
অনলাইন বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্মৃতির আয়নায়
আলাউর রহমান চৌধুরী —
অবশেষে মরণ সমুদ্রের সেপারে পাড়ি জমালেন ষাটের দশকের তুখোড় ছাত্রনেতা ও পরবর্তী কালীন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আলাউর রহমান চৌধুরী।গত ২৬ আগষ্ট সকালে ফেসবুকে যখন তার মৃত্যু সংবাদ ভেসে উঠে তখন কিছুটা রুদ্ধবাক হয়ে পড়েছিলাম।তারপর মৃত্যুনামক আমোঘ সত্যটিকে মেনে নিতে হয়ে ছিলো। “জন্মিলে মরিতে হবে /অমর কে কোথা কবে” মাইকেল মধূসুধনের এ উক্তিটিই অমর এবং যথাযথ।
রাজনৈতিক লুকোচুরির আরোপিত নির্জনতার প্রেক্ষাপটে তার এ মৃত্যু অনাকাঙ্খিত হলেও বিধি লিপির নিরেট বাস্তবতায় এ মৃত্যুই বোধহয় অবধারিত ছিলো।রাজনৈতিক সহযোদ্ধা এবং অনুরাগীদের ব্যাপক উপস্থিতে আলাউর রহমান চৌধুরীর অনন্ত যাত্রা ব্যন্জনাময় না হলেও অস্পষ্ট অনুরাগে ছিলো মহিমান্বিত।
৬৯এর ছাত্র আন্দোলন এবং গণঅভ্যত্থানে তৎকালীন মৌলভী বাজার মহকুমা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ন আহব্বায়ক ছিলেন আলাউর রহমান চৌধুরী। আহব্বায়ক ছিলেন মৌলভী বাজার কলেজ ছাত্রসংসদের ভিপি মরহুম জয়নাল হোসেন। সে সময়ে প্রতিদিনই ছাত্র বিক্ষোভ অনুষ্টিত হতো। এ বিক্ষোভে গ্রামান্চলের স্কুলগুলো হতেও ছাত্ররা বিক্ষোভ সহকারে শরীক হতো।বিক্ষোভ শেষে পৌরসভা শিশু পার্কে ছাত্র জমায়েত রীতিমতো মধ্যমানের জনসভার আদল নিতো।আমি তখন সরকারি স্কুলের দশম শ্রেণীর ছাত্র ছিলাম। কোন ছাত্রনেতা কি বলতেন সেটি শোনার কৌতুহল নিয়ে প্রতিদিনই ছাত্রজমায়েতে উপস্থিত থাকার একটি বাতিক মাথায় চেপেছিলো। জয়নাল হোসেনের সভাপতিত্বে ছাত্রজমায়েতে বক্তব্য রাখতেন মোঃ ফিরোজ ,আজিজুল হক ইকবাল ,মুজিবুর রহমান মুজিব ,নাসিরুদ্দিন চৌধুরী (বর্তমানে দিরাই শাল্লার বি এন পি দলীয় এম পি) আব্দুল অদুদ ,মোঃ জহিরুদ্দিন,মাহবুব বকস ,সিরাজুল হক ,মুকিত খান,মাহমুদুর রহমান ,আলাউর রহমান চৌধুরী সহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ।(স্মৃতি বিভ্রমের কারণে অন্যান্য ছাত্রনেতাদের নামোল্লেখ করতে না পারায় ক্ষমা প্রার্থী )বক্তা হিসেবে সকলেই সুবক্তা ছিলেন।তার মধ্যে ব্যতিক্রমী ছিলেন আলাউর ভাই।
বক্তব্যে কবিতার মিশাল সহ অনর্গল কথা বলতে পারতেন যতিচিহ্ন ছাড়াই।
আন্দোলনের উত্তুঙ্গ মুহুর্তে অর্থাৎ ৬৯এর ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় ছাত্র ইউনিয়নের একটি মিছিল শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে চৌমুহনা চত্বরে জড়ো হয়েছে সবেমাত্র।তখন চৌমুহনাতে পাকা একটি ট্রাফিক ষ্ট্যান্ড ছিলো। তাতে মাইকবাঁধার উদ্যোগ নেয়া হচ্ছিলো।এ সময় ডি আই বি দারোগা আবুল হাসিম আলাউর রহমান চৌধুরীকে ডেকে নিয়ে কানে কানে বলেছিলেন -বাপুরা মইরোনা,মার্শাল ল জারি হতে চলেছে।সিলেট থেকে সেনাবাহিনী রওয়ানা হয়ে বোধহয় শেরপুর ফেরীঘাটে পৌছে গেছে।এসেই তোমাদেরকে পাকড়াও করতে পারে।অতএব সময় থাকতে পালাও।এ তথ্য জানার পরপরই সমাবেশটি পন্ড হয়ে গিয়েছিলো।
