, শনিবার, ১১ জুলাই ২০২৬, ২৭ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

২৩ জুনকে ঘিরে এত ভয় কেন?

  • প্রকাশের সময় : ১২:৩২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
  • ২১ পড়া হয়েছে
২৩ জুনকে ঘিরে এত ভয় কেন? আওয়ামী লীগ কি এখনও সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বাস্তবতা?
আহমাদ সাদ
শিক্ষক কলামিস্ট ও রাজনীতিবিদ
২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে অস্বাভাবিক তৎপরতা, সতর্কতা ও সাংঘাতিক কড়াকড়ি দেখা যাচ্ছে, তাতে একটি প্রশ্ন সামনে চলে আসে—আওয়ামী লীগকে নিয়ে এত ভয় কেন?
সরকার, প্রশাসন, পুলিশ, র‍্যাব এবং সরকারসমর্থিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর বক্তব্য  পর্যবেক্ষণ করলে মনে হয়, আওয়ামী লীগকে নিয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহলে এক ধরনের দুশ্চিন্তা,  উদ্বেগ উৎকন্ঠা ও ভীতি কাজ করছে। ২৩ জুনকে কেন্দ্র করে সাঁড়াশি অভিযান, কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মাঠে নামতে না দেওয়ার ঘোষণা সেই আশঙ্কাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামী লীগ কি কোনো জঙ্গি সংগঠন? আওয়ামী লীগ কি কোনো সশস্ত্র রাজনৈতিক দল? বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, আওয়ামী লীগ কখনো শ্রেণিশত্রু খতম কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার রাজনীতি করেনি। বরং জন্মলগ্ন থেকেই দলটি এদেশের মানুষের মৌলিক অধিকার, গণতন্ত্র ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, ছেষট্টির ৬ দফা, ‘৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি অধ্যায়ে  আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব  দিয়ে এসেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ সংগ্রাম, তার কারাবরণ এবং ৩০ লক্ষ বাঙালির আত্মাহুতি, ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম হারানোর মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাঁকে, রক্তমাখা ইতিহাসের প্রতিটি পৃষ্ঠায় আওয়ামী লীগের অতুলনীয় অবদানের কথা লিখা আছে।
স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেও আওয়ামী লীগের পথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। ৭২ থেকে ৭৫ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকাকালে চরমপন্থী চৈনিক বামধারার সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠীর হামলায় আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতা-কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। সর্বহারা পার্টি ও জাসদের  গণবাহিনীসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহিংসতার শিকার হয়েছেন নেত্রকোনার এমপি আব্দুল খালেক, বরিশালের এমপি ইউসুফ আলীসহ দলটির তৃণমূল কর্মীরা। শুধুমাত্র বাজিতপুরেই আওয়ামী লীগের ১৮ জন নেতাকর্মী রাজনৈতিক সহিংসতার বলি হয়েছেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে যে রক্তাক্ত অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগকে বহুবার রাজনৈতিক সহিংসতা ও হামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ১৯৮১ সালে পিতৃমাতৃভ্রাতৃহারা শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তনের পর থেকে তাঁকেও বারবার জীবননাশের ঝুঁকি নিয়ে রাজনীতি করতে হয়েছে।
