, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শহীদ মেহেরুননেসাকে হ//ত্যার পারে চুলের বেণী দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে টাঙিয়ে রাখে

  • প্রকাশের সময় : এক ঘন্টা আগে
  • ০ পড়া হয়েছে

 

অনলাইন ১২ জুলাই, ২০২৬
১৯৪২ সালের ২০ আগস্ট। কলকাতার খিদিরপুরে আব্দুর রাজ্জাক ও নূরুননেসার ঘরে জন্ম নেয় এক কন্যাসন্তান। নাম রাখা হয় মেহেরুননেসা, আদরের ডাকনাম ‘রানু’। কে জানত, এই রানুর জীবনকাহিনী বাংলার ইতিহাসের পাতায় একাধারে অসীম সাহস ও চরম নৃশংসতার এক বেদনাবিধুর উপাখ্যান হয়ে থাকবে!
মেহেরুননেসার শৈশব খুব সহজ ছিল না। তৎকালীন সমাজের রক্ষণশীলতার কারণে স্কুলে পড়তে পারেননি তিনি। কিন্তু তাতে দমে যাননি তিনি। বাবা ও বড় বোন মোমেনা খাতুনের অনুপ্রেরণায় ঘরে বসেই শুরু হয় তার বিদ্যাভ্যাস। নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে হয়ে ওঠেন স্বশিক্ষিত।
মেহেরুননেসার পরিবার একসময় সচ্ছল ছিল। কলকাতায় তাদের কাপড় ও জুতার দোকান ছিল। কিন্তু ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সাম্প্রদায়িক দা/ঙ্গায় দোকানগুলো পু/ড়িয়ে দেওয়া হয়, লু/ট হয় বাড়ি।
বাবার সঙ্গে শিশু মেহেরুননেসা কয়লার দোকানে কাজ শুরু করেন। সেখানকার অভিজ্ঞতাই পরে তার কয়লাখনির মানুষদের নিয়ে কবিতা লেখার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। তিনি লিখেছিলেন—
‘কয়লা খনির গভীরে দেখেছি জ্বলতে
জ্বালানীবিহীন মহাজীবনের সলতে’
১৯৫০ সালে মেহেরুননেসার পরিবার নামমাত্র মূল্যে কলকাতার বাড়ি বিক্রি করে দেয়। এরপর তারা পাড়ি জমান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে।
ঢাকায় এসে প্রথমে পুরান ঢাকার তাঁতিবাজারে ও পরে মিরপুরে স্থায়ী ঠিকানা হয় তাদের। বাবার অসুস্থতা (ক্যানসার) এবং সংসারের অভাব মেহেরুননেসাকে অল্প বয়সেই পরিণত করে তোলে। ১৯৬৯ সালে তার বাবা মারা যান।
মা ও ছোট দুই ভাই—রফিকুল ইসলাম বাবলু ও শহিদুল ইসলাম টুটুলের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন মেহেরুননেসা। বাংলা একাডেমিতে অনুলিখন, পত্রিকার প্রুফ দেখা ও পরে ফিলিপস কোম্পানিতে চাকরি—এভাবেই চলতে থাকে তার জীবনসংগ্রাম।
এত কঠোর পরিশ্রমের মধ্যেও তার ভেতরকার কবিসত্তা ডালপালা মেলতে থাকে। মাত্র ১০ বছর বয়সে ১৯৫২ সালে ‘দৈনিক সংবাদ’-এর খেলাঘর পাতায় তার প্রথম কবিতা ‘চাষী’ প্রকাশিত হয়। ১৯৫৪ সালে ‘রাজবন্দী’ কবিতায় তিনি দাবি তোলেন—‘আমাদের দাবি মানতে হবে, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। ’
এই কিশোরীর এমন প্রতিবাদী উচ্চারণ পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের নজর এড়ায়নি। পুলিশ তার বাড়িতে হানা দেয়, কিন্তু তার বয়স দেখে অবাক হয়ে শুধু তাকে সতর্ক করে ফিরে যায়। তারপরও ‘বেগম’, ‘ইত্তেফাক’, ‘মাসিক মোহাম্মদী’, ‘কৃষিকথা’সহ বিভিন্ন পত্রিকায় তার লেখা প্রকাশ হতে থাকে।
