, মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী।

  • প্রকাশের সময় : ০৮:০১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬
  • ১২ পড়া হয়েছে
শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী।
টাঙ্গাইলের এক জমিদার পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর বাবা আবদুল হামিদ চৌধুরী ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের স্পিকার এবং ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া ‘খান বাহাদুর’ উপাধির অধিকারী।
১৯৬৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে দায়িত্ব নেন।
১৯৭১ সালের মার্চে তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের অধিবেশনে যোগ দিতে জেনেভায় অবস্থান করছিলেন।
২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা ও নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রের মৃ**র খবর জেনে তিনি এক মুহূর্তও দেরি করেননি।
পাকিস্তান সরকারের কাছে পাঠানো পদত্যাগপত্রে তিনি লিখেছিলেন,
​“আমার নিরস্ত্র ছাত্রদের উপর গু** চালানোর পর আমার ভাইস চ্যান্সেলর থাকার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। তাই আমি পদত্যাগ করলাম।”
পদত্যাগ করার পর তিনি আর পাকিস্তান সরকারের সাথে আপস করেননি। মুজিবনগর সরকারের বিশেষ দূত হিসেবে জেনেভা থেকে সোজা লন্ডনে চলে যান। সেখানে বসে তিনি ইউরোপ ও আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে অসামান্য ভূমিকা রাখেন। তাঁর কূটনৈতিক বুদ্ধিমত্তা ও তৎপরতা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বিশাল বিজয় এনে দিয়েছিলো।🖤
​১৯৭১ সালের জুনে লন্ডনে এক প্রেস কনফারেন্সে তিনি পাক হানাদার বাহিনীর বর্বরতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছিলেন,
“যারা আমাদের নারী ও শিশুদের হ** করছে, আমরা কি কখনো তাদের ক্ষমা করতে পারি বা তাদের জঘন্য অপরাধ ভুলে যেতে পারি? অবশ্যই না। এই গণহ**র পর এই দুই অংশের একসঙ্গে টিকে থাকার কোনো উপায় নেই।
বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী যখন লন্ডনে তখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, স্বাধীনতাকামী সাড়ে সাত কোটি মানুষের পক্ষে আন্তর্জাতিক বিশ্বকে জাগ্রত করতে হলে ইউরোপের রাজধানীগুলোতে তীব্র কূটনৈতিক চাপ তৈরি করতে হবে।
​সে সময় লন্ডনে পাকিস্তান সরকারের শক্তিশালী দূতাবাস এবং ব্রিটিশ সরকারের ভেতরেও পাকিস্তানি লবির ভালোই প্রভাব ছিলো। প্রবাসী বাঙালিদের নিয়ে যখনই বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী কোনো প্রতিবাদ সভা, সেমিনার বা লবিংয়ের আয়োজন করতেন, তখনই পাকিস্তানি কূটনীতিবিদরা ভীষণ নড়েচড়ে বসতো।
একদিন লন্ডনে এক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংবাদ সম্মেলনে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী পাকিস্তানি সামরিক জান্তার নির্মম বর্বরতা, ধ**ণ ও গণহ**র দলিলপত্র এবং ছবি বিশ্ব মিডিয়ার সামনে তুলে ধরছেন।
ঠিক সেই সময় পাকিস্তানি দূতাবাসের কিছু গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক প্রতিনিধি সেখানে উপস্থিত হয় এবং তাঁকে হুমকি দিতে শুরু করে, তিনি যেন অবিলম্বে এই “রাষ্ট্রদ্রোহী” কার্যক্রম বন্ধ করেন, না হলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তাঁর পাসপোর্টের কার্যকারিতা শেষ বলে ঘোষণা করা হবে।
​কিন্তু বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ছিলেন আপাদমস্তক একজন নির্ভীক মানুষ। তিনি একটুও না ঘাবড়ে উপস্থিত আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের সামনেই পাকিস্তানি কূটনীতিকদের সেই হুমকির তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি বুক ফুলিয়ে সগর্বে ঘোষণা করেন,
​”যে সরকার তার নিজের দেশের নিরীহ নিরস্ত্র নাগরিকদের নির্বিচারে হ** করে, সেই অবৈধ সরকারের দেওয়া পাসপোর্টের বা হুমকির আমার কোনো পরোয়া নেই! আমার একমাত্র পরিচয় এখন স্বাধীনতাকামী বাংলার কোটি মানুষের মুক্তি সংগ্রাম।”
তিনি বিশ্বাস করতেন বাংলাদেশ হবে একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে ধর্মকে কোনো বিশেষ সংকীর্ণতায় না রেখে ব্যক্তির নিজস্ব চর্চার বিষয় হিসেবে রাখা হবে এবং রাষ্ট্র হবে ধর্মনিরপেক্ষ।
আশির দশকে দেশের সামরিক শাসন ও স্বৈরাচার বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী অত্যন্ত সাহসী এবং অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন।
১৯৮৭ সালের ২ আগস্ট লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরে তাঁর ম*দেহ দেশে ফিরিয়ে এনে টাঙ্গাইলের নাগবাড়ির মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
​একজন শিক্ষক, ভিসি, বিচারপতি, কূটনীতিক ও রাষ্ট্রপতির জীবন পেরিয়ে তিনি হয়ে আছেন আমাদের ইতিহাসের এক ধ্রুবতারা। ইতিহাসের এই মহানায়ককে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর কৃতজ্ঞতা l অ সা ধা র ন’s Post
 মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।
জনপ্রিয়

রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী।

প্রকাশের সময় : ০৮:০১ অপরাহ্ন, শনিবার, ৮ আগস্ট ২০২৬
শনিবার, ০৮ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশের দ্বিতীয় রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী।
টাঙ্গাইলের এক জমিদার পরিবারে তাঁর জন্ম। তাঁর বাবা আবদুল হামিদ চৌধুরী ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদের স্পিকার এবং ব্রিটিশ সরকারের দেওয়া ‘খান বাহাদুর’ উপাধির অধিকারী।
১৯৬৯ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি হিসেবে দায়িত্ব নেন।
১৯৭১ সালের মার্চে তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের অধিবেশনে যোগ দিতে জেনেভায় অবস্থান করছিলেন।
২৫ মার্চ রাতে ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা ও নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্রের মৃ**র খবর জেনে তিনি এক মুহূর্তও দেরি করেননি।
পাকিস্তান সরকারের কাছে পাঠানো পদত্যাগপত্রে তিনি লিখেছিলেন,
​“আমার নিরস্ত্র ছাত্রদের উপর গু** চালানোর পর আমার ভাইস চ্যান্সেলর থাকার কোন যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। তাই আমি পদত্যাগ করলাম।”
পদত্যাগ করার পর তিনি আর পাকিস্তান সরকারের সাথে আপস করেননি। মুজিবনগর সরকারের বিশেষ দূত হিসেবে জেনেভা থেকে সোজা লন্ডনে চলে যান। সেখানে বসে তিনি ইউরোপ ও আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের পক্ষে বিশ্বজনমত গঠনে অসামান্য ভূমিকা রাখেন। তাঁর কূটনৈতিক বুদ্ধিমত্তা ও তৎপরতা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে বিশাল বিজয় এনে দিয়েছিলো।🖤
​১৯৭১ সালের জুনে লন্ডনে এক প্রেস কনফারেন্সে তিনি পাক হানাদার বাহিনীর বর্বরতার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছিলেন,
“যারা আমাদের নারী ও শিশুদের হ** করছে, আমরা কি কখনো তাদের ক্ষমা করতে পারি বা তাদের জঘন্য অপরাধ ভুলে যেতে পারি? অবশ্যই না। এই গণহ**র পর এই দুই অংশের একসঙ্গে টিকে থাকার কোনো উপায় নেই।
বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী যখন লন্ডনে তখন তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, স্বাধীনতাকামী সাড়ে সাত কোটি মানুষের পক্ষে আন্তর্জাতিক বিশ্বকে জাগ্রত করতে হলে ইউরোপের রাজধানীগুলোতে তীব্র কূটনৈতিক চাপ তৈরি করতে হবে।
​সে সময় লন্ডনে পাকিস্তান সরকারের শক্তিশালী দূতাবাস এবং ব্রিটিশ সরকারের ভেতরেও পাকিস্তানি লবির ভালোই প্রভাব ছিলো। প্রবাসী বাঙালিদের নিয়ে যখনই বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী কোনো প্রতিবাদ সভা, সেমিনার বা লবিংয়ের আয়োজন করতেন, তখনই পাকিস্তানি কূটনীতিবিদরা ভীষণ নড়েচড়ে বসতো।
একদিন লন্ডনে এক গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক সংবাদ সম্মেলনে বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী পাকিস্তানি সামরিক জান্তার নির্মম বর্বরতা, ধ**ণ ও গণহ**র দলিলপত্র এবং ছবি বিশ্ব মিডিয়ার সামনে তুলে ধরছেন।
ঠিক সেই সময় পাকিস্তানি দূতাবাসের কিছু গোয়েন্দা ও কূটনৈতিক প্রতিনিধি সেখানে উপস্থিত হয় এবং তাঁকে হুমকি দিতে শুরু করে, তিনি যেন অবিলম্বে এই “রাষ্ট্রদ্রোহী” কার্যক্রম বন্ধ করেন, না হলে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং তাঁর পাসপোর্টের কার্যকারিতা শেষ বলে ঘোষণা করা হবে।
​কিন্তু বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী ছিলেন আপাদমস্তক একজন নির্ভীক মানুষ। তিনি একটুও না ঘাবড়ে উপস্থিত আন্তর্জাতিক সাংবাদিকদের সামনেই পাকিস্তানি কূটনীতিকদের সেই হুমকির তীব্র প্রতিবাদ জানান। তিনি বুক ফুলিয়ে সগর্বে ঘোষণা করেন,
​”যে সরকার তার নিজের দেশের নিরীহ নিরস্ত্র নাগরিকদের নির্বিচারে হ** করে, সেই অবৈধ সরকারের দেওয়া পাসপোর্টের বা হুমকির আমার কোনো পরোয়া নেই! আমার একমাত্র পরিচয় এখন স্বাধীনতাকামী বাংলার কোটি মানুষের মুক্তি সংগ্রাম।”
তিনি বিশ্বাস করতেন বাংলাদেশ হবে একটি আধুনিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যেখানে ধর্মকে কোনো বিশেষ সংকীর্ণতায় না রেখে ব্যক্তির নিজস্ব চর্চার বিষয় হিসেবে রাখা হবে এবং রাষ্ট্র হবে ধর্মনিরপেক্ষ।
আশির দশকে দেশের সামরিক শাসন ও স্বৈরাচার বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী অত্যন্ত সাহসী এবং অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন।
১৯৮৭ সালের ২ আগস্ট লন্ডনে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। পরে তাঁর ম*দেহ দেশে ফিরিয়ে এনে টাঙ্গাইলের নাগবাড়ির মাটিতে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
​একজন শিক্ষক, ভিসি, বিচারপতি, কূটনীতিক ও রাষ্ট্রপতির জীবন পেরিয়ে তিনি হয়ে আছেন আমাদের ইতিহাসের এক ধ্রুবতারা। ইতিহাসের এই মহানায়ককে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা ও গভীর কৃতজ্ঞতা l অ সা ধা র ন’s Post
 মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।