লেখা থাকে না। মানুষ বিদায় নেয় এই বিশ্বাসে যে ফিরে আসবে। রেহানাও নিশ্চয়ই সেই বিশ্বাসেই গিয়েছিলেন। ১৪ আগস্ট তিনি বাবাকে চিঠি লিখলেন। ছোট ভাই রাসেলের কথাও লিখলেন। জার্মানির প্রকৃতি কেমন, তারা কী দেখেছেন, সেইসব সাধারণ কথা। রাসেল যেন ঠিকমতো খায়, বিশ্রাম নেয়, নিজের যত্ন নেয়, সেই কথাও ছিল। চিঠির সঙ্গে কিছু পোস্টকার্ডও পাঠিয়েছিলেন। চিঠিটি তখনও পথে। ঢাকার ধানমন্ডিতে আরেকটি রাত নামছিল। ১৫ আগস্ট ১৯৭৫।
ভোরের ঢাকা। সেনা সদস্যরা ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে হামলা চালাল। শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হলেন। নিহত হলেন শেখ ফজিলাতুন নেছা মুজিব। শেখ কামাল। শেখ জামাল। শেখ রাসেল। সুলতানা কামাল। রোজী জামাল। শেখ নাসেরসহ পরিবারের আরও সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনও সেই হত্যাকাণ্ডে নিহত হন। দুই বোন বেঁচে গেলেন। কারণ তাঁরা তখন দেশের বাইরে। এই বেঁচে যাওয়ার মধ্যে কোনো আনন্দ ছিল না। ছিল একটি অদ্ভুত শূন্যতা। যে মানুষগুলোকে আগের দিন পর্যন্ত ফোন করা যেত, তাদের আর কেউ ফোন ধরবে না। যে মাকে বলা যেত, “মা, আমি এসেছি”, তিনি আর দরজা খুলবেন না। যে ছোট ভাইকে বলা যেত, “রাসেল, খেয়েছিস?”, সে আর কোনোদিন উত্তর দেবে না।
বহু বছর পর ১৯৮৩ সালের একটি সাক্ষাৎকারে শেখ রেহানা সেই রাতের কথা বলতে গিয়ে বলেছিলেন, তাঁর মনে হয়েছিল, ১৫ আগস্ট তাঁর জীবনটিও নিয়ে নেওয়া হলে ভালো হতো। তিনি প্রশ্ন করেছিলেন, রাসেলের দোষ কী ছিল, তাঁর মায়ের দোষ কী ছিল। তিনি নিজেকে বলেছিলেন অনাথ, অসহায়। একই সাক্ষাৎকারে তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার দাবি করেন। এই একটি শব্দ তাঁর জীবনের গভীরে গিয়ে বসে আছে। অসহায়। কিন্তু পৃথিবী তাঁকে অসহায় থাকার সুযোগও দেয়নি। বেঁচে থাকার জন্য মানুষকে কখনো কখনো নিজের শোককে পাশে সরিয়ে রাখতে হয়। শোক পরে করা যাবে। এখন বাঁচতে হবে।
১৯৭৫-এর পর দুই বোন আর দেশে ফিরতে পারলেন না। বাংলাদেশে তখন তাঁদের পরিবারের ওপর নেমে এসেছে রাজনৈতিক ও আইনি অন্ধকার। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর হত্যাকারীদের দায়মুক্তি দেওয়ার জন্য ইনডেমনিটি ব্যবস্থা চালু হয়েছিল। দুই বোনের দেশে ফেরার সুযোগও দীর্ঘ সময় বন্ধ ছিল। তাঁরা ১৯৮১ সালে দেশে ফেরেন। কিন্তু তার আগে রেহানার সামনে ছিল আরেকটি বাস্তবতা। লন্ডন। ১৯৭৬ সালে তিনি সেখানে যান।
সে সময় লন্ডনের কিলবার্নে তাঁর জীবন ছিল নিরাপত্তাহীন। বহু বছর পরে তাঁর নিজের কথায় জানা যায়, তিনি সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত চাকরি খুঁজতেন। থাকার জায়গা ছিল না। খাবারের নিশ্চয়তা ছিল না। কোথায় যাবেন, কী করবেন, তিনি জানতেন না। ১৯৭৭ সালে কিলবার্নেই ড. শফিক আহমেদ সিদ্দিকের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়।