উনসত্তর, সত্তর থেকে একাত্তরের উত্তাল সময়ে মেহেরুননেসা ছিলেন রাজপথের লড়াকু সৈনিক। ভাষাশহীদদের স্মরণে লিখেছিলেন—
‘শহীদ ভাইরা! স্বর্গ শিখর হোতে
চোখ মেলে দ্যাখো আজ বাংলার
পীচমোড় কালো পথে
তোমাদের যতো উত্তরসূরী
বুলেটের মুখে হাসে।’
মিরপুর অবাঙালি-অধ্যুষিত হওয়ায় নিজেদের অস্তিত্ব ও স্বাধীন সত্তা বজায় রাখার তাগিদে মেহেরুননেসা বন্ধু কাজী রোজীর সঙ্গে মিলে গঠন করেছিলেন ‘অ্যাকশন কমিটি’।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে তার ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। সেখানে অ্যাকশন কমিটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে মেহেরুননেসাও গিয়েছিলেন, দাঁড়িয়েছিলেন জনতার সারিতে।
ওই বছরেরই ২৩ মার্চ পাকিস্তান প্রজাতন্ত্র দিবসে নিজ বাড়ির ছাদে স্বাধীন বাংলার পতাকা ওড়ান তিনি। এই দুঃসাহসই বি/হারী ও রা/জা/কা/রদের নজরে তাকে শ/ত্রু করে তোলে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ, ঘুমন্ত বাঙালির ওপর মানব ইতিহাসের অন্যতম না/র/কীয় গ/ণহ//ত্যা চালায় পাকিস্তান সে/নাবা/হিনী ও তাদের এদেশীয় দো/সররা। সেই কা/লরাত্রির পর মিরপুর এলাকা অবাঙালি ও বি/হারীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
কবি কাজী রোজী তার লেখা ‘শহীদ কবি মেহেরুননেসা’ বইয়ে ২৭ মার্চের সেই দিনটির বর্ণনা দেন। মেহেরুননেসার বাড়িতে তল্লাশি হতে পারে জেনে বন্ধু কাজী রোজী তাকে অন্য কোথাও সরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু দুই ভাই ও মাকে নিয়ে কোথায় যাবেন, সেই চিন্তায় তিনি বাড়ি ছাড়তে পারেননি।
২৭ মার্চ মেহেরুননেসার মিরপুর ৬ নম্বর ডি ব্লকের ১২ নম্বর রোডের ৮ নম্বরে বাড়িতে অবাঙালিরা হা/ম/লা চালায়। প্রথমে তার দুই ভাইয়ের মা/থা কু/পি/য়ে শরীর থেকে আলাদা করে ফেলে। সন্তানদের এভাবে চোখের সামনে ম/র/তে দেখে বিপ/ন্ন মা নূরুননেসা জ্ঞান হারান। এরপর তাকেও কে//টে ফেলে ঘা/ত/কেরা।
এরপর অমানুষিক নির্যাতনের পর মেহেরুননেসাকে হ//ত্যা করা হয়। তার মা/থা শ/রীর থেকে আলাদা করে চুলের বেণী দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে টাঙিয়ে রাখে। চলতে থাকে ঘা/ত/কদের উল্লাস।
এই পুরো হ//ত্যায/জ্ঞের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন মেহেরুননেসার এক অবাঙালি প্রতিবেশী। তিনি বলেছিলেন, এমন না/র/কীয় হ//ত্যায/জ্ঞ তিনি জীবনে কখনো দেখেননি।
তথ্যসূত্র: দ্যা ডেইলী স্টার
সৌজন্যে: বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি সমগ্র

মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।

জনপ্রিয়

শহীদ মেহেরুননেসাকে হ//ত্যার পারে চুলের বেণী দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে টাঙিয়ে রাখে

