, বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১১ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মোকতাদির চৌধুরীকে থামানোর ষড়যন্ত্র?

  • প্রকাশের সময় : ৫৯ মিনিট আগে
  • ১২ পড়া হয়েছে

অনলাইন বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬

মোকতাদির চৌধুরীকে থামানোর ষড়যন্ত্র, ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে উগ্রতার দিকে ঠেলে দেওয়ার অপচেষ্টা
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সংস্কৃতিমনা, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী, টানা চারবার বিপুল ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্য, সাবেক গণপূর্তমন্ত্রী ও যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের করা হয়েছে। সেই মামলার জালে আটকে তিনি আজ ২২ মাস ধরে কারাগারে।
বিষয়টি এখন আর কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় নয়। বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী মানবাধিকার সংগঠন Human Rights Watch (HRW)-ও বিষয়টি তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। ২৩ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদনে HRW উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর নাম উল্লেখ করে বলেছে—“RAM Obaidul Muktadir Chowdhury, 71, has been in detention for 22 months without charge and has serious heart problems.” অর্থাৎ, ৭১ বছর বয়সী মোকতাদির চৌধুরী কোনো অভিযোগ ছাড়াই ২২ মাস ধরে আটক এবং তাঁর গুরুতর হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা রয়েছে।
এই একটি বাক্যই অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়।
একজন প্রবীণ যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক মন্ত্রী এবং চারবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য যদি ২২ মাস ধরে কারাগারে থাকেন, অথচ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা তাঁর আটককে “without charge” হিসেবে চিহ্নিত করে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এটি কি ন্যায়বিচারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, নাকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার দীর্ঘ ছায়া?
আরও উদ্বেগজনক হলো তাঁর শারীরিক অবস্থা। HRW যখন কারাবন্দিত্বের পাশাপাশি তাঁর গুরুতর হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যার কথাও উল্লেখ করছে, তখন তাঁর দীর্ঘমেয়াদি আটক শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি মানবিক ও মানবাধিকার প্রশ্নেও পরিণত হয়।
মোকতাদির চৌধুরীকে যারা চেনেন, তারা জানেন—ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজনীতিতে তিনি শুধু একজন ব্যক্তি নন; তিনি এই জনপদের অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বহুত্ববাদী সমাজের পক্ষে একটি উচ্চকণ্ঠ রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করেন।
তাই তাঁর কণ্ঠকে স্তব্ধ করার অর্থ শুধু একজন রাজনীতিককে কারাগারে আটকে রাখা নয়। এর রাজনৈতিক অভিঘাত আরও গভীর।
কারণ, মোকতাদির চৌধুরীর কণ্ঠ যতদিন সক্রিয় থাকবে, ততদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাটিতে সাম্প্রদায়িকতা, উগ্রবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে একটি দৃশ্যমান রাজনৈতিক প্রতিরোধ থাকবে। সেই কণ্ঠকে যদি দীর্ঘদিন কারাগারের দেয়ালের মধ্যে বন্দী রাখা যায়, তাহলে যারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী অসাম্প্রদায়িক চরিত্রকে বদলে দিতে চায়, তাদের পথ অনেকটাই মসৃণ হয়ে যায়।
এই কারণেই ৫ আগস্টের পর তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর বাদী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রাজনৈতিক-সামাজিক পরিচয়, মামলাগুলোর প্রেক্ষাপট এবং অভিযোগগুলোর প্রমাণ—সবকিছুই নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি।
কেননা, কয়েকটি মামলার বাদী হিসেবে হেফাজতে ইসলামীর নেতাকর্মী বা তাদের ঘনিষ্ঠ বলয়ের ব্যক্তিদের নাম প্রকাশ্যে এসেছে। যেমন, একটি হত্যা মামলার বাদী ছিলেন নবীনগর উপজেলা হেফাজতে ইসলামীর সভাপতি মাওলানা মেহেদী হাসান। আবার ২০২১ সালের হেফাজত-পুলিশ সংঘর্ষে নিহত এক মাদ্রাসাছাত্রের বোনও তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।
অর্থাৎ, মামলাগুলোকে শুধু বিচ্ছিন্ন আইনি ঘটনা হিসেবে দেখলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতাটি আড়ালে থেকে যায়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সুরসম্রাট আলাউদ্দিন খাঁর জনপদ। এই মাটি শিল্প, সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতির। এই জনপদের পরিচয় কোনো সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার একচ্ছত্র আধিপত্যে নির্ধারিত হতে পারে না।
তাই মোকতাদির চৌধুরীকে ঘিরে আজকের প্রশ্নটি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত মুক্তির প্রশ্ন নয়।
প্রশ্নটি হলো—একজন অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক কণ্ঠকে ২২ মাস কারাগারে রেখে কি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিসরকে অন্য কারও জন্য ফাঁকা করে দেওয়া হচ্ছে?
আর যদি সত্যিই তা হয়ে থাকে, তাহলে মোকতাদিরকে থামানোর এই প্রচেষ্টা নিছক একজন রাজনীতিককে থামানোর প্রচেষ্টা নয়—এটি একটি জনপদের অসাম্প্রদায়িক আত্মাকে দুর্বল করার প্রচেষ্টা।
HRW-এর প্রতিবেদন সেই আশঙ্কাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আলোচনার টেবিলেও নিয়ে এসেছে।
আমরা কোনো বিচারহীন বন্দিত্ব চাই না। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা চাই—উগ্রবাদের চারণভূমি নয়। অসাম্প্রদায়িকতার কণ্ঠ চাই—কারাগারের নীরবতা নয়।

