
অনলাইন রবিবার, ০২ আগস্ট,
আমার ছেলে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। ভীষণ উড়নচণ্ডী। পড়াশোনায় অমনোযোগী। সারাদিন খেলাধুলা আর এর ওর সাথে মা রা মা রি করে। স্কুলে অনিয়মিত। যখন-তখন আমার কাছে টাকা চায়, আর আমি কোনো প্রশ্ন না করেই দিয়ে দিই। কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে, কী করছে, কিছুই খোঁজ জানি না। ধীরে ধীরে সে বখাটে বন্ধুদের সঙ্গে চলাফেরা করা শুরু করল, ক্ষতিকর অভ্যাস গুলো আয়ত্ত করে নিল।
এখন প্রশ্ন হলো, দোষটা শুধু এই ১২-১৩ বছরের শিশুটির, নাকি আমারও?
শিশুর ভুলের দায় সম্পূর্ণ অস্বীকার করা যাবে না নিশ্চয়ই। কিন্তু একজন অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের নিরাপত্তা, অর্থের উপযোগিতা, বন্ধুবান্ধব, অনলাইন ও অফলাইন একটিভিটিজ মনিটরিং করা এবং সঠিক পথ দেখানোর প্রধানতম দায়িত্ব কার? তার অভিভাবকের!
ঠিক একই প্রশ্ন আমি ওই ঘটনাতেও করি।
যদি একটি মেয়ে ১১-১২ বছর বয়সেই টিকটক করে, প্রেমের সম্পর্কে জড়ায়, বয়সের তুলনায় অকালপক্ব আচরণ করে, তাহলে প্রথম প্রশ্ন হওয়া উচিত, তাকে দেখে রাখার মানুষজন কোথায় ছিল? শুনেছি তার মা নাকি বিদেশে গৃহকর্মীর চাকরি করতো আর বাবা অটোরিকশা চালায়। তাকে সীমারেখা শেখানোর দায়িত্ব তাহলে কার ছিল? সোশ্যাল মিডিয়ায় তার পদচারণার পথিকৃৎ কে ছিল? তার হাতে স্মার্টফোন কে তুলে দিয়েছিল? সারাদিন এডাল্ট কন্টেন্ট দেখে কেউ তো ফেরেশতা হয় না। ইঁচড়ে পাকা হওয়ার সকল উপকরণ চারপাশে সাজিয়ে রেখে দিনশেষে শুধু মেয়েটির দিকে ফিঙ্গার পয়েন্ট করলে কি হবে?
যদি সত্যিই বিয়ের সময় মেয়েটির বয়স ১২ বছর হয়ে থাকে, তাহলে সে আইনগত ও মানসিক, দুই দিক থেকেই শিশু। টিকটক করা, সাজগোজ করা, প্রেমের সম্পর্কে জড়ানো বা বিয়েতে রাজি হওয়া, মা হওয়া এসবের কোনোটিই তাকে প্রাপ্তবয়স্ক করে তোলে না। এই বয়সে বিচারবোধ, emotional balance ও continuous দায়িত্ব নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি হয় না। এই বয়সে ভুল পথে গেলে পথ দেখাতে হয়, শাসন করতে হয়, বোঝাতে হয়। ১২ বছরের শিশু তো প্রাপ্তবয়স্ক না। তার কাছ থেকে আপনি কতটা দায়িত্বশীল আচরণ আশা করেন? সে ইঁচড়ে পাকা বলেই তো তার এই দুরন্তপনার ফায়দা উঠিয়ে তার সাথে প্রেম করা গিয়েছে, বিয়ে করা গিয়েছে, সন্তানের জন্ম দেওয়া গিয়েছে। এখন শেষে এসে সেই দুরন্তপনা নিয়ে প্রশ্ন করলে তো হবে না!
অথচ এই পুরো ঘটনায় মেয়েটির ভুল নিয়ে সবাই কথা বলছে। কিন্তু কেউই বলছে না শিশুটি কেন এমন হলো, তাকে নিরাপদ রাখার দায়িত্বে যারা ছিলেন তারা কোথায় ছিলেন। হয়তো সে সুন্দর ছিল বলেই সবার নজর কেড়েছে আর সে নিজেও উপভোগ করেছে বিষয়টা।
একজন প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ কেন একজন নাবালিকার সঙ্গে সম্পর্কে জড়াল? তখনো তো তার এই স্বভাবগুলো গোপন ছিল না। মেয়েটি আগেও এমনই ছিল। তাকে বিয়ে করল কেন ছেলেটি? কী আশা করেছিল সে? বিয়ের পরদিন থেকেই সে হঠাৎ একজন দায়িত্বশীল স্ত্রী, পুত্রবধূ এবং আদর্শ মা হয়ে যাবে?
