
অনলাইন মঙ্গলবার ০৬ অক্টোবর ২০২৬
জীবিত অবস্থায় মূল্যায়িত হননি, বরং নিজের দলের শাসনামলেই কারাভোগ করতে হয়েছে মাসের পর মাস—শুধুই ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়ার প্রতিহিংসার কারণে!
এটাই কি তবে আওয়ামী লীগের রাজনীতির ট্র্যাজেডি? মৃত্যুর পর আজ হয়তো সবাই সোশ্যালের পর্দায় তাকে নিয়ে শোকের সাগরে ভাসবে, শ্রদ্ধা জানাবে। অথচ একরাশ অতৃপ্তি, অপমান আর প্রচণ্ড মনোকষ্ট বুকে নিয়েই চিরতরে চলে গেলেন আমার শ্রদ্ধেয় ফখরুদ্দিন ভাই।
২০২১ সালের ১৩ জুলাই। বিপ্লব বড়ুয়ার নির্দেশে সাতকানিয়ার তৎকালীন পৌর মেয়র জোবায়েরকে বাদী বানিয়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আমাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। মামলায় ফখরুদ্দিন ভাইকে ১ নম্বর এবং আমাকে ২ নম্বর আসামি করা হয়েছিল। ১৪ তারিখ রাতে চট্টগ্রামের হামজারবাগ থেকে সাতকানিয়া থানা পুলিশ উনাকে গ্রেফতার করে।
গ্রেফতারের পর বিপ্লব বড়ুয়ার সরাসরি নির্দেশে উনার ওপর চালানো হয় নির্মম শারীরিক নির্যাতন। বুধবার গ্রেফতার করা হলেও পুলিশ শনিবার পর্যন্ত বিষয়টি চেপে রাখে এবং রবিবার উনাকে আদালতে চালান দেয়। একপর্যায়ে সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া নির্যাতনের মুখেই উনি আমার বিরুদ্ধে আদালতে জবানবন্দি দিতে বাধ্য হন। ওরা চেষ্টা করেছিলো আমিন ভাইয়ের বিরুদ্ধেও উনার মুখ থেকে বলাতে।
পরবর্তীতে কারাগারে আমাদের যখন দেখা হলো, সেই জবানবন্দি নিয়ে উনার আফসোসের কোনো শেষ ছিল না। একদম ছোট বাচ্চার মতো আমার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলেন। আমি উনাকে জড়িয়ে ধরে বলেছিলাম—”ভাই, মূল পোস্ট তো দিয়েছিলাম আমি। আপনি তো কারো নাম উল্লেখ না করে শুধু একটা সাধারণ কমেন্ট করেছিলেন। তার জন্য আপনাকে এত নির্যাতন সহ্য করতে হলো!” আমি নিজেও উনার কাছে ক্ষমা চেয়েছিলাম।
উনার দুটি সন্তান তখন ডাক্তার, একজন চুয়েটে পড়ত। দল ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় নিজেদের দলের লোকের দ্বারাই পিতা এভাবে নির্যাতনের শিকার হয়ে কারাগারে—এই চরম অপমান ও আঘাত উনার পরিবার কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। এই ঘটনার পর পরিবার থেকেও উনি অনেকটা আড়ালে চলে যান। সন্তানরা তো চাইবেই না তাদের বাবা এমন রাজনীতিতে থাকুক।
কারাগারে থাকা অবস্থায় নিয়ম অনুযায়ী উনি প্রতি সপ্তাহে শুধু আমিন ভাইয়ের সাথে ফোনে কথা বলতেন। আমিন ভাইও উনার জন্য প্রতি মাসে খরচের টাকা পাঠাতেন। যখন বিপ্লব বড়ুয়া ক্ষমতার দাপটে আমাদের জামিন আটকে রেখেছিল, তখন আমিন ভাই তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদকে দিয়ে বিচারককে ফোন করান। কিন্তু বিচারক জানান—”প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের প্রচণ্ড চাপ আছে, জামিন দেওয়া সম্ভব নয়।” পরবর্তীতে হাছান মাহমুদ ক্ষিপ্ত হয়ে হস্তক্ষেপ করার পর অবশেষে জামিন মঞ্জুর হয়। দীর্ঘ ৬টি মাস আমাদের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কাটাতে হয়েছিলো ফখরুদ্দিন ভাইকে।
যেদিন উনার জামিন হলো, সেদিন উনি বাচ্চার মতো আনন্দিত হয়ে আমার কাছে ছুটে এসেছিলেন। উনার সেই নিষ্পাপ, খুশিতে আত্মহারা মুখটা আজও আমার চোখের সামনে জ্বলজ্বল করছে। উনি বের হওয়ার কিছুদিন পর উচ্চ আদালতের আপিল বিভাগ থেকে আমারও জামিন হয় ( আমার জামিন হওয়ার প্রক্রিয়া ও ঘটনা আমি ধারাবাহিকভাবে ফেসবুকে লিখেছি)।
কারাগার থেকে বের হওয়ার কিছুদিন পরই ছিল আওয়ামী লীগের সম্মেলন। সম্মেলনে আমিন ভাই উপ-প্রচার থেকে সমাজকল্যাণ সম্পাদক হলেন। এরপর যখন উপকমিটি গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলো, ফখরুদ্দিন ভাই আশা করেছিলেন অন্তত সেই উপকমিটিতে উনার স্থান হবে। কিন্তু উপকমিটি প্রকাশের পর দেখা গেল, সেখানে উনার নাম নেই!
