
জাহাঙ্গীর আলম জাহান
অনলাইন বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
২০০৯ -২০২৪-এর ৫ আগস্ট এই সাড়ে পনের বছরের আওয়ামী শাসনামলে অনেক লেখককেই মুজিবপ্রেমে গদগদ হতে দেখেছি। আবার ২৪-এর আগস্ট-পরবর্তী কঠিন সময়ে ওই লেখকদের অনেককেই রাতারাতি ভোল পাল্টিয়ে কথিত ‘জুলাই যুদ্ধের’ ঘোর সমর্থক হতে দেখেছি। এদের অনেকেই মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী সেজে বাংলা একাডেমি, শিশু একাডেমিসহ অন্যান্য সরকারি, আধা-সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকাশিত মুজিববর্ষের বিভিন্ন বই ও সঙ্কলনে, পদ্মাসেতু বিষয়ক বই ও সঙ্কলনে, এমনকি শেখ রাসেল ও শেখ হাসিনার জন্মদিবস পালনোপলক্ষ্যে প্রকাশিত বই ও সঙ্কলনে ছড়া, কবিতা, স্মৃতিচারণসহ বিভিন্ন প্রশস্তিসূচক রচনা লিখে নিজেকে খাস আওয়ামীপন্থী প্রমাণের আপ্রাণ চেষ্টাও করেছেন। কিন্তু ৫ আগস্টের পর বাস্তবতার সাথে তাল মিলিয়ে এদের অনেকেই কথিত ‘নতুন স্বাধীনতা’র পক্ষশক্তি হিসেবে নিজেকে জাহির করার জন্য নতুন মুখোশে আবির্ভূত হন। বড়ো বিচিত্র এদেশ, বড়ো বিচিত্র এদেশের সঙ্কর মানুষ। আমরা এদের সবাইকে চিনি। এদের অতীত এবং বর্তমানকেও
প্রত্যক্ষ করার বিরল সুযোগ আমাদের হয়েছে। এরা অতিপ্রেম দেখিয়ে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন পুরস্কার যেমন বাগিয়েছেন, তেমনি অনেকে অর্জন করেছেন বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবি।
কথা হচ্ছে যে মানুষ ব্যক্তিগত স্বার্থে সহসা পোশাক পাল্টিয়ে নতুন দলের জার্সি গায়ে দেন, তারা আর যা-ই হোক, কোনোভাবেই সৎ ও সজ্জন হতে পারেন না। আজ পুরনো জার্সি খুলে সুবিধাজনক নতুন জার্সিতে আবির্ভূত হলেও ভবিষ্যতে এরা নতুন দলের জার্সি খুলতেও যে এতটুকু সময় নেবে না, তা নতুন দলগুলো যদি বুঝতে পারতো, তাহলে তারা এই চিহ্নিত গিরগিটিদের এত সহজে কোলে তুলে নিতো না। হ্যাঁ, এরা একপ্রকার গিরগিটিই। ঘন ঘন রং পাল্টাতে এদের জুড়ি নেই।
আওয়ামী লীগের দোষ ও পাপের পাল্লাও একেবারে হাল্কা নয়। বিগত সাড়ে পনের বছরে রাজনীতিকে এককেন্দ্রিক করার ক্ষেত্রে এ দল আত্মঘাতি পারদর্শিতা দেখিয়েছে। ১৯৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর দখলদার পাকিস্তান বাহিনির নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে সারাদেশে বিজয় পতাকা উড্ডীন হলেও প্রবল পাকিস্তানপন্থী ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী অপশক্তি হিসেবে বিহারী সম্প্রদায় সশস্ত্র প্রতিরোধ অব্যাহত রেখে খোদ রাজধানীর মিরপুর অংশকে ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত পাকিস্তান বানিয়ে রেখেছিল। বীর মুক্তিযোদ্ধারা অনেক কৌশলে তাদেরকে নিরস্ত্র করে মিরপুর এলাকায় বিজয়ের লাল-সবুজ পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। যে পাকিস্তানের জন্য বিহারী সম্প্রদায় জানপ্রাণ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে নস্যাৎ করার সশস্ত্র যুদ্ধ চালিয়ে গেল, স্বাধীনতার পর তাদের পেয়ারে