
Somenath Sengupta’s Post
“শুধুই তো ডাল-ভাত-তরকারি,শুক্তো খেয়ে আর সম্তান উৎপাদন করে জীবন চলে না, জীবনের সঙ্গে রক্তের সঙ্গে, ছবি-গান, মূর্তির সম্পর্ক, জলের সঙ্গে জীবনের সম্পর্কের মতোই৷”
– রামকিঙ্কর বেইজ।
রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের চিঠি এসেছে কিভাবে শান্তিনিকেতনে যেতে হবে, কোন রাস্তা,কী ট্রেন, ঠিকানা ইত্যাদি। জেনারেল লাইব্রেরির উপরতলায় কলাভবনে তিনি নিজেই সঙ্গে করে নিয়ে গিয়ে নন্দলাল বসুর সাথে রামকিঙ্করের পরিচয় করিয়ে দিলেন। বলিষ্ঠ চেহারার মানুষ, গায়ে সিল্কের পাঞ্জাবি,পরনে ধুতি। রামকিঙ্করের ছবি দেখতে চাইলেন নন্দলাল বসু, রামকিঙ্কর ছবি দেখালেন।
বললেন, “তুমি সবই জানো আবার এখানে কেন ?” একটু ভেবে বললেন, “আচ্ছা দু-তিন বছর থাকো তো।”
সেই দু-তিন বছর আর শেষ হয় নি। সুইস টেন্টে মাথায় ভিজে তোয়ালে জড়িয়ে মাস্টার মশাই নন্দলাল বসু বসে তাঁর ছাত্র সহকর্মীর কাজ দেখছেন আর মাঝেমধ্যে ডাকছেন-
‘”একটু ছায়ায় বসে একটা বিড়ি খেয়ে যাও হে কিঙ্কর”।
মাস্টারমশাইয়ের প্রতি রামকিঙ্কর সর্বদা শ্রদ্ধাশীল, বলেছেন তাঁর সাহচর্যে এসে দেখলাম কী অদ্ভুত শিল্পী। রামকিঙ্করের কথায় আমাদের আচার্যদেব নন্দলাল বসু ছিলেন বিশ্বকর্মার বরপুত্র, তাঁর সান্নিধ্যে এসে আমরা পরম ধন্য হয়েছি।
বাঁকুড়ার যুগীপাড়ায় ১৯০৬সালের ২৫ মে রামকিঙ্করের জন্ম। পিতা চণ্ডীচরণ বেইজ, মায়ের নাম সম্পূর্ণা। আর এক বিখ্যাত শিল্পী যামিনী রায়ের বাড়ি ছিল পাশের গ্ৰাম বেলেতোড়ে। রামকিঙ্কর বেইজের পিতৃদেব ক্ষৌরকাজ করে বেলা তিনটের সময় বাজারে যেতেন তরিতরকারি কিনতে,চাল-ডাল অবশ্য যজমানিদের বাড়ি থেকে পাওয়া যেত৷ বোঝা যায় ছোটবেলায় তাঁর বাড়ির আর্থিক অবস্থা ছিল খুব খারাপ,অত্যন্ত দরিদ্র অবস্থার মধ্যে কেটেছে৷ ছোটবেলায় পড়াশোনা করাটা রামকিঙ্করের খুব পছন্দ ছিল না। দাদা রামপদ বেইজ, মাটির মেঝেতে খড়ি দিয়ে অ আ ক খ লিখে দিয়ে অনুজের হাতে খড়িটি দিয়ে বলতেন এর ওপর বুলিয়ে দাও। ছোট্ট রামকিঙ্করের মন কিন্তু দেওয়ালে ঝোলানো একটা ছবির দিকে তাকিয়ে থাকত কখন ওই রকম আঁকতে পারবে সেই আশায়। এক টুকরো কাগজ কিংবা খড়ি দেওয়া সাদা দেওয়ালে আঁকার চেষ্টা চলত। রঙের প্রয়োজন ছিল, গাছের পাতার রস,বাটনা -বাটা শিলের হলুদ, মেয়েদের পায়ের আলতা,মুড়ি -ভাজা খোলার চাঁছা ভুসোকালি এইসব দিয়ে রঙের প্রয়োজন মেটাতেন। পিতার আর্থিক অবস্থা ভাল নয় তবুও স্কুলে বিনা বেতনে পড়তে পারতেন নিজের অঙ্কনগুণের জন্য।
সহজলভ্য কম দামের জিনিস দিয়ে ছবি আঁকা অথবা পতুল গড়ার কাজ করতেন কিশোর কিঙ্কর৷ বাবা ছেলের তৈরি ওই সব জিনিস নিয়ে মেলায় যেতেন,দু’চারটে বিক্রি হত,দু’পয়সা,চার পয়সা হাতে আসত৷ ছেলে-বাবা দু’জনের মুখ ভরে উঠত হাসিতে৷ ছোটবলা থেকে ঝোঁক ছবি আঁকার,অনন্ত সুত্রধর একজন জাত শিল্পী,তিনি নানা রকমের প্রতিমা বানাতেন,ছোট্ট কিঙ্কর দাঁড়িয়ে সে কাজ দেখতেন৷ বালকের একাগ্রতা দেখে অনন্ত মিস্ত্রি দিলেন তাঁকে কাজে লাগিয়ে৷ প্রতিভাবানদের প্রতিভা সারাজীবন নিশ্চয়ই চাপা থাকবে না,কারও না কারও চোখে পড়বে,এক্ষেত্রে সহায় হয়েছিলেন প্রবাসী পত্রিকার সম্পাদক রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়৷ তিনি আঠারো বছরের তরুণ রামকিঙ্কর কে বলেছিলেন তুমি কি শান্তিনিকেতনে নন্দবাবুর কাছে আঁকা শিখবে? ছেলেটি এক কথায় রাজি হয়ে গেল৷ রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতনে এসে নিজেকে নতুন করে আবিস্কার করলেন৷ হয়েছিলেন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাস্কর৷
