, মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ছয়জনের ছায়ায় একাত্তর: মুজিবনগর উপদেষ্টা পরিষদ

  • প্রকাশের সময় : ১০:০৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬
  • ১৪ পড়া হয়েছে

অনলাইন মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬

ছয়জনের ছায়ায় একাত্তর: মুজিবনগর উপদেষ্টা পরিষদ
১৭ এপ্রিল ১৯৭১। মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আমবাগান। সেখানেই শপথ নিল প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার— মুজিবনগর সরকার। বঙ্গবন্ধু তখন পাকিস্তানের কারাগারে। তাঁর অনুপস্থিতিতে সরকারটাকে রাজনৈতিক বৈধতা আর নৈতিক ওজন দিতে গঠন করা হলো ৬ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ। উদ্দেশ্য একটাই—বিশ্বকে দেখানো, এটা একটা দলের বিদ্রোহ না, সাত কোটি মানুষের জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ।
চলুন সেই ছয় রত্নকে একটু গভীরে চিনি-
১. মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী: মজলুমের মুখ, বিদ্রোহের ব্যাকরণ
১৮৮০ সালে সিরাজগঞ্জের ধানগড়া গ্রামে। বাবা হাজি শরাফত আলী খান। দারিদ্র্য আর শোষণ দেখে বড় হয়েছেন, তাই সারা জীবন ‘মজলুম জননেতা’ হয়ে থেকেছেন।
১৯১৯ সালে কংগ্রেসে যোগ দিয়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন। ১৯৪৭-এর পর বুঝলেন, পাকিস্তানেও বাঙালি মুক্তি পায়নি। ১৯৪৯ সালে ঢাকার রোজ গার্ডেনে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করলেন— প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তিনি, আর সাধারণ সম্পাদক তরুণ শেখ মুজিব। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক গুরু ভাসানীই।
১৯৫৭ সালে টাঙ্গাইলের কাগমারী সম্মেলনে পাকিস্তানকে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে বিদায় জানালেন। পাকিস্তানের সঙ্গে পশ্চিমা সামরিক চুক্তির প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ ছেড়ে গঠন করলেন ন্যাপ।
১৯৭১ সালে বয়স ৯১। শরীর ভাঙা, চোখে ছানি, কিন্তু কণ্ঠে বজ্র। মার্চের শুরুতে টাঙ্গাইলের সন্তোষে সর্বদলীয় সভা ডেকে বললেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হবেই, লাখো লাশ পড়বে, তবু স্বাধীন হব।’ ২৫ মার্চের পর ভারতে গেলেন। মতপার্থক্য ভুলে তাজউদ্দীন সরকারকে পূর্ণ সমর্থন দিলেন।
ভাসানী ছিলেন চীনপন্থী, আর মুজিবনগর সরকার ভারত-সোভিয়েত ঘেঁষা। তবু তিনি পাশে দাঁড়ালেন। এতে বিশ্ব বুঝল— বাম-ডান, চীন-রাশিয়া সবাই এক। ৩১ মে ১৯৭১ ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে বললেন, ‘বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিন, অস্ত্র দিন।’ ভারতের সংসদে তাঁর নামে আলোচনা হলো। তাঁর একটা বিবৃতির ওজন ছিল লাখো রাইফেলের সমান।
স্বাধীন দেশে ফিরে ফারাক্কা লংমার্চ করলেন, হুকুমতের সমালোচনা করলেন। ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর ঢাকা মেডিকেলে মারা যান। জানাজায় ১০ লাখ মানুষ— বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জানাজা।
২. অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ: লাল পতাকার সেতুবন্ধন
জন্ম ১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল কুমিল্লার দেবিদ্বারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ। পরে একই বিভাগের অধ্যাপক হন। ছাত্রদের কাছে ‘মোজাফফর স্যার’ ছিলেন তাত্ত্বিক ও সৎ রাজনীতির প্রতীক।
১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের টিকিটে এমএলএ। ১৯৫৭ সালে ন্যাপ গঠনের সময় ভাসানীর সঙ্গে। ১৯৬৭ সালে ন্যাপ ভাঙলে মস্কোপন্থী অংশের সভাপতি হন। তাঁর দল ছিল সুশৃঙ্খল, ক্যাডারভিত্তিক, সোভিয়েতবান্ধব।