কমিটি ঘোষণার দিন উনি আমাকে ফোন করে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেছিলেন—”সাজ্জাত, আমরা বোধহয় কারো আপন হতে পারলাম না! চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি ছিলাম, মাস্টার্স পাস করা লোক… অথচ একটা সামান্য উপকমিটিতেও আমার জায়গা হলো না। আর সমাজে কত বখাটে লোক এসে কমিটিতে পদ পেয়ে গেল!”
কষ্ট চেপে উনি পরবর্তীতে আমিন ভাইকে হোয়াটসঅ্যাপে একটি চিঠি লিখে পাঠান। আমিন ভাই বিষয়টি আমাকে ফোনে জানালে আমি বলেছিলাম—”আমিন ভাই, আপনি উনাকে কমিটিতে রাখতে পারতেন।” তখন আমিন ভাই বললেন—”তুমি বা ফখরুল কেউ তো আমাকে আগে আগ্রহের কথা বলোনি! তোমার অনুরোধে একজনকে রেখেছি, কিন্তু তোমরা তো উনার কথা বলোনি।” আমি বলেছিলাম—”আমার কথায় যাকে রেখেছেন তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ, কিন্তু ফখরুল ভাই তো অনেক জ্যেষ্ঠ, উনাকে রাখা দরকার ছিল।”
এই বঞ্চনার কষ্টটা ফখরুদ্দিন ভাই শেষ দিন পর্যন্ত মনে বয়ে বেরিয়েছেন। উনাদের মতো ত্যাগী ও শিক্ষিত মানুষকে দল কখনো মূল্যায়ন করেনি। আওয়ামী লীগে পদ পেতে হলে যোগ্যতা নয়, পকেটে অঢেল টাকা থাকতে হয়—এই সহজ সত্যটি এই সরল মানুষটি কখনোই বুঝে উঠতে পারেননি। তবে এত অবহেলা আর কষ্টের মাঝেও উনার সন্তানরা যে মানুষ হয়েছেন, যোগ্য স্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন—মৃত্যুর আগে অন্তত এই শান্তিটুকু উনি দেখে যেতে পেরেছেন। ফখরুদ্দিন ভাই ভালো লিখতে পারতেন এবং তাঁর হাতের লেখাও খুবই সুন্দর ছিলো।
আজ খবরটা শোনার পর আমিন ভাইও আমাকে হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করেছিলেন। উনি একদম বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। উনাকে বললাম—”বয়সে আপনার চেয়ে বড় হওয়া সত্ত্বেও ফখরুদ্দিন ভাই আপনার অনুপস্থিতিতে কখনো আপনাকে নাম ধরে ডাকেননি, মনেপ্রাণে আপনাকে নেতা মানতেন।”
তবে এই আকস্মিক মৃত্যু নিয়ে আমার মনে এক গভীর খটকা আর সন্দেহ কাজ করছে। এই মৃত্যুটা কি আসলেই স্রেফ একটি দুর্ঘটনা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো রহস্য রয়েছে? আমিন ভাই জানালেন—আজ বা কাল উনার ভাইপোর বিয়ে ছিল। হয়তো সেই উদ্দেশ্যে ঢাকা থেকে এসে ট্রেনে করে বাড়িতে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। উনার ভাইও নিশ্চিত করেছেন যে উনি ঢাকায় ছিলেন।
যে মানুষটা জীবনভর শুধু ত্যাগই দিয়ে গেলেন, বিনিময়ে পেলেন জুলুম, জেল আর বঞ্চনা—আজ উনার মৃত্যুর পর সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইক-কমেন্টের জোয়ার ভাসবে। কিন্তু জীবিত অবস্থায় এই ত্যাগী নেতাকে যে তিল তিল করে শেষ করে দেওয়া হলো, সেই দায় কি দল কখনো এড়াতে পারবে?
বিদায় ফখরুদ্দিন ভাই। ওপারে শান্তিতে থাকুন। আপনার এই অকাল ও রহস্যজনক প্রস্থান আমরা কোনোদিন ভুলব না।
—–
সংযুক্তি -কারাগার থেকে বের হওয়ার পর ধানমন্ডি ৩/এ পার্টি অফিসে ফখরুদ্দিন ভাইয়ের উপর হামলা করিয়েছে বিপ্লব বড়ুয়া তার লোক দিয়ে। তখন থানায় মামলা করেন তিনি। সিসিটিভির ফুটেজ দেখে ধরা যেত সেই হামলাকারীদের। সনাক্ত করার চেষ্টা চালালে বিপ্লব বড়ুয়া প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের ক্ষমতা দেখিয়ে সেটাও বন্ধ করেন।
SK Tutul’s Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।





















