
Pavel Rahman’s Post
স্মৃতিটুকু থাক – ৭৪ শেখহাসিনা
আনন্দবাজারের সেই ছবিটি! ‘গৃহবন্দী শেখ হাসিনা’হাসিনা
Pavel Rahman
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের দিনগুলোর একদিন। ১৯৮৭ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে বনানীর আণবিক শক্তি কমিশনের স্টাফ কোয়ার্টারে হাজির হলাম আমি আর বেবি আপা। বেবি আপা, যিনি ‘বেবি মওদুদ’ নামেই সর্বাধিক পরিচিত।
একতলার ছোট্ট দুই রুমের ফ্ল্যাটে থাকতেন পরমাণু বিজ্ঞানী ড. এম. এ. ওয়াজেদ মিয়া ও তাঁর সহধর্মিণী শেখ হাসিনা। তাঁদের দুই সন্তান—পুতুল ও জয়—তখন দেশের বাইরে পড়াশোনা করছেন। তবে দিনের বেশির ভাগ সময়ই হাসিনা আপা কাটাতেন বাবার বাড়ি, ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে।
হাসিনা আপার তখন ছোট্ট সংসার। রান্নাবান্না সবই নিজের হাতে করতেন। আর সেই সুযোগে আমি আমার ক্যামেরা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে উঠলাম। আমরা দুপুরে খাব বলে তিনি এক পট চাল বেশি বসালেন। আমি চুলার পাশে দাঁড়িয়ে একের পর এক ছবি তুলছি। মাংস কষানো, লাল শাক ভাজি, ডাল—সবকিছুরই ছবি। একসময় আপা হেসে বললেন,
— ‘আর কত তুলবি?’
একজন সাধারণ গৃহবধূ—পরনে সাদামাটা একটি সুতি শাড়ি খোলা চুল। দুপুরে খাওয়ার সময় জয় আর পুতুলের প্রসঙ্গ উঠতেই তাঁর অনমনীয় মুখটায় যেন এক মুহূর্তের জন্য বিষণ্নতার ছায়া নেমে এলো।
খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে নানা পারিবারিক গল্প। খাওয়া শেষে বিছানায় আধশোয়া হয়ে বই পড়ছিলেন। এমন সময় আপা বলে উঠলেন,
— ‘এটাও তুলবি?’
আমি বললাম, ‘তুলি। ক্যামেরা হাতে থাকলে হাত তো নিশপিশ করেই।’
নানা মুহূর্তের অনেক ছবি তুলে ফেললাম সারা দিনে।
১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে শহীদ নূর হোসেনের মৃত্যু এবং তাঁর পিঠজুড়ে উৎকীর্ণ ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’—এই অবিস্মরণীয় ছবিটি যেন স্বৈরাচার সরকারের পতনের বার্তা বয়ে আনল। সারা দেশ একটি ছবিতেই ফুঁসে উঠল। সেই সময় বৃহৎ দুই জোটের নেত্রী যুগপৎ আন্দোলনের লক্ষ্যে এক হতেই গৃহবন্দী হলেন দুই নেত্রী।
শেখ হাসিনাকে ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধু ভবনে গৃহবন্দী করা হয়। পুরো ৩২ নম্বর এলাকা কাঁটাতারের ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়। তৎকালীন এরশাদ সরকারের পুলিশ কঠোর নিরাপত্তায় বাড়ি ও আশপাশের পুরো এলাকা অবরুদ্ধ করে রাখে।
আমি তখন আমেরিকান সংবাদ সংস্থা এপি (Associated Press) এবং কলকাতার বহুল প্রচারিত বাংলা দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা-র ফটোগ্রাফার। বাংলাদেশের উত্তাল গণআন্দোলনের খবর বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের মতো আনন্দবাজার পত্রিকাতেও গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হচ্ছিল।
আনন্দবাজারসহ বিভিন্ন পত্রিকা ‘গৃহবন্দী শেখ হাসিনা’র একটি ছবি চাইছিল। কিন্তু গৃহবন্দী অবস্থায় ঘরের ভেতরে ঢুকে ছবি তোলা কি এত সহজ? তবু আশায় আশায় ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরের সামনে সারা দিন ঘুরে কাটালাম। কোনো লাভ হলো না।