২৫ মার্চের পর কলকাতায় চলে যান। উপদেষ্টা পরিষদে যোগ দিয়ে সোভিয়েত ব্লকের সমর্থন আদায়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মস্কো, প্রাগ, পূর্ব বার্লিনে তাঁর সরাসরি যোগাযোগ ছিল। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ৪, ৫ ও ১৩ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব তোলে। সোভিয়েত ইউনিয়ন তিনবারই ভেটো দেয়। এর পেছনে মোজাফফর-তাজউদ্দীনের গোপন কূটনীতি কাজ করেছে।
তিনি বারবার আন্তর্জাতিক মহলে বলেছেন, ‘এটা জাতীয় মুক্তির যুদ্ধ, শ্রেণি যুদ্ধ না। আমরা আগে স্বাধীন হব, পরে সমাজতন্ত্রের কথা ভাবব।’ এতে মস্কো নিশ্চিন্ত হয় যে স্বাধীন বাংলাদেশ ‘চীনের ঘাঁটি’ হবে না। আবার দেশের ভেতর তাঁর দলের হাজার হাজার কর্মী ছাত্র ইউনিয়ন-ন্যাপ-কমিউনিস্ট ব্যানারে গেরিলা যুদ্ধ করেছে। ‘লাল বাহিনী’ নামে পরিচিত ছিল তারা।
স্বাধীন দেশে সংসদ সদস্য নির্বাচিত। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব। ২০১৯ সালের ২৩ আগস্ট ৯৭ বছর বয়সে মারা যান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বামপন্থার ‘নৈতিক অভিভাবক’ ছিলেন।
৩. মণি সিংহ: প্রগতিশীল রাজনীতির প্রাণপুরুষ
সিপিবি সভাপতি। ব্রিটিশ আমলে টঙ্ক-হাজং-কৃষক আন্দোলনের নায়ক। ১৯৭১-এ ত্রিপুরা-মেঘালয় সীমান্তে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে রাজনৈতিক ক্লাস নিতেন। বোঝাতেন, ‘বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস, কিন্তু সেই নল ধরতে হবে দেশের জন্য।’
৪. মনোরঞ্জন ধর
কংগ্রেস নেতা, পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক আইন ও শিক্ষামন্ত্রী। পাকিস্তান যখন বলছিল, ”হিন্দুরা গোলমাল করছে।’ তখন তিনি লন্ডন-নিউইয়র্কে গিয়ে বললেন, ‘আমি হিন্দু, আমি বাংলাদেশি, পাকিস্তান সেনা আমার গ্রাম পুড়িয়েছে।’ বিবিসি-রয়টার্সে তাঁর সাক্ষাৎকার পাকিস্তানের প্রোপাগান্ডা ধসিয়ে দেয়।
৫. অহিদুর রহমান
ন্যাপের অহিদ অংশের নেতা। সর্বদলীয় চরিত্র রাখতে তাঁকে নেওয়া হয়। কলকাতায় বসে প্রবাসী বাঙালি, ইউরোপের প্রগতিশীল মহল আর ত্রাণ সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করতেন।
৬. তাজউদ্দীন আহমদ
প্রধানমন্ত্রী ও পদাধিকারবলে সদস্যসচিব। ৪৫ বছর বয়সে ৯ মাসে একটা যুদ্ধকালীন রাষ্ট্র চালিয়েছেন। ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে বলতেন, ‘ইয়াংম্যান উইথ ওল্ড হেড।’ পাঁচ প্রবীণ উপদেষ্টাকে সম্মান দিয়ে, পরামর্শ নিয়ে সরকার চালিয়েছেন।
উপদেষ্টা পরিষদ কী দিল বাংলাদেশকে?*
রাজনৈতিক বৈধতা: বিশ্ব দেখল, সরকারটা সর্বদলীয়। ন্যাপ দুই ভাগ, সিপিবি, কংগ্রেস, আওয়ামী লীগ— সবাই এক টেবিলে।
কূটনৈতিক সেতু: ভাসানী ভারত-চীনের জনমত, মোজাফফর সোভিয়েত ব্লক, মনোরঞ্জন পশ্চিমা বিশ্ব— তিন দরজাই খোলা রাখলেন।
অভ্যন্তরীণ ঐক্য: দলীয় কোন্দল ঠেকালেন। ‘আগে দেশ, পরে মত’—এই মন্ত্র চালু রাখলেন।
মনোবল: বঙ্গবন্ধু জেলে, কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক গুরু ভাসানী পাশে আছেন—এটা মুক্তিযোদ্ধাদের বুকে আগুন দিয়েছে।
শেষ কথা: ছয়টি বটগাছের ছায়া
মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রীরা ছিলেন সরকারের হাত-পা, আর উপদেষ্টারা ছিলেন বটগাছ। রোদ-ঝড় তাঁরা মাথায় নিয়েছেন, যাতে তরুণ সরকারটা হাঁটতে পারে।
আজ আমরা ভোটে মারামারি করি, টক শোতে গালি দিই। কিন্তু ১৯৭১ সালে ৯১ বছরের ভাসানী আর ৪৯ বছরের মোজাফফর এক টেবিলে বসেছিলেন। কারণ, তাঁরা জানতেন, দলের চেয়ে দেশ বড়। মতের চেয়ে মাটি বড়।
এই ছয়জন না থাকলে ১৬ ডিসেম্বর হয়তো আসত না। আসলেও দেরিতে আসত। রক্ত আরও বেশি ঝরত, শরণার্থীর লাশে সীমান্ত ভরে যেত।
তাঁদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। তাঁরা ছিলেন বলেই আমরা আজ পাসপোর্টে লিখি ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’। এই নামটা প্রথম লিখেছিলেন তাজউদ্দীন, আর সেই কলমে কালি দিয়েছিলেন ভাসানী-মোজাফফর-মণি সিংহরা।
ভুলে গেলে চলবে না—স্বাধীনতা শুধু মুক্তিযোদ্ধার না, স্বাধীনতা উপদেষ্টারও।
খন্দকার মোঃ জসীম উদ্দিন
সাংবাদিক, কলাম লেখক, রাজনীতিবিদ, সমাজ সেবক ও রাষ্ট্রচিন্তক।