এখানে ইতিহাসের সঙ্গে মানুষের জীবনের একটি নির্মম পার্থক্য আছে। বাংলাদেশে তখন কেউ তাঁকে দেখছে বঙ্গবন্ধুর মেয়ে হিসেবে। কেউ দেখছে শহীদের পরিবারের সন্তান হিসেবে। কেউ হয়তো ভবিষ্যতের রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হিসেবে। কিন্তু কিলবার্নের একটি রাস্তায় চাকরি খুঁজতে থাকা তরুণীটির কাছে তখন কোনো উপাধির দাম ছিল না। তার দরকার ছিল একটি ঘর। কিছু খাবার। একটি নিরাপদ আগামীকাল। মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় বিপর্যয়ের পরেও জীবন তার ছোট ছোট দাবি নিয়ে সামনে এসে দাঁড়ায়।
শোক করার সময় নেই। কারণ ঘর দরকার। খাবার দরকার। সন্তান হবে। সংসার হবে। জীবন চলবে। একজন মৃত বাবার মেয়ে তখন জীবিত পৃথিবীর কাছে ফিরে আসতে বাধ্য হয়। এভাবেই মানুষ বেঁচে থাকে। বড় কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে নয়। কখনো শুধু পরের সকাল পর্যন্ত পৌঁছে গিয়ে।
১৯৭৯ সালে শেখ রেহানা আবার প্রকাশ্যে সামনে এলেন। স্টকহোমে তিনি বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার দাবিতে একটি সম্মেলন ও বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেন। সেখানে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের দাবি আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তুলে ধরার চেষ্টা হয়। সমসাময়িক স্মৃতিচারণ ও পরবর্তী গবেষণামূলক প্রতিবেদনে ১০ মে ১৯৭৯ স্টকহোমে তাঁর অংশগ্রহণের কথা উল্লেখ আছে। এই ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রেহানাকে শুধু একটি ঘরের ভেতর কাঁদতে থাকা নারী হিসেবে দেখলে তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়। তিনি চুপ ছিলেন না। তিনি বিচার চেয়েছিলেন। তিনি তাঁর বাবার হত্যার কথা বলেছেন। কিন্তু তাঁর রাজনীতি কখনো বোনের রাজনীতির মতো প্রকাশ্য ও কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠেনি। দুই বোনের জীবন তখন ধীরে ধীরে আলাদা পথে হাঁটছে। একজনের সামনে বাংলাদেশ। অন্যজনের সামনে লন্ডন। একজনের সামনে মিছিল, দল, নির্বাচন, রাষ্ট্র। অন্যজনের সামনে সংসার, সন্তান, পরিবার, স্মৃতি। কিন্তু তাদের মাঝখানে একটি অদৃশ্য সুতো টানটান হয়ে রইল। রক্তের সুতো। শোকের সুতো। ইতিহাসের সুতো।
১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা দেশে ফিরলেন। ১৭ মে। দীর্ঘ নির্বাসনের পর। তারপর বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাস নতুন দিকে বাঁক নিল। শেখ হাসিনা ধীরে ধীরে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মুখ হয়ে উঠলেন। বোনের জীবন যত বড় হতে থাকল, রেহানার নিজের পরিচয় ততই একটি অদ্ভুত সমস্যায় পড়ল। তিনি ছিলেন না প্রধানমন্ত্রী। ছিলেন না মন্ত্রী। ছিলেন না সংসদ সদস্য। কোনো সরকারি পদে