, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৬ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
গণভবনের ভিডিও ধারণসহ রেকিকরা হয় শাইখ সিরাজের নেতৃত্বে রাহুল-মমতারা মিছিল করে যাবেন সুপ্রিম কোর্টে,মিছিলে গোটা ভারত হাঁটবে। সোমবার দিল্লি পুলিশ পরীক্ষায় রোটন তাঁর বাবার চেহলাম আয়োজনে ও বাধা ফজলে করিম চৌধুরী! আমাদের বিড়ি টানা,হাতাকাটা জামা পরার উপর যতক্ষণ না আক্রমণ আসবে ততোক্ষণ ? এই মানুষ এভাবে পচে গেল কেন? অবশেষে ডিপ স্টেট এবং ইউনূস ও খলিল সাহেবদের সাকসেস! রোটন ভাইয়ের জানাজা পড়তে যাওয়া মুসল্লীদের মসজিদ থেকে বের করে, নির্মম নির্যাতন করেছে বিএনপির ক্যাডাররা!! জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম মুসলিম সভাপতি — বদরুদ্দীন তৈয়বজী পাকিস্তানপন্থী খাঁটি মুসলমান ইনকিলাব মঞ্চ বাবা-মায়ের কাছ থেকে যা শিখেছি ত্রপা মজুমদার

নারীদের বয়স ভিন্ন, মিডিয়া-মবের ভাষা একই

  • প্রকাশের সময় : ০৫:৫৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
  • ৮ পড়া হয়েছে
অনলাইন শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

নারীদের বয়স ভিন্ন, মিডিয়া-মবের ভাষা একই

নেহা বোরার বয়স ২৯। তিনি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক এবং অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের জাতীয় সভাপতি।
তাসনিম সিরাজ মাহবুব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সহযোগী অধ্যাপক। দিলারা চৌধুরী বাংলাদেশের প্রবীণ প্রজন্মের রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ও বিশ্লেষক।
মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত তরুণী কলেজ ছাত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি অপর তিনজনের চেয়ে শিক্ষায় এবং সুযোগে ভিন্ন।
চার নারী চারটি ভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের ঘটনাও এক নয়। ভারত ও বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যমে তাদের ঘিরে যে প্রতিক্রিয়াগুলো দেখা যাচ্ছে, সেখানে একটি অস্বস্তিকর মিল আছে: এটি আর মতের লড়াই নয়, এটি গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের নামে মবোক্রেসি; নারীর বক্তব্যের জবাব না দিয়ে নারীকে শাস্তির বস্তু বানানো।
নেহা বোরার ক্ষেত্রে বিষয়টি সবচেয়ে নগ্নভাবে দেখা যায়। তিনি দিল্লির জন্তর মন্তরে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনার বিরুদ্ধে এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে চলা প্রতিবাদে অংশ নেন। পুলিশি বাধা অতিক্রমের চেষ্টা করার সময় তাকে আটক করা হয়।
এরপর তার রাজনৈতিক অবস্থান, প্রতিবাদের যুক্তি কিংবা নির্বাচন-ব্যবস্থা নিয়ে তার বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক করার বদলে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তার প্রতিবাদের দৃশ্য কেটে-ছেঁটে, ধীরগতিতে এবং ইঙ্গিতপূর্ণ ভঙ্গিতে উপস্থাপন করা ভিডিও। কিছু ক্ষেত্রে ভিডিওর সঙ্গে অশ্লীল ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যও জুড়ে দেওয়া হয়।
অর্থাৎ একজন রাজনৈতিক কর্মীকে রাজনীতি দিয়ে মোকাবিলা করার বদলে তার শরীরকে মবের বিনোদনের উপকরণে পরিণত করা হলো।