প্রকাশের সময় : এক ঘন্টা আগে

 

অনলাইন ১২ জুলাই, ২০২৬
১৯৪২ সালের ২০ আগস্ট। কলকাতার খিদিরপুরে আব্দুর রাজ্জাক ও নূরুননেসার ঘরে জন্ম নেয় এক কন্যাসন্তান। নাম রাখা হয় মেহেরুননেসা, আদরের ডাকনাম ‘রানু’। কে জানত, এই রানুর জীবনকাহিনী বাংলার ইতিহাসের পাতায় একাধারে অসীম সাহস ও চরম নৃশংসতার এক বেদনাবিধুর উপাখ্যান হয়ে থাকবে!
মেহেরুননেসার শৈশব খুব সহজ ছিল না। তৎকালীন সমাজের রক্ষণশীলতার কারণে স্কুলে পড়তে পারেননি তিনি। কিন্তু তাতে দমে যাননি তিনি। বাবা ও বড় বোন মোমেনা খাতুনের অনুপ্রেরণায় ঘরে বসেই শুরু হয় তার বিদ্যাভ্যাস। নিজের অদম্য ইচ্ছাশক্তিতে হয়ে ওঠেন স্বশিক্ষিত।
মেহেরুননেসার পরিবার একসময় সচ্ছল ছিল। কলকাতায় তাদের কাপড় ও জুতার দোকান ছিল। কিন্তু ১৯৪৭ সালের দেশভাগের সাম্প্রদায়িক দা/ঙ্গায় দোকানগুলো পু/ড়িয়ে দেওয়া হয়, লু/ট হয় বাড়ি।
বাবার সঙ্গে শিশু মেহেরুননেসা কয়লার দোকানে কাজ শুরু করেন। সেখানকার অভিজ্ঞতাই পরে তার কয়লাখনির মানুষদের নিয়ে কবিতা লেখার অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল। তিনি লিখেছিলেন—
‘কয়লা খনির গভীরে দেখেছি জ্বলতে
জ্বালানীবিহীন মহাজীবনের সলতে’
১৯৫০ সালে মেহেরুননেসার পরিবার নামমাত্র মূল্যে কলকাতার বাড়ি বিক্রি করে দেয়। এরপর তারা পাড়ি জমান তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে।
ঢাকায় এসে প্রথমে পুরান ঢাকার তাঁতিবাজারে ও পরে মিরপুরে স্থায়ী ঠিকানা হয় তাদের। বাবার অসুস্থতা (ক্যানসার) এবং সংসারের অভাব মেহেরুননেসাকে অল্প বয়সেই পরিণত করে তোলে। ১৯৬৯ সালে তার বাবা মারা যান।
মা ও ছোট দুই ভাই—রফিকুল ইসলাম বাবলু ও শহিদুল ইসলাম টুটুলের দায়িত্ব কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন মেহেরুননেসা। বাংলা একাডেমিতে অনুলিখন, পত্রিকার প্রুফ দেখা ও পরে ফিলিপস কোম্পানিতে চাকরি—এভাবেই চলতে থাকে তার জীবনসংগ্রাম।
এত কঠোর পরিশ্রমের মধ্যেও তার ভেতরকার কবিসত্তা ডালপালা মেলতে থাকে। মাত্র ১০ বছর বয়সে ১৯৫২ সালে ‘দৈনিক সংবাদ’-এর খেলাঘর পাতায় তার প্রথম কবিতা ‘চাষী’ প্রকাশিত হয়। ১৯৫৪ সালে ‘রাজবন্দী’ কবিতায় তিনি দাবি তোলেন—‘আমাদের দাবি মানতে হবে, রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। ’
এই কিশোরীর এমন প্রতিবাদী উচ্চারণ পাকিস্তানি গোয়েন্দাদের নজর এড়ায়নি। পুলিশ তার বাড়িতে হানা দেয়, কিন্তু তার বয়স দেখে অবাক হয়ে শুধু তাকে সতর্ক করে ফিরে যায়। তারপরও ‘বেগম’, ‘ইত্তেফাক’, ‘মাসিক মোহাম্মদী’, ‘কৃষিকথা’সহ বিভিন্ন পত্রিকায় তার লেখা প্রকাশ হতে থাকে।
