
অনলাইন শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
আমি তাসনিম সিরাজ মাহবুব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক।গত ৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে আমার মাস্টার্স ফাইনাল সেমিস্টারের ক্লাসে সংঘটিত ঘটনাএবং পরবর্তী বিভাগীয় সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আমার বক্তব্য তুলে ধরছি।
আমি ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী এবং ব্যক্তিগত পারিবারিক জীবনে ধর্মীয় অনুশাসন পালন করি। ধর্মীয় বিশ্বাস ও চর্চা আমার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আমার প্রায় ৩৪ বছরের শিক্ষকতা জীবনে যেসব ছাত্র-ছাত্রী আমাকে কাছে থেকেদেখেছেন তারা আমার ধর্মীয় বিশ্বাস মূল্যবোধ ও আচরণ সম্পর্কে জানেন। কোন শিক্ষার্থীর ধর্মীয় বিশ্বাস বা পোশাককে অবমাননা করার প্রশ্ন এখানে অবান্তর।
সেদিন ক্লাসে দরজার বা দিকে আরো দুজন ছাত্রীর সাথে একজন শিক্ষার্থী বসে ছিলোযার চোখ সহ সমগ্র মুখমণ্ডল ঢাকা ছিল। তার চোখ দেখতে না পাওয়ায় তাকে তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করতে পারছিলাম না। চোখে চোখে রেখে যোগাযোগ করতে না পাড়ায় তিনি আমার বক্তব্য কিভাবে গ্রহণ করছেন এবং শ্রেণিকক্ষের কার্যক্রমের মাঝে কিভাবে অংশ নিচ্ছেন তা বুঝতেও আমার অসুবিধা হচ্ছিলো। এতে পাঠদানের সময় আমি স্বস্তি অনুভব করছিলাম না।
একজন শিক্ষক হিসেবে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবেশে পাঠদান আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ এবং সেই বিবেচনা থেকেই আমি বিষয়টি নিয়ে কথা বলি।
এ প্রসঙ্গে আমি সূরা আনূরের ৩১ নম্বর আয়াতে বর্ণিত শালীনতাসৌন্দর্য প্রদর্শন সীমিত রাখা এবং সরাসরি চেহারা আবৃত করার নির্দেশের উল্লেখ করি।
ক্লাসে বোরখা পড়া অন্য দুই শিক্ষার্থীর উদাহরণ দিয়ে বলি যে আল কোরআনের অনুবাদ করে আমার বোঝাপড়া অনুযায়ী শরীরের গঠন স্পষ্ট না হয় এমন শালীন পোশাক পড়েও মুখমণ্ডল দৃশ্যমান রাখা যায়। মুখমণ্ডল খোলা রাখা জায়েজ। এমন ধর্মীয় ব্যাখ্যার কথাও তাকে বলি।
নিজের হজ পালনের অভিজ্ঞতা উল্লেখ করে ইহরাম অবস্থায় নারীদের নেকাব না পড়ার হাদিসের কথাও আলোচনা করি।
এই পুরো আলোচনাটির মধ্যে তার পোশাক পরিবর্তনের বিষয়ে কোন কথাই হয়নি।
আমি কেবলমাত্র চোখ দেখতে না পারার ফলে স্বস্তিবোধ করছি না বলার পরে তিনি ক্লাস থেকে চলে যান। তার সঙ্গে এ বিষয়ে কোন বিতর্ক হয়নি। তবে তার পক্ষে কথা বলা অন্য একজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে মতবিনিময় হয়।
তিনি পোশাক নির্বাচনের স্বাধীনতার কথা বললে আমি শিক্ষার্থীদের পরিচয় শনাক্ত করতে পারা এবং স্বাচ্ছন্দ্যপূর্ণ পরিবেশে পাঠদানের প্রয়োজনীয়তার কথা বলি। একজন
শিক্ষকের পক্ষে যেকোনো শিক্ষার্থীর পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হওয়া ও শ্রেণিকক্ষে কার্যকর যোগাযোগের ব্যত্যয় ঘটলে শিক্ষাদানে কি ধরনের সমস্যা হতে পারে সেটা বোঝানোই আমার বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল।
সেদিন ওই একই ক্লাসে আরো অনেক শিক্ষার্থী শুধু হিজাব এবং হিজাবের সাথে বোরখা পড়ে
ক্লাসে উপস্থিত ছিলেন।
তাদের মুখমণ্ডল ক্ষেত্রবিশেষে শুধু চোখ দৃশ্যমান
থাকায় তাদের চিনতে আমার কোন সমস্যা হয়নি এবং তাদের কাউকে পোশাক সম্পর্কে আমি কিছু বলিও।
সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীকে বলেছিলাম অন্যার্থীরাও বোরখা ও হিজাব পড়ে এসেছেন এবং এই একইভাবে পর্দা করা যায়। এতে পর্দা সম্পর্কে ইসলাম ধর্মের যে নির্দেশ আছে তা পুরোপুরিভাবে পালিত হয়। সমগ্র মুখমণ্ডলের সাথে তার চোখও ঢাকা থাকলে তাকে কিভাবে চিনবো সে প্রশ্নও করেছিলাম।