শান্তিনিকেতনে এসে প্রথম যখন চাকরি হয়। গাঁয়ের লোকেরা রামকিঙ্করের বাবা-মা’কে ভয় ধরিয়ে দেয় ছেলের বিষয়ে। সত্যিই ছেলের বিয়ের বয়স হয়েছে একটা বিয়ে দেওয়ার প্রয়োজন। অভিভাকরা পাত্রী পছন্দ করে রেখেছিলেন, ছেলে চটে গিয়ে বাবাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন বিয়ের কথা হলে তিনি আর বাড়ি মুখো হবেন না। রামকিঙ্কর বেইজের বিয়ের গল্প ওখানেই ইতি,নিজে বলেছেন বিয়ে টিয়ে করবেন এসব ইচ্ছে তাঁর কোনওকালেই ছিল না। রামকিঙ্কর হয়েছিলেন কলাভবনের ভাস্কর্য বিভাগের প্রথম অধ্যাপক৷ তাঁর কাজ দেখে একদিন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ডেকে বলেছিলেন আমার সব জায়গা ভরে দে তোর কাজ দিয়ে৷
১৯৩৮সালে ভরা গ্রীষ্মে তাঁর বিখ্যাত ‘সাঁওতাল পরিবার’-এর বিরাট কংক্রিকেটের প্যানেলটি বানাতে শুরু করেন শান্তিনিকেতনে৷ সেই সময়ে রামকিঙ্করের স্মৃতিচারণায় তাঁর ছাত্র-শিল্পী প্রভাস সেন ‘দেশ’ পত্রিকায় বলেছেন ‘গ্রীষ্মের আগুন ছড়ানো আকাশের নিচে গ্লাভসপরা ডান হাত দিয়ে কাঁকর মেশানো সিমেন্ট বালি ছুড়ে ছুড়ে মূর্তিতে গঠন আনছেন,বাঁ হাতে তরকারি জড়ানো রুটি,মাথায় বাঁশ পাতার টোকা,আর মুখে উদাত্ত স্বরে গান ‘রস নাই রস নাই….,..’৷ রামকিঙ্কর একবার এক বক্তৃতায় বলেছিলেন —
“শুধুই তো ডাল-ভাত-তরকারি, শুক্তো খেয়ে আর সম্তান উৎপাদন করে জীবন চলে না, জীবনের সঙ্গে রক্তের সঙ্গে, ছবি-গান, মূর্তির সম্পর্ক, জলের সঙ্গে জীবনের সম্পর্কের মতোই৷”
শেষ জীবনে অন্নপূর্ণা সিরিজের ছবিতে তুলে ধরেছিলেন অনাহারে কষ্ট পাওয়া মানুষের কথা,অবলা পশু আর সাধারণ মানুষের বেদনার কথা৷
১৯৭৭সালে বিশ্বভারতীর সর্বোচ্চ সম্মান ‘দেশিকোত্তম’ উপাধি পেয়েছেন। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডি-লিট দেয়৷ সারাজীবনে একশো কুড়ি-পঁচিশটির মতন ভাস্কর্য তৈরি করেছেন,আর তেলরঙ,জলরঙ, মিলিয়ে দুশো সাতাশটি ছবি এঁকেছেন,সবমিলিয়ে একথা নতুন করে বলার নিশ্চয়ই প্রয়োজন নেই তিনি ছিলেন ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাস্কর, তিনি রামকিঙ্কর বেইজ৷
মা যখন মারা যান তখন শান্তিনিকেতনে রামকিঙ্কর কিছু ভাস্কর্য নিয়ে ব্যস্ত। যখন মায়ের অবস্থা খারাপ তখন ও তাঁকে দেখতে যেতে পারেন নি। রামকিঙ্কর বলেছেন একজন শিল্পী যতক্ষণ সৃষ্টির নেশায় মাতাল হয়ে থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত মৃত্যু কোনোভাবেই তাঁকে স্পর্শ করতে পারে না। সত্যি কি তাই!
বহুবার বিদেশ যাওয়ার আমন্ত্রণ পেয়েছেন, যাননি। রামকিঙ্কর বলতেন কি হবে গিয়ে ? দেশ ছেড়ে লাভ কী ? আমার ছবি আঁকা, মূর্তি গড়ার যা প্রেক্ষাপট যারা অনুসঙ্গ তারা সব এখানেই আছে। বিদেশ গিয়ে শিখবই বা কী ? ছবি আঁকা বা মূর্তি গড়া?সে তো নিজের এলেমের প্রশ্ন। তারজন্য দরজায় দরজায় ভিক্ষে করা কেন? অনেকেই অবশ্য যান। অবন ঠাকুরও বিদেশে যাননি, যামিনী রায় যাননি হ্যাঁ রামকিঙ্করও যাননি।
(তথ্যসূত্র : স্রষ্টা ও সৃষ্টি,বিশ্বের শ্রেষ্ঠ শিল্পীদের শিল্পকর্ম ও জীবনকথা – নিখিলেশ বন্দ্যোপাধ্যায়,
রামকিঙ্কর বেইজ, আমি চাক্ষিক, রূপকার মাত্র,
রচনা, বক্তৃতা চিঠিপত্র সাক্ষাৎকার,
সংকলন ও বিন্যাস : সন্দীপন ভট্টাচার্য)





