১৯৮৮ সালে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানের ঘটনা এখন হয়ত অনেকেই ভুলে যেতে পারেন, পুলিশ কমিশনার রকিবুল হুদার নির্দেশে শেখ হাসিনাকে টার্গেট করে গুলিবর্ষণ করা হয়। মানবঢাল রচনা করে নেত্রীকে বাঁচাতে পারলেও সেখানে ২৪ জন নেতাকর্মী প্রাণ হারিয়েছিলেন।  ২০০১-২০০৬ সময়কালে যে ভয়ংকর রাজনৈতিক সহিংসতা বাংলাদেশে চলেছে তা সেই সময়ের পত্র-পত্রিকা সাক্ষী। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী সমর্থক, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর  ভয়াবহ বর্বরতা সংঘটিত হয়েছে। মায়ের সামনে মেয়েকে ধর্ষণ করা, বাড়িঘর লুটপাট করে জ্বালিয়ে দেওয়া ইত্যাকার ঘটনায় যেন এক রক্তাক্ত কসাইখানায় পরিণত হয়েছিল বাংলাদেশ। ২০০১ সালের ১৬ জুন নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলায় ২০ জন নেতাকর্মী নিহত হয়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা— আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। ২১ আগস্টের হামলায় আইভী রহমানসহ ২২ জন নিহত হন, আহত হন শতাধিক মানুষ। ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জের বৈদ্যেরবাজারে গ্রেনেড হামলায় সাবেক অর্থমন্ত্রী  আওয়ামী লীগ নেতা শাহ এএসএম কিবরিয়াসহ ৩ জন নিহত হন। ধিরাই উপজেলায় সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জনসভায় গ্রনেড হামলায় ২জন নিহত অসংখ্য আহত, বাগেরহাটের মোল্লাহাট উপজেলায় শেখ হেলালের জনসভায় বোমা হামলায় ৯ জন আওয়ামী লীগ নেতা কর্মী প্রাণ হারিয়েছে। খুলনায় আওয়ামী লীগ এমপি এডভোকেট মঞ্জুরুল ইমামকে, নাটোরে মমতাজউদ্দিনকে হত্যা করা হয়। দেশের অনেক জায়গায় নেতা কর্মীর হাত পা কেটে নেয়া হয়,চোখ উপড়ে ফেলা হয়। এই ঘটনাগুলো সেই সময়ের পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতার আসার পর একটি ঘটনারও প্রতিশোধ গ্রহণ করেছে বলে কোন প্রমাণ নেই। আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে প্রমাণ করেছে তারা প্রতিহিংসা কিংবা প্রতিশোধের  রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। আওয়ামী লীগ প্রতিশোধ গ্রহণ করেছে দেশের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটিয়ে। রক্ত দেওয়া এবং জীবন দেওয়া যেন আওয়ামী লীগের ভাগ্যলিখন।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক রাজনীতি করার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলেও দলটির প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও আলোচনা কমেনি বরং ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতির অঙ্গনে  আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি জনগণের  কাছে একটি শূন্যতার অনুভূতি তৈরি করছে। যখন বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে  মাতৃভূমিকে সাম্রাজ্যবাদের কাছে  বিকিয়ে দেওয়া হয় তখন জনগণ  আওয়ামী লীগের শূন্যতা প্রতিনিয়ত  উপলব্ধি করে।
আজ সংসদীয় গণতান্ত্রিক  রাজনীতিতে সরকার ও বিরোধী রাজনীতির মধ্যে কোন দূরত্ব নেই। খুন ধর্ষণ রাহাজানি,  সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের সমস্যা, অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা মানবাধিকার পরিস্থিতি প্রশ্নে প্রতিবাদী শক্তিশালী রাজনৈতিক কণ্ঠের অভাব অনুভূত হচ্ছে। সরকার, সরকারি প্রশাসন, রাজনৈতিক দলসমূহ সম্মিলিতভাবে আওয়ামী লীগ মোকাবেলায় সাজসাজ রব তুলছে। একদিকে একা আওয়ামী লীগ, আরেকদিকে রেস্ট অফ আওয়ামী লীগ, অর্থাৎ আওয়ামী লীগ বনাম অন্য সকল রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনিক শক্তি।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—যদি আওয়ামী লীগ জনসমর্থন হারিয়েই থাকে, তাহলে তাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা না করে এত কড়াকড়ি কেন? কেন একটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে এত সতর্কতা, এত প্রস্তুতি?
