
অনলাইন শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
সুমন জাহিদের কথা নিশ্চয়ই ভুলে গিয়েছেন অনেকেই? শহীদ বুদ্ধিজীবী সেলিনা পারভীনের একমাত্র সন্তান। একটা মৃত্যু কিভাবে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিপক্ষে ভাগ হয়ে যেতে পারে, খুন নাকি আত্মহত্যা, সেই রহস্যে দেশবাসী কিভাবে বিমূঢ় হয়ে যেতে পারে এবং একটা আত্মহত্যার পেছনের নায়কেরা কিভাবে মুক্তিযুদ্ধকে ঢাল বানিয়ে আলোচনার বাইরে থাকতে পারেন, সুমন জাহিদের মৃত্যু ছিল তার একটা আদর্শ দৃষ্টান্ত।
এর সাথে গণমাধ্যমেরও একটা গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ছিল।
গণমাধ্যম নিয়ে আমি কোন বিশেষজ্ঞ না। রাজনীতি, ইতিহাস, রাষ্ট্রবিজ্ঞান কিছু বুঝি, কিছু মূলনীতিকে ধারণ করার চেষ্টা করি। সেই জায়গা থেকেই প্রয়াত সাংবাদিক তৌফিক ইমরোজ খালিদী প্রসঙ্গে আবারও কিছু কথা বলি। আমার আগের লেখাতেও তার কৃতিত্বের একটা স্বীকৃতির পাশাপাশি বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ ওই সময়টিতে তার নেতিবাচক ভূমিকা যে দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের সাংবাদিকতার বিশাল ক্ষতি করেছে, সেটা আবারও একভাবে বলবার চেষ্টা করবো।
কারণ তারই রেশ এখনও গণমাধ্যমে প্রবলভাবেই রয়ে গেছে।
মানুষ নিরপেক্ষ না, এটা তো সুনিশ্চিত! কিন্তু আমার সব সময়েই মনে হয়, পেশাগত জায়গা থেকে একটা সীমারেখা সকল পেশায় থাকা উচিত। সেটা এই যে, চিকিৎসক ভিন্ন মতাদর্শের মানুষকে চিকিৎসা দিতে বাধ্য থাকবেন। নিজ মতাদর্শের মানুষ বড় ধরনের অপরাধ করলে গণমাধ্যমকর্মী তা লুকোবেন না।
এর বাইরেই বিশাল দুনিয়া যেখানে আপনি আপনার বক্তিগত মতাদর্শই প্রয়োগ করবেন– গণমাধ্যমে আপনি লিখবেন আপনার পক্ষের যুক্তি নিয়ে, চিকিৎসক হিসেবে আপনি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাকে নিজের মত ঢেলে সাজাবেন।
এই ন্যুনতম নাগরিক বোঝাপড়াটা না থাকলে সহিংসতা সেই দেশের নিয়তি হয়। প্রত্যেকে নিজের মত করে বুদ্ধিবৃত্তিক ও মাঠের লাঠিয়াল জোগাড় করায় ব্যস্ত হয়।
এবার আবার আসি সুমন জাহিদের কথায়। ১৫ জুন, ২০১৮ সালে তিনি রেললাইনে আত্মহত্যা করেন। আইন শৃঙ্খলা বাহিনী একদম শুরু থেকেই বিষয়টা নিয়ে নিশ্চিত ছিল। অনেকগুলো পত্রিকাতেও প্রতক্ষদর্শী শিশুদের বিবরণ এসেছে।
বাংলাদেশের অন্তত দু্টি বড় পত্রিকা এই আত্মহত্যাকে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মামলায় সাক্ষী হিসেবে থাকার কারণে তাদের হাতে খুন হিসেবে দেখাতে চাওয়া ব্যক্তিদের বিবৃতিতে বেশ প্রাধান্য দিয়েছিল। এই দুটি পত্রিকায় কোন প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ কখনোই নেয়া হয়নি।
অথচ সুমন জাহিদের ঘনিষ্ঠরা সকলেই জানতেন, কয়েকমাস ধরে সুমন একটা ভয়াবহ সংকটে পড়েছিলেন।
সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দীন খান আলমগীর একটা ব্যাংক বানিয়েছিলেন, ফার্মার্স ব্যাংক নামে। সেখানে সুমন যোগ দেন। মা মারা যাবার পর সুমন এতিমখানাতে মানুষ হয়েছিলেন। কয়েকজন আত্মীয়ের কাছ থেকে বেশ বড় অংকের টাকা নিয়ে তিনি ওই সময়ে ফার্মার্স ব্যাংকে জমা দেন।
দ্রুতই মহিউউদ্দীন আলমগীর সহ অন্যরা ফার্মার্স ব্যাংকের সব টাকা পয়সা আত্মসাৎ করেন।
পানিতেই পরেছিলেন সুমন জাহিদ। চাকরি যেমন নেই, তেমনি আত্মীয়দের চাপ। টাকার অংকটা কয়েক কোটির মত।
সুমন জাহিদের আত্মহত্যা আসলে মুক্তিযুদ্ধ ব্যবসায়ের একটা প্রত্যক্ষ ফল ছিল। মুক্তিযুদ্ধের নাম নিয়ে একটা দল দেশটাকে লুণ্ঠন করছিল। অথচ দেশের বহু বুদ্ধিজীবী মুক্তিযুদ্ধের গায়ে আঁচড় লাগে, এই ভয়ে এই সব বিষয় নিয়ে মুখ খুলছিলেন না। ফলাফল ছিল সুমন জাহিদদের মরে যাওয়া।
এই একই ব্যকরণ তিন তিনটা জালিয়াতির নির্বাচনেও গণমাধ্যমের ভুমিকার বেলাতে কাজ করেছে। সত্য জানি সবাই, বলা যাবে না, কারণ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষে দেশটা ভাগ করা হয়েছে।
এই লাঠিয়ালবৃত্তির সাংবাদিকতা দেশে চলেছে। সাধারণ গণমাধ্যমকর্মীদের দায় এতে সামান্যই। নীতি নির্ধারকরাই ছিলেন কুশীলব।
আমি সে সময়ে দুটো লেখা লিখেছিলাম। একটা খুঁজে পাইনা।
অন্য লেখাটা ফেসবুকে পেলাম। সেটা দিচ্ছি তুলে এখানে, দেখুন, পুরো বাংলাদশের সাথে কোন মিল পান কি না:
“ফারমার্স ব্যাঙ্কের উদ্যোক্তাদের বহু আগে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনলে, আমানতকারীদের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করলে শহীদ সেলিনা পারভীনের পুত্র সুমন জাহিদকে হয়তো ট্রেনের নিচে গলা পেতে দিয়ে আত্মহত্যা করতে হতো না।
টং ঘরের চায়ের দোকানি নারী জানান, চারদিন তিনি চা খেয়েছেন ওই দোকানে; জানি না তিনি আসন্ন মৃত্যুর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন কি না।
বিকল্পগুলো ভেবেছিলেন কী? তার মা ছিলেন সংগ্রামী নারী, তার রক্তের বিনিময়ে অর্জিত দেশটিতে মুক্তিযুদ্ধের নামেই তো লাখো মানুষকে এইভাবে পথে বসানো হয়েছে। সুমন জাহিদ কি বসতে পারতেন একটা প্রতিবাদী অনশনে? কিছুটা ঝাঁকুনি দিতে পারতেন সমাজকে, রাষ্ট্রকে? অথবা দীর্ঘ জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত মানুষটি কাউকে আর বিব্রত করতে চাননি? তাই বিদায় নিলেন যে আ্ত্মীয়দের অর্থ তিনি বিনিয়োগ করেছিলেন এই কারবারে, তাদের ডুবিয়ে এবং নিজেকেেও ফাঁকি দিয়ে।
চা দোকানি বলেছেন চুপচাপ লোক, অথচ মৃত্যুর আগে আগে টঙের দোকানের উষ্ণ চা খেতে খেতেও তিনি গল্প করেছিলেন রেললাইনের পাশে খেলারত তিনটি শিশুর সাথে, যাদের একজনের নাম নার্গিস নাকি নাদিয়া। “নাদিয়া বলছিল, ‘আমি কেমন আছি তা জানতে চান লোকটা। বলি, ভালো আছি।” ট্রেনের আওয়াজ পেয়ে সুমন জাহিদ ঘোরগ্রস্তের মত মাটিতে বসে পড়েন, জানতে চান সত্যি ট্রেন আসতেছে কি না! তারপর লোহার পাতে আড়াআড়ি শয্যা নিলে তিন শিশু ছুটে যায়, নার্গিস তার পা ধরে টেনে সরিয়ে আনার চেষ্টা করে।