এটাই নারীবিদ্বেষের সবচেয়ে নগ্ন রূপ: নারী কি বলছে বা কি করছে তা অপ্রাসঙ্গিক; তাকে কিভাবে দেখা, ভোগ করা, যৌনভাবে অপমান করা বা সামাজিকভাবে হেয় করা যায়, সেটিই মবের বিষয়।
তাসনিম সিরাজ মাহবুবের ঘটনাটি অন্য ধরনের। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক। স্নাতকোত্তরের একটি শ্রেণিকক্ষে নিকাব পরা এক ছাত্রীকে সামনে না বসে পেছনে গিয়ে বসতে বলা নিয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে।
শিক্ষার্থীদের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই ছাত্রীকে নিকাবের কারণে অস্বস্তিকর ও অনিরাপদ বোধ করার কথা তাসনিম জানিয়েছিলেন এবং পেছনে বসতে বলেছিলেন। একই ঘটনায় ছাত্রীকে মৌলবাদী ও সন্ত্রাসী বলার অভিযোগও শিক্ষার্থীরা তুলেছেন; তবে এই অংশটি শিক্ষার্থীদের অভিযোগ হিসেবে দেখা উচিত, প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে নয়।
ঘটনার পর বিভাগীয়ভাবে তাসনিম সিরাজকে পাঠদান থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
এখানে তাসনিমের বক্তব্য সঠিক ছিল কি না, তার আচরণ ক্ষমতার অপব্যবহার ছিল কি না, অথবা একজন শিক্ষার্থীর পোশাক নিয়ে শিক্ষকের মন্তব্য কতটা গ্রহণযোগ্য, এসব নিয়ে কঠোর বিতর্ক হতে পারে।
অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তও হওয়া উচিত। কিন্তু এখানেই প্রশ্নটি অন্য জায়গায় চলে যায়: একটি শ্রেণিকক্ষের অভিযোগ কিভাবে মুহূর্তের মধ্যে একজন নারী শিক্ষককে সামাজিকভাবে ধ্বংস করার জন্য মবের হাতে তুলে দেওয়া হয়?
অভিযোগের বিচার আর মবের বিচার এক জিনিস নয়। প্রথমটির প্রয়োজন প্রমাণ, শুনানি ও ন্যায়বিচার; দ্বিতীয়টির প্রয়োজন শুধু ভাইরাল ক্ষোভ।
তাসনিম সিরাজের প্রতি জুলেখা সিরাপ মেটাভার্স থেকে আমারও পর্যবেক্ষণ আছে। আমরা দীর্ঘকাল ধরে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির পক্ষে বলে যাচ্ছি এবং তার দণ্ডকে, প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপে আইনের অপপ্রয়োগ বিধায় দণ্ড মকুবের দাবি জানিয়ে আসছি। এরকম একটি পোস্টে তাসনিম মন্তব্য আকারে বলেছিলেন, পোস্ট লেখক কেন রাষ্ট্রপতির স্ত্রীর সংগ্রামী জীবন এবং মিন্নির জীবনকে পাশাপাশি তুলনা করলেন, তিনি বুঝেন নাই।
সংশ্লিষ্ট পোস্টে কবি, নাট্যকার চয়ন খায়রুল হাবিব সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলামের কাছে মৃত্যুদণ্ড বহাল এবং মকুবের সর্বোচ্চ দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে আবেদন করেছিলেন যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির স্ত্রী যে নাগরিক অধিকার পায়, একই অধিকার এমন কি অন্য কারো দণ্ডিত স্ত্রীরও থাকা দরকার। এখানে না বোঝার কিছু নাই। কিন্তু তার অবস্থান থেকে তাসনিম সেটা বুঝতে চান নাই। আমাদের অবস্থান থেকে আমরা ওনার বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছিলাম।
দিলারা চৌধুরীর ক্ষেত্রটি আরও ভিন্ন। তিনি বাংলাদেশের প্রবীণ রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ও বিশ্লেষক এবং পাকিস্তান আমলে ইয়হিয়া খানের যোগাযোগ-মন্ত্রী গোলাম ওয়াহেদ চৌধুরীর স্ত্রী। বাংলাদেশের রাজনীতি, রাষ্ট্রব্যবস্থা, গণতন্ত্র, আওয়ামী লীগ, শেখ হাসিনা এবং শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল নিয়ে তার দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ রয়েছে। শেখ হাসিনার দীর্ঘদিন দলীয় নেতৃত্বে থাকার বিষয়েও তিনি প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন।
