, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
গণভবনের ভিডিও ধারণসহ রেকিকরা হয় শাইখ সিরাজের নেতৃত্বে রাহুল-মমতারা মিছিল করে যাবেন সুপ্রিম কোর্টে,মিছিলে গোটা ভারত হাঁটবে। সোমবার দিল্লি পুলিশ পরীক্ষায় রোটন তাঁর বাবার চেহলাম আয়োজনে ও বাধা ফজলে করিম চৌধুরী! আমাদের বিড়ি টানা,হাতাকাটা জামা পরার উপর যতক্ষণ না আক্রমণ আসবে ততোক্ষণ ? এই মানুষ এভাবে পচে গেল কেন? অবশেষে ডিপ স্টেট এবং ইউনূস ও খলিল সাহেবদের সাকসেস! রোটন ভাইয়ের জানাজা পড়তে যাওয়া মুসল্লীদের মসজিদ থেকে বের করে, নির্মম নির্যাতন করেছে বিএনপির ক্যাডাররা!! জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম মুসলিম সভাপতি — বদরুদ্দীন তৈয়বজী পাকিস্তানপন্থী খাঁটি মুসলমান ইনকিলাব মঞ্চ বাবা-মায়ের কাছ থেকে যা শিখেছি ত্রপা মজুমদার

“জিন্না তোমাদের, আর শেখ মুজিব আমাদের! ল্যাটা চুকে গেল কি?”

  • প্রকাশের সময় : ১১:২৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৩৩ পড়া হয়েছে
অনলাইনশুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর২০২৬
“জিন্না তোমাদের, আর শেখ মুজিব আমাদের! ল্যাটা চুকে গেল কি?”
পড়ালেখা করে যতটুকু শিখেছি তাতে মনে হয়েছে, আমাদের নিজেদের ইতিহাসটা আমাদেরকে আরেকটু নিরপেক্ষভাবে দেখতে হবে। বুঝতে হবে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস এর মুল্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের কাছে কত বেশি মুল্যবান। বিশেষ করে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত সময়টা তো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর বাংলাদেশের ইতিহাস বুঝতে হলে শুধু ১৯৭১ থেকে শুরু করলেও হবে না। আবার শুধু ১৯৪৭ এর পাকিস্তান আন্দোলন দিয়েও বাংলাদেশের জন্মকে ব্যাখ্যা করা যাবে না। তবে একটা কথা মানতেই হবে যে, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ এই ২৪ বছরের ধারাবাহিক রাজনৈতিক ঘটনাগুলোই আমাদের বাংলাদেশকে সৃষ্টি করেছে।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। মুহাম্মদ আলী জিন্না ছিলেন পাকিস্তান আন্দোলনের প্রধান রাজনৈতিক নেতা এবং নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রথম গভর্নর-জেনারেল। তাঁর নেতৃত্ব ছাড়া পাকিস্তান আন্দোলনের সফল হওয়া কঠিন ছিল এটাও সত্য।
তার মানে, পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় জিন্নার ঐতিহাসিক অবদান ছিল।
আচ্ছা, সেই সময়ের (১৯৪৭ সালের) পূর্ববঙ্গের (আমাদের বর্তমান বাংলাদেশ) মানুষ পাকিস্তান রাষ্ট্রকে এমন একটি নতুন রাষ্ট্র হিসেবে ভেবেছিল যেখানে তারা নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার পাবে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর একটি অংশ হিসেবে মর্যাদা পাবে।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবার শুরু থেকেই বাঙালির সেই আশা খুব দ্রুতই পরীক্ষার মুখে পড়তে থাকে।
এই যেমন, ১৯৪৭ থেকে ৪৮ ভাষার প্রশ্ন দিয়েই অমিল শুরু হয়৷ পাকিস্তানের ক্ষমতাশীনরা ছিল উর্দুভাষী, ফর্সা, লম্বা; আর আমরা বাঙালিরা ছোটখাটো দেখতে, কম পড়ালেখা করা ও বেশিরভাগই কৃষি নির্ভর মানুষ ছিলাম। দিনকে দিন বাঙালিদের নিচু বর্ণের মানুষের মতো করে ভাবতে শুরু করে পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দুভাষীরা।
একটা পর্যায় পর অবশ্য আমাদের পুর্ব পাকিস্তানের যারা শিক্ষিত বাঙালি নেতা ছিল তারা এটিকে ধরে বসেছিল। এই নেতারা প্রশ্ন করে বসলো, পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভাষা কী হবে?
আমরা পূর্ববাংলায় সংখ্যায় মানুষ ছিলাম বেশি। আর এই বেশি মানুষের বড় অংশের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। তাই বেশি মানুষের ভাষাই হবে রাষ্ট্রভাষা এই দাবী তো আমাদের যথার্থই। এর পর ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তুলেছিল।
২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলার সন্তান ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে পরিষদের অন্যতম ভাষা করার প্রস্তাব দিলেন। যা হবার তাই হলো, প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়ে গেল।
কিন্তু বাংলার মানুষ বলে কথা। হেরে যাবার পাত্র নয় তারা। এরপর ১১ মার্চ ১৯৪৮ বাংলা ভাষার দাবিতে প্রথম ধর্মঘট পালিত হল। এই আন্দোলনে আজকে যার ছবি ফেলে দিয়ে জিন্নার ছবি লাগিয়েছে পাকিস্তান এর বন্ধু দলের জুনিয়র টিমের তরুন ডাকসু ছাত্ররা সেই শেখ মুজিবুর রহমানই সেই ধর্মঘটের অন্যতম এক কুশিলব ছিলেন। পাকিস্তান সরকার প্রথম ধাপেই শেখ মুজিব সহ আরো বহু রাজনৈতিক ও ছাত্রনেতাকে গ্রেপ্তার করে জেলে দিলেন।
তবে, এখানে মনে রাখতে হবে, ভাষা আন্দোলন শুধু শেখ মুজিবের একার আন্দোলন ছিল না। তমদ্দুন মজলিশ, ছাত্রসমাজ, বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন এবং অসংখ্য সাধারণ মানুষজনও এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন।
যাই হোক, ২১ মার্চ ১৯৪৮ সালে, মোহাম্মদ আলী জিন্নার সঙ্গে পূর্ববাংলার মানুষের প্রথম একটি মনস্তাত্ত্বিক বড় সংঘাত ঘটে। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জিন্না ঘোষণা করে বসেন,
“The State Language of Pakistan is going to be Urdu and no other language.”