ছিলেন না। তবু তিনি শেখ হাসিনার বোন। এই পরিচয়টি কখনো তাঁর কাছ থেকে আলাদা হলো না। মানুষের চোখে তিনি নিজে যতটা, তার চেয়ে বেশি হয়ে উঠলেন অন্য একজনের সঙ্গে সম্পর্ক। এটাই ছায়ার সমস্যা। ছায়া কখনো একা হাঁটে না। আলো যেদিকে যায়, সে সেদিকেই যায়। শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে রেহানার নামও বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক আলোচনায় এসেছে। তাঁকে শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ পারিবারিক ও রাজনৈতিক পরিসরের মানুষ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। কিন্তু তাঁর নিজের কোনো সাংবিধানিক পদ ছিল না। এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ক্ষমতার পাশে থাকা আর ক্ষমতার পদে থাকা এক জিনিস নয়। কিন্তু সাধারণ মানুষের চোখে দুটির দূরত্ব অনেক সময় থাকে না। আর এখানেই রেহানার জীবনের ট্র্যাজেডি আরও জটিল হয়ে ওঠে। তিনি যদি কিছু বলেন, মানুষ ভাবতে পারে তিনি ক্ষমতার পক্ষ থেকে বলছেন। তিনি যদি চুপ থাকেন, মানুষ ভাবতে পারে তাঁর বলার কিছু নেই। তিনি যদি বোনের পাশে থাকেন, বলা যায় তিনি ক্ষমতার অংশ। তিনি যদি দূরে থাকেন, প্রশ্ন উঠতে পারে কেন দূরে। নিজের মত কী? নিজের সিদ্ধান্ত কী? নিজের জীবন কোথায়? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর ইতিহাস খুব কমই খোঁজে।
তারপর এল সন্তানদের জীবন। মেয়ে টিউলিপ। মা তাঁকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন। এটা টিউলিপ নিজেই পরে বলেছেন। কারণ তিনি তাঁর মায়ের জীবন দেখেছিলেন। রাজনীতি তাঁর মায়ের পরিবার কেড়ে নিয়েছে। বাবাকে কেড়ে নিয়েছে। মাকে কেড়ে নিয়েছে। ভাইদের কেড়ে নিয়েছে। দেশ থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। লন্ডনের রাস্তায় কাজ খুঁজতে বাধ্য করেছে। তাই মেয়ে যখন রাজনীতির দিকে হাঁটতে চাইল, একজন মা হয়তো নিজের অতীতের দিকে তাকিয়েছিলেন। বলেছিলেন, এই পথটা নয়। অন্য কোনো পথ বেছে নে। কিন্তু সন্তানকে নিজের ভয়ের ভেতরে সারাজীবন আটকে রাখা যায় না। টিউলিপ নিজের পথ বেছে নিলেন। ২০১৫ সালে তিনি প্রথম ব্রিটিশ এমপি নির্বাচিত হন। ২০২৪ সালের নির্বাচনে তিনি নতুন সীমানার Hampstead and Highgate আসন থেকে আবার নির্বাচিত হন। বর্তমানে তিনি ব্রিটিশ হাউস অব কমন্সের সদস্য। ২০২৪ সালের পর তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় আরও বড় হলো। তিনি ব্রিটিশ সরকারের অর্থনৈতিক সচিবের দায়িত্ব পেলেন। ৯ জুলাই ২০২৪ থেকে ১৪ জানুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত তিনি Economic Secretary to the Treasury ছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতি তাঁকে ছাড়ল না। কখনোই পুরোপুরি ছাড়েনি। কারণ একজন ব্রিটিশ রাজনীতিবিদ হয়েও তাঁর পারিবারিক পরিচয় বাংলাদেশের সঙ্গে বাঁধা। তাঁর মা শেখ রেহানা। তাঁর খালা শেখ হাসিনা। তাঁর নানা শেখ মুজিবুর রহমান। যে দেশ তাঁর জন্মভূমি নয়, সেই দেশের রাজনীতিও একসময় তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের অংশ হয়ে গেল।