মূলত দিলারার অবস্থান মুক্তিযুদ্ধকে হয় অস্বিকার, নয় বিতর্কিত করা, ভারত নিয়ে বিষোদ্গার, সহজ বাংলাতে যাকে ত্যানা পেঁচানো বলা যায়। দ্রস্টব্য যে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারি দল কম, বিরোধি দল কয়েক হাজার গুণ বেশী পরিমানে এই ককটেল জনতাকে গেলাতে চাইছে।
দিলারা চৌধুরীকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভের একটি অংশ তাই তার কোনো একটি সাম্প্রতিক বক্তব্যের চেয়েও বড়। এটি তার রাজনৈতিক ইতিহাস, পারিবারিক পরিচয় এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কে তার অবস্থানের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া।
এখানেও একই প্রবণতা দেখা যায়: দিলারা চৌধুরীর যুক্তির জবাব দেওয়ার বদলে তাকে স্বামীর পরিচয়, তার রাজনৈতিক পরিবার এবং অবস্থানের সঙ্গে একীভূত করে বিচার করা। যেন একজন প্রবীণ নারী বুদ্ধিজীবীর নিজের কোনো স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সত্তা থাকতে পারে না; তিনি কেবল কারও স্ত্রী, কারও পক্ষের মানুষ, কারও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহনকারী।
এখানে নেহা, মিন্নি, তাসনিম, দিলারা ভিন্ন প্রজন্মের হলেও তাদের মধ্যে অদ্ভুত একটি সেতু তৈরি হয়।
নেহা, তরুণ নারী প্রতিবাদকারী। তার শরীরকে পরিণত করা হয় প্রদর্শনীর বস্তুতে।
তাসনিম, বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষক। তাকে পরিণত করা হয় একটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংঘাতের মুখে দাঁড়ানো বিতর্কিত চরিত্রে।
দিলারা, প্রবীণ নারী বুদ্ধিজীবী। তাকে পরিণত করা হয় স্বামীর রাজনৈতিক পরিচয় এবং তার নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতীকে।
মিন্নি, তরুনী ছাত্রী। প্রকাশ্যে স্বামী হত্যায় তাকে বাঁধা দিতে দেখা গেছে। সাংসদ ধীরেন্দ্রনাথ শম্ভু নিজের ছেলের দিক থেকে দৃষ্টি সরাতে প্রধান আসামী নয়ন বন্ডের ক্রস ফায়ারে হত্যা ঘটায় এবং থানার ওসির যোগসাজশে মিন্নিকে রাজসাক্ষী থেকে আসামিতে রুপান্তর করে।
লেখক অভিজিৎ রায়কে দল বেধে কুপিয়ে হত্যার সময়ও স্ত্রী বন্যা বাঁধা দিয়েছিল। এরকম মব আক্রমণের মুখে একক প্রতিরোধ সাধারণত ব্যর্থ হয়। কেউ ঘুনাক্ষরেও মার্কিন নাগরিক বন্যার প্রতি কোনও দোষারোপ করে নাই।
মিন্নি, নেহা, তাসনিম, দিলারার বয়স ভিন্ন। সামাজিক অবস্থান ভিন্ন। রাজনৈতিক ভাষাও ভিন্ন। কিন্তু মবের বৈশিষ্ট্য একই: নারীকে ব্যক্তি হিসেবে না দেখে একটি লৈঙ্গিক, যৌন প্রতীকে পরিণত করা।
এখানে নারীর শরীরকে বস্তুকরণের গভীর অর্থটি বোঝা যায়। বস্তুকরণ শুধু নারীর শরীরকে যৌন বস্তুতে পরিণত করা নয়। নারীকে বয়স, পোশাক, শরীর, ধর্ম, স্বামী, চরিত্র, যৌনতা, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা কোনো একটি বিতর্কের মধ্যে আটকে দিয়ে তার সম্পূর্ণ মানবিক সত্তাকে অস্বীকার করাও বস্তুকরণ।
নেহার ক্ষেত্রে নারী প্রথমে শরীর। তাসনিমের ক্ষেত্রে নারী প্রথমে বিতর্ক। দিলারার ক্ষেত্রে নারী প্রথমে স্বামীর পরিচয় ও রাজনৈতিক অবস্থান।
মিন্নির ক্ষেত্রে, সে দরকার অনুযায়ী দৃশ্যমান, দরকারে অদৃশ্য। তাদের বক্তব্য তখন গৌণ। তাদের ব্যক্তিসত্তা আরও গৌণ।