অর্থাৎ তাঁর মতে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, অন্য কোন ভাষা নয়।
দ্বিতীয়বার, মাত্র তিন দিন পরই ২৪ মার্চ ১৯৪৮ সালে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে, কার্জন হলে, আরো বিস্তারিতভাবে জিন্না আবার বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন।
এবার তাঁর বক্তব্য ছিল মূলত:
“There can, however, be only one lingua franca … and that language should be Urdu…”
এবং পরে বলেন,
“The State language, therefore, must obviously be Urdu…”
শেষে আরও জোর দিয়ে বলেন,
“There can be only one State language and that language, in my opinion, can only be Urdu.”
অর্থাৎ তাঁর যুক্তি ছিল, প্রদেশগুলোর নিজস্ব ভাষা থাকতে পারে, কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রের আন্তঃপ্রাদেশিক যোগাযোগের জন্য একটি মাত্র রাষ্ট্রভাষা থাকবে এবং সেটি হবে কেবল উর্দু, অন্য কোন ভাষা নয়। অথচ বাংলায় কথা বলা মানুষের সংখ্যা তখন সব থেকে বেশি।
এই কথায় পূর্ববাংলার বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে যায়, এবং এর পর ভাষা আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয়।
যাই হোক, ইতিহাসের এই জায়গায় জিন্নার অবদানকে দুইভাবে দেখতে হবে;
এক, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় জিন্না পূর্ব-পশ্চিম দুই পাকিস্তানেই ছিলেন প্রধান নেতা।
দুই, বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবির বিরোধিতা করে সেই জিন্না প্রথমবারের মতো হয়ে গেলেন পূর্ববাংলার মানুষের ভাষাগত আকাঙ্ক্ষার কাছে সাক্ষাৎ শত্রু।
এর পরই সেই ঐতিহাসিক ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের বিস্ফোরণ শুরু হয়ে গেল। পাকিস্তানিদের মামলা, দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষার দাবি নতুন শক্তি পেয়েছিল যা আমরা সবাই জানি।
এরপর ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ ঢাকায় ১৪৪ ধারা ভেঙে ছাত্ররা মিছিল করলে পুলিশ গুলি চালায় এটাও আমরা সবাই জানি। পাকিস্তান পুলিশের গুলিতে আমাদের বাঙালি ভাই সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেকে শহীদ হন এগুলোও আমরা জানি।
তবে যা জানা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, ভাষা আন্দোলনের এই রক্তের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার দাবি আর শুধু একটা ভাষার দাবি থাকে নাই। এটি হয়ে যায় বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি আন্দোলন।
এখানে একটি ব্যাপার অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন যে, ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনের সময় বাংলার নেতা শেখ মুজিব এর নাম আসে না কেন? এর উত্তর হচ্ছে, তিনি আসলে ৫২’র সেই সময়ে মিছিলে নেতৃত্বই দিতে পারেন নি। কারন, তাকে পাকিস্তান সরকার বন্দী করে কারাগারে রেখেছিলেন। তবে শেখ মুজিব ২১ ফেব্রুয়ারির সেই সময়ে রাজপথের প্রধান নেতা ছিলেন না সত্য, কিন্তু তিনি এর আগের ১৯৪৮ এর ভাষা আন্দোলনে সম্মুখসারির একজন সক্রিয় নেতা ছিলেন এবং ১৯৫২ সালের আন্দোলনের সময় কারাগার থেকেও তিনি ভাষার দাবির পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন।
এরপর ১৯৫৪ সালে বাংলার মানুষ মুসলিম লীগকে একেবারে প্রত্যাখ্যান করে দিল। এতে করে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বাংলার নেতাদের যুক্তফ্রন্ট বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করেছিল।
যুক্তফ্রন্ট এই ভোটে ২১ দফার একটি দাবী তুলে ধরে। আর এই দাবীর অন্যতম একটি দাবি ছিল, “বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা এবং পূর্ববাংলায় স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করা।”
এই দাবীতেই মুসলিম লীগ ভয়াবহভাবে পরাজিত হয়।
আর এই দাবীটাই ছিল বাঙালির সাহসী পদক্ষেপের প্রথম একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
একটা ব্যাপার এখানে পরিষ্কার হয়ে যায়, পূর্ববাংলার মানুষ শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আর রাজনীতি করতে চাইছিল না; তারা ভাষা, অর্থনীতি, অধিকার ও স্বায়ত্তশাসনও চাইছিল। এখান থেকেই পাকিস্তান সরকারের মাথায় চিন্তার ভাঁজ পড়তে শুরু করে।
এরপর পাকিস্তান সরকার বাংলার মানুষের শক্ত মনোভাব টের পেতে শুরু করে। বাংলার মানুষ কখন না আবার স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে ফেলে এই ভয়ে ১৯৫৬ সালে এসে শেষমেশ পাকিস্তান বাংলা ভাষাকেও উর্দুর সাথে যৌথভাবে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে পাকিস্তানের ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা ও উর্দু এই দুই ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
মানুষ এজন্যই বলে, গাধা পানি খায় ঘোলা করে। ১৯৪৮ সাল থেকে ষড়যন্ত্র, হত্যা, জেল,জুলুম অত্যাচার করতে করতে যতদিনে এসে ১৯৫৬ সালে বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার স্বীকৃতি দিল ততদিনে আমাদের পূর্ববাংলার মানুষের মনে নানা বঞ্চনার গভীর ক্ষত তৈরি হয়েই গেছে। বাংলার মানুষের মনে একটা প্রশ্ন গভীর হয়ে গেছে যে, “রাষ্ট্রে আমাদের জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও ক্ষমতা কেন আমাদের হাতে নেই? আমরা কেন নিচু জাতের মতো বঞ্চিত হতে থাকব?”
