
অনলাইন রবিবার, ১১ অক্টোবর ২০২৬
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এক সভায় গত বুধবার সচিবালয় স্থানান্তরের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সভায় গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, গণপূর্ত অধিদপ্তর ও স্থাপত্য অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পরদিনই সচিবালয় স্থানান্তরের একটি প্রকল্প বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অন্তর্ভুক্ত করতে পরিকল্পনা কমিশনকে চিঠি দিয়েছে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। আগামী সপ্তাহে পরিকল্পনা কমিশনে এই প্রকল্পের ওপর একটি আন্তমন্ত্রণালয় সভা হওয়ার কথা রয়েছে।
জানতে চাইলে বৈঠকে উপস্থিত স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি আসিফুর রহমান ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, সচিবালয়কে শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তরের বিষয়ে বৈঠকে স্থাপত্য অধিদপ্তর থেকে তিনটি আলাদা নকশা তুলে ধরা হয়। সেখান থেকে একটি নকশা চূড়ান্তে সবাই একমত হন।
স্থপতি আসিফুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, এ নকশার ওপর ভিত্তি করে প্রকল্পটি তৈরি করা হবে। নকশাগুলো জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকেও উপস্থাপন করা হবে।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বেশ কয়েকবার শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
২০১৫ সালে সচিবালয় সরাতে ২ হাজার ২০৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বলা হয়, ২০১৮ সালের জুন মাসের মধ্যে কাজ শেষ হবে।
জিয়া উদ্যানের উত্তর ও বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রের পশ্চিম দিকে, যেখানে প্রতিবছর বাণিজ্য মেলা হয়, সেখানেই ৩২ একর জমির ওপর সচিবালয় তৈরি করার কথা তখন বলা হয়েছিল। আরও বলা হয়েছিল, জাতীয় সংসদ ভবনের স্থপতি লুই আই কানের মূল পরিকল্পনা অনুসারে এ সচিবালয় হচ্ছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে চার লাখ ডলার খরচ করে মার্কিন স্থপতি লুই আই কানের করা জাতীয় সংসদ ভবনসহ পুরো শেরেবাংলা নগরের মূল নকশা দেশে আনা হয়েছিল। নকশা অনুযায়ী, শেরেবাংলা নগরে ১৪ তলা ভিতের ওপর ৯ তলাবিশিষ্ট ৪টি মূল ভবন করার কথা ছিল।
অবশ্য পরে সচিবালয় স্থানান্তর হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে সচিবালয়কে সরানো নিয়ে আলোচনা হয়নি।
নতুন বিএনপি সরকারের আমলে সচিবালয়ের ভেতর ২১ তলা একটি ভবন করতে সাড়ে ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্প নেওয়া হয়। গত ২৬ এপ্রিল একনেক সভায় এ প্রকল্পটি উত্থাপন করা হলে তা অনুমোদন না দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়।
সভায় সচিবালয় শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তর করা যায় কি না, তা পর্যালোচনা করতে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও স্থাপত্য অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
৩,৫০০ কোটি টাকার প্রকল্প
সচিবালয়কে কোথায় স্থানান্তর করা যায়, তা নিয়ে গত পাঁচ মাসে অংশীজনদের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সম্ভাব্য প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
পাঁচ মাস ধরে পর্যালোচনা করে গত বুধবার প্রধানমন্ত্রীর সামনে একটি প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়। স্থাপত্য অধিদপ্তরের তিনটি দল আলাদা তিনটি নকশা প্রধানমন্ত্রী সামনে তুলে ধরেন। সভায় একটি নকশা চূড়ান্ত করা হয়। ওই নকশার ওপর ভিত্তি করে প্রকল্প তৈরি করতে গণপূর্ত অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়।
নতুন সড়কসহ যা যা হবে
প্রস্তাবিত নকশার আলোকে সচিবালয়ের চারপাশে সার্কুলার বা চক্রাকার সড়ক হবে। বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের পেছন দিয়ে একটি সড়ক নির্মাণ করা হবে। এই সড়ক জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের (সাবেক গণভবন) পাশ দিয়ে মিরপুর সড়কে উঠবে।
জাদুঘরের পাশে স্কুল, হাসপাতাল, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে। সড়কটি করতে গেলে এসব স্থাপনা সরিয়ে ফেলতে হতে পারে।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, বিজয় সরণি থেকে যে সড়কটি আগারগাঁও হয়ে মিরপুর ১০ নম্বরের দিকে গেছে, সে সড়কের নিচ দিয়ে একটি পাতাল সড়ক করার আলোচনা চলছে। ওপরের সড়ক দিয়ে প্রস্তাবিত সচিবালয় ঢোকা যাবে, নিচের সড়ক দিয়ে মিরপুর সড়কে যাওয়া যাবে। এ জন্য আলাদা একটি প্রকল্প নেওয়া হতে পারে।
প্রস্তাবিত নকশা অনুযায়ী, সচিবালয়ে প্রতিটি ভবন হবে ১২ তলা। জাতীয় সংসদের সঙ্গে মিল রেখে ভবনগুলো করা হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তরের পর মূল চ্যালেঞ্জ হবে যানজট। যদিও ওই এলাকায় যানজট মুক্ত রাখতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়।
বর্তমান সচিবালয় অপ্রতুল জায়গার কারণে কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক কাজ করতে সমস্যা হয়। সচিবালয়ের কারণে আশপাশের ব্যাপক যানজট হয়। এতে কর্মঘণ্টা নষ্ট হয়। বর্তমান সচিবালয়ে জায়গার পরিমাণ ১৭ লাখ বর্গফুট। প্রস্তাবিত সচিবালয়ের নকশায় জায়গার পরিমাণ হবে ৩১ লাখ বর্গফুট।
বাণিজ্য মেলার জায়গাটি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের। ২০২১ সালে বাণিজ্য মেলা সরিয়ে পূর্বাচলে নেওয়া হয়। এখন মাঠ খালি পড়ে থাকে। খালি মাঠে পার্ক বানাতে চার বছর আগে ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প নিয়েছিল গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। যদিও সে প্রকল্প আলোর মুখ দেখেনি।
‘যানজটের অবস্থা ভয়াবহ হতে পারে’
গণপূর্ত মন্ত্রণালয় মনে করছে, এভাবে জায়গাটি খালি রাখলে কেউ না কেউ দখল করে নেবে। তখন চাইলেও কিছু করা যাবে না। সচিবালয় স্থানান্তর করলে কেউ আর জায়গাটা দখল করতে পারবে না।
স্থপতি ইকবাল হাবিব মনে করেন, ১৯৬৯ সালে করা লুই কানের নকশার আলোকে ২০২৬ সালে এসে সচিবালয় শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তর ঠিক হবে না। তাঁর মতে, মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ার মতো বাংলাদেশেও সচিবালয়কে স্থানান্তরের চিন্তা করতে হবে ভিন্ন কোথাও।
ইকবাল হাবিব বলেন, ইতিমধ্যে শেরেবাংলা নগর ও আগারগাঁওয়ে অনেক সরকারি স্থাপনা গড়ে উঠেছে। এমনিতেই সেখানে যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে। নতুন করে সচিবালয় হলে সেখানে যানজটের অবস্থা ভয়াবহ হতে পারে।





