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে টিউলিপ সিদ্দিকের ওপর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক নিয়ে ব্রিটেনে প্রশ্ন উঠতে থাকে। তিনি নিজেই যুক্তরাজ্যের Independent Adviser on Ministerial Standards-এর কাছে বিষয়টি পাঠান। তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে Ministerial Code ভঙ্গের প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং তাঁর আর্থিক সম্পদ অবৈধ উৎস থেকে এসেছে, এমন প্রমাণও উপদেষ্টা পাননি। তবে সম্পত্তি-সংক্রান্ত কিছু বিষয়ে পুরোনো নথির সীমাবদ্ধতার কারণে সব প্রশ্নের সম্পূর্ণ নিশ্চয়তা দেওয়া সম্ভব হয়নি। টিউলিপ ১৪ জানুয়ারি ২০২৫ মন্ত্রিত্ব থেকে পদত্যাগ করেন। একজন মা হিসেবে রেহানা তখন কী অনুভব করেছিলেন, তার নির্ভরযোগ্য কোনো ব্যক্তিগত বর্ণনা আমাদের হাতে নেই। গল্পকার এখানে অনুমান করতে পারে। কিন্তু ইতিহাসের নামে অনুমানকে সত্য বলা যায় না। তাই আমরা শুধু ভাবতে পারি। একজন মা নিজের জীবনের যে ইতিহাস থেকে মেয়েকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন, সেই ইতিহাসই যদি একদিন মেয়ের দরজায় গিয়ে দাঁড়ায়, তখন সেই মায়ের ভেতরে কী হয়? তিনি কি আবার ১৯৭৫ দেখতে পান? একজন বাবা হারানোর রাত? একটি পরিবার হারানোর রাত? নাকি তিনি শুধু মেয়ের মুখ দেখেন? একজন মা তখন রাজনীতির ভাষা বোঝেন না। তিনি শুধু সন্তানের মুখ বোঝেন।
তারপর বাংলাদেশে আবার বড় পরিবর্তন এল। ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়েন এবং দেশ ত্যাগ করেন। তারপর তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা শুরু হয়। শেখ রেহানার বিরুদ্ধেও দুর্নীতির মামলা হয়। এবার তাঁর নাম শুধু রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হিসেবে নয়, একটি ফৌজদারি মামলার আসামি হিসেবেও সংবাদপত্রে ফিরে এল। ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৪ পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে প্লট বরাদ্দ-সংক্রান্ত একটি মামলায় শেখ রেহানাকে সাত বছরের কারাদণ্ড দেয়। একই মামলায় শেখ হাসিনাকে পাঁচ বছর এবং টিউলিপ সিদ্দিককে দুই বছর কারাদণ্ড দেওয়া হয়। তিনজনকেই এক লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়। মামলাটি তাঁদের অনুপস্থিতিতে পরিচালিত হয়েছিল। আদালত শেখ রেহানার নামে বরাদ্দ হওয়া ১০ কাঠা প্লট বাতিলেরও নির্দেশ দেয়।