মবের সবচেয়ে ভয়াবহ জায়গাটি এখানেই। মব প্রথমে একজন নারীকে সংজ্ঞায়িত করে। তারপর সেই সংজ্ঞাটিকে তার বিরুদ্ধে প্রমাণ বানায়। এরপর সেই তথাকথিত প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে অপমান, হেয়, বহিষ্কার, নীরব বা সামাজিকভাবে একঘরে করার দাবি তোলে।
এই মব শুধু পুরুষদের দিয়ে তৈরি হয় না। নারীরাও এতে অংশ নেন, কখনও সরাসরি, কখনও উসকানিদাতা হিসেবে, কখনও দর্শক হিসেবে, কখনও আবার মবের নৈতিক বৈধতা জোগানো মানুষ হিসেবে।
পুরুষের নারীবিদ্বেষ যখন নারীরাও বহন করেন, তখন পিতৃতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হয়। কারণ তখন সেটিকে আর শুধু পুরুষের আগ্রাসন বলে দেখা যায় না; সেটি সমাজের সম্মিলিত নৈতিক রায় বলে প্রতিষ্ঠিত হয়।
এখানে ভারত ও বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার মিলটি গুরুত্বপূর্ণ। মবের পতাকা বদলায়। কারও হাতে থাকে জাতীয়তাবাদের পতাকা, কারও হাতে ধর্মের, কারও হাতে প্রগতিশীলতার, কারও হাতে দলীয় আনুগত্যের। কিন্তু নারীকে অপমান করার কৌশলটি আশ্চর্যজনকভাবে একই থাকে।
এক পক্ষ বলে নারীটি চরিত্রহীন। অন্য পক্ষ বলে নারীটি পাগল। কেউ তাকে যৌন বস্তু বানায়। কেউ তার পোশাককে অপরাধের প্রমাণ বানায়। কেউ তাকে স্বামীর রাজনৈতিক পরিচয়ে আটকে ফেলে। কেউ তার মতের বদলে তার শরীর নিয়ে কথা বলে। কেউ তার বক্তব্যের বদলে তার মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
শব্দ আলাদা। রাজনৈতিক শিবির আলাদা। নৈতিকতার ভাষা আলাদা। কিন্তু উদ্দেশ্য এক, নারীটিকে তার বক্তব্য থেকে সরিয়ে এমন একটি পরিচয়ের মধ্যে বন্দি করা, যার মাধ্যমে তাকে অপমান করা সহজ।
এটাই মবোক্রেসির আসল শক্তি। এখানে কাউকে যুক্তিতে পরাজিত করতে হয় না। তার বিরুদ্ধে প্রমাণ হাজির করতে হয় না। তাকে শুধু এমন একটি সামাজিক চরিত্রে পরিণত করতে হয়, যাকে ঘৃণা করা বৈধ বলে মনে হয়।
তারপর শুরু হয় গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের বিচার।
প্রথমে ছবি। তারপর কাটা ভিডিও। তারপর কুৎসিত মন্তব্য। তারপর চরিত্রহনন। তারপর শাস্তির দাবি। শেষ পর্যন্ত নারীটি যে মানুষ, এই মৌলিক সত্যটিই মুছে যায়।
এই লেখাতে বলার পরেও, মনে করিয়ে দিতে চাই নেহা, তাসনিম, দিলারার প্রতি যা করা হচ্ছে, আওয়ামী সাংসদ, থানার ওসি, মেজিস্ট্রেট এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের শাসন এবং বিচার-ব্যবস্থা আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির প্রতি তাই করেছিল। মিন্নিকে রাজসাক্ষি থেকে অভিযুক্ত বানিয়ে মৃত্যদন্ড দিয়েছিল।
এটাই গণমাধ্যম-নির্ভর মবোক্রেসি: যেখানে মতামত ও যুক্তি দিয়ে জনমত তৈরি হয় না; ভাইরাল অপমান দিয়ে রায় তৈরি হয়।
নেহা, তাসনিম, দিলারা, মিন্নি চার জনের ঘটনা এক নয়। তাঁদের বক্তব্যও এক নয়। তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থানও এক নয়। তাঁদের সমালোচনা করার অধিকার অবশ্যই আছে। কিন্তু সমালোচনা আর মবের হাতে একজন নারীকে তুলে দেওয়া এক জিনিস নয়।
তিন প্রজন্মের চার নারী আমাদের সামনে তাই একই প্রশ্ন রেখে যান:
নারীর বক্তব্যের জবাব কি বক্তব্য দিয়ে দেওয়া হবে, নাকি নারী হওয়াটা তার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে?
একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য আসল পরীক্ষাটি এখানে।
তৃণা রাব্বানি

Trina Rabbani’s Post

মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।

জনপ্রিয়

গণভবনের ভিডিও ধারণসহ রেকিকরা হয় শাইখ সিরাজের নেতৃত্বে

নারীদের বয়স ভিন্ন, মিডিয়া-মবের ভাষা একই

প্রকাশের সময় : ০৫:৫৪ অপরাহ্ন, শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
অনলাইন শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬

নারীদের বয়স ভিন্ন, মিডিয়া-মবের ভাষা একই

নেহা বোরার বয়স ২৯। তিনি জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষক এবং অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের জাতীয় সভাপতি।
তাসনিম সিরাজ মাহবুব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সহযোগী অধ্যাপক। দিলারা চৌধুরী বাংলাদেশের প্রবীণ প্রজন্মের রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ও বিশ্লেষক।
মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত তরুণী কলেজ ছাত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নি অপর তিনজনের চেয়ে শিক্ষায় এবং সুযোগে ভিন্ন।
চার নারী চারটি ভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছেন। তাদের ঘটনাও এক নয়। ভারত ও বাংলাদেশের সামাজিক মাধ্যমে তাদের ঘিরে যে প্রতিক্রিয়াগুলো দেখা যাচ্ছে, সেখানে একটি অস্বস্তিকর মিল আছে: এটি আর মতের লড়াই নয়, এটি গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের নামে মবোক্রেসি; নারীর বক্তব্যের জবাব না দিয়ে নারীকে শাস্তির বস্তু বানানো।
নেহা বোরার ক্ষেত্রে বিষয়টি সবচেয়ে নগ্নভাবে দেখা যায়। তিনি দিল্লির জন্তর মন্তরে নির্বাচন কমিশনের বিশেষ নিবিড় পুনর্বিবেচনার বিরুদ্ধে এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে চলা প্রতিবাদে অংশ নেন। পুলিশি বাধা অতিক্রমের চেষ্টা করার সময় তাকে আটক করা হয়।
এরপর তার রাজনৈতিক অবস্থান, প্রতিবাদের যুক্তি কিংবা নির্বাচন-ব্যবস্থা নিয়ে তার বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক করার বদলে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে তার প্রতিবাদের দৃশ্য কেটে-ছেঁটে, ধীরগতিতে এবং ইঙ্গিতপূর্ণ ভঙ্গিতে উপস্থাপন করা ভিডিও। কিছু ক্ষেত্রে ভিডিওর সঙ্গে অশ্লীল ও যৌন ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যও জুড়ে দেওয়া হয়।
অর্থাৎ একজন রাজনৈতিক কর্মীকে রাজনীতি দিয়ে মোকাবিলা করার বদলে তার শরীরকে মবের বিনোদনের উপকরণে পরিণত করা হলো।
এটাই নারীবিদ্বেষের সবচেয়ে নগ্ন রূপ: নারী কি বলছে বা কি করছে তা অপ্রাসঙ্গিক; তাকে কিভাবে দেখা, ভোগ করা, যৌনভাবে অপমান করা বা সামাজিকভাবে হেয় করা যায়, সেটিই মবের বিষয়।
তাসনিম সিরাজ মাহবুবের ঘটনাটি অন্য ধরনের। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক। স্নাতকোত্তরের একটি শ্রেণিকক্ষে নিকাব পরা এক ছাত্রীকে সামনে না বসে পেছনে গিয়ে বসতে বলা নিয়ে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে।
শিক্ষার্থীদের বক্তব্য অনুযায়ী, ওই ছাত্রীকে নিকাবের কারণে অস্বস্তিকর ও অনিরাপদ বোধ করার কথা তাসনিম জানিয়েছিলেন এবং পেছনে বসতে বলেছিলেন। একই ঘটনায় ছাত্রীকে মৌলবাদী ও সন্ত্রাসী বলার অভিযোগও শিক্ষার্থীরা তুলেছেন; তবে এই অংশটি শিক্ষার্থীদের অভিযোগ হিসেবে দেখা উচিত, প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে নয়।
ঘটনার পর বিভাগীয়ভাবে তাসনিম সিরাজকে পাঠদান থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
এখানে তাসনিমের বক্তব্য সঠিক ছিল কি না, তার আচরণ ক্ষমতার অপব্যবহার ছিল কি না, অথবা একজন শিক্ষার্থীর পোশাক নিয়ে শিক্ষকের মন্তব্য কতটা গ্রহণযোগ্য, এসব নিয়ে কঠোর বিতর্ক হতে পারে।
অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তও হওয়া উচিত। কিন্তু এখানেই প্রশ্নটি অন্য জায়গায় চলে যায়: একটি শ্রেণিকক্ষের অভিযোগ কিভাবে মুহূর্তের মধ্যে একজন নারী শিক্ষককে সামাজিকভাবে ধ্বংস করার জন্য মবের হাতে তুলে দেওয়া হয়?