একটা শিশুর অকালপক্বতা কখনোই তাকে প্রাপ্তবয়স্ক বানিয়ে দেয় না। বরং সেটি প্রায়ই বড়দের ব্যর্থতার লক্ষণ। শিশুরা ভুল করবে, সেই কারণেই তাদের পরিবার, অভিভাবক, আইন ও সমাজের সুরক্ষা প্রয়োজন।
এই ঘটনায় মেয়েটির ভুল নিয়ে আলোচনা হতেই পারে। কিন্তু সেই সঙ্গে প্রাপ্তবয়স্ক স্বামী, দুই পরিবারের সিদ্ধান্ত এবং অভিভাবকদের দায়িত্বও সমান গুরুত্ব দিয়ে প্রশ্নের মুখে আসা উচিত। জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় তাদেরকেও দাঁড় করানো উচিত। মেয়েটির আচরণে সমস্যা থাকলেও প্রাপ্তবয়স্কদের দায়িত্বকে উপেক্ষা করা যায় না।
আজকে যদি বলেন যে, সে সংসার করতে পারেনি, সন্তানের দায়িত্ব নিতে পারেনি, একাধিক সম্পর্কে জড়িয়েছে বা দায়িত্বজ্ঞানহীন ছিল, তাহলে সেটি বিস্ময়ের বিষয় কেন? যে বয়সে একটি শিশুর নিজেরই মানসিক বিকাশ চলার কথা, সেই বয়সে তাকে স্ত্রী, পুত্রবধূ ও মা, এই তিনটি ভূমিকা একসঙ্গে পালন করতে দেওয়াটাই ছিল অবাস্তব প্রত্যাশা। শিশুদের ভুল হতে পারে, কিন্তু সেই ভুল থেকে ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব ছিল বড়দের।
এই ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট প্রায় প্রত্যেকেরই বক্তব্য শুনেছি এবং প্রত্যেকের বক্তব্যের বেশিরভাগ অংশই সত্যি। মেয়েটির শাশুড়ি এবং হাসবেন্ড, সঙ্গে হাজবেন্ডের বন্ধু যা যা বলেছে সেটাও সত্যি বলে মনে হয়েছে। মেয়েটি যে অতিরিক্ত fast এটা নিয়েও কোন দ্বিমত নেই এবং এটাও আমার মনে হয় যে মেয়েটির এই নানান সম্পর্কে জড়ানো এবং বিয়ে করা এই সিরিজ এখানেই শেষ নয়। আর শিশু সন্তানটির দায়িত্বও এই মেয়ের পক্ষে নেওয়া সম্ভব নয়। সে বড়জোর সন্তান নিয়ে tiktok করতে পারবে।
কিন্তু মূল প্রশ্ন তো এটা নয়।
আমি মেয়েটির সব কাজকে সমর্থন করছি না। ভুল করলে ভুলই বলতে হবে। কিন্তু সেই ভুলের সম্পূর্ণ দায় একজন নাবালিকার কাঁধে চাপিয়ে দিয়ে, তাকে বিয়ে করা প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি, দুই পরিবারের সিদ্ধান্ত এবং অভিভাবকদের ব্যর্থতাকে আড়াল করাও ন্যায্য নয়।
অনেকে আবার দুর্বল যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করছেন যে, ছেলেটি একটা জন্ম নিবন্ধনের ছবি শো করছে যেখানে দেখাচ্ছে মেয়েটার বয়স ১৯ বছর। জন্ম নিবন্ধন এর ওয়েবসাইটে গিয়ে সার্চ করুন এটা ফেইক জন্ম নিবন্ধন হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।
অনেকে এটাও বলেছেন যে, আগেকার দিনে তো ১২-১৩ বছরেই বিয়ে হতো। হ্যাঁ, হতো। আরো অনেক ধরনের অন্যায় প্রথাও ছিল। এখনও সমাজের কিছু অংশে, বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে, বাল্যবিবাহ ঘটে। কিন্তু কোনো কিছু বহুদিন ধরে চলছে বলেই তা আদর্শ হয়ে যায় না।
আমার বাসার যে গৃহকর্মী, তার বিয়ে হয়েছিল ১৩ বছর বয়সে। দুজন সন্তান হওয়ার পর তার হাজবেন্ড আবার আরেকটি বিয়ে করে। এরপর সে নিজেই সংসার থেকে বের হয়ে চলে আসে। এখন তার বয়স মাত্র ২৭, অথচ তাকে দেখতে মনে হয় ৪৭ বছর। সঙ্গে নানান ধরনের শারীরিক সমস্যা, পুষ্টি স্বল্পতা, গাইনি সমস্যা, হাড়ের ক্ষয়, কোমর ও মেরুদণ্ডের ব্যথাস। তার নিজের মেয়েকেও সে ১৩ বছর বয়সেই বিয়ে দিয়েছে। সেই মেয়ে এখন আবার প্রেগন্যান্ট!
সমাজে এমন অনেক কুপ্রথা আছে, যা বছরের পর বছর চলে এসেছে। কিন্তু শুধু পুরোনো বলেই কোনো প্রথা সঠিক হয়ে যায় না। অন্যায়কে প্রশ্রয় দিলে তা আরও ছড়ায়। সমাজের কাজ অন্যায়কে স্বাভাবিক বলে মেনে নেওয়া নয়, বরং প্রশ্ন করা, ক্ষতিকর প্রথার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এবং মানুষকে সঠিক পথ দেখানো। আর প্রতিরোধ করলে তবেই পরিবর্তন আসে।
নোটঃ সেভেনে পড়া কোন সন্তান আমার নেই। পোস্টের শুরুতে যেই উদাহরণ দেওয়া হয়েছে সেটা কাল্পনিক।
Farida Akhter’s Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।





