এরপরের কাহিনি অন্যরকম। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন শুরু হলো। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করলেন, গণতন্ত্র স্থগিত হয়ে গেল। রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত হয়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্যও ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকল।
বাংলার মানুষের প্রতি বৈষম্য আরো বাড়তে থাকল। এই সময় থেকেই পূর্ববাংলার রাজনীতি খুব ধীরে ধীরে স্বায়ত্তশাসনের দিকে এগোতে থাকল।
এর পরই এলো শেখ মুজিবের ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফার ঘোষণা। বাংলার নেতা শেখ মুজিবের রাজনৈতিক ভূমিকা নতুন উচ্চতায় ওঠে গেল এই ছয় দফার মধ্য দিয়ে। ১৯৬৬ সালের সেই ৬ দফার মূল দাবী ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে।
এখানে মনে রাখতে হবে, ছয় দফা কিন্তু সরাসরি স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণা ছিল না। বরং এটি ছিল পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে একটি ফেডারেল ব্যবস্থা ও পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষে স্বায়ত্তশাসনের একটি দাবি মাত্র। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এটিকে পাকিস্তান ভাঙার গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখেছিল। এর পরিনতিতে সেই একই কায়দায় বাংলার নেতা শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করা হলো। বাংলার নেতা শেখ মুজিব এইভাবে বার বার জেলে যাওয়া আসা করতে করতেই জীবনের প্রায় ১৪ টা বছরই কাটিয়েছেন পাকিস্তান জেল খানাতেই। কিছু হলেই পাকিস্তান পুলিশ তাঁকে জেলে দিত।
যাইহোক, ৬ দফার পরিপ্রেক্ষিত ও অন্যান্য কিছু আন্দোলনের ভয়ে পর ১৯৬৮ সালে শেখ মুজিবকে ধরতে আবার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করলো পাকিস্তান সরকার। এর পর তো সবাই জানি আমরা যে, বাঙালিরা ১৯৬৯ সালে বড়সড় গণঅভ্যুত্থান সফল করলেন। ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ তীব্র আন্দোলনের মুখে সরকার মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় এবং শেখ মুজিবসহ অন্যান্য নেতারা মুক্তি পান।
এর পর ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে রেসকোর্স ময়দানে তাঁকে ঐতিহাসিক “বঙ্গবন্ধু” উপাধি দেওয়া হয়।
ঠিক এ সময় থেকেই শেখ মুজিব পূর্ববাংলার মানুষের প্রধান রাজনৈতিক নেতা বঙ্গবন্ধু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
এর পর ১৯৭০ সালে নির্বাচন হয়। ১৯৭০ সালের এই নির্বাচনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টির মধ্যে ১৬৭টি জাতীয় পরিষদ আসন জয়লাভ করে।
এর ফলে শেখ মুজিব শুধু একজন জনপ্রিয় নেতাই থাকলেন না। তিনি নির্বাচনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের রাজনৈতিক ম্যান্ডেটও অর্জন করে নিলেন। এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্তগুলোর অন্যতম একটি।
এর পর বাঙালিরা ভোটে জিতলেও বাংলার নেতা শেখ মুজিবকে আর পাকিস্তানিরা ক্ষমতা দিতে চায় না। নানাভাবে টালবাহানা করা শুরু করে দেয়। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে দেন।
পুর্ব বাংলার মানুষের সংখ্যা গরিষ্ঠতা সত্ত্বেও ক্ষমতা না দেওয়ায় মানুষ উত্তেজিত হতে থাকে। এরপর পূর্ববাংলায় শুরু হয় বড়সড় অসহযোগ আন্দোলন।
৭ মার্চ ১৯৭১ রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণ দেন।
সেই ভাষণের প্রতিটি লাইন সবার জানা। তিনি বলে বসেন,
“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
তিনি সরাসরি সেদিন স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দিলেও জনগণকে সেদিনের বক্তব্যে অনেকটাই প্রস্তুত করে ফেলেছিলেন এবং প্রতিরোধের নির্দেশনাও দিয়েছিলেন। তাঁর ভাষণকে Banglapedia বাংলাদেশের স্বাধীনতার দিকে একটি turning point হিসেবে বর্ণনা করেছে।
যাইহোক, আমরা সবাই জানি ২৫ মার্চ ১৯৭১ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে নির্বিচারে নিরীহ মানুষদের মারতে থাকে।
ঐদিন ২৫ মার্চ রাতেই শেখ মুজিব আবার গ্রেপ্তার হন।
এর আগেই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রেরণ করে দেন বলে ঐতিহাসিক দলিলে উল্লেখ পাওয়া যায়।
শুরু হয় আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ।
২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের নয় মাসের এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শেষে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। তারপর জন্ম নেয় আমাদের এই স্বাধীন বাংলাদেশ।
এতগুলো কথা বলার উদ্দেশ্য হলো, জিন্না ও শেখ মুজিবের অবদান কার কতখানি তা দেখানো।
এখানে আবেগ নয়, ইতিহাস দিয়ে বিচার করতে হবে।
মুহাম্মদ আলী জিন্নার ঐতিহাসিক অবদান:
১) পাকিস্তান আন্দোলনের প্রধান নেতা তিনি মানতেই হবে।
২) ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা তাঁরই ছিল।
৩) নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রথম গভর্নর-জেনারেল ছিলেন তিনি।
কিন্তু তার দোষের কাজ যেগুলো:-
১) তিনি বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবির পক্ষে ছিলেন না। উল্টো ঘোর বিরোধী ছিলেন।
২) ১৯৪৮ সালে তিনি উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলেছেন।