এই জায়গায় একজন গল্পকারের কলম খুব সাবধানে চলা উচিত। কারণ সহানুভূতি আর খালাস এক জিনিস নয়। একজন মানুষের শৈশবের দুঃখ তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে মুছে দেয় না। আবার কোনো মামলার রায়ও তাঁর পুরো জীবনকে ব্যাখ্যা করে না। একজন মানুষ একই সঙ্গে নিজের জীবনের শিকার হতে পারেন, আবার নিজের জীবনের কিছু সিদ্ধান্তের জন্য জবাবদিহিও করতে পারেন।
মানুষ এত সরল নয়। সাহিত্যও হওয়া উচিত নয়। রেহানার প্রতি সহানুভূতি মানে তাঁর জীবনের সব রাজনৈতিক বা আইনি প্রশ্নকে অস্বীকার করা নয়। সহানুভূতি মানে শুধু এইটুকু দেখা যে, একজন মানুষও তাঁর নিজের গল্পের মধ্যে একটি মানুষ ছিলেন।
রেহানা আবার মেয়ের ছবির দিকে তাকালেন। টিউলিপ। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্য। নিজের রাজনৈতিক জীবন আছে। নিজের সংসদ আছে। নিজের নির্বাচনী এলাকা আছে। নিজের ভোটার আছে। নিজের বক্তৃতা আছে। নিজের ভুলও আছে, নিজের সাফল্যও আছে। কিন্তু তার পেছনে আরও কয়েকটি নাম দাঁড়িয়ে আছে। শেখ মুজিবুর রহমান। শেখ হাসিনা। শেখ রেহানা। একজন মানুষ নিজের নামের আগে যত নাম বহন করে, নিজের জন্য জায়গা তত ছোট হয়ে যায়। রেহানা এই কষ্টটি বুঝবেন না, তা কীভাবে সম্ভব? তিনি নিজেই তো সারাজীবন অন্য নামের পাশে দাঁড়িয়ে থেকেছেন। প্রথমে বাবার মেয়ে। তারপর বোনের বোন। তারপর মেয়ের মা। মাঝখানে কোথাও একটি নারী ছিল। তার নিজের কিছু স্বপ্ন ছিল কি? আমরা জানি না। সে কী হতে চেয়েছিল? জানি না। সে কি কোনোদিন চেয়েছিল, এমন একটি জীবন যেখানে কেউ তাকে চিনবে না? জানি না। ইতিহাস এই প্রশ্নগুলো সংরক্ষণ করেনি। ইতিহাস সাধারণত বিজয়ীদের তারিখ সংরক্ষণ করে। পরাজিতদের কান্না নয়। ক্ষমতাবানদের বক্তৃতা সংরক্ষণ করে। একজন নারীর অসম্পূর্ণ স্বপ্ন নয়।
সেদিন রাতে রেহানা আয়নার সামনে দাঁড়ালেন। বয়সের রেখাগুলো মুখে গভীর হয়েছে। চোখের চারপাশে সময় বসে আছে। তিনি আয়নায় তাকিয়ে হঠাৎ ভাবলেন, ছোটবেলায় তিনি কী হতে চেয়েছিলেন? কেউ কি তাঁকে কখনো সেই প্রশ্ন করেছিল? তিনি কি নিজের জন্য কোনো জীবন কল্পনা করেছিলেন? কোনো পেশা? কোনো শহর? কোনো এমন ঘর, যেখানে দরজায় তাঁর বাবার নাম থাকবে না, বোনের নাম থাকবে না, মেয়ের নাম থাকবে না? যেখানে তিনি শুধু রেহানা? তিনি উত্তর পেলেন না। শুধু মনে হলো, জীবনে তাঁর সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা কোনো পদ না পাওয়া নয়। কোনো ক্ষমতা না পাওয়া নয়। কোনো রাজনৈতিক পরিচয় না পাওয়াও নয়। তাঁর অপূর্ণতা আরও সাধারণ। তিনি হয়তো নিজের মতো করে বাঁচার যথেষ্ট সময় পাননি। একজন মানুষের জীবনে নিজের মতো করে বাঁচার সময়টুকুই তো সবচেয়ে মূল্যবান। কেউ সেটা কেড়ে নিলে মানুষ বাইরে থেকে যত সফলই দেখাক, ভেতরে কোথাও একটি ঘর খালি থাকে। রেহানার সেই ঘরটি হয়তো আজও খালি।
