হোটেলটির রিজার্ভেশন ম্যানেজার একেএম সরওয়ার বলেন, ‘২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় এ বছর আমাদের হোটেলে বুকিং কম। বিশেষ করে ৫ আগস্টের পর থেকে এ ধারা অব্যাহত রয়েছে। ২০২২ ও ২০২৩ সালে ইভেন্ট, করপোরেট অনুষ্ঠানসহ বিভিন্ন আয়োজনে প্রায় সব হলরুম ও আবাসন কক্ষ অগ্রিম বুকিং থাকত। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও অর্থনৈতিক মন্দার কারণে এখন বুকিং কমে থাকতে পারে। তবে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে এবং বিদেশী অতিথির আগমন বাড়লে ব্যবসায় আবার গতি ফিরবে।’
তবে আগের দুই বছরের তুলনায় বুকিং কম হলেও সংকট কাটিয়ে উঠছে বলে জানিয়েছেন প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও পরিচালনাকারী হোটেলস ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. ইসরাত হোসেন খান। তিনি বলেন, ‘সরকারি হোটেলগুলোতে সবসময় লাভ হবে—এমন নয়। এগুলোকে সেবামূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবেও বিবেচনা করা হয়। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানের পর কিছু সময় সংকট ছিল। পরের বছর পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলেও এখন আবার বুকিং কমেছে। আমরা এ সংকট কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি।’
প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও ও সরকারি মালিকানাধীন আরেক পাঁচ তারকা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকায় গত রোববার সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সোনারগাঁওয়ে তিনটি ও ইন্টারকন্টিনেন্টালে দুটি ইভেন্ট অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ইন্টারকন্টিনেন্টালের ২২৬টি কক্ষের মধ্যে ওইদিন প্রায় ৫৫ শতাংশ বুকিং ছিল। হোটেল সূত্রে জানা যায়, বছরের শুরুতে কক্ষ ও স্যুইটের বুকিং ৭০-৭৫ শতাংশ থাকলেও গত দুই মাসে তা গড়ে প্রায় ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে। হোটেলটিতে ইভেন্ট ও করপোরেট আয়োজনের জন্য ১১টি ভেন্যু রয়েছে। এসব ভেন্যুর বুকিংও আগের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ কমেছে।
হোটেল সূত্রে জানা যায়, গত এক বছরে ইন্টারকন্টিনেন্টালের রূপসী বাংলা ও ক্রিস্টাল বলরুমে অনুষ্ঠানের সংখ্যা কমেছে অন্তত ৩০ শতাংশ। আগে এসব ভেন্যুতে ৮০ শতাংশ বুকিং হতো। এছাড়া ছোট মিটিং রুম বা ছোট ইভেন্ট রুমগুলোতেও নেই আগের মতো বুকিং। ইন্টারকন্টিনেন্টালের মার্কেটিং এক্সিকিউটিভ মুসকান তাবাসসুম বলেন, ‘আমাদের হোটেলগুলো মূলত ইভেন্টভিত্তিক ভেন্যু ব্যবসা করে। আবাসনের রুমগুলো কমই ভাড়া হয়। এখন প্রায় ৫০ শতাংশ মতো বুক আছে। আর ইভেন্টের ক্ষেত্রে একই রকম। ২০২২-২৩ সালের সঙ্গে তুলনা করলে এটি খুবই কম। ২০২৫ সালেও কিছুটা কাটিয়ে ওঠা গিয়েছিল। আশা করছি, আগামী কয়েক মাসে পরিস্থিতির আরো উন্নতি হবে।’
ইন্টারকন্টিনেন্টাল ঢাকার ক্যাটারিং সেলস বিভাগের পরিচালক আরিফ আহমেদ বলেন, ‘আমরা ধীরে ধীরে আগের অবস্থায় ফিরছি এবং বুকিংও বাড়ছে। ২০২৪ সালের আন্দোলন ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় মানুষের চলাচল এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রম কমে যাওয়ায় মিটিং, সম্মেলন ও বিভিন্ন করপোরেট আয়োজনেও প্রভাব পড়েছিল। এখন পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ায় এসব আয়োজন আবার বাড়ছে। আগামী তিন মাসের বেশির ভাগ দিনেই আমাদের ভেন্যু বুকিং রয়েছে। আশা করছি, গত দুই বছরের তুলনায় এবার ব্যবসা ভালো হবে।’
আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে ঢাকার আরেক পাঁচ তারকা হোটেল লা মেরিডিয়ানেরও। বহুজাতিক হোটেল চেইন ম্যারিয়ট ইন্টারন্যাশনালের অধীনে পরিচালিত হোটেলটির ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মোট আয় ছিল ২ কোটি ৫২ লাখ ডলার। ওই সময়ের বিনিময় হার অনুযায়ী বাংলাদেশী মুদ্রায় এর পরিমাণ ছিল প্রায় ২৯৭ কোটি টাকা। পরের অর্থবছরে, অর্থাৎ ২০২৪-২৫ সালে আয় নেমে আসে ১ কোটি ৬১ লাখ ডলারে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কিছুটা বেড়ে ১ কোটি ৭৪ লাখ ডলারে দাঁড়ালেও ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় আয় এখনো প্রায় ৩১ শতাংশ কম।