৩) ফলে পূর্ববাংলার ভাষাগত অধিকারের আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের সংঘাত তৈরি হয়।
এখানে এটা স্পষ্ট যে, জিন্না কোনভাবেই বাংলার মানুষের পক্ষের বা বাংলাদেশের স্বাধীনতার কোন নেতাই নন, তিনি শুধুই পাকিস্তান সৃষ্টির একজন নেতা।
এবার বাঙালি নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান দেখা যাক:-
তিনি-
১) ১৯৪৮-এর ভাষা আন্দোলনে অংশ নেন এবং বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার সেই আন্দোলনের নেতা।
২) পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় শাসনের বিরুদ্ধে পূর্ববাংলার রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে আন্দোলন করেন তিনি।
৩) ১৯৬৬ সালে গুরুত্বপূর্ণ ছয় দফার মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসনের দাবি সামনে আনেন তিনি।
৪) ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের পর বাঙালির প্রধান রাজনৈতিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন তিনি।
৫) ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালির বিপুল গণরায় লাভ করেন তিনি।
৬) ৭ মার্চ ১৯৭১ ঐতিহাসিক নেতৃত্ব ও বক্তব্য দেন তিনি।
৭) ২৫ মার্চের পর স্বাধীনতার প্রথম ঘোষণা দেন তিনি।
৮) তাঁর নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরিতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখে।
তবে এখানেও সত্যটা সম্পূর্ণ বলতেই হবে। বাংলাদেশ কোনভাবেই শুধু একজন মানুষের কারণে স্বাধীন হয়নি।
সকল ভাষাশহীদ, ছাত্রসমাজ, মওলানা ভাসানী, শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম), শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম এ জি ওসমানী, অগণিত রাজনৈতিক কর্মী, সকল বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সকল বীরঙ্গনা মাতা-নারী-ভগ্নিরা এবং সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সংগ্রামেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। তার সাথে আমাদের দেশের বঙ্গবন্ধু খেতাব পাওয়া শেখ মুজিবের যে দীর্ঘ ত্যাগ, এক দুইটা বছর না প্রায় ১৪ বছর জেলে কাটানো, এগুলো মিলিয়ে, আসল বাঙালি সে যে দলেরই হোক, জিন্নাকে তো তারা শেখ মুজিবের থেকে উচু স্থানে বসাতেই পারবে না।
সহজ কথায়, জিন্না পাকিস্তান সৃষ্টি করেছিলেন। আর শেখ মুজিব বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছেন। এখানে পাকিস্তান না হলে বাংলাদেশ হতো না ব্লা ব্লা ব্লা এসব যুক্তি তুলে ধরলে রাজনীতি না করা যেকোনো সাধারণ মানুষও হাসবে।
অথচ আমরা আমাদের গৌরবজনক ইতিহাসকে মুছে না ফেলে এভাবেও তো ভাবতে পারি। জিন্নার নেতৃত্বে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল একথা সত্যি; আর পাকিস্তানের বৈষম্য, ভাষা-অধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাঙালির রাজনৈতিক জাতিসত্তা স্বাধীন বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে যায় একথাও তো সত্যি। ইতিহাসের কাউকে ভালোবাসতে হলে অন্য কাউকে মুছে ফেলতে হয় না। এখানেই আছে কারো অজ্ঞতা আর কুট কিছু তুলে ধরার প্রয়াস।
জিন্নার পাকিস্তান সৃষ্টির অবদান স্বীকার যেমন করা যায়, আবার ১৯৪৮ এ আমাদের বাংলা ভাষানীতির বিরোধিতার জন্য তাঁর সমালোচনা তো মানুষ করবেই।
অন্যদিকে, শেখ মুজিবের স্বাধীনতা আন্দোলনে কেন্দ্রীয় ভূমিকা যেমন স্বীকার করা যায়, আবার উনাকে একা একক হিরো না ভেবে ভাষা আন্দোলন বা মুক্তিযুদ্ধের অন্য সব নেতা-সংগঠকের অবদানও একসাথে যথাযথভাবে স্মরণ করা যায়। কারণ ইতিহাস তো কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয়। ইতিহাস একটি জাতির সম্মিলিত স্মৃতি। এই স্মৃতি যারা বিকৃত করতে চায় তাদের উদ্দেশ্য ও লোভ ভিন্ন কিছুর দিকেই।
শেষ কথা হচ্ছে, আমরা বাংলাদেশ পেয়েছি অনেক রক্তের বিনিময়ে। আর আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশ সৃষ্টির বিপক্ষে তখন মুক্তিযুদ্ধের সময় ও মুক্তিযুদ্ধের আগের সময় থেকেই যারা পাকিস্তানি উর্দুভাষীদের সাথে মিলে বাঙালিদের বিরোধিতা করে এসেছিল তারাই আজ শেখ মুজিবকে মুছে দিয়ে জিন্নাকে তার উপরে বসানোর চেষ্টা করছে। এখন তারা শুধু মুখে বলতে পারছে না যে, পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশেরও জাতির পিতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। আসল কথা তো হলো, জিন্না জিন্নার জায়গায়; আর শেখ মুজিব মুজিবের জায়গায়। আমরা বাংলাদেশী, আমাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত শেখ মুজিবের কর্ম, ত্যাগ, প্রচেষ্টা এগুলো তো ভুলবার নয়। শেখ মুজিবের ছবি নামিয়ে, তাকে ছোট করে সেখানে জিন্নার ছবি লাগাতে হবে কেন? যার যার অবস্থানে সে থাকুক না! ইতিহাস তো চাইলেই আমরা বদলাতে পারি না, পারি কি?

এম আই প্রধান’s Post

মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।

জনপ্রিয়

গণভবনের ভিডিও ধারণসহ রেকিকরা হয় শাইখ সিরাজের নেতৃত্বে

“জিন্না তোমাদের, আর শেখ মুজিব আমাদের! ল্যাটা চুকে গেল কি?”

প্রকাশের সময় : ১১:২৯ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
অনলাইনশুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর২০২৬
“জিন্না তোমাদের, আর শেখ মুজিব আমাদের! ল্যাটা চুকে গেল কি?”