তিনি আবার টেবিলের কাছে এলেন। পুরোনো ছবিটা তুলে নিলেন। ছবিতে বাবা। কাছেই মা। ভাইয়েরা। ছোট্ট রাসেল। আর তিনি। ছবির সবাই যেন জীবিত। ছবির ভেতর কেউ জানে না সামনে কী আসছে। কেউ জানে না, কয়েক বছরের মধ্যে এই ছবিটি জীবনের চেয়ে বড় হয়ে যাবে। তিনি ছবিটা বুকে চেপে ধরলেন। তারপর মেয়ের ছবির দিকে তাকালেন। দুটি ছবি। একটিতে তাঁর অতীত। অন্যটিতে তাঁর ভবিষ্যৎ। মাঝখানে তিনি নিজে। একটি সেতুর মতো। এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন নাম, স্মৃতি, রক্ত, শোক, গর্ব, অভিযোগ, সন্দেহ এবং ভালোবাসা। কিন্তু সেতুর নিজের কোনো গন্তব্য থাকে না। সে শুধু অন্যদের পার করে দেয়।
বাইরে তখন বৃষ্টি থেমে গেছে। রাস্তায় পানি জমে আছে। আলো এসে সেই পানিতে পড়েছে। রেহানা জানালার সামনে দাঁড়ালেন। কাচে তাঁর প্রতিবিম্ব দেখা গেল। তিনি একটু নড়লেন। প্রতিবিম্বও নড়ল। কিন্তু তার পেছনে আরেকটি অন্ধকার আকৃতি। ছায়া। তিনি অনেকক্ষণ সেটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। হঠাৎ তাঁর মনে হলো, এতদিন তিনি যে ছায়াটাকে নিজের বলে ভেবেছেন, সেটি আসলে তাঁর নিজের নয়। সেটা বাবার ছায়া। তারপর বোনের। তারপর মেয়ের। তাঁর নিজের ছায়াটা কোথায়? তিনি জানেন না। হয়তো কোনোদিন জানতেও পারবেন না। তবু তিনি জানালাটা খুললেন। ঠান্ডা বাতাস ঘরে ঢুকে পড়ল। তিনি চোখ বন্ধ করলেন। অনেক মৃত্যু পেরিয়ে। অনেক নির্বাসন পেরিয়ে। অনেক বছর বোনের পাশে থেকেও নিজের আলাদা পরিচয় তৈরি করতে না পারার ভার পেরিয়ে। অনেক অভিযোগ পেরিয়ে। অনেক সন্দেহ পেরিয়ে। একজন মানুষ তখনও বেঁচে আছেন। এটাই হয়তো তাঁর জীবনের সবচেয়ে সাধারণ অথচ সবচেয়ে কঠিন অর্জন। তিনি বেঁচে আছেন। সবকিছুর পরেও। বাবাকে হারিয়ে। মাকে হারিয়ে। ভাইদের হারিয়ে। দেশ থেকে দূরে থেকে। লন্ডনের রাস্তায় কাজ খুঁজে। সংসার করে। সন্তান বড় করে। বোনের রাজনৈতিক জীবনের বিশাল ছায়ার নিচে নিজের আলাদা জীবনটাকে যতটুকু সম্ভব বাঁচিয়ে রেখে। তারপর সেই একই রাজনীতির ঢেউ যখন তাঁর মেয়ের দরজায় গিয়ে আঘাত করল, তখন আবার তিনি একজন মা হয়ে দাঁড়ালেন। এই জায়গায় এসে তাঁর জীবনের ট্র্যাজেডি সবচেয়ে সম্পূর্ণ হয়। যে নারী নিজের মেয়েকে রাজনীতি থেকে দূরে রাখতে চেয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত তাঁর মেয়ের জীবনেও বাংলাদেশের রাজনীতি ঢুকে পড়ল। ইতিহাস যেন তাঁকে বলল, তুমি যেখানেই যাও, আমি তোমার সঙ্গে যাব।
হয়তো শেখ রেহানার প্রতি সহানুভূতির সবচেয়ে বড় কারণ তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় নয়। বরং তাঁর জীবনের সেই অংশ, যেখানে তিনি অন্য সবার মতো একজন সাধারণ মানুষ হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পারেননি। তিনি কোনোদিন নিজের বাবার মৃত্যুকে অতিক্রম করতে পারেননি। কেউ পারে কি? তিনি নিজের মাকে ভুলতে পারেননি। কেউ পারে কি? তিনি রাসেলের কথা ভুলতে পারেননি। কেউ পারে কি? তিনি দেশ থেকে দূরে গিয়েও