অভিযোগের বিচার আর মবের বিচার এক জিনিস নয়। প্রথমটির প্রয়োজন প্রমাণ, শুনানি ও ন্যায়বিচার; দ্বিতীয়টির প্রয়োজন শুধু ভাইরাল ক্ষোভ।
তাসনিম সিরাজের প্রতি জুলেখা সিরাপ মেটাভার্স থেকে আমারও পর্যবেক্ষণ আছে। আমরা দীর্ঘকাল ধরে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির পক্ষে বলে যাচ্ছি এবং তার দণ্ডকে, প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপে আইনের অপপ্রয়োগ বিধায় দণ্ড মকুবের দাবি জানিয়ে আসছি। এরকম একটি পোস্টে তাসনিম মন্তব্য আকারে বলেছিলেন, পোস্ট লেখক কেন রাষ্ট্রপতির স্ত্রীর সংগ্রামী জীবন এবং মিন্নির জীবনকে পাশাপাশি তুলনা করলেন, তিনি বুঝেন নাই।
সংশ্লিষ্ট পোস্টে কবি, নাট্যকার চয়ন খায়রুল হাবিব সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলামের কাছে মৃত্যুদণ্ড বহাল এবং মকুবের সর্বোচ্চ দায়িত্বপ্রাপ্ত হিসেবে আবেদন করেছিলেন যে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির স্ত্রী যে নাগরিক অধিকার পায়, একই অধিকার এমন কি অন্য কারো দণ্ডিত স্ত্রীরও থাকা দরকার। এখানে না বোঝার কিছু নাই। কিন্তু তার অবস্থান থেকে তাসনিম সেটা বুঝতে চান নাই। আমাদের অবস্থান থেকে আমরা ওনার বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছিলাম।
দিলারা চৌধুরীর ক্ষেত্রটি আরও ভিন্ন। তিনি বাংলাদেশের প্রবীণ রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ও বিশ্লেষক এবং পাকিস্তান আমলে ইয়হিয়া খানের যোগাযোগ-মন্ত্রী গোলাম ওয়াহেদ চৌধুরীর স্ত্রী। বাংলাদেশের রাজনীতি, রাষ্ট্রব্যবস্থা, গণতন্ত্র, আওয়ামী লীগ, শেখ হাসিনা এবং শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল নিয়ে তার দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষণ রয়েছে। শেখ হাসিনার দীর্ঘদিন দলীয় নেতৃত্বে থাকার বিষয়েও তিনি প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন।
মূলত দিলারার অবস্থান মুক্তিযুদ্ধকে হয় অস্বিকার, নয় বিতর্কিত করা, ভারত নিয়ে বিষোদ্গার, সহজ বাংলাতে যাকে ত্যানা পেঁচানো বলা যায়। দ্রস্টব্য যে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারি দল কম, বিরোধি দল কয়েক হাজার গুণ বেশী পরিমানে এই ককটেল জনতাকে গেলাতে চাইছে।
দিলারা চৌধুরীকে ঘিরে সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভের একটি অংশ তাই তার কোনো একটি সাম্প্রতিক বক্তব্যের চেয়েও বড়। এটি তার রাজনৈতিক ইতিহাস, পারিবারিক পরিচয় এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস সম্পর্কে তার অবস্থানের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া।
