
অনলাইন সোমবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শুরুটা হয়েছিল ৪০ বছর আগে, ১৯৮৬ সালে। আমার নতুন অফিস ২০ নম্বর শেখ সাহেব বাজার। আমীরুলের বাসা আমলিগোলা, সকালে নাস্তা সেরে চলে আসতেন-আড্ডা চলত বিরামহীম। আমীরুলের আড্ডা মানেই এক নতুন মাত্রা যোগ হওয়া। সকালে একটু বেলা করে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা শেষে ১১/১২ টার দিকে এসে বসতেন অধুনা অফিসে। ততক্ষণে সাজ্জাদও এসে যেতেন। সিগারেটের পিপাসা কণ্ঠে নিয়েই আমীরুল আসতেন। এই পথটুকু হেঁটে আসার সময় সঙ্গে জুটে যেতেন আরও দুয়েকজন অপেক্ষাকৃত তরুণ-কিশোর। অফিসে বসেই পাশের দোকান থেকে এক শলা সিগারেট আনাতেন। ওকে একসঙ্গে কখনো একাধিক সিগারেট কিনতে দেখতাম না। কখনও কখনও রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া কোনো কিশোরকে গলা ছেড়ে ডাকতেন, ‘অই ছোট ভাই এদিকে আহো’। ছোট ভাই অনেকটা ভ্যাবাচেকা খেয়ে এলো। তার নাম, ঠিকানা, বংশ কুষ্টির হদিস নেওয়ার পর, ‘ছোট ভাই একটা সিগারেট আইনা দ্যাও তো’। ছোট ভাই সিগারেট এনে দিলো। ‘আরে মিয়া ম্যাচ আনবা না? সিগারেট ধরাইমু ক্যামতে?’ ছোট ভাই ম্যাচ এনে দিয়ে বিদায় নিলো। আমি অবাক এবং আনন্দ নিয়ে আমীরুলের কীর্তি দেখতাম।
পরিচিত কেউ ওই রাস্তা দিয়ে যেতে থাকলে সে-ও কখনও কখনও আড্ডায় যোগ দিত। সাজ্জাদ শরীফ, সানী ভাই-কখনও রিটন ভাই, আলী ইমাম ভাই। তখন পরবর্তী দু’জনই শেখ সাহেব বাজারের কাছেই বাস করতেন আর সাজ্জাদ শরৎগুপ্ত রোডে থাকলেও সকালে চলে আসতেন আমার অফিসে। সানি ভাই থাকতেন আমলি গোলা। আহমাদ মাযহার ভাইও যোগ দিযেছেন কখনও কখনও! ওই আড্ডাগুলো নিছক আড্ডা ছিল না, ‘সময় প্রকাশন’-এর শুরুর দিক্কার অনেক পরিকল্পনা হতো ওই আড্ডা থেকে। ইমদাদুল হক মিলন ভাইকে ডেকে নিয়ে আসা আমার বাসায়-নতুন বইয়ের পরিকল্পনা করা। হুমায়ূন আহমেদ ভাইয়ের শহীদুল্লাহ হলের বাসায় গিয়ে এবং সৈয়দ শামসুল হকের গুলশানের বাসায় গিয়ে সময় প্রকাশনের জন্য বই চাওয়া, শাহরিয়ার কবিরের সঙ্গে ‘বিচিত্রা’ অফিসে গিয়ে দেখা করা এবং বইয়ের আলাপ দেওয়া-সবকিছুই সময় প্রকাশনের যাত্রা শুরুর গল্প, আর এসব গল্পের সঙ্গী ছিল আমীরুল। সে নিজে দায়িত্ব নিল মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বইয়ের। রচিত হলো, ‘কিশোর মুক্তিযোদ্ধাদের সত্যি গল্প’। সম্পাদনা করে পাণ্ডুলিপি তৈরি করল, ‘কিশোর উপযোগী মুক্তিযুদ্ধের নির্বাচিত গল্প’, ‘শহীদ বুদ্ধিজীবির সন্তানদের স্মৃতিকথা : আমার বাবা’-আরও অনেক। আমার আজিমপুরের চায়না বিল্ডিং গলির বাসায় আড্ডা আর খাওয়া চলত।
আড্ডা থেকে উঠে কখনও আলী ইমাম ভাইয়ের সঙ্গে বিটিভি অফিসে যেতাম। আমার প্রথম উপস্থাপনা বিটিভি’র আউটডোর রেকডিংয়ের সময় সঙ্গে ছিলেন আমীরুল। ‘হ ফরিদ ভাই, পয়লা দিনেই বাজিমাত করছেন!’ সাহিত্য-সংস্কৃতির একজন নিখুঁত সমালোচকের ওই উক্তি আমায় অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।
আমার একটা ৫০ সিসি হোন্ডা ছিল-এসব যাত্রায় আমার হোন্ডার পেছনে বসে থাকত আমীরুল। ওর ওজন বেশি ছিল, ব্যালেন্স করতে আমার কষ্ট হলে ওকে বলতাম। তখন সে একটা স্মৃতি বলেছিল-সে যখন এক বছরের কম বয়সী তখন পুরনো ঢাকায় স্বাস্থ্যবান শিশুকে পুরস্কৃত করার একটা প্রতিযোগিতা হয়েছিল, সম্ভবত ১৯৬৪-৬৫ সালে। আমীরুল প্রথম হয়েছিল, বেশি ওজনের জন্য।