সম্ভবত এখানেই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বিজয়। কারণ আওয়ামী লীগের অবদানকে  মানুষ ভুলে গেলে তাকে ঠেকানোর জন্য এত আয়োজনের প্রয়োজন হতো না। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের এত সতর্কতা, নিষিদ্ধতাই আওয়ামী লীগের প্রতি জনগণের সহমর্মিতা বাড়াচ্ছে। আওয়ামী লীগকে ঠেকানোর প্রতিরোধী বিশাল আয়োজনের কারণে বরং আওয়ামী লীগের প্রতি জনগণের তিল তিল সহানুভূতি বিশাল ভালোবাসায় রূপ নিচ্ছে। সরকার প্রশাসন ও সরকার সমর্থিত সকল রাজনৈতিক শক্তি একত্রিত হয়ে যতই আওয়ামী লীগের প্রতি কঠোর হবে, ততই জনগণ আওয়ামী লীগের প্রতি নমনীয় ও দরদী হয়ে উঠবে। পরিণতিতে  আওয়ামী লীগের পর্বততুল্য বিশাল জনসমর্থন নিয়ে এক মহা প্রলয়ংকরী  প্রত্যাবর্তন ঘটার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।
জনগণের মাঝে ২৩ জুনকে ঘিরে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে, তা হলো—আওয়ামী লীগকে ঘিরে এত ভয় কেন? ২৩ জুন ২০২৬  প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে আওয়ামী লীগের প্রাথমিক বিজয় ঘটলো?

আহমাদ সাদ
শিক্ষক কলামিস্ট ও রাজনীতিবিদ
জনপ্রিয়

২৩ জুনকে ঘিরে এত ভয় কেন?

প্রকাশের সময় : ১২:৩২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৩ জুন ২০২৬
২৩ জুনকে ঘিরে এত ভয় কেন? আওয়ামী লীগ কি এখনও সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক বাস্তবতা?
আহমাদ সাদ
শিক্ষক কলামিস্ট ও রাজনীতিবিদ
২৩ জুন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে অস্বাভাবিক তৎপরতা, সতর্কতা ও সাংঘাতিক কড়াকড়ি দেখা যাচ্ছে, তাতে একটি প্রশ্ন সামনে চলে আসে—আওয়ামী লীগকে নিয়ে এত ভয় কেন?
সরকার, প্রশাসন, পুলিশ, র‍্যাব এবং সরকারসমর্থিত রাজনৈতিক শক্তিগুলোর বক্তব্য  পর্যবেক্ষণ করলে মনে হয়, আওয়ামী লীগকে নিয়ে সরকার ও সংশ্লিষ্ট মহলে এক ধরনের দুশ্চিন্তা,  উদ্বেগ উৎকন্ঠা ও ভীতি কাজ করছে। ২৩ জুনকে কেন্দ্র করে সাঁড়াশি অভিযান, কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মাঠে নামতে না দেওয়ার ঘোষণা সেই আশঙ্কাকেই আরও স্পষ্ট করে তুলছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামী লীগ কি কোনো জঙ্গি সংগঠন? আওয়ামী লীগ কি কোনো সশস্ত্র রাজনৈতিক দল? বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বলে, আওয়ামী লীগ কখনো শ্রেণিশত্রু খতম কিংবা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করার রাজনীতি করেনি। বরং জন্মলগ্ন থেকেই দলটি এদেশের মানুষের মৌলিক অধিকার, গণতন্ত্র ও আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকারের সংগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, আইয়ুববিরোধী আন্দোলন, ছেষট্টির ৬ দফা, ‘৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধ—প্রতিটি অধ্যায়ে  আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব  দিয়ে এসেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে দীর্ঘ সংগ্রাম, তার কারাবরণ এবং ৩০ লক্ষ বাঙালির আত্মাহুতি, ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রম হারানোর মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বাঁকে, রক্তমাখা ইতিহাসের প্রতিটি পৃষ্ঠায় আওয়ামী লীগের অতুলনীয় অবদানের কথা লিখা আছে।