প্রতীকি দৃশ্যের মত। মহিউদ্দিন খান আলমগীরের নেত্রী হাসিনা। শত পরিবারে ঈদের দিনেও মুখে তাই হাসি না, কান্না। আর খুনী এত শক্তিমান, নিহত তাই স্বেচ্ছায় নিজেই মৃত্যুফাঁস পড়ে নেন।
আর শিশুরা তাকে জাগিয়ে তুলবার, জীবনে টেনে আনবার চেষ্টা করে যায় দুর্বল অপুষ্ট হাতে।”
আদর্শ না, দলবাজি কিভাবে মুক্তিযুদ্ধকে নিছক পণ্যে পরিণত করতে পারে, গণমাধ্যম পরিণত হতে পারে ভয়াবহ হাতিয়ারে– সুমন জাহিদ তার একটা দৃষ্টান্ত।
আমি এরপর বহুবার তার বনধুদের কাছে অনুরোধ করেছি, পোস্টমর্টেম প্রতিবেদন এলে যেন তারা শাহবাগে একটা আয়োজন করেন। সুমন জাহিদ খুন কিংবা আত্মহত্যা– যেটাই করুন না কেন, আমাদের তো বলবার কিছু আছে দুটো ঘটনাতেই।
প্রয়াত সুমন জাহিদকে তার বন্ধুরাও ত্যাগ করেছিলেন, কারণ তাতে মুক্তিযুদ্ধ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
শহীদ বুদ্ধিজীবী সেলিনা পারভীনের সন্তানও এই দেশে আরেকবার স্বেচ্ছায় শহীদ হলেন।
সুমন জাহিদকে নিয়ে লেখা, ১৬ জুন, ২০১৮।
ফারমার্স ব্যাঙ্কের উদ্যোক্তাদের বহু আগে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনলে, আমানতকারীদের ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করলে শহীদ সেলিনা পারভীনের পুত্র সুমন জাহিদকে হয়তো ট্রেনের নিচে গলা পেতে দিয়ে আত্মহত্যা করতে হতো না।
টং ঘরের চায়ের দোকানি নারী জানান, চারদিন তিনি চা খেয়েছেন ওই দোকানে; জানি না তিনি আসন্ন মৃত্যুর প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন কি না।
বিকল্পগুলো ভেবেছিলেন কী? তার মা ছিলেন সংগ্রামী নারী, তার রক্তের বিনিময়ে অর্জিত দেশটিতে মুক্তিযুদ্ধের নামেই তো লাখো মানুষকে এইভাবে পথে বসানো হয়েছে। সুমন জাহিদ কি বসতে পারতেন একটা প্রতিবাদী অনশনে? কিছুটা ঝাঁকুনি দিতে পারতেন সমাজকে, রাষ্ট্রকে? অথবা দীর্ঘ জীবনযুদ্ধে ক্লান্ত মানুষটি কাউকে আর বিব্রত করতে চাননি? তাই বিদায় নিলেন যে আ্ত্মীয়দের অর্থ তিনি বিনিয়োগ করেছিলেন এই কারবারে, তাদের ডুবিয়ে এবং নিজেকেেও ফাঁকি দিয়ে।
চা দোকানি বলেছেন চুপচাপ লোক, অথচ মৃত্যুর আগে আগে টঙের দোকানের উষ্ণ চা খেতে খেতেও তিনি গল্প করেছিলেন রেললাইনের পাশে খেলারত তিনটি শিশুর সাথে, যাদের একজনের নাম নার্গিস নাকি নাদিয়া। “নাদিয়া বলছিল, ‘আমি কেমন আছি তা জানতে চান লোকটা। বলি, ভালো আছি।” ট্রেনের আওয়াজ পেয়ে সুমন জাহিদ ঘোরগ্রস্তের মত মাটিতে বসে পড়েন, জানতে চান সত্যি ট্রেন আসতেছে কি না! তারপর লোহার পাতে আড়াআড়ি শয্যা নিলে তিন শিশু ছুটে যায়, নার্গিস তার পা ধরে টেনে সরিয়ে আনার চেষ্টা করে।
প্রতীকি দৃশ্যের মত। মহিউদ্দিন খান আলমগীরের নেত্রী হাসিনা। শত পরিবারে ঈদের দিনেও মুখে তাই হাসি না, কান্না। আর খুনী এত শক্তিমান, নিহত তাই স্বেচ্ছায় নিজেই মৃত্যুফাঁস পড়ে নেন।
আর শিশুরা তাকে জাগিয়ে তুলবার, জীবনে টেনে আনবার চেষ্টা করে যায় দুর্বল অপুষ্ট হাতে।
Firoz Ahmed’s Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।





