Jashim Uddin’s Post

মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।

জনপ্রিয়

ছয়জনের ছায়ায় একাত্তর: মুজিবনগর উপদেষ্টা পরিষদ

প্রকাশের সময় : ১০:০৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬

অনলাইন মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট ২০২৬

ছয়জনের ছায়ায় একাত্তর: মুজিবনগর উপদেষ্টা পরিষদ
১৭ এপ্রিল ১৯৭১। মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আমবাগান। সেখানেই শপথ নিল প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার— মুজিবনগর সরকার। বঙ্গবন্ধু তখন পাকিস্তানের কারাগারে। তাঁর অনুপস্থিতিতে সরকারটাকে রাজনৈতিক বৈধতা আর নৈতিক ওজন দিতে গঠন করা হলো ৬ সদস্যের উপদেষ্টা পরিষদ। উদ্দেশ্য একটাই—বিশ্বকে দেখানো, এটা একটা দলের বিদ্রোহ না, সাত কোটি মানুষের জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ।
চলুন সেই ছয় রত্নকে একটু গভীরে চিনি-
১. মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী: মজলুমের মুখ, বিদ্রোহের ব্যাকরণ
১৮৮০ সালে সিরাজগঞ্জের ধানগড়া গ্রামে। বাবা হাজি শরাফত আলী খান। দারিদ্র্য আর শোষণ দেখে বড় হয়েছেন, তাই সারা জীবন ‘মজলুম জননেতা’ হয়ে থেকেছেন।
১৯১৯ সালে কংগ্রেসে যোগ দিয়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন। ১৯৪৭-এর পর বুঝলেন, পাকিস্তানেও বাঙালি মুক্তি পায়নি। ১৯৪৯ সালে ঢাকার রোজ গার্ডেনে আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠন করলেন— প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তিনি, আর সাধারণ সম্পাদক তরুণ শেখ মুজিব। অর্থাৎ বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক গুরু ভাসানীই।
১৯৫৭ সালে টাঙ্গাইলের কাগমারী সম্মেলনে পাকিস্তানকে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে বিদায় জানালেন। পাকিস্তানের সঙ্গে পশ্চিমা সামরিক চুক্তির প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ ছেড়ে গঠন করলেন ন্যাপ।
১৯৭১ সালে বয়স ৯১। শরীর ভাঙা, চোখে ছানি, কিন্তু কণ্ঠে বজ্র। মার্চের শুরুতে টাঙ্গাইলের সন্তোষে সর্বদলীয় সভা ডেকে বললেন, ‘পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হবেই, লাখো লাশ পড়বে, তবু স্বাধীন হব।’ ২৫ মার্চের পর ভারতে গেলেন। মতপার্থক্য ভুলে তাজউদ্দীন সরকারকে পূর্ণ সমর্থন দিলেন।
ভাসানী ছিলেন চীনপন্থী, আর মুজিবনগর সরকার ভারত-সোভিয়েত ঘেঁষা। তবু তিনি পাশে দাঁড়ালেন। এতে বিশ্ব বুঝল— বাম-ডান, চীন-রাশিয়া সবাই এক। ৩১ মে ১৯৭১ ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে বললেন, ‘বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিন, অস্ত্র দিন।’ ভারতের সংসদে তাঁর নামে আলোচনা হলো। তাঁর একটা বিবৃতির ওজন ছিল লাখো রাইফেলের সমান।