চলতি অর্থবছরে লা মেরিডিয়ানের আয় আরো কমেছে বলে জানান হোটেলটির স্বত্বাধিকারী ও বেস্ট হোল্ডিংস লিমিটেডের চেয়ারম্যান আমিন আহমেদ ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ‘কভিডের সময় হোটেলের আয় একেবারেই পড়ে গিয়েছিল। সেই ধাক্কা কাটিয়ে ২০২২ সাল থেকে বিদেশী অতিথির আগমন ও সম্মেলন কক্ষের বুকিং বাড়তে শুরু করে। কিন্তু ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় বর্তমানে আমাদের আয় অর্ধেকেরও কম। দুই বছর ধরে প্রিমিয়াম স্যুইটগুলোর বড় অংশ খালি পড়ে আছে। ব্যাংক ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের সম্মেলন আয়োজনও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। ফলে সম্মেলন কক্ষের বুকিংও কমে গেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিচালন ব্যয় তুলে আনাই কঠিন হয়ে পড়ছে।’
প্রায় একই চিত্র ঢাকার শেরাটন ও দ্য ওয়েস্টিনের। শেরাটন ঢাকার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমাদের বলরুম, ক্যাটারিং এবং ফুড অ্যান্ড বেভারেজ কার্যক্রম চালু আছে। তবে রুম ভাড়া দেয়ায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় আবাসন ব্যবসা করা যাচ্ছে না। ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ভালো চললেও বলরুমে বড় আয়োজন কমেছে। বর্তমানে ৫০-১০০ জনের ছোট পরিসরের এনজিও অনুষ্ঠানই তুলনামূলক বেশি হচ্ছে। রাজনৈতিক, বিদেশী অতিথি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার অনুষ্ঠানও আগের চেয়ে কম। অথচ পরিচালন ব্যয় কমেনি, ফলে রাজস্বে চাপ পড়েছে। এর পেছনে শুধু অর্থনৈতিক মন্দাই নয়, প্রতিযোগিতা বেড়ে যাওয়ার প্রভাবও থাকতে পারে। তবে নভেম্বর থেকে জানুয়ারির পিক সিজনে ব্যবসা বাড়বে বলে আমরা আশা করছি।’
দ্য ওয়েস্টিন ঢাকা ও শেরাটনের পরিচালক মো. শাখাওয়াত হোসেনবলেন, ‘আমাদের কক্ষের অতিথি অবস্থানের হার মোটামুটি ঠিক আছে, তবে গড় দৈনিক কক্ষ ভাড়া কিছুটা কমেছে। বাজারে চাহিদা ধীর থাকার কারণেই এমনটি হয়েছে। আশা করি পূজার পর বা অক্টোবরের পরেই বেড়ে যাবে। ব্যাংকোয়েট এবং ফুড অ্যান্ড বেভারেজ ব্যবসাও ভালো চলছে। আগস্ট ও সেপ্টেম্বর সাধারণত তুলনামূলক দুর্বল সময়, কারণ এ সময়ে দেশ-বিদেশে ছুটি বেশি থাকে এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমও কিছুটা কমে যায়। অক্টোবরের পর থেকে চাহিদা বাড়ে, আর নভেম্বর-ডিসেম্বরে ব্যবসা সাধারণত আরো ভালো হয়।’
গত বছরের তুলনায় এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভালো জানিয়ে তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম কমে গিয়েছিল। ২০২৫ সালেও তার প্রভাব ছিল। এখন পরিস্থিতি তুলনামূলক স্থিতিশীল হওয়ায় ব্যবসাও ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াচ্ছে। ২০২২ ও ২০২৩ সালে ব্যবসা ভালো ছিল, ২০২৪ সালের শেষ দিকে তা কমে যায়। ২০২৬ সালে এসে গত বছরের তুলনায় পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি দেশের পাঁচ তারকা হোটেলের বুকিং এবং বিমানে চলাচলকারী যাত্রী বাড়ছে না কমছে তা দিয়ে সেই দেশের অর্থনীতির চিত্র ফুটে ওঠে। পাঁচ তারকা হোটেলের বুকিং কমে যাওয়া বৈদেশিক বাণিজ্য, পর্যটন ও বিনিয়োগ স্থবিরতা তুলে ধরে। বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পাঁচ তারকা হোটেলের বুকিংয়ের চিত্র যখন নেতিবাচক হয় তখন অর্থনীতির সংকুচিত অবস্থা দেখা যায়। এ চিত্র মানে ব্যবসায়িক পরিস্থিতি ভালো না, অর্থনীতিতে বিনিয়োগ নেই। আরেকটি কারণ হতে পারে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির ঘাটতি। এগুলো যদি উত্তরণ করা না যায় তাহলে অতিথিরা যেমন আসবে না, তেমনি সরকারের রাজস্বেও এর নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাবে।’
তবে সংকট কাটাতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানিয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের হোটেল ও রেস্তোরাঁ সেলের নিয়ন্ত্রক ড. প্রকাশ কান্তি চৌধুরী। তিনি বলেন, ‘বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও দেশের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে হোটেলগুলোতে বুকিং ও অতিথি কিছুটা কমেছে। পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে সরকারি দুটি হোটেলসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা, বিভিন্ন প্যাকেজভিত্তিক বুকিং অফার চালু করা এবং সেগুলোর প্রচার বাড়ানোর পরামর্শ দেয়া হয়েছে। পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের অনুষ্ঠান সরকারি হোটেলগুলোতে আয়োজনের উদ্যোগও নেয়া হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘শুধু ঢাকা নয়, সারা দেশের সরকারি-বেসরকারি হোটেল-মোটেলে অতিথি আকৃষ্ট করতে এবং পর্যটন গন্তব্যগুলো তুলে ধরতে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো ও সেবার মান উন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। আমরা আশা করছি, আগামী বছর থেকে পরিস্থিতির উন্নতি হবে এবং হোটেলগুলোর ব্যবসাও ঘুরে দাঁড়াবে।’






