Supporter of Humanity’s Post

মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।

জনপ্রিয়

মোকতাদির চৌধুরীকে থামানোর ষড়যন্ত্র?

প্রকাশের সময় : ৫৯ মিনিট আগে

অনলাইন বুধবার, ২৬ আগস্ট ২০২৬

মোকতাদির চৌধুরীকে থামানোর ষড়যন্ত্র, ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে উগ্রতার দিকে ঠেলে দেওয়ার অপচেষ্টা
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সংস্কৃতিমনা, অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী, টানা চারবার বিপুল ভোটে নির্বাচিত সংসদ সদস্য, সাবেক গণপূর্তমন্ত্রী ও যুদ্ধাহত বীর মুক্তিযোদ্ধা উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের করা হয়েছে। সেই মামলার জালে আটকে তিনি আজ ২২ মাস ধরে কারাগারে।
বিষয়টি এখন আর কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিতর্কের বিষয় নয়। বিশ্বের অন্যতম প্রভাবশালী মানবাধিকার সংগঠন Human Rights Watch (HRW)-ও বিষয়টি তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। ২৩ আগস্ট ২০২৬ প্রকাশিত প্রতিবেদনে HRW উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর নাম উল্লেখ করে বলেছে—“RAM Obaidul Muktadir Chowdhury, 71, has been in detention for 22 months without charge and has serious heart problems.” অর্থাৎ, ৭১ বছর বয়সী মোকতাদির চৌধুরী কোনো অভিযোগ ছাড়াই ২২ মাস ধরে আটক এবং তাঁর গুরুতর হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যা রয়েছে।
এই একটি বাক্যই অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়।
একজন প্রবীণ যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক মন্ত্রী এবং চারবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য যদি ২২ মাস ধরে কারাগারে থাকেন, অথচ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা তাঁর আটককে “without charge” হিসেবে চিহ্নিত করে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এটি কি ন্যায়বিচারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, নাকি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার দীর্ঘ ছায়া?
আরও উদ্বেগজনক হলো তাঁর শারীরিক অবস্থা। HRW যখন কারাবন্দিত্বের পাশাপাশি তাঁর গুরুতর হৃদ্‌যন্ত্রের সমস্যার কথাও উল্লেখ করছে, তখন তাঁর দীর্ঘমেয়াদি আটক শুধু রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি মানবিক ও মানবাধিকার প্রশ্নেও পরিণত হয়।
মোকতাদির চৌধুরীকে যারা চেনেন, তারা জানেন—ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজনীতিতে তিনি শুধু একজন ব্যক্তি নন; তিনি এই জনপদের অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং বহুত্ববাদী সমাজের পক্ষে একটি উচ্চকণ্ঠ রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিনিধিত্ব করেন।