এখানেও একই প্রবণতা দেখা যায়: দিলারা চৌধুরীর যুক্তির জবাব দেওয়ার বদলে তাকে স্বামীর পরিচয়, তার রাজনৈতিক পরিবার এবং অবস্থানের সঙ্গে একীভূত করে বিচার করা। যেন একজন প্রবীণ নারী বুদ্ধিজীবীর নিজের কোনো স্বতন্ত্র রাজনৈতিক সত্তা থাকতে পারে না; তিনি কেবল কারও স্ত্রী, কারও পক্ষের মানুষ, কারও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার বহনকারী।
এখানে নেহা, মিন্নি, তাসনিম, দিলারা ভিন্ন প্রজন্মের হলেও তাদের মধ্যে অদ্ভুত একটি সেতু তৈরি হয়।
নেহা, তরুণ নারী প্রতিবাদকারী। তার শরীরকে পরিণত করা হয় প্রদর্শনীর বস্তুতে।
তাসনিম, বিশ্ববিদ্যালয়ের নারী শিক্ষক। তাকে পরিণত করা হয় একটি ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সংঘাতের মুখে দাঁড়ানো বিতর্কিত চরিত্রে।
দিলারা, প্রবীণ নারী বুদ্ধিজীবী। তাকে পরিণত করা হয় স্বামীর রাজনৈতিক পরিচয় এবং তার নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতীকে।
মিন্নি, তরুনী ছাত্রী। প্রকাশ্যে স্বামী হত্যায় তাকে বাঁধা দিতে দেখা গেছে। সাংসদ ধীরেন্দ্রনাথ শম্ভু নিজের ছেলের দিক থেকে দৃষ্টি সরাতে প্রধান আসামী নয়ন বন্ডের ক্রস ফায়ারে হত্যা ঘটায় এবং থানার ওসির যোগসাজশে মিন্নিকে রাজসাক্ষী থেকে আসামিতে রুপান্তর করে।
লেখক অভিজিৎ রায়কে দল বেধে কুপিয়ে হত্যার সময়ও স্ত্রী বন্যা বাঁধা দিয়েছিল। এরকম মব আক্রমণের মুখে একক প্রতিরোধ সাধারণত ব্যর্থ হয়। কেউ ঘুনাক্ষরেও মার্কিন নাগরিক বন্যার প্রতি কোনও দোষারোপ করে নাই।
মিন্নি, নেহা, তাসনিম, দিলারার বয়স ভিন্ন। সামাজিক অবস্থান ভিন্ন। রাজনৈতিক ভাষাও ভিন্ন। কিন্তু মবের বৈশিষ্ট্য একই: নারীকে ব্যক্তি হিসেবে না দেখে একটি লৈঙ্গিক, যৌন প্রতীকে পরিণত করা।
এখানে নারীর শরীরকে বস্তুকরণের গভীর অর্থটি বোঝা যায়। বস্তুকরণ শুধু নারীর শরীরকে যৌন বস্তুতে পরিণত করা নয়। নারীকে বয়স, পোশাক, শরীর, ধর্ম, স্বামী, চরিত্র, যৌনতা, রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা কোনো একটি বিতর্কের মধ্যে আটকে দিয়ে তার সম্পূর্ণ মানবিক সত্তাকে অস্বীকার করাও বস্তুকরণ।
নেহার ক্ষেত্রে নারী প্রথমে শরীর। তাসনিমের ক্ষেত্রে নারী প্রথমে বিতর্ক। দিলারার ক্ষেত্রে নারী প্রথমে স্বামীর পরিচয় ও রাজনৈতিক অবস্থান।
মিন্নির ক্ষেত্রে, সে দরকার অনুযায়ী দৃশ্যমান, দরকারে অদৃশ্য। তাদের বক্তব্য তখন গৌণ। তাদের ব্যক্তিসত্তা আরও গৌণ।
মবের সবচেয়ে ভয়াবহ জায়গাটি এখানেই। মব প্রথমে একজন নারীকে সংজ্ঞায়িত করে। তারপর সেই সংজ্ঞাটিকে তার বিরুদ্ধে প্রমাণ বানায়। এরপর সেই তথাকথিত প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে অপমান, হেয়, বহিষ্কার, নীরব বা সামাজিকভাবে একঘরে করার দাবি তোলে।
এই মব শুধু পুরুষদের দিয়ে তৈরি হয় না। নারীরাও এতে অংশ নেন, কখনও সরাসরি, কখনও উসকানিদাতা হিসেবে, কখনও দর্শক হিসেবে, কখনও আবার মবের নৈতিক বৈধতা জোগানো মানুষ হিসেবে।