স্বাধীন দেশে ফিরে ফারাক্কা লংমার্চ করলেন, হুকুমতের সমালোচনা করলেন। ১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর ঢাকা মেডিকেলে মারা যান। জানাজায় ১০ লাখ মানুষ— বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জানাজা।
২. অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ: লাল পতাকার সেতুবন্ধন
জন্ম ১৯২২ সালের ১৪ এপ্রিল কুমিল্লার দেবিদ্বারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ। পরে একই বিভাগের অধ্যাপক হন। ছাত্রদের কাছে ‘মোজাফফর স্যার’ ছিলেন তাত্ত্বিক ও সৎ রাজনীতির প্রতীক।
১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের টিকিটে এমএলএ। ১৯৫৭ সালে ন্যাপ গঠনের সময় ভাসানীর সঙ্গে। ১৯৬৭ সালে ন্যাপ ভাঙলে মস্কোপন্থী অংশের সভাপতি হন। তাঁর দল ছিল সুশৃঙ্খল, ক্যাডারভিত্তিক, সোভিয়েতবান্ধব।
২৫ মার্চের পর কলকাতায় চলে যান। উপদেষ্টা পরিষদে যোগ দিয়ে সোভিয়েত ব্লকের সমর্থন আদায়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন। মস্কো, প্রাগ, পূর্ব বার্লিনে তাঁর সরাসরি যোগাযোগ ছিল। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে ৪, ৫ ও ১৩ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব তোলে। সোভিয়েত ইউনিয়ন তিনবারই ভেটো দেয়। এর পেছনে মোজাফফর-তাজউদ্দীনের গোপন কূটনীতি কাজ করেছে।
তিনি বারবার আন্তর্জাতিক মহলে বলেছেন, ‘এটা জাতীয় মুক্তির যুদ্ধ, শ্রেণি যুদ্ধ না। আমরা আগে স্বাধীন হব, পরে সমাজতন্ত্রের কথা ভাবব।’ এতে মস্কো নিশ্চিন্ত হয় যে স্বাধীন বাংলাদেশ ‘চীনের ঘাঁটি’ হবে না। আবার দেশের ভেতর তাঁর দলের হাজার হাজার কর্মী ছাত্র ইউনিয়ন-ন্যাপ-কমিউনিস্ট ব্যানারে গেরিলা যুদ্ধ করেছে। ‘লাল বাহিনী’ নামে পরিচিত ছিল তারা।
স্বাধীন দেশে সংসদ সদস্য নির্বাচিত। এরশাদবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব। ২০১৯ সালের ২৩ আগস্ট ৯৭ বছর বয়সে মারা যান। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বামপন্থার ‘নৈতিক অভিভাবক’ ছিলেন।
৩. মণি সিংহ: প্রগতিশীল রাজনীতির প্রাণপুরুষ
সিপিবি সভাপতি। ব্রিটিশ আমলে টঙ্ক-হাজং-কৃষক আন্দোলনের নায়ক। ১৯৭১-এ ত্রিপুরা-মেঘালয় সীমান্তে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে রাজনৈতিক ক্লাস নিতেন। বোঝাতেন, ‘বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস, কিন্তু সেই নল ধরতে হবে দেশের জন্য।’