শেষ পর্যন্ত মাথায় এলো স্টক ছবির পরিকল্পনা। মৌচাকে আমাদের এপি অফিসে পুরোনো নেগেটিভ আর প্রিন্ট ঘাঁটতে বসলাম। হঠাৎ কয়েক দিন আগে বনানীর বাসায় তোলা একটি ছবি চোখে পড়ল। ছবিতে শেখ হাসিনা বই পড়ছেন। সংবাদ-সংশ্লিষ্ট এই ফিচারধর্মী ছবিটি আমার খুবই পছন্দ হলো।
দ্রুত ছবিটি প্যাকেট করে ছুটলাম কুর্মিটোলা বিমানবন্দরে, কলকাতাগামী ফ্লাইট ধরতে। এক অচেনা যাত্রীর হাতে ছবিটি পাঠানোর অনুরোধ করলাম। তিনি রাজি হলেন না। দ্বিতীয়জনও না করে দিলেন। শেষ পর্যন্ত তৃতীয় একজন সহৃদয় যাত্রী আমার অনুরোধ রাখলেন। তিনি ছবির প্যাকেটটি কলকাতায় নিয়ে গেলেন। সেখানে পৌঁছে তাঁর ফোন পাওয়ার পর আনন্দবাজার পত্রিকার লোকজন গিয়ে ছবিটি সংগ্রহ করেন।
পরদিন ছবিটি আনন্দবাজার পত্রিকার লিড ছবি হিসেবে প্রকাশিত হলো। ক্যাপশনে লেখা ছিল—
‘ঢাকায় গৃহবন্দী শেখ হাসিনা বই পড়ছেন — পাভেল রহমান।’
স্টোরির প্রয়োজনে ছবিটি ব্যবহার করা হলেও এটি যে কয়েক দিন আগে তোলা একটি ফাইল ছবি, ক্যাপশনে তা উল্লেখ করা হয়নি। আর সেখান থেকেই শুরু হলো আসল নাটক।
আনন্দবাজার পত্রিকা ঢাকায় পৌঁছাতেই স্পেশাল ব্রাঞ্চ পুলিশের যেন ‘চক্ষু চড়কগাছ’। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা ফিল্ড অফিসারদের তলব করে প্রশ্নের পর প্রশ্ন করতে লাগলেন—
“তোমাদের চোখের সামনে দিয়ে পাভেল রহমান ভেতরে ঢুকল কীভাবে?”
ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে দায়িত্বরত গোয়েন্দা কর্মকর্তারা হতবাক। তাঁদের মাথায় তখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে—
“কী করে? কী করে? কী করে?”
তাঁরা জানালেন,
“পাভেল রহমানকে আমরা কয়েকবার ৩২ নম্বরের সামনে দেখেছি, কিন্তু তিনি কখন ভেতরে ঢুকলেন, সেটাই বুঝতে পারছি না!”
এরপর শুরু হলো আমাকে খোঁজার অভিযান। আমার নম্বরে একের পর এক ফোন আসতে লাগল। ভুল করে দু-একবার ফোন ধরলেও পরিচয় বুঝতে পেরে আমি মজা করেই কল কেটে দিতাম। একই প্রশ্ন শুনতে শুনতে আমি বিরক্তও হচ্ছিলাম—
“কী করে ভেতরে ঢুকলেন?”
প্রেস ক্লাবে আমাকে খুঁজেছেন, বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেছেন—আর আমি দিব্যি শহরের অন্য প্রান্তে ঘুরে বেড়াচ্ছি।
কিন্তু, কী করে?
শেষ পর্যন্ত গোয়েন্দারা হাজির হলেন মৌচাকের আমাদের এপি অফিসে। এবার যেন উল্টো তারাই ‘ধরা’ পড়লেন আমার কাছে।
তাঁরা অনুনয়ের সুরে বললেন,
— “ভাই, আমাদের একটু বাঁচান।”
বাবার সহকর্মীরা ছোটবেলা থেকেই আমাকে ‘ভাতিজা’ বলেই চিনতেন। কিন্তু সেদিন তাঁরা আমাকে ‘ভাই’ বলে সম্বোধন করলেন। তাঁদের অসহায় মুখ দেখে আর না করতে পারলাম না।
অবশেষে ফিল্ড অফিসারদের চাকরি বাঁচানোর জন্য আমি নিজেই মালিবাগের স্পেশাল ব্রাঞ্চ অফিসে হাজির হলাম।
“আসল রহস্যটা তখন খুলে বললাম…”
পাভেল রহমান
বেবিলন, নিউ ইয়র্ক।
২৯ জুন ২৬।
ক্যাপশন-
একজন সাধারণ গৃহবধূ—পরনে সাদামাটা একটি সুতি শাড়ি খোলা চুল। দুপুরে খাওয়ার সময় জয় আর পুতুলের প্রসঙ্গ উঠতেই তাঁর অনমনীয় মুখটায় যেন এক মুহূর্তের জন্য বিষণ্নতার ছায়া নেমে এলো। খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে নানা পারিবারিক গল্প। খাওয়া শেষে বিছানায় আধশোয়া হয়ে বই পড়ছিলেন। এমন সময় আপা বলে উঠলেন,
— ‘এটাও তুলবি?’





















