
অনলাইন শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
রাষ্ট্রপতি কেন সাবেক সেনাপ্রধান নূরুদ্দীন খানের সঙ্গে দেখা করলেন—ওয়াকারকে ঘিরে কোনো সমঝোতার চেষ্টা?
ভেতর থেকে আসা খবর হিসেবে যে বর্ণনাটি আলোচনায় আছে, সেটি হলো—নূরুদ্দীন খানকে বঙ্গভবনে ডাকলে খবরটা সারা দেশে চাউর হয়ে যেতে পারে। এই আশঙ্কায় রাষ্ট্রপতি নাকি নিজেই গোপনে ডিওএইচএসে তাঁর বাসায় গিয়েছিলেন। সেখানে প্রায় এক ঘণ্টা বৈঠক হয়েছে বলে শোনা যাচ্ছে।
কী এমন আলোচনা ছিল, যার জন্য রাষ্ট্রপতিকে নিজেই সেখানে যেতে হলো?
নূরুদ্দীন খান শুধু একজন সাবেক সেনাপ্রধান নন। ১৯৯০ সালে এরশাদের শাসনের শেষ সময়ে তিনি সেনাপ্রধান ছিলেন। গণআন্দোলনের মুখে এরশাদকে ক্ষমতায় রাখতে সেনাবাহিনী আর সামরিক সমর্থন দিতে রাজি হয়নি। সেই সিদ্ধান্তে তাঁর ভূমিকা ছিল। পরে ১৯৯৬ সালে তিনি আওয়ামী লীগের হয়ে এমপি হন এবং শেখ হাসিনার সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।
এখানেই প্রশ্ন। আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি ও মন্ত্রী হওয়ার পরও সংকটের সময়ে তাঁর কাছে যাওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে কেন? তাঁর কোন সম্পর্ক বা যোগাযোগ এখন কাজে লাগতে পারে?
তাঁর আমেরিকান যোগাযোগের কথাও আলোচনায় আছে। বিভিন্ন মার্কিন প্রশাসনের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় থাকার যে কথা বলা হচ্ছে, সেটি বর্তমান পরিস্থিতিতে কতটা ভূমিকা রাখছে? আমার ধারণা, এই সাক্ষাতের উদ্দেশ্য বুঝতে হলে সেই দিকটিও দেখতে হবে। তাঁর মন্ত্রিত্বকালের চুক্তির ইতিহাস আর আজকের ব্যক্তিগত প্রভাব অবশ্য আলাদা বিষয়।
ওয়াকার-উজ-জামানের সঙ্গে নূরুদ্দীন খানের সম্পর্কের জায়গাটি আরও সরাসরি। ওয়াকারের নিজের বক্তব্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে ও পরে তাঁদের বেশ কয়েকবার বৈঠক হয়েছে। বিপদে তিনি নূরুদ্দীন খানের কাছ থেকে বুদ্ধি-পরামর্শ নেন। সেই অর্থে নূরুদ্দীন খান তাঁর গুরু ও পরামর্শদাতা।
তাহলে কি রাষ্ট্রপতি এমন একজনের কাছে গিয়েছেন, যাঁর কথা ওয়াকার গুরুত্ব দিয়ে শোনেন?
এর আগে রাষ্ট্রপতি ও ওয়াকারের মধ্যে ফোনালাপের যে খবর আসছে, সেখানে তাঁকে সৌদি আরবে রাষ্ট্রদূত করে পাঠানোর প্রস্তাবের কথা রয়েছে। সেই বর্ণনায় বলা হচ্ছে, ওয়াকার প্রস্তাবে রাজি হননি। দেশে ফিরে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
এই ফোনালাপের সঙ্গে নূরুদ্দীন খানের বাসায় যাওয়ার খবরটি মিলিয়ে দেখলে প্রশ্ন ওঠে—সরাসরি কথায় কাজ না হওয়ায় কি এবার তাঁর গুরুর মাধ্যমে সমঝোতার চেষ্টা হচ্ছে? ওয়াকারকে অন্য দায়িত্বে পাঠাতে রাজি করানোই কি উদ্দেশ্য? নাকি সরকারের সঙ্গে তাঁর কোনো মতবিরোধ মেটাতে মধ্যস্থতা চাওয়া হচ্ছে?
সেনাবাহিনীর ভেতরেও বিভিন্ন পক্ষের টানাপোড়েনের কথা আসছে। কিছু অংশ ওয়াকারের নেতৃত্ব মানতে চাইছে না—এমন দাবি রয়েছে। সরকার সারা দেশে ‘ক্লিন হার্ট’-এর মতো অভিযান চালাতে চেয়েছিল, কিন্তু তাতে অংশ নেওয়া নিয়ে আপত্তি এসেছে বলেও শোনা যাচ্ছে। এসব বর্ণনা সঠিক হলে মতবিরোধ শুধু পদ নিয়ে নয়; বাহিনীকে কী ধরনের কাজে ব্যবহার করা হবে, তা নিয়েও।
ওয়াকার এখন বিদেশ সফরে। তাঁর অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্রদূত করার কথিত প্রস্তাব, বাহিনীর ভেতরের মতবিরোধের খবর এবং নূরুদ্দীন খানের বাসায় রাষ্ট্রপতির কথিত এক ঘণ্টার বৈঠক—সব মিলিয়ে তাঁর দেশে ফেরার পরের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
আমার কাছে মূল বিষয়টা সেই সাক্ষাৎ। বঙ্গভবনে ডাকলে খবর ছড়িয়ে পড়বে বলে রাষ্ট্রপতি যদি নিজেই গোপনে গিয়ে থাকেন, তাহলে আলোচনাটা কি সাধারণ সৌজন্যের ছিল? নাকি এমন একটি সমঝোতা প্রয়োজন হচ্ছে, যার জন্য ওয়াকারের আস্থাভাজন মানুষটির সাহায্য নিতে হচ্ছে?