পড়ালেখা করে যতটুকু শিখেছি তাতে মনে হয়েছে, আমাদের নিজেদের ইতিহাসটা আমাদেরকে আরেকটু নিরপেক্ষভাবে দেখতে হবে। বুঝতে হবে আমাদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস এর মুল্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের কাছে কত বেশি মুল্যবান। বিশেষ করে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত সময়টা তো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। আর বাংলাদেশের ইতিহাস বুঝতে হলে শুধু ১৯৭১ থেকে শুরু করলেও হবে না। আবার শুধু ১৯৪৭ এর পাকিস্তান আন্দোলন দিয়েও বাংলাদেশের জন্মকে ব্যাখ্যা করা যাবে না। তবে একটা কথা মানতেই হবে যে, ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ এই ২৪ বছরের ধারাবাহিক রাজনৈতিক ঘটনাগুলোই আমাদের বাংলাদেশকে সৃষ্টি করেছে।
১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়। মুহাম্মদ আলী জিন্না ছিলেন পাকিস্তান আন্দোলনের প্রধান রাজনৈতিক নেতা এবং নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রথম গভর্নর-জেনারেল। তাঁর নেতৃত্ব ছাড়া পাকিস্তান আন্দোলনের সফল হওয়া কঠিন ছিল এটাও সত্য।
তার মানে, পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় জিন্নার ঐতিহাসিক অবদান ছিল।
আচ্ছা, সেই সময়ের (১৯৪৭ সালের) পূর্ববঙ্গের (আমাদের বর্তমান বাংলাদেশ) মানুষ পাকিস্তান রাষ্ট্রকে এমন একটি নতুন রাষ্ট্র হিসেবে ভেবেছিল যেখানে তারা নিজেদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অধিকার পাবে, মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর একটি অংশ হিসেবে মর্যাদা পাবে।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবার শুরু থেকেই বাঙালির সেই আশা খুব দ্রুতই পরীক্ষার মুখে পড়তে থাকে।
এই যেমন, ১৯৪৭ থেকে ৪৮ ভাষার প্রশ্ন দিয়েই অমিল শুরু হয়৷ পাকিস্তানের ক্ষমতাশীনরা ছিল উর্দুভাষী, ফর্সা, লম্বা; আর আমরা বাঙালিরা ছোটখাটো দেখতে, কম পড়ালেখা করা ও বেশিরভাগই কৃষি নির্ভর মানুষ ছিলাম। দিনকে দিন বাঙালিদের নিচু বর্ণের মানুষের মতো করে ভাবতে শুরু করে পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দুভাষীরা।
একটা পর্যায় পর অবশ্য আমাদের পুর্ব পাকিস্তানের যারা শিক্ষিত বাঙালি নেতা ছিল তারা এটিকে ধরে বসেছিল। এই নেতারা প্রশ্ন করে বসলো, পাকিস্তান রাষ্ট্রের ভাষা কী হবে?
আমরা পূর্ববাংলায় সংখ্যায় মানুষ ছিলাম বেশি। আর এই বেশি মানুষের বড় অংশের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। তাই বেশি মানুষের ভাষাই হবে রাষ্ট্রভাষা এই দাবী তো আমাদের যথার্থই। এর পর ১৯৪৭ সালের ডিসেম্বরেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি তুলেছিল।
২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ পাকিস্তান গণপরিষদে বাংলার সন্তান ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বাংলাকে পরিষদের অন্যতম ভাষা করার প্রস্তাব দিলেন। যা হবার তাই হলো, প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যাত হয়ে গেল।
কিন্তু বাংলার মানুষ বলে কথা। হেরে যাবার পাত্র নয় তারা। এরপর ১১ মার্চ ১৯৪৮ বাংলা ভাষার দাবিতে প্রথম ধর্মঘট পালিত হল। এই আন্দোলনে আজকে যার ছবি ফেলে দিয়ে জিন্নার ছবি লাগিয়েছে পাকিস্তান এর বন্ধু দলের জুনিয়র টিমের তরুন ডাকসু ছাত্ররা সেই শেখ মুজিবুর রহমানই সেই ধর্মঘটের অন্যতম এক কুশিলব ছিলেন। পাকিস্তান সরকার প্রথম ধাপেই শেখ মুজিব সহ আরো বহু রাজনৈতিক ও ছাত্রনেতাকে গ্রেপ্তার করে জেলে দিলেন।
তবে, এখানে মনে রাখতে হবে, ভাষা আন্দোলন শুধু শেখ মুজিবের একার আন্দোলন ছিল না। তমদ্দুন মজলিশ, ছাত্রসমাজ, বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন এবং অসংখ্য সাধারণ মানুষজনও এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন।
যাই হোক, ২১ মার্চ ১৯৪৮ সালে, মোহাম্মদ আলী জিন্নার সঙ্গে পূর্ববাংলার মানুষের প্রথম একটি মনস্তাত্ত্বিক বড় সংঘাত ঘটে। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জিন্না ঘোষণা করে বসেন,
“The State Language of Pakistan is going to be Urdu and no other language.”
অর্থাৎ তাঁর মতে, পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু, অন্য কোন ভাষা নয়।
দ্বিতীয়বার, মাত্র তিন দিন পরই ২৪ মার্চ ১৯৪৮ সালে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তন অনুষ্ঠানে, কার্জন হলে, আরো বিস্তারিতভাবে জিন্না আবার বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন।
এবার তাঁর বক্তব্য ছিল মূলত:
“There can, however, be only one lingua franca … and that language should be Urdu…”
এবং পরে বলেন,
“The State language, therefore, must obviously be Urdu…”
শেষে আরও জোর দিয়ে বলেন,
“There can be only one State language and that language, in my opinion, can only be Urdu.”