দেশকে ছাড়তে পারেননি। তিনি বোনের জীবন থেকে আলাদা হতে চাইলেও বোনের জীবন তাঁকে ছাড়েনি। তিনি নিজের মেয়েকে নিজের অতীত থেকে বাঁচাতে চাইলেও অতীত মেয়ের জীবনেও পৌঁছে গেল। একজন মানুষ কতবার নতুন করে জীবন শুরু করতে পারে? রেহানা হয়তো বহুবার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু প্রতিবারই পেছন থেকে কোনো একটি নাম এসে তাঁকে ধরে ফেলেছে। বাবা। বোন। দেশ। মেয়ে। ইতিহাস।
রাত আরও গভীর হলো। রেহানা জানালার সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন। লন্ডনের রাস্তা ধীরে ধীরে ফাঁকা হচ্ছে। দূরে একটি বাস চলে গেল। ভেজা রাস্তায় তার আলো কিছুক্ষণ রয়ে গেল। তারপর মিলিয়ে গেল। রেহানা জানালা বন্ধ করলেন। পুরোনো ছবিটা তুলে রাখলেন। আদালতের কাগজটা ভাঁজ করলেন। মেয়ের ছবিটা শেষবারের মতো দেখলেন। তারপর ছবিটা বুকে চেপে ধরলেন। একজন মা তখন রাজনীতির ভাষা বোঝেন না। তিনি শুধু সন্তানের মুখ বোঝেন। তিনি জানেন না ইতিহাস তাঁর পরিবারকে কী নামে ডাকবে। তিনি জানেন না মানুষ তাঁকে কী চোখে দেখবে। তিনি জানেন না ভবিষ্যৎ তাঁর জন্য কী লিখে রেখেছে তিনি শুধু জানেন, জীবন যতবার তাঁকে মাটিতে ফেলেছে, ততবার কোনোভাবে তিনি উঠে দাঁড়িয়েছেন হয়তো এটাই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সত্য। তিনি ক্ষমতার মানুষ কি না, ইতিহাস তার বিচার করবে। তিনি কোনো সিদ্ধান্তে কতটা জড়িত ছিলেন, আদালত তার বিচার করবে। তিনি বোনের কতটা কাছাকাছি ছিলেন, রাজনৈতিক ইতিহাস তার হিসাব রাখবে। কিন্তু একজন মেয়ে হিসেবে, একজন বোন হিসেবে, একজন মা হিসেবে, একজন মানুষ হিসেবে তাঁর ভেতরের যে দীর্ঘ শোক, তার কোনো আদালত নেই।
সেই শোকের কোনো রায় নেই। সেই শোকের কোনো সাজা নেই। শুধু একটি দীর্ঘ জীবন আছে। আর সেই জীবনের শেষে দাঁড়িয়ে একজন নারী নিজের ছায়াকে খুঁজছেন। হয়তো তিনি কোনোদিন নিজের ছায়াকে পুরোপুরি খুঁজে পাবেন না। হয়তো সেটি তাঁর বাবার ছায়ার নিচে চাপা পড়ে থাকবে। হয়তো বোনের ছায়া তাকে ঢেকে রাখবে। হয়তো মেয়ের ভবিষ্যৎ আবার সেই ছায়াকে অন্যদিকে নিয়ে যাবে। তবু কোনো এক গভীর রাতে, যখন সব শব্দ থেমে যাবে, তখন তিনি হয়তো নিজের ভেতর থেকে একটি খুব ছোট্ট কণ্ঠ শুনতে পাবেন।
কেউ বলছে, “আমি তো শুধু রেহানা হতে চেয়েছিলাম।” এই কথাটির কোনো রাজনৈতিক অর্থ নেই। কোনো দল নেই। কোনো পক্ষ নেই। কোনো স্লোগান নেই। আছে শুধু একজন মানুষের অসম্পূর্ণ জীবনের দীর্ঘশ্বাস। আর তখন হয়তো বোঝা যাবে, ছায়া শুধু আলোর অভাব নয়। ছায়ারও একটি জীবন থাকে। কেউ তাকে দেখে না। কেউ তার নাম ধরে ডাকে না। কেউ তার জন্য আলাদা করে ইতিহাস লেখে না। তবু সে সারাজীবন পাশে থাকে। নিঃশব্দে। অবিচলভাবে। একজন মানুষের মতো। শেখ রেহানার মতো।

আবু মকসুদ Abu Maksud’s Post

মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।