স্বাধীনতার অব্যবহিত পরেও আওয়ামী লীগের পথ ছিল কণ্টকাকীর্ণ। ৭২ থেকে ৭৫ আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকাকালে চরমপন্থী চৈনিক বামধারার সশস্ত্র রাজনৈতিক গোষ্ঠীর হামলায় আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতা-কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। সর্বহারা পার্টি ও জাসদের  গণবাহিনীসহ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর সহিংসতার শিকার হয়েছেন নেত্রকোনার এমপি আব্দুল খালেক, বরিশালের এমপি ইউসুফ আলীসহ দলটির তৃণমূল কর্মীরা। শুধুমাত্র বাজিতপুরেই আওয়ামী লীগের ১৮ জন নেতাকর্মী রাজনৈতিক সহিংসতার বলি হয়েছেন।
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার মধ্য দিয়ে যে রক্তাক্ত অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগকে বহুবার রাজনৈতিক সহিংসতা ও হামলার মুখোমুখি হতে হয়েছে। ১৯৮১ সালে পিতৃমাতৃভ্রাতৃহারা শেখ হাসিনার দেশে প্রত্যাবর্তনের পর থেকে তাঁকেও বারবার জীবননাশের ঝুঁকি নিয়ে রাজনীতি করতে হয়েছে।
১৯৮৮ সালে চট্টগ্রামের লালদীঘি ময়দানের ঘটনা এখন হয়ত অনেকেই ভুলে যেতে পারেন, পুলিশ কমিশনার রকিবুল হুদার নির্দেশে শেখ হাসিনাকে টার্গেট করে গুলিবর্ষণ করা হয়। মানবঢাল রচনা করে নেত্রীকে বাঁচাতে পারলেও সেখানে ২৪ জন নেতাকর্মী প্রাণ হারিয়েছিলেন।  ২০০১-২০০৬ সময়কালে যে ভয়ংকর রাজনৈতিক সহিংসতা বাংলাদেশে চলেছে তা সেই সময়ের পত্র-পত্রিকা সাক্ষী। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী সমর্থক, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর  ভয়াবহ বর্বরতা সংঘটিত হয়েছে। মায়ের সামনে মেয়েকে ধর্ষণ করা, বাড়িঘর লুটপাট করে জ্বালিয়ে দেওয়া ইত্যাকার ঘটনায় যেন এক রক্তাক্ত কসাইখানায় পরিণত হয়েছিল বাংলাদেশ। ২০০১ সালের ১৬ জুন নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়ায় আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলায় ২০ জন নেতাকর্মী নিহত হয়। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা— আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করে। ২১ আগস্টের হামলায় আইভী রহমানসহ ২২ জন নিহত হন, আহত হন শতাধিক মানুষ। ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি হবিগঞ্জের বৈদ্যেরবাজারে গ্রেনেড হামলায় সাবেক অর্থমন্ত্রী  আওয়ামী লীগ নেতা শাহ এএসএম কিবরিয়াসহ ৩ জন নিহত হন। ধিরাই উপজেলায় সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জনসভায় গ্রনেড হামলায় ২জন নিহত অসংখ্য আহত, বাগেরহাটের মোল্লাহাট উপজেলায় শেখ হেলালের জনসভায় বোমা হামলায় ৯ জন আওয়ামী লীগ নেতা কর্মী প্রাণ হারিয়েছে। খুলনায় আওয়ামী লীগ এমপি এডভোকেট মঞ্জুরুল ইমামকে, নাটোরে মমতাজউদ্দিনকে হত্যা করা হয়। দেশের অনেক জায়গায় নেতা কর্মীর হাত পা কেটে নেয়া হয়,চোখ উপড়ে ফেলা হয়। এই ঘটনাগুলো সেই সময়ের পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে ক্ষমতার আসার পর একটি ঘটনারও প্রতিশোধ গ্রহণ করেছে বলে কোন প্রমাণ নেই। আওয়ামী লীগ দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলে প্রমাণ করেছে তারা প্রতিহিংসা কিংবা প্রতিশোধের  রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। আওয়ামী লীগ প্রতিশোধ গ্রহণ করেছে দেশের ব্যাপক উন্নয়ন ঘটিয়ে। রক্ত দেওয়া এবং জীবন দেওয়া যেন আওয়ামী লীগের ভাগ্যলিখন।
সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক রাজনীতি করার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলেও দলটির প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও আলোচনা কমেনি বরং ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গণতান্ত্রিক রাজনীতির অঙ্গনে  আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি জনগণের  কাছে একটি শূন্যতার অনুভূতি তৈরি করছে। যখন বাণিজ্য চুক্তির মাধ্যমে  মাতৃভূমিকে সাম্রাজ্যবাদের কাছে  বিকিয়ে দেওয়া হয় তখন জনগণ  আওয়ামী লীগের শূন্যতা প্রতিনিয়ত  উপলব্ধি করে।
আজ সংসদীয় গণতান্ত্রিক  রাজনীতিতে সরকার ও বিরোধী রাজনীতির মধ্যে কোন দূরত্ব নেই। খুন ধর্ষণ রাহাজানি,  সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের সমস্যা, অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক নিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা মানবাধিকার পরিস্থিতি প্রশ্নে প্রতিবাদী শক্তিশালী রাজনৈতিক কণ্ঠের অভাব অনুভূত হচ্ছে। সরকার, সরকারি প্রশাসন, রাজনৈতিক দলসমূহ সম্মিলিতভাবে আওয়ামী লীগ মোকাবেলায় সাজসাজ রব তুলছে। একদিকে একা আওয়ামী লীগ, আরেকদিকে রেস্ট অফ আওয়ামী লীগ, অর্থাৎ আওয়ামী লীগ বনাম অন্য সকল রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনিক শক্তি।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে—যদি আওয়ামী লীগ জনসমর্থন হারিয়েই থাকে, তাহলে তাকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা না করে এত কড়াকড়ি কেন? কেন একটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে এত সতর্কতা, এত প্রস্তুতি?
সম্ভবত এখানেই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বিজয়। কারণ আওয়ামী লীগের অবদানকে  মানুষ ভুলে গেলে তাকে ঠেকানোর জন্য এত আয়োজনের প্রয়োজন হতো না। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের এত সতর্কতা, নিষিদ্ধতাই আওয়ামী লীগের প্রতি জনগণের সহমর্মিতা বাড়াচ্ছে। আওয়ামী লীগকে ঠেকানোর প্রতিরোধী বিশাল আয়োজনের কারণে বরং আওয়ামী লীগের প্রতি জনগণের তিল তিল সহানুভূতি বিশাল ভালোবাসায় রূপ নিচ্ছে। সরকার প্রশাসন ও সরকার সমর্থিত সকল রাজনৈতিক শক্তি একত্রিত হয়ে যতই আওয়ামী লীগের প্রতি কঠোর হবে, ততই জনগণ আওয়ামী লীগের প্রতি নমনীয় ও দরদী হয়ে উঠবে। পরিণতিতে  আওয়ামী লীগের পর্বততুল্য বিশাল জনসমর্থন নিয়ে এক মহা প্রলয়ংকরী  প্রত্যাবর্তন ঘটার সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে।
জনগণের মাঝে ২৩ জুনকে ঘিরে যে প্রশ্নটি সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হচ্ছে, তা হলো—আওয়ামী লীগকে ঘিরে এত ভয় কেন? ২৩ জুন ২০২৬  প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে আওয়ামী লীগের প্রাথমিক বিজয় ঘটলো?

আহমাদ সাদ
শিক্ষক কলামিস্ট ও রাজনীতিবিদ