অর্থাৎ তাঁর যুক্তি ছিল, প্রদেশগুলোর নিজস্ব ভাষা থাকতে পারে, কিন্তু পাকিস্তান রাষ্ট্রের আন্তঃপ্রাদেশিক যোগাযোগের জন্য একটি মাত্র রাষ্ট্রভাষা থাকবে এবং সেটি হবে কেবল উর্দু, অন্য কোন ভাষা নয়। অথচ বাংলায় কথা বলা মানুষের সংখ্যা তখন সব থেকে বেশি।
এই কথায় পূর্ববাংলার বাংলা ভাষাভাষী মানুষের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে যায়, এবং এর পর ভাষা আন্দোলন আরও শক্তিশালী হয়।
যাই হোক, ইতিহাসের এই জায়গায় জিন্নার অবদানকে দুইভাবে দেখতে হবে;
এক, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় জিন্না পূর্ব-পশ্চিম দুই পাকিস্তানেই ছিলেন প্রধান নেতা।
দুই, বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় মর্যাদার দাবির বিরোধিতা করে সেই জিন্না প্রথমবারের মতো হয়ে গেলেন পূর্ববাংলার মানুষের ভাষাগত আকাঙ্ক্ষার কাছে সাক্ষাৎ শত্রু।
এর পরই সেই ঐতিহাসিক ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের বিস্ফোরণ শুরু হয়ে গেল। পাকিস্তানিদের মামলা, দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষার দাবি নতুন শক্তি পেয়েছিল যা আমরা সবাই জানি।
এরপর ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ ঢাকায় ১৪৪ ধারা ভেঙে ছাত্ররা মিছিল করলে পুলিশ গুলি চালায় এটাও আমরা সবাই জানি। পাকিস্তান পুলিশের গুলিতে আমাদের বাঙালি ভাই সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেকে শহীদ হন এগুলোও আমরা জানি।
তবে যা জানা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, ভাষা আন্দোলনের এই রক্তের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার দাবি আর শুধু একটা ভাষার দাবি থাকে নাই। এটি হয়ে যায় বাঙালির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি আন্দোলন।
এখানে একটি ব্যাপার অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন যে, ২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ এর ভাষা আন্দোলনের সময় বাংলার নেতা শেখ মুজিব এর নাম আসে না কেন? এর উত্তর হচ্ছে, তিনি আসলে ৫২’র সেই সময়ে মিছিলে নেতৃত্বই দিতে পারেন নি। কারন, তাকে পাকিস্তান সরকার বন্দী করে কারাগারে রেখেছিলেন। তবে শেখ মুজিব ২১ ফেব্রুয়ারির সেই সময়ে রাজপথের প্রধান নেতা ছিলেন না সত্য, কিন্তু তিনি এর আগের ১৯৪৮ এর ভাষা আন্দোলনে সম্মুখসারির একজন সক্রিয় নেতা ছিলেন এবং ১৯৫২ সালের আন্দোলনের সময় কারাগার থেকেও তিনি ভাষার দাবির পক্ষে শক্ত অবস্থান নিয়েছিলেন।
এরপর ১৯৫৪ সালে বাংলার মানুষ মুসলিম লীগকে একেবারে প্রত্যাখ্যান করে দিল। এতে করে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বাংলার নেতাদের যুক্তফ্রন্ট বিপুল ভোটে বিজয় লাভ করেছিল।
যুক্তফ্রন্ট এই ভোটে ২১ দফার একটি দাবী তুলে ধরে। আর এই দাবীর অন্যতম একটি দাবি ছিল, “বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা এবং পূর্ববাংলায় স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করা।”
এই দাবীতেই মুসলিম লীগ ভয়াবহভাবে পরাজিত হয়।
আর এই দাবীটাই ছিল বাঙালির সাহসী পদক্ষেপের প্রথম একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত।
একটা ব্যাপার এখানে পরিষ্কার হয়ে যায়, পূর্ববাংলার মানুষ শুধু ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে আর রাজনীতি করতে চাইছিল না; তারা ভাষা, অর্থনীতি, অধিকার ও স্বায়ত্তশাসনও চাইছিল। এখান থেকেই পাকিস্তান সরকারের মাথায় চিন্তার ভাঁজ পড়তে শুরু করে।
এরপর পাকিস্তান সরকার বাংলার মানুষের শক্ত মনোভাব টের পেতে শুরু করে। বাংলার মানুষ কখন না আবার স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে ফেলে এই ভয়ে ১৯৫৬ সালে এসে শেষমেশ পাকিস্তান বাংলা ভাষাকেও উর্দুর সাথে যৌথভাবে রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়। পরবর্তীতে পাকিস্তানের ১৯৫৬ সালের সংবিধানে বাংলা ও উর্দু এই দুই ভাষাকেই রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
মানুষ এজন্যই বলে, গাধা পানি খায় ঘোলা করে। ১৯৪৮ সাল থেকে ষড়যন্ত্র, হত্যা, জেল,জুলুম অত্যাচার করতে করতে যতদিনে এসে ১৯৫৬ সালে বাংলাকে রাষ্ট্র ভাষার স্বীকৃতি দিল ততদিনে আমাদের পূর্ববাংলার মানুষের মনে নানা বঞ্চনার গভীর ক্ষত তৈরি হয়েই গেছে। বাংলার মানুষের মনে একটা প্রশ্ন গভীর হয়ে গেছে যে, “রাষ্ট্রে আমাদের জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেও ক্ষমতা কেন আমাদের হাতে নেই? আমরা কেন নিচু জাতের মতো বঞ্চিত হতে থাকব?”