তাই তাঁর কণ্ঠকে স্তব্ধ করার অর্থ শুধু একজন রাজনীতিককে কারাগারে আটকে রাখা নয়। এর রাজনৈতিক অভিঘাত আরও গভীর।
কারণ, মোকতাদির চৌধুরীর কণ্ঠ যতদিন সক্রিয় থাকবে, ততদিন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাটিতে সাম্প্রদায়িকতা, উগ্রবাদ ও প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে একটি দৃশ্যমান রাজনৈতিক প্রতিরোধ থাকবে। সেই কণ্ঠকে যদি দীর্ঘদিন কারাগারের দেয়ালের মধ্যে বন্দী রাখা যায়, তাহলে যারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঐতিহ্যবাহী অসাম্প্রদায়িক চরিত্রকে বদলে দিতে চায়, তাদের পথ অনেকটাই মসৃণ হয়ে যায়।
এই কারণেই ৫ আগস্টের পর তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর বাদী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের রাজনৈতিক-সামাজিক পরিচয়, মামলাগুলোর প্রেক্ষাপট এবং অভিযোগগুলোর প্রমাণ—সবকিছুই নিরপেক্ষভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি।
কেননা, কয়েকটি মামলার বাদী হিসেবে হেফাজতে ইসলামীর নেতাকর্মী বা তাদের ঘনিষ্ঠ বলয়ের ব্যক্তিদের নাম প্রকাশ্যে এসেছে। যেমন, একটি হত্যা মামলার বাদী ছিলেন নবীনগর উপজেলা হেফাজতে ইসলামীর সভাপতি মাওলানা মেহেদী হাসান। আবার ২০২১ সালের হেফাজত-পুলিশ সংঘর্ষে নিহত এক মাদ্রাসাছাত্রের বোনও তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।
অর্থাৎ, মামলাগুলোকে শুধু বিচ্ছিন্ন আইনি ঘটনা হিসেবে দেখলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বৃহত্তর রাজনৈতিক বাস্তবতাটি আড়ালে থেকে যায়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সুরসম্রাট আলাউদ্দিন খাঁর জনপদ। এই মাটি শিল্প, সাহিত্য, সংগীত ও সংস্কৃতির। এই জনপদের পরিচয় কোনো সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িকতার একচ্ছত্র আধিপত্যে নির্ধারিত হতে পারে না।
তাই মোকতাদির চৌধুরীকে ঘিরে আজকের প্রশ্নটি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত মুক্তির প্রশ্ন নয়।
প্রশ্নটি হলো—একজন অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক কণ্ঠকে ২২ মাস কারাগারে রেখে কি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক পরিসরকে অন্য কারও জন্য ফাঁকা করে দেওয়া হচ্ছে?
আর যদি সত্যিই তা হয়ে থাকে, তাহলে মোকতাদিরকে থামানোর এই প্রচেষ্টা নিছক একজন রাজনীতিককে থামানোর প্রচেষ্টা নয়—এটি একটি জনপদের অসাম্প্রদায়িক আত্মাকে দুর্বল করার প্রচেষ্টা।
HRW-এর প্রতিবেদন সেই আশঙ্কাকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আলোচনার টেবিলেও নিয়ে এসেছে।
আমরা কোনো বিচারহীন বন্দিত্ব চাই না। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মুক্তিযুদ্ধের চেতনা চাই—উগ্রবাদের চারণভূমি নয়। অসাম্প্রদায়িকতার কণ্ঠ চাই—কারাগারের নীরবতা নয়।

Supporter of Humanity’s Post

মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।