ওদের আমলি গোলার বাসায় যেতাম যখন-তখন, আমলি গোলার বিখ্যাত ‘খাতাপুরি’র স্বাদ সেখানেই প্রথম নেই। একবার ওর বড়ভাই কামাল আহমেদ অসুস্থ হলেন, জন্ডিস হয়েছিল সম্ভবত, কামাল ভাই হতাশায় ভুগছিলেন। আমীরুলের সে কী চেষ্টা বড় ভাইয়ের মন ভালো করার। আলী ইমাম ভাইয়ের বাসায় এসে তার সংগ্রহশালার বই দেখানো, গল্প করা, খাওয়া। নিজ পরিবারের প্রতি দায়িত্ব তখন থেকেই ছিল, যা ওর জীবনের শেষ পর্যায় পর্যন্ত আমরা দেখলাম।
’৯০-’৯১ সালের দিক থেকে আড্ডা শুরু হলো বাংলামোটরে ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে’। মাঝেমধ্যে আমিও আড্ডায় যোগ দিতাম। যোগ হলেন চয়ন ইসলাম ও লিলি ইসলাম। শুরু হলো নতুন অধ্যায়-আড্ডার পরিধি বৃদ্ধি পেলো, চলতে শুরু করল-কখনও চয়ন ইসলামের ভালুকার ‘তেপান্তর’-এ, কখনও সিরাজগঞ্জের গ্রামের বাড়িতে আবার কখনও সুন্দরবনের গভীর অরণ্যে। দেশের সীমানা পেরিয়ে কলকাতা পর্যন্ত ভ্রমণ প্রসারিত হলো।
এরমধ্যে শুরু হলো নতুন অভিযান-A2Z (এ টু জেড) নামের একটি প্রতিষ্ঠান খুললেন চয়ন ইসলাম, বেইলি রোডে অফিস। আমীরুলকে দায়িত্ব দেওয়া হলো। আমাদের বইয়ের কম্পোজ শুরু হলো ওই প্রতিষ্ঠানে। আমীরুলের নিজস্ব রুম হলো-আমাদের আড্ডার জায়গা হলো। এখনে আড্ডা আর কাজ দু’টোই পাশাপাশি চলত।
কয়েক বছর যেতে-না-যেতেই ফরিদুর রেজা সাগর ভাই খুললেন চ্যানেল আই-আমীরুল A2Z থেকে হাইজ্যাক হয়ে যোগ দিল চ্যানেল আইয়ে। এর পর শুরু হলো তার জীবনের আর এক সম্প্রসারিত অধ্যায়। চ্যানেল আইয়ের কল্যানে এই জীবন-যাপন দেশবাসী দেখেছেন, জেনেছেন। এত পরিবর্তনের মাঝেও কখনও থেমে থাকেনি তার লেখনি। যখন যেখানে বসেছেন সেখানেই একটা কাগজ টেনে নিয়ে লিখতে শুরু কেরেছেন। সাহিত্যের সব শাখায় বিচরণ করেছেন। আমাদের শিশু-সাহিত্য সমৃদ্ধ হয়েছে তার অংশগ্রহণে। শিশু-সাহিত্যের জন্য ওর ভালোবাসা ছিল অফুরাণ। ওর পড়া ছিল উল্লেখ করার মতো। বাংলা সাহিত্যের উল্লেখযোগ্য সব কিছুই পাঠ করা হয়ে গিয়েছিল। খুব দ্রুত পড়তে এবং সবটুকু মনে রাখতে পারতেন। এমনও হয়েছে, কোনো একটা লেখা ওকে পড়তে দিয়েছি। আমার ধারনার এক-চতুর্থাংশ সময়ে পড়া শেষ করেছে। আমি বলেছি, পুরোটা ভালো করে পড়েন। তখন সে মুখস্থ বলে শুনিয়েছে। অবাক হতে হয়েছে আমাকে।
দাবা খেলার খুব ভক্ত ছিলেন। দাবাড়ুরা তার প্রিয় ছিল। একবার আমাকে নিয়ে গেলেন নিয়াজ মুর্শেদের অফিসে-‘ফরিদ ভাই, নিয়াজের একটা বই করতে হবে।’ দাবাড়ু জিয়াউর রহমান দীর্ঘদিন আমীরুলের স্নেহ পেয়েছেন। জিয়াকে আমার বাসায় একাধিক দিন নিয়ে এসেছেন দাওয়াত খাওয়াতে। ‘ওর একটা বই বের করতে হবে!’ নিয়াজের বইটা প্রকাশিত না হলেও জিয়ার বই ‘দাবা : খেলার রাজা, রাজার খেলা’ প্রকাশিত হয়েছিল ফেব্রুয়ারি ১৯৯৭-এ। এই বইয়ের কাজ নিয়ে আমীরুলের সে কী ব্যস্ততা, দাবার প্রতিটি চালের সিম্বলিক ছক-যেন কোথাও কোনো ভুল না হয়। নিজের বইয়ের ক্ষেত্রেও ওকে এত পরিশ্রম করতে দেখিনি। এরকম আরও অনেক গল্প আছে-মানুষের উপকার করা, লেখকদের হাতে ধরা লেখা শেখানো, প্রকাশকদের গড়ে তোলা ইত্যাদি ইত্যাদি।
ওর কথা বলে শেষ করা যাবে না। অন্তহীন প্রাণ নিয়ে সাহিত্য-সংস্কৃতির সেবা করে গেছেন আমীরুল ইসলাম। অবশেষে দীর্ঘ রোগ ভোগার পর ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, প্রথম প্রহর ১.০৭ মিনিটে থেমে গেল হৃদস্পন্দন! তার শেষ বিদায় স্নিক্ত হয়েছে মানুষের ভালোবাসায়। আমাদের শিশু-কিশোররা যতদিন সাহিত্য পাঠ করবে ততদিন আমীরুল বেঁচে থাকবেন তাদের মাঝে।
Farid Ahmed’s Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।





