এরপরের কাহিনি অন্যরকম। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন শুরু হলো। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান সামরিক শাসন জারি করলেন, গণতন্ত্র স্থগিত হয়ে গেল। রাজনৈতিক অধিকার সংকুচিত হয়ে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্যও ক্রমশ স্পষ্ট হতে থাকল।
বাংলার মানুষের প্রতি বৈষম্য আরো বাড়তে থাকল। এই সময় থেকেই পূর্ববাংলার রাজনীতি খুব ধীরে ধীরে স্বায়ত্তশাসনের দিকে এগোতে থাকল।
এর পরই এলো শেখ মুজিবের ১৯৬৬ সালের ঐতিহাসিক ছয় দফার ঘোষণা। বাংলার নেতা শেখ মুজিবের রাজনৈতিক ভূমিকা নতুন উচ্চতায় ওঠে গেল এই ছয় দফার মধ্য দিয়ে। ১৯৬৬ সালের সেই ৬ দফার মূল দাবী ছিল পূর্ব পাকিস্তানের জন্য রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বায়ত্তশাসন দিতে হবে।
এখানে মনে রাখতে হবে, ছয় দফা কিন্তু সরাসরি স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণা ছিল না। বরং এটি ছিল পাকিস্তানের কাঠামোর মধ্যে একটি ফেডারেল ব্যবস্থা ও পূর্ব পাকিস্তানের পক্ষে স্বায়ত্তশাসনের একটি দাবি মাত্র। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী এটিকে পাকিস্তান ভাঙার গভীর ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখেছিল। এর পরিনতিতে সেই একই কায়দায় বাংলার নেতা শেখ মুজিবকে গ্রেপ্তার করা হলো। বাংলার নেতা শেখ মুজিব এইভাবে বার বার জেলে যাওয়া আসা করতে করতেই জীবনের প্রায় ১৪ টা বছরই কাটিয়েছেন পাকিস্তান জেল খানাতেই। কিছু হলেই পাকিস্তান পুলিশ তাঁকে জেলে দিত।
যাইহোক, ৬ দফার পরিপ্রেক্ষিত ও অন্যান্য কিছু আন্দোলনের ভয়ে পর ১৯৬৮ সালে শেখ মুজিবকে ধরতে আবার আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা করলো পাকিস্তান সরকার। এর পর তো সবাই জানি আমরা যে, বাঙালিরা ১৯৬৯ সালে বড়সড় গণঅভ্যুত্থান সফল করলেন। ২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ তীব্র আন্দোলনের মুখে সরকার মামলা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয় এবং শেখ মুজিবসহ অন্যান্য নেতারা মুক্তি পান।
এর পর ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সালে রেসকোর্স ময়দানে তাঁকে ঐতিহাসিক “বঙ্গবন্ধু” উপাধি দেওয়া হয়।
ঠিক এ সময় থেকেই শেখ মুজিব পূর্ববাংলার মানুষের প্রধান রাজনৈতিক নেতা বঙ্গবন্ধু হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
এর পর ১৯৭০ সালে নির্বাচন হয়। ১৯৭০ সালের এই নির্বাচনে তৎকালীন আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের ১৬৯টির মধ্যে ১৬৭টি জাতীয় পরিষদ আসন জয়লাভ করে।
এর ফলে শেখ মুজিব শুধু একজন জনপ্রিয় নেতাই থাকলেন না। তিনি নির্বাচনের মাধ্যমে পূর্ব পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের রাজনৈতিক ম্যান্ডেটও অর্জন করে নিলেন। এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুহূর্তগুলোর অন্যতম একটি।
এর পর বাঙালিরা ভোটে জিতলেও বাংলার নেতা শেখ মুজিবকে আর পাকিস্তানিরা ক্ষমতা দিতে চায় না। নানাভাবে টালবাহানা করা শুরু করে দেয়। ১৯৭১ সালের ১ মার্চ ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে দেন।
পুর্ব বাংলার মানুষের সংখ্যা গরিষ্ঠতা সত্ত্বেও ক্ষমতা না দেওয়ায় মানুষ উত্তেজিত হতে থাকে। এরপর পূর্ববাংলায় শুরু হয় বড়সড় অসহযোগ আন্দোলন।
৭ মার্চ ১৯৭১ রেসকোর্স ময়দানে শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণ দেন।
সেই ভাষণের প্রতিটি লাইন সবার জানা। তিনি বলে বসেন,
“এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
তিনি সরাসরি সেদিন স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না দিলেও জনগণকে সেদিনের বক্তব্যে অনেকটাই প্রস্তুত করে ফেলেছিলেন এবং প্রতিরোধের নির্দেশনাও দিয়েছিলেন। তাঁর ভাষণকে Banglapedia বাংলাদেশের স্বাধীনতার দিকে একটি turning point হিসেবে বর্ণনা করেছে।
যাইহোক, আমরা সবাই জানি ২৫ মার্চ ১৯৭১ পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে নির্বিচারে নিরীহ মানুষদের মারতে থাকে।
ঐদিন ২৫ মার্চ রাতেই শেখ মুজিব আবার গ্রেপ্তার হন।
এর আগেই তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রেরণ করে দেন বলে ঐতিহাসিক দলিলে উল্লেখ পাওয়া যায়।
শুরু হয় আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ।
২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালের নয় মাসের এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের শেষে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। তারপর জন্ম নেয় আমাদের এই স্বাধীন বাংলাদেশ।
এতগুলো কথা বলার উদ্দেশ্য হলো, জিন্না ও শেখ মুজিবের অবদান কার কতখানি তা দেখানো।
এখানে আবেগ নয়, ইতিহাস দিয়ে বিচার করতে হবে।
মুহাম্মদ আলী জিন্নার ঐতিহাসিক অবদান:
১) পাকিস্তান আন্দোলনের প্রধান নেতা তিনি মানতেই হবে।
২) ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় কেন্দ্রীয় ভূমিকা তাঁরই ছিল।
৩) নতুন পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রথম গভর্নর-জেনারেল ছিলেন তিনি।