আমি তাকে কোন প্রশ্নের উত্তর দিতে বাধ্য করিনি। পোশাক পরিবর্তন করতে নিকাব খুলতে কিংবা ক্লাস ত্যাগ করতেও নির্দেশ দিইনি। ধর্মীয় পোশাকের কারণে তাকে কোন শাস্তি দিইনি বা ভবিষ্যতে আমার ক্লাসে আসতেও নিষেধ করিনি। কথা বলেছিলাম চোখ ঢাকা নিয়ে।হিজাব বোরখা বা পর্দার বিরুদ্ধে নয়।
তিনি ক্লাস থেকে চলে যাওয়ার পর কয়েকজন শিক্ষার্থী আমার সাথে কথা বলেন। আমি তাদের কাছ থেকে জানতে পারি যে সেই ছাত্রী সম্ভবত আমার কথায় ব্যথিত হয়েছেন এবং তাই তিনি ক্লাস ছেড়ে চলে গেছেন। তখন আমি উপস্থিত শিক্ষার্থীদের বলি আমি কখনোই চাই না আমার কথায় কেউ কষ্ট পাক। তোমরা যখন বলছো যে সে কষ্ট পেয়ে ক্লাস ছেড়ে গেছে আমি তাকে সরি বলতে চাই।
তার কাছে সরাসরি দুঃখ প্রকাশের জন্য সহপাঠীদের মাধ্যমে তাকে বিভাগের ভিতরে খোঁজ করাই।
যখন জানতে পারি যে সে শ্রেণিকক্ষ ২০৮১র ভিতরে বসে আছে তখন আরেকজন ছাত্রীর মাধ্যমে আমি তিনবার ডেকে পাঠাই এবং করিডোরে।
দাঁড়িয়ে প্রায় ১০ মিনিটের মত তার জন্য অপেক্ষা করি।
তিনি পাশের কক্ষে অবস্থান করলেও বারবার খবর পাঠানোর পরেও আমার সঙ্গে কথা বলতে ওই কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসেননি।
ফলে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও তার কাছে সরাসরি দুঃখ প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি।
একই সময়ে পরিবারের একজন গুরুতর অসুস্থ সদস্যের অ** প্রচারের কারণে আমাকে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হয়।
এই পারিবারিক সংকটের মধ্যেই জানতে পারি আমার বক্তব্য বিকৃতভাবে প্রচার করা হচ্ছে।
যা আমার বলা কথার প্রেক্ষাপট ও উদ্দেশ্যকে যথাযথভাবে তুলে ধরছে না।
বিষয়টি আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত করেছে। আরো জানতে পারি শিক্ষার্থীদের লিখিত অভিযোগের ভিত্তিতে
ইংরেজি বিভাগ আমার বক্তব্য গ্রহণ না করেই আমার সব কোর্স অন্য শিক্ষকদের মধ্যে বন্টন করেছে। আমার ব্যাখ্যা উপস্থাপনের সুযোগ পাওয়ার আগেই এমন সিদ্ধান্তে আমি মর্মাহত হয়েছি।
বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে আমার অনুরোধ অভিযোগগুলোর বিষয়ে আমার পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা দেওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা হোক। সংশ্লিষ্ট সভার বক্তব্য ও প্রাসঙ্গিক তথ্যের ভিত্তিতে ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে
যাচাই করা হোক। এই প্রক্রিয়ায় আমি প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে প্রস্তুত।
ঘটনার পর বেনামী ফোন ইমেইল আপত্তিকর বার্তা ও হুমকি আমার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলেছে। সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীসহ সবার মর্যাদা ও নিরাপত্তা
নিশ্চিত করতে এবং হুমকি ও হয়রানি প্রতিরোধে কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করছি।
আমি বিশ্বাস করি শ্রেণিকক্ষ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক উভয়ের জন্য সম্মানজনক ও নিরাপদ স্থান হওয়া প্রয়োজন।
পরিচয় যাচাইয়ের প্রয়োজন হলে তা ধর্মীয় বিশ্বাস ব্যক্তিগত মর্যাদা ও গোপনীয়তার
প্রতি সম্মান রেখে সুস্পষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালার মাধ্যমে সম্পন্ন হওয়া উচিত।
গণমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি অনুরোধ আমার বক্তব্য যথাযথভাবে তুলে ধরুন এবং ঘটনাটির নিরপেক্ষ যাচাইয়ের সুযোগ দিন।
পারস্পরিক সম্মান ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার পরিবেশ বজায় রেখে বিষয়টি ন্যায়সঙ্গত নিষ্পত্তি প্রত্যাশা করছি।
আমার কথা শোনার জন্য অনেক ধন্যবাদ। খোদা হাফেজ।
নিকাব ইস্যুতে নিজের বক্তব্য তুলে ধরলেন ঢাবি অধ্যাপক তাসনিম সিরাজ মাহবুব।
Diary of She’s Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।





