বয়সের তারতম্য থাকায় আলাউর রহমানের সাথে মুখপরিচিতি ব্যাতীত ঘনিষ্টতা তেমন ছিলোনা।তবে রাজনীতিই একসময় ঘনিষ্ট সান্নিধ্যে টেনে এনেছিলো। ছাত্রজীবন শেষে আশির দশকের অধিকাংশ সময় অতিক্রান্ত হয়েছিলো শ্রীমঙ্গলে।অবস্থা বিবেচনায় রাজনীতি বিমুখ ছিলাম। কিন্তু মরহুম মোঃ ইলিয়াছ নাছোড় বান্দা হয়ে আমাকে শ্রীমঙ্গল আওয়ামী লীগে টেনে নিয়েছিলেন।শ্রীমঙ্গল আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদকের দায়িত্ব কাধে বর্তেছিলো।কিন্তু আওয়ামী লীগের আভ্যন্তরীণ কোন্দলে আমরা ক’জন কোনঠাসা হয়ে পড়েছিলাম।৮৪ সনের পৌর নির্বাচনকে কেন্দ্রকরে দুই দলীয় প্রার্থী যথাক্রমে এম এ রহিম এবং সৈয়দ আব্দুল মুজিবকে ঘিরে দলীয় বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছিলো। নির্বাচনে এম এ রহিম জয়ী হলে মুজিবের সমর্থন কারীরা কোনঠাসা হয়ে পড়েছিলো।আমার অবস্থান ছিলো সৈয়দ মুজিবের পক্ষে।বছরদিনের
মাথায় সৈয়দ মুজিব তার অনুসারী কয়েকজনকে নিয়ে বি এন পিতে যোগদান করেছিলেন।আমার প্রতিও চাপ ছিলো।কিন্তু আমি বলেছিলাম এক মুখে দুই বুলি আওড়ানোর পরিবর্তে ঘরে বসে থাকাই বেহতর।তন্মধ্যে বিয়ে শাদী সম্পন্ন হলে শ্রীমঙ্গল ছেড়ে বাড়ীতেই ফিরে আসি।
বাকশাল নেতা আব্দুর রাজ্জাকের সাথে পরিচিতি ছিলো আগ থেকেই।লোক মারফত তিনি আমাকে একাধিকবার খবর পাঠিয়েছিলেন দেখা করার জন্য। সম্ভবত ৮৭ সনে ঢাকায় গিয়েছিলাম তিনদিনের পি আই বির ট্রেনিং এর জন্য। তখন আমি শ্রীমঙ্গল থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক শ্রীবাণীর প্রধান সম্পাদকের দায়িত্বে নিয়োজিত।এক সকালে হাজির হয়েছিলাম আব্দুর রাজ্জাকের সাতমসজিদ রোডস্থ বাসায়। আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরে টেনে নিয়েছিলেন ডাইনিং রুমে।নাস্তা খেতে খেতে আমার হালঅবস্থান জেনে নিয়ে বলেছিলেন -রাজনৈতিক বলয়ে বসবাস করে রাজনীতিবর্জ্জিত হওয়া যায়না।সাংবাদিকতা করতে আপত্তি নেই।একটি পেশায় থাকতে হবেতো! তবে তোমাকে মৌলভী বাজারের বা্কশালে থাকতে হবে। সেখানকার ফিরোজ লন্ডনে আছে।ফরিদ (মীর্জা ফরিদ বেগ )ধরা দিয়েও দিচ্ছেনা। ইকবাল একা কুলিয়ে উঠতে পারছেনা।এমতাবস্থায় তোমাকে আমার প্রয়োজন আছে। রাজ্জাক ভাইয়ের সম্মোহনী জালকে ছিন্নকরতে পারছিলামনা।