পাকিস্তান তাদেরকে ফিরিয়ে নিতে রাজি হলো না। নতুন গঠিত স্বাধীন বাংলাদেশে বিহারীরা হয়ে গেল রিফিউজি। না, রিফিউজি তারা আগেও ছিল। এরা তো মূলত পাকিস্তানের কেউ নয়। এদের আদিনিবাস ভারতের বিহারে। মূলত ১৯৪৬-এর হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় টিকতে না পেরে এরা প্রাণ বাঁচানোর প্রয়োজনে বিহার ত্যাগ করে তদানীন্তন পূর্ববঙ্গে (পরে পূর্ব পাকিস্তান) এসে বিফিউজির জীবন বেছে নিয়েছিল। সে সময় অনেক হিন্দু ধর্মাবলম্বী মাড়োয়ারি বিহারীও এই বঙ্গে চলে আসে। সেই থেকে বিহারীরা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে বসতি গেড়ে বসে। পূর্ব পাকিস্তান রেল বিভাগের অধিকাংশ পদই ছিল বিহারীদের দখলে। যে কারণে পূর্ব পাকিস্তানের যেখানেই রেল জংশন, সেখানেই ছিল বিহারীদের আধিক্য।
মুক্তিযুদ্ধের প্রাক্কালে এই বিহারী সম্প্রদায় প্রবলভাবে আওয়ামী বিরোধিতা ও স্বাধীনতা বিরোধিতায় অংশ নেয়। বাঙালি-বিহারী সংঘাতে প্রাণ হারায় হাজার হাজার বাঙালি। বাঙালিদের হাতে বিহারীও নিধন হয় অগণিত। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এরা পাকিস্তান রক্ষার নামে দলে দলে রাজাকার বাহিনীতে যোগ দিয়ে কয়েক লক্ষ বাঙালিকে নির্বিচারে হত্যা করেছে এবং হানাদার বাহিনীর হাতে তুলে দিয়ে হত্যা করিয়েছি। এরা আজ পর্যন্ত বাংলাদেশের স্বাধীনতা মেনে নেয়নি এবং অন্তরে পাকিস্তানকে ধারণ করে। চব্বিশের মেটিক্যুলাস ডিজাইনের আন্দালনে এদেরও ছিল সক্রিয় অংশগ্রহণ। হাসিনা-বিতারণে এই বিহারীদের অবদানও কোনো অংশে কম নয়। চব্বিশের পাঁচ আগস্টের পর এরাই ঢাকায় জিন্নাহ্’র জন্মদিন পালন করার ধৃষ্টতা দেখিয়েছে। ঘটা করে উর্দু গজল পরিবেশনের অনুষ্ঠান করেছে। পাকিস্তান পুনরুদ্ধারে নতুন করে নানামুখী ষড়যন্ত্র চালিয়ে যাচ্ছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, শেখ হাসিনা তাঁর শাসনামলে এই বিহারীদের নৌকায় তোলার অভিপ্রায় নিয়ে এদেরকে এনআইডি প্রদানের মাধ্যমে বাংলাদেশের নাগরিক বানিয়ে ভোটাধিকার পর্যন্ত প্রদান করেছেন। এতকিছু করেও তিনি বিহারীদের মন জয় করতে পারেননি।
কওমিপন্থীরা কোনোদিন কওমি সনদের স্বীকৃতি পেতে রাষ্ট্রের কাছে ধর্না দিয়েছে বলে আমার জানা নেই। অথচ এই কওমি সনদের স্বীকৃতি দিয়ে এদেরকেও তিনি নৌকায় তুলতে চেয়েছেন। তার ফল কী হয়েছে সেটা নিশ্চয় নতুন করে ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই।
মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ ঠেকানোর জন্য শেখ হাসিনা সীমান্তে কড়া প্রহরা আরোপ করেছিলেন। তখন এদেশের মোল্লা-মুন্সিরা বিপন্ন মুসলিম ভাইদের বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার জন্য বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটে কত-না সমাবেশ মিছিল করেছে। এমনকি তারা এমনও বলেছে, যদি সরকার রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিতে না পারে