পুরুষের নারীবিদ্বেষ যখন নারীরাও বহন করেন, তখন পিতৃতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হয়। কারণ তখন সেটিকে আর শুধু পুরুষের আগ্রাসন বলে দেখা যায় না; সেটি সমাজের সম্মিলিত নৈতিক রায় বলে প্রতিষ্ঠিত হয়।
এখানে ভারত ও বাংলাদেশের অভিজ্ঞতার মিলটি গুরুত্বপূর্ণ। মবের পতাকা বদলায়। কারও হাতে থাকে জাতীয়তাবাদের পতাকা, কারও হাতে ধর্মের, কারও হাতে প্রগতিশীলতার, কারও হাতে দলীয় আনুগত্যের। কিন্তু নারীকে অপমান করার কৌশলটি আশ্চর্যজনকভাবে একই থাকে।
এক পক্ষ বলে নারীটি চরিত্রহীন। অন্য পক্ষ বলে নারীটি পাগল। কেউ তাকে যৌন বস্তু বানায়। কেউ তার পোশাককে অপরাধের প্রমাণ বানায়। কেউ তাকে স্বামীর রাজনৈতিক পরিচয়ে আটকে ফেলে। কেউ তার মতের বদলে তার শরীর নিয়ে কথা বলে। কেউ তার বক্তব্যের বদলে তার মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
শব্দ আলাদা। রাজনৈতিক শিবির আলাদা। নৈতিকতার ভাষা আলাদা। কিন্তু উদ্দেশ্য এক, নারীটিকে তার বক্তব্য থেকে সরিয়ে এমন একটি পরিচয়ের মধ্যে বন্দি করা, যার মাধ্যমে তাকে অপমান করা সহজ।
এটাই মবোক্রেসির আসল শক্তি। এখানে কাউকে যুক্তিতে পরাজিত করতে হয় না। তার বিরুদ্ধে প্রমাণ হাজির করতে হয় না। তাকে শুধু এমন একটি সামাজিক চরিত্রে পরিণত করতে হয়, যাকে ঘৃণা করা বৈধ বলে মনে হয়।
তারপর শুরু হয় গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের বিচার।
প্রথমে ছবি। তারপর কাটা ভিডিও। তারপর কুৎসিত মন্তব্য। তারপর চরিত্রহনন। তারপর শাস্তির দাবি। শেষ পর্যন্ত নারীটি যে মানুষ, এই মৌলিক সত্যটিই মুছে যায়।
এই লেখাতে বলার পরেও, মনে করিয়ে দিতে চাই নেহা, তাসনিম, দিলারার প্রতি যা করা হচ্ছে, আওয়ামী সাংসদ, থানার ওসি, মেজিস্ট্রেট এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের শাসন এবং বিচার-ব্যবস্থা আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নির প্রতি তাই করেছিল। মিন্নিকে রাজসাক্ষি থেকে অভিযুক্ত বানিয়ে মৃত্যদন্ড দিয়েছিল।
এটাই গণমাধ্যম-নির্ভর মবোক্রেসি: যেখানে মতামত ও যুক্তি দিয়ে জনমত তৈরি হয় না; ভাইরাল অপমান দিয়ে রায় তৈরি হয়।
নেহা, তাসনিম, দিলারা, মিন্নি চার জনের ঘটনা এক নয়। তাঁদের বক্তব্যও এক নয়। তাঁদের রাজনৈতিক অবস্থানও এক নয়। তাঁদের সমালোচনা করার অধিকার অবশ্যই আছে। কিন্তু সমালোচনা আর মবের হাতে একজন নারীকে তুলে দেওয়া এক জিনিস নয়।
তিন প্রজন্মের চার নারী আমাদের সামনে তাই একই প্রশ্ন রেখে যান:
নারীর বক্তব্যের জবাব কি বক্তব্য দিয়ে দেওয়া হবে, নাকি নারী হওয়াটা তার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হবে?
একটি গণতান্ত্রিক সমাজের জন্য আসল পরীক্ষাটি এখানে।
তৃণা রাব্বানি

Trina Rabbani’s Post

মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।