মৌলভী বাজারে জাতীয় ছাত্রলীগ তখন সাবেক ছাত্রনেতা ও কলেজ সংসদের ভিপি আব্দুল মতিনের ছত্রচ্ছায়ায় কিবরিয়া,চন্দন ,বুলবুল ,কয়ছর মকিছ ,রেনু ,কালীপদ ,মোস্তাক, শওকত ,সহ অপরাপরদের তৎপরতায় দৃশ্যমান হয়ে উঠেছিলো।বাকশাল জেলা কমিটীও তার অবকাঠামোকে খাড়া করে ফেলেছিলো। আমি তৎপর হয়ে শ্রীমঙ্গলে শক্ত অবস্থান তৈরী করার পাশাপাশি কমলগন্জ,রাজনগর ও কুলাউড়াতে শাখা প্রতিষ্ঠায় উদ্যোগী হয়ে সাড়াও পেয়েছিলাম।
বাকশালের জেলাকমিটীকে ঢেলে সাজানোর জন্য একটি সম্মেলনের গুরুত্ব অনুভুত হচ্ছিল সংশ্লিষ্ট মহলে।এ লক্ষে আমাকে আহব্বায়ক করে একটি সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটী গঠন করা হয়েছিল ১৯৮৯ সনের মে মাসে। জুন মাসের প্রথমার্ধে সম্মেলনের তারিখ নির্ধারিত হয়েছিল।সম্মেলনকে সামনে রেখে আজিজুল হক ইকবালের সভাপতি পদকে অক্ষত রেখে বাকী পদবিন্যাস নিয়ে আলাপ আলোচনা চলছিলো।তন্মধ্যে ইকবালভাই একদিন আমাকে একান্তে তার বাসায় ডেকে নিয়েছিলেন।আলাপ শুরু করে তিনি বলেছিলেন-আসন্ন সম্মেলনে তুমি সেক্রেটারি হচ্ছো নিশ্চিত।এখন তোমার সিদ্ধান্তের উপর একটি বিষয় নির্ভর করছে।আমি আমতা আমতা করে বলেছিলাম -খুলে না বল্লেতো কিছুই বুঝতে পারছিনা।সিগারেটে অগ্নি সংযোগ করে তিনি বলেছিলেন ,ন্যাপের আলাউর বাকশালে আসতে চায়।তাকে কোনপদে বসানো যেতে পারে?তখন ন্যাপ ও জাসদের রাজনীতিতে ভাঁটার টান ধরেছে।জেলা পর্য্যায়ের প্রতিশ্রুতিশীল নেতৃবৃন্দ হতাশ হয়ে দলবদল করছিলেন।আওয়ামী লীগের প্রতিই তারা আগ্রহী ছিলেন।কিন্তু জেলা ও থানা পর্য্যায়ের আওয়ামী মিরাশদার নেতৃবৃন্দ তাদের মিরাশ তথা কর্তৃত্ব হারানোর আশংকায় ন্যাপ কিংবা জাসদ থেকে যোগদানেচ্ছুদেরকে পাত্তা দেননি।ফলে বিকল্প হিসেবে তারা বি এন পিতেই যোগদান করেছিলেন দেশের সবজেলা এবং উপজেলাতে।
ইকবাল ভাইয়ের ইঙ্গিত সূচক কথার জবাবে বলেছিলাম ,আলাউর ভাইকে ঠেলা দেওয়ার মতো যোগ্যতা আমার নাই।তিনি যদি সেক্রেটারি পদ গ্রহণ করেন তাহলে আমি সেটিকে সানন্দে বরণ করে নেবো।তীর্য্যক দৃষ্টিতে ইকবাল ভাই আমার দিকে চেয়ে বলেছিলেন -আজ আবার তোমাকে নতুন করে চিনলাম! যাইহোক, ইকবালভাই সহ অপরাপরদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আলাপ আলোচনা শুরু হয়েছিলো। আমার উপর দায়িত্ব বর্তেছিলো চলমান সেক্রেটারী মির্জা নজরুল বেগকে ম্যানেজ করার জন্য।
জুনের প্রথম সপ্তাহেই স্থানীয় জন মিলনকেন্দ্রে জেলা বাকশালের সম্মেলন অনুষ্টিত হয়েছিলো। হলটি কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে উঠেছিলো।কেন্দ্রীয় নেতা আব্দুর রাজ্জাক এবং জাতীয় ছাত্রলীগ সভাপতি নুরুল ফজল বুলবুল সহ একাধিক নেতৃবৃন্দ তাতে উপস্থিত ছিলেন।বক্তাদের মধ্যে কৌশলে আলাউর রহমান চৌধুরীকেও ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম।