কিন্তু তার দোষের কাজ যেগুলো:-
১) তিনি বাংলাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করার দাবির পক্ষে ছিলেন না। উল্টো ঘোর বিরোধী ছিলেন।
২) ১৯৪৮ সালে তিনি উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলেছেন।
৩) ফলে পূর্ববাংলার ভাষাগত অধিকারের আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের সংঘাত তৈরি হয়।
এখানে এটা স্পষ্ট যে, জিন্না কোনভাবেই বাংলার মানুষের পক্ষের বা বাংলাদেশের স্বাধীনতার কোন নেতাই নন, তিনি শুধুই পাকিস্তান সৃষ্টির একজন নেতা।
এবার বাঙালি নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের অবদান দেখা যাক:-
তিনি-
১) ১৯৪৮-এর ভাষা আন্দোলনে অংশ নেন এবং বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার সেই আন্দোলনের নেতা।
২) পাকিস্তানি কেন্দ্রীয় শাসনের বিরুদ্ধে পূর্ববাংলার রাজনৈতিক অধিকার নিয়ে আন্দোলন করেন তিনি।
৩) ১৯৬৬ সালে গুরুত্বপূর্ণ ছয় দফার মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসনের দাবি সামনে আনেন তিনি।
৪) ১৯৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের পর বাঙালির প্রধান রাজনৈতিক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন তিনি।
৫) ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বাঙালির বিপুল গণরায় লাভ করেন তিনি।
৬) ৭ মার্চ ১৯৭১ ঐতিহাসিক নেতৃত্ব ও বক্তব্য দেন তিনি।
৭) ২৫ মার্চের পর স্বাধীনতার প্রথম ঘোষণা দেন তিনি।
৮) তাঁর নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক ভিত্তি তৈরিতে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখে।
তবে এখানেও সত্যটা সম্পূর্ণ বলতেই হবে। বাংলাদেশ কোনভাবেই শুধু একজন মানুষের কারণে স্বাধীন হয়নি।
সকল ভাষাশহীদ, ছাত্রসমাজ, মওলানা ভাসানী, শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান (বীর উত্তম), শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, তাজউদ্দীন আহমদ, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, এম এ জি ওসমানী, অগণিত রাজনৈতিক কর্মী, সকল বীর মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধে আমাদের সকল বীরঙ্গনা মাতা-নারী-ভগ্নিরা এবং সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের সম্মিলিত সংগ্রামেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে। তার সাথে আমাদের দেশের বঙ্গবন্ধু খেতাব পাওয়া শেখ মুজিবের যে দীর্ঘ ত্যাগ, এক দুইটা বছর না প্রায় ১৪ বছর জেলে কাটানো, এগুলো মিলিয়ে, আসল বাঙালি সে যে দলেরই হোক, জিন্নাকে তো তারা শেখ মুজিবের থেকে উচু স্থানে বসাতেই পারবে না।
সহজ কথায়, জিন্না পাকিস্তান সৃষ্টি করেছিলেন। আর শেখ মুজিব বাংলাদেশ সৃষ্টি করেছেন। এখানে পাকিস্তান না হলে বাংলাদেশ হতো না ব্লা ব্লা ব্লা এসব যুক্তি তুলে ধরলে রাজনীতি না করা যেকোনো সাধারণ মানুষও হাসবে।
অথচ আমরা আমাদের গৌরবজনক ইতিহাসকে মুছে না ফেলে এভাবেও তো ভাবতে পারি। জিন্নার নেতৃত্বে পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছিল একথা সত্যি; আর পাকিস্তানের বৈষম্য, ভাষা-অধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের দীর্ঘ সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাঙালির রাজনৈতিক জাতিসত্তা স্বাধীন বাংলাদেশের দিকে এগিয়ে যায় একথাও তো সত্যি। ইতিহাসের কাউকে ভালোবাসতে হলে অন্য কাউকে মুছে ফেলতে হয় না। এখানেই আছে কারো অজ্ঞতা আর কুট কিছু তুলে ধরার প্রয়াস।
জিন্নার পাকিস্তান সৃষ্টির অবদান স্বীকার যেমন করা যায়, আবার ১৯৪৮ এ আমাদের বাংলা ভাষানীতির বিরোধিতার জন্য তাঁর সমালোচনা তো মানুষ করবেই।
অন্যদিকে, শেখ মুজিবের স্বাধীনতা আন্দোলনে কেন্দ্রীয় ভূমিকা যেমন স্বীকার করা যায়, আবার উনাকে একা একক হিরো না ভেবে ভাষা আন্দোলন বা মুক্তিযুদ্ধের অন্য সব নেতা-সংগঠকের অবদানও একসাথে যথাযথভাবে স্মরণ করা যায়। কারণ ইতিহাস তো কোনো ব্যক্তির সম্পত্তি নয়। ইতিহাস একটি জাতির সম্মিলিত স্মৃতি। এই স্মৃতি যারা বিকৃত করতে চায় তাদের উদ্দেশ্য ও লোভ ভিন্ন কিছুর দিকেই।
শেষ কথা হচ্ছে, আমরা বাংলাদেশ পেয়েছি অনেক রক্তের বিনিময়ে। আর আমাদের এই প্রিয় বাংলাদেশ সৃষ্টির বিপক্ষে তখন মুক্তিযুদ্ধের সময় ও মুক্তিযুদ্ধের আগের সময় থেকেই যারা পাকিস্তানি উর্দুভাষীদের সাথে মিলে বাঙালিদের বিরোধিতা করে এসেছিল তারাই আজ শেখ মুজিবকে মুছে দিয়ে জিন্নাকে তার উপরে বসানোর চেষ্টা করছে। এখন তারা শুধু মুখে বলতে পারছে না যে, পাকিস্তানের মতো বাংলাদেশেরও জাতির পিতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ। আসল কথা তো হলো, জিন্না জিন্নার জায়গায়; আর শেখ মুজিব মুজিবের জায়গায়। আমরা বাংলাদেশী, আমাদের কাছে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত শেখ মুজিবের কর্ম, ত্যাগ, প্রচেষ্টা এগুলো তো ভুলবার নয়। শেখ মুজিবের ছবি নামিয়ে, তাকে ছোট করে সেখানে জিন্নার ছবি লাগাতে হবে কেন? যার যার অবস্থানে সে থাকুক না! ইতিহাস তো চাইলেই আমরা বদলাতে পারি না, পারি কি?

এম আই প্রধান’s Post

মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।