উনসত্তর, সত্তর থেকে একাত্তরের উত্তাল সময়ে মেহেরুননেসা ছিলেন রাজপথের লড়াকু সৈনিক। ভাষাশহীদদের স্মরণে লিখেছিলেন—
‘শহীদ ভাইরা! স্বর্গ শিখর হোতে
চোখ মেলে দ্যাখো আজ বাংলার
পীচমোড় কালো পথে
তোমাদের যতো উত্তরসূরী
বুলেটের মুখে হাসে।’
মিরপুর অবাঙালি-অধ্যুষিত হওয়ায় নিজেদের অস্তিত্ব ও স্বাধীন সত্তা বজায় রাখার তাগিদে মেহেরুননেসা বন্ধু কাজী রোজীর সঙ্গে মিলে গঠন করেছিলেন ‘অ্যাকশন কমিটি’।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান রেসকোর্স ময়দানে তার ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। সেখানে অ্যাকশন কমিটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে মেহেরুননেসাও গিয়েছিলেন, দাঁড়িয়েছিলেন জনতার সারিতে।
ওই বছরেরই ২৩ মার্চ পাকিস্তান প্রজাতন্ত্র দিবসে নিজ বাড়ির ছাদে স্বাধীন বাংলার পতাকা ওড়ান তিনি। এই দুঃসাহসই বি/হারী ও রা/জা/কা/রদের নজরে তাকে শ/ত্রু করে তোলে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ, ঘুমন্ত বাঙালির ওপর মানব ইতিহাসের অন্যতম না/র/কীয় গ/ণহ//ত্যা চালায় পাকিস্তান সে/নাবা/হিনী ও তাদের এদেশীয় দো/সররা। সেই কা/লরাত্রির পর মিরপুর এলাকা অবাঙালি ও বি/হারীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়।
কবি কাজী রোজী তার লেখা ‘শহীদ কবি মেহেরুননেসা’ বইয়ে ২৭ মার্চের সেই দিনটির বর্ণনা দেন। মেহেরুননেসার বাড়িতে তল্লাশি হতে পারে জেনে বন্ধু কাজী রোজী তাকে অন্য কোথাও সরে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু দুই ভাই ও মাকে নিয়ে কোথায় যাবেন, সেই চিন্তায় তিনি বাড়ি ছাড়তে পারেননি।
২৭ মার্চ মেহেরুননেসার মিরপুর ৬ নম্বর ডি ব্লকের ১২ নম্বর রোডের ৮ নম্বরে বাড়িতে অবাঙালিরা হা/ম/লা চালায়। প্রথমে তার দুই ভাইয়ের মা/থা কু/পি/য়ে শরীর থেকে আলাদা করে ফেলে। সন্তানদের এভাবে চোখের সামনে ম/র/তে দেখে বিপ/ন্ন মা নূরুননেসা জ্ঞান হারান। এরপর তাকেও কে//টে ফেলে ঘা/ত/কেরা।
এরপর অমানুষিক নির্যাতনের পর মেহেরুননেসাকে হ//ত্যা করা হয়। তার মা/থা শ/রীর থেকে আলাদা করে চুলের বেণী দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে টাঙিয়ে রাখে। চলতে থাকে ঘা/ত/কদের উল্লাস।
এই পুরো হ//ত্যায/জ্ঞের প্রত্যক্ষদর্শী ছিলেন মেহেরুননেসার এক অবাঙালি প্রতিবেশী। তিনি বলেছিলেন, এমন না/র/কীয় হ//ত্যায/জ্ঞ তিনি জীবনে কখনো দেখেননি।
তথ্যসূত্র: দ্যা ডেইলী স্টার
সৌজন্যে: বাংলাদেশের দুষ্প্রাপ্য ছবি সমগ্র

মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।