প্রথম অধিবেশন শেষে বিকেলে কাউন্সিল অধিবেশন বসেছিলো।রাজ্জাকভাই ও বুলবুল কাউন্সিল অধিবেশনে না এসে অপর কেন্দ্রীয় নেতা এডভোকেট হেমায়েত উদ্দিনকে পাঠিয়েছিলেন।মীর্জ্জা নজরুল বেগ কোন নবাগতকে সেক্রেটারি করতে নারাজ ছিলো আগ থেকেই।সাবজেক্ট কমিটী তাকে অনেক বুঝানোর পর দলীয় বৃহত্তর স্বার্থে সেক্রেটারী হিসেবে মেনে নিয়েছিল।শেষ মেষ কাউন্সিল অধিবেশনে জেলা সভাপতি হিসেবে আজিজুল হক ইকবাল সাধারণ সম্পাদক পদে আলাউর রহমান চৌধুরী এবং সাংগঠনিক সম্পাদক পদে সরওয়ার আহমদের নাম ঘোষিত হয়েছিলো। এক সপ্তাহের মাথায় পূর্ণাঙ্গ কমিটী ঘোষণা করা হয়েছিলো।
দলে নবাগত হলেও রাজনীতির মাঠেতো আলাউর রহমান ছিলেন পুরানো প্লেয়ার।তাই জেলা বাকশালে গতিশীলতা আনতে পেরেছিলেন।তার সি এন্ড বি কলোনীর বাসভবন হয়ে উঠেছিলো নেতাকর্ম্মীদের আড্ডা স্থল।৯০ এর এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে বিরোধী দলীয় রাজনৈতিক মন্চে আলাউর রহমান ছিলেন অনলবর্ষি বক্তা।
৯১ এর নির্বাচনউত্তর বাস্তবতায় বাকশাল এবং আওয়ামী লীগ একীভূত হলে বাকশালের সবাই আওয়ামী বলয়ে একাকার হয়ে গিয়েছিলেন। নতুনভাবে আওয়ামী লীগের জেলা ও থানাকমিটী গঠিত হলে মোঃ ফিরোজ,ইকবাল ভাই ,আলাউর ভাই ,আব্দুল মতিন ,রাধাপদ দেব সজল,ইমদাদু হক মিন্টু প্রমুখরা নতুন পদে অভিষিক্ত হয়েছিলেন।পেশাদারিত্বের চাপে আমি সক্রিয় রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়ি।
রাজনীতির সর্পিল পথ পিচ্ছিল এবং কর্দমাক্ত হলেও এখানে বিদ্বেষ এবং জিঘাংসার কালো ছায়া ছিলো না।রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিন্নতা থাকলেও সামাজিক ভাবে পারস্পরিক সু সম্পর্ক এবং সহমর্মিতার রজ্জু বন্ধন ছিলো অটুট । হালে সেটিতে ছেদ পড়েছে।মৌলভী বাজার মহকুমা ছাত্রলীগের প্রতিষ্টাতা সভাপতি ও আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য মোঃ ফিরোজ লন্ডনে মৃত্যুবরণ করেছিলেন দু বছর আগে।তার মৃত্যু সংবাদে শররের চৌমুহনাতে তার মালিকানাধীন বিল্ডিং এ একটি শোক ব্যানার টাঙানো হয়েছিলো।একটি মহল এ শোকব্যানার টি ছিড়ে তাতে অগ্নি সংযোগ করেই থামেনি জানাজা নামাজের মাইকিং এ পর্য্যন্ত বাঁধা প্রদান করেছিলো বলে অভিযোগ উঠেছিলো। এটিকে ধারণায় রেখে সদ্য প্রয়াত আলাউর রহমান চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার দাফন অনুষ্টানেও বোধ হয় সাবধানি পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিলো।অনেকেই তার মৃত্যু সংবাদ জানতে পারেনি।ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও দলীয় সুহৃদরদের অনেকে জানাজায় অংশনিতে পারেননি টিকি টিকির নজর এড়ানোর জন্য। এই উল্টো বাস্তবতার পরও বলাযাবে ,আড়ালের পর্দা টেনে রাজনৈতিক নেতৃত্বকে ঢেকে রাখা কোন কালেই সম্ভব হবার নয়।
Sorwar Ahmed’s Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।





