৪. মনোরঞ্জন ধর
কংগ্রেস নেতা, পূর্ব পাকিস্তানের সাবেক আইন ও শিক্ষামন্ত্রী। পাকিস্তান যখন বলছিল, ”হিন্দুরা গোলমাল করছে।’ তখন তিনি লন্ডন-নিউইয়র্কে গিয়ে বললেন, ‘আমি হিন্দু, আমি বাংলাদেশি, পাকিস্তান সেনা আমার গ্রাম পুড়িয়েছে।’ বিবিসি-রয়টার্সে তাঁর সাক্ষাৎকার পাকিস্তানের প্রোপাগান্ডা ধসিয়ে দেয়।
৫. অহিদুর রহমান
ন্যাপের অহিদ অংশের নেতা। সর্বদলীয় চরিত্র রাখতে তাঁকে নেওয়া হয়। কলকাতায় বসে প্রবাসী বাঙালি, ইউরোপের প্রগতিশীল মহল আর ত্রাণ সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করতেন।
৬. তাজউদ্দীন আহমদ
প্রধানমন্ত্রী ও পদাধিকারবলে সদস্যসচিব। ৪৫ বছর বয়সে ৯ মাসে একটা যুদ্ধকালীন রাষ্ট্র চালিয়েছেন। ইন্দিরা গান্ধী তাঁকে বলতেন, ‘ইয়াংম্যান উইথ ওল্ড হেড।’ পাঁচ প্রবীণ উপদেষ্টাকে সম্মান দিয়ে, পরামর্শ নিয়ে সরকার চালিয়েছেন।
উপদেষ্টা পরিষদ কী দিল বাংলাদেশকে?*
রাজনৈতিক বৈধতা: বিশ্ব দেখল, সরকারটা সর্বদলীয়। ন্যাপ দুই ভাগ, সিপিবি, কংগ্রেস, আওয়ামী লীগ— সবাই এক টেবিলে।
কূটনৈতিক সেতু: ভাসানী ভারত-চীনের জনমত, মোজাফফর সোভিয়েত ব্লক, মনোরঞ্জন পশ্চিমা বিশ্ব— তিন দরজাই খোলা রাখলেন।
অভ্যন্তরীণ ঐক্য: দলীয় কোন্দল ঠেকালেন। ‘আগে দেশ, পরে মত’—এই মন্ত্র চালু রাখলেন।
মনোবল: বঙ্গবন্ধু জেলে, কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক গুরু ভাসানী পাশে আছেন—এটা মুক্তিযোদ্ধাদের বুকে আগুন দিয়েছে।
শেষ কথা: ছয়টি বটগাছের ছায়া
মুজিবনগর সরকারের মন্ত্রীরা ছিলেন সরকারের হাত-পা, আর উপদেষ্টারা ছিলেন বটগাছ। রোদ-ঝড় তাঁরা মাথায় নিয়েছেন, যাতে তরুণ সরকারটা হাঁটতে পারে।
আজ আমরা ভোটে মারামারি করি, টক শোতে গালি দিই। কিন্তু ১৯৭১ সালে ৯১ বছরের ভাসানী আর ৪৯ বছরের মোজাফফর এক টেবিলে বসেছিলেন। কারণ, তাঁরা জানতেন, দলের চেয়ে দেশ বড়। মতের চেয়ে মাটি বড়।
এই ছয়জন না থাকলে ১৬ ডিসেম্বর হয়তো আসত না। আসলেও দেরিতে আসত। রক্ত আরও বেশি ঝরত, শরণার্থীর লাশে সীমান্ত ভরে যেত।
তাঁদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। তাঁরা ছিলেন বলেই আমরা আজ পাসপোর্টে লিখি ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ’। এই নামটা প্রথম লিখেছিলেন তাজউদ্দীন, আর সেই কলমে কালি দিয়েছিলেন ভাসানী-মোজাফফর-মণি সিংহরা।
ভুলে গেলে চলবে না—স্বাধীনতা শুধু মুক্তিযোদ্ধার না, স্বাধীনতা উপদেষ্টারও।
খন্দকার মোঃ জসীম উদ্দিন
সাংবাদিক, কলাম লেখক, রাজনীতিবিদ, সমাজ সেবক ও রাষ্ট্রচিন্তক।

Jashim Uddin’s Post

মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।