তাহলে আমরা প্রত্যেকে নিজেদের বাড়িতে দুই-চারজন করে আশ্রয় দেবো, তবু সরকার রোহিঙ্গাদের জন্য সীমান্ত উন্মুক্ত করে দিক। এরপরও শেখ হাসিনা সীমান্ত থেকে কঠোর নজরদারি প্রত্যাহার করেননি। পরে লোকমুখে প্রচারিত হয় (সত্য-মিথ্যা জানি না) কে বা কারা জননেত্রীকে বোঝালেন- আশ্রয়হারা রেহিঙ্গাদের আশ্রয় দিলেই নাকি তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়ে যাবেন। এর কিছুদিন পরই সীমান্ত অবমুক্ত করা হলো এবং পর্যায়ক্রমে ১১ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশাধিকার পেল। সেই রোহিঙ্গাদের আর স্বদেশে ফেরত পাঠানো গেল না। পরে শোনা যায়, রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে নানা অপকর্মে জড়াতে শুরু করেছে। এমনকি বাংলাদেশবিরোধী কর্মকাণ্ডেও এরা পারঙ্গম হয়ে উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, চব্বিশের আন্দোলনে রোহিঙ্গাদের বড়ো একটি অংশ হাসিনা-বিতারণে সরাসরি ভূমিকা রেখেছে।
আমাদের প্রিয় নেত্রীর এ রকম আরও কিছু সিদ্ধান্ত আজকে আমাদের জন্য কত বড়ো দুর্ভোগ ডেকে এনেছে তা অনুধাবন করতে হবে। বিগত সাড়ে পনেরো বছর ‘জয়বাংলা’র ছদ্মাবরণে যারা সরকারের সুদৃষ্টি পেয়ে নানান সুবিধা লুটেছে এবং ২৪-এর পর রাতারাতি পল্টি মেরে নতুন জার্সি গায়ে চড়িয়েছে, আমার মনে হয় যদি আওয়ামী লীগ আবার কখনও রাষ্ট্রক্ষমতা ফিরে পায়, তখন এই পল্টিবাজরাই হবে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে কাছের বন্ধু। আর আমরা যারা চরম ঝুঁকির মধ্যে থেকেও স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও বঙ্গবন্ধুর ইমেজ সমুন্নত রাখার জন্য ফেসবুকে লেখালেখি করে কিংবা যে সকল তৃণমূল কর্মী সীমিত পরিসরে হলেও মিছিল-সমাবেশ করে দলের অস্তিত্ব ঘোষণা করছেন, সুদিনে এরা আবারও অবহেলার গহ্বরে তলিয়ে যাবেন। কারণ শুধু বাংলাদেশে নয়, পৃথিবীর মধ্যে আওয়ামী লীগই একমাত্র দল যারা বারবার ইতিহাস তৈরি করে কিন্তু ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেয় না।
এরপরও এটাই ঐতিহাসিক সত্য, যারা আওয়ামী লীগ করে, যারা মনেপ্রাণে বঙ্গবন্ধু আর মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ ও লালন করে, তাদের কাছে শেখ হাসিনাই একমাত্র নির্ভরযোগ্য নেত্রী। তারা এ-ও বিশ্বাস করে, একমাত্র আওয়ামী লীগের কাছেই বাংলাদেশ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব, ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং সার্বিক জননিরাপত্তা বিপদমুক্ত। তাই প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, স্বীকৃতি-অস্বীকৃতি ও সম্ভাব্য অবজ্ঞা-অবহেলাকে প্রধান্য না দিয়ে খাঁটি দেশপ্রেমিকরা ও মুজিবপ্রেমিরা তাদের আদর্শের লড়াই চালিয়ে যাবেই। শেখ হাসিনার সম্মানজনক প্রত্যাবর্তন এবং আবার বাংলার শাসনক্ষমতায় তাঁর পুনরারোহণ ছাড়া আমাদের কারোরই মুক্তি নেই। লক্ষ্য আমাদের স্থির, জয় আমাদের সুনিশ্চিত। ওই বাজে সুদিনের রণভেরি।
‘যুদ্ধ করে বেঁচে থাকায় কী যে সুখ
কী করে বুঝবে– যারা যুদ্ধবিমুখ?’
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।





