নূরুদ্দীন খানের আওয়ামী লীগের অতীত, ওয়াকারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক এবং আমেরিকান যোগাযোগের আলোচনা—এই জায়গাগুলো মিলিয়েই প্রশ্নটা করছি: রাষ্ট্রপতি তাঁর কাছে কী চাইলেন?
ওয়াকারের ঘনিষ্ঠজনদের কাছ থেকে আসছে বলে যে বর্ণনাটি শোনা যাচ্ছে, সেখানে ৭ সেপ্টেম্বরের একটি ফোনালাপের কথা বলা হচ্ছে। রাষ্ট্রপতি নাকি ওয়াকারকে বলেছিলেন, সফর শেষে যেন সরাসরি তাঁর সঙ্গে দেখা করেন, কিছু কথা আছে। কিন্তু তাঁদের ফোনালাপ খুব একটা ভালোভাবে শেষ হয়নি। সেই বর্ণনা অনুযায়ী, ওয়াকার নিজের অবস্থান শক্তভাবে তুলে ধরেছেন এবং দেশে ফিরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
এখানেই প্রশ্ন—ওয়াকারের এই আত্মবিশ্বাসের পেছনে কী আছে? শুধু সেনাপ্রধানের পদ, নাকি বাইরের কোনো সম্পর্কও তাঁকে শক্ত অবস্থান নিতে সাহায্য করছে?
রাখাইন করিডোর নিয়ে তাঁর আপত্তি এবং ‘ব্লাডি করিডোর’ মন্তব্যের খবরের সময় অনেকেই ধরে নিয়েছিলেন, আমেরিকার সঙ্গে তাঁর স্বার্থের বড় সংঘাত তৈরি হয়েছে। কিন্তু একটি বিষয়ে আপত্তি থাকলেই সব বিষয়ে সম্পর্ক শেষ হয়ে যায় না। সামরিক সহযোগিতা, অস্ত্র কেনাবেচা এবং আঞ্চলিক স্বার্থের জায়গায় আবার বোঝাপড়া হতে পারে।
বাংলাদেশের যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম কেনা বাড়ানোর বিষয়টি এখানেই প্রাসঙ্গিক। আমেরিকার অস্ত্র বিক্রির স্বার্থ আছে, বাংলাদেশের সামরিক নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পর্ক রাখারও স্বার্থ আছে। অন্যদিকে ওয়াকারের জন্যও মার্কিন সামরিক মহলের সঙ্গে যোগাযোগ নিজের অবস্থান ধরে রাখতে কাজে আসতে পারে। তবে রাষ্ট্রীয় এই সম্পর্ক থেকে আমেরিকা ব্যক্তিগতভাবে ওয়াকারকেই পদে রাখতে চায়—এ সিদ্ধান্ত সরাসরি টানা যায় না।
আমার প্রশ্নটা তাই একটু ভিন্ন: দুই পক্ষের স্বার্থ কি এমন জায়গায় মিলেছে, যেখানে আমেরিকারও ওয়াকারকে প্রয়োজন হতে পারে, আবার ওয়াকারেরও আমেরিকার সঙ্গে সম্পর্ক প্রয়োজন হতে পারে?
এই সম্ভাবনাটি মাথায় রাখলে নূরুদ্দীন খানের কাছে রাষ্ট্রপতির কথিত যাওয়ার খবরটি নতুনভাবে দেখা যায়। একদিকে তিনি ওয়াকারের গুরু ও পরামর্শদাতা। অন্যদিকে তাঁর আমেরিকান যোগাযোগের কথাও আলোচনায় আছে। তাহলে কি এমন একজনের সাহায্য চাওয়া হচ্ছে, যিনি ওয়াকারের সঙ্গে কথা বলতে পারেন এবং বাইরের অবস্থানও বুঝতে পারেন?
সরাসরি ফোনে সমাধান না হলে, আস্থাভাজন মানুষের মাধ্যমে কথা বলা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এখানে কী নিয়ে সমঝোতা দরকার হচ্ছে—ওয়াকারকে অন্য দায়িত্বে পাঠানো, তাঁর সঙ্গে সরকারের মতবিরোধ মেটানো, নাকি সেনাবাহিনীর ভেতরের টানাপোড়েন সামলানো?
রাষ্ট্রপতির কথিত এক ঘণ্টার বৈঠকের আসল প্রশ্নটা এখানেই। নূরুদ্দীন খানের কাছে শুধু পরামর্শ চাওয়া হয়েছে, নাকি ওয়াকারকে বোঝানোর দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে?
Sayed Mahmood Rashad Haider’s Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।





















