
অনলাইন শুক্রবার, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বিদেশে পাচার হওয়া টাকা ফিরিয়ে আনা এক দীর্ঘ আইনি ও কূটনৈতিক লড়াই। আইনি জটিলতা, আন্তর্জাতিক মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স আর বিদেশি আদালতের দীর্ঘসূত্রতার কারণে সেই টাকা ফেরত আসতে বছর গড়িয়ে দশক পার হয়ে যায়। আইনজীবী নিয়োগ ও অন্যান্য জটিলতায় রাষ্ট্রের খরচও বৃদ্ধি পায়।
কিন্তু দেশের ভেতরের প্রক্সি সম্পদ গুলোর চিত্র একদম ভিন্ন।
অর্থ পাচারকারী ও দুর্নীতিবাজরা তাদের অবৈধ উপার্জনের পুরোটা বিদেশে পাঠায় না। একটা বড় অংশ দেশের ভেতরেই থাকে। বেনামে রাখা হয়। ড্রাইভার, পিয়ন, দূরসম্পর্কের আত্মীয়, বিশ্বস্ত কোনো ব্যবসায়ী, বন্ধু, ভুয়া কোম্পানির নামে থাকে। জমি, বিলাসবহুল কমার্শিয়াল স্পেস, রিসোর্ট, তারকা হোটেল ছাড়াও অবৈধ টাকা শেয়ারবাজারে খাটায়।
বিদেশের টাকা ফেরানো কঠিন। দেশের ভেতরের এই প্রক্সি সম্পদগুলো তো আমাদের হাতের নাগালের ভেতরেই আছে!
সুষ্ঠু অডিটের মাধ্যমে এগুলো শনাক্ত করে সরকারি হেফাজতে নেওয়া সম্ভব। এটাই এখন সবচেয়ে বড় জরুরি পদক্ষেপ।
একজন দুর্নীতিবাজ আমলা, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও ব্যাংক লুটপাটকারী নিজের নামে কোটি কোটি টাকার জমি ফ্ল্যাট এসব কিনেন না। তারা ভালো করেই জানেন এতে করে আয়কর বিভাগ ও দুদকের নজরে পড়তে হবে। তাই বেছে নেন প্রক্সি/নোমিনি পদ্ধতি।
কাগজে কলমে নাম থাকে অন্যের। সুবিধা ভোগ করেন আরেকজন কিংবা আসল অপরাধী। জমি বা কমার্শিয়াল স্পেস কেনা হয় পিয়ন, ড্রাইভার, ভ্যালু না থাকা কোনো আত্মীয়র নামে। কখনো ভুয়া কোম্পানির নামে।
টাকা দেওয়ার উৎস যাচাই করলে বেরিয়ে আসবে সত্য। বিক্রেতাকে টাকা দেওয়া হয় নগদ ক্যাশে। কখনো একাধিক ভুয়া ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে ছোট ছোট ব্ল্যাক মানির ট্রানজ্যাকশনে।
শেয়ারবাজার ও রিসোর্ট ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়। দেশের নামীদামি রিসোর্ট ও কমার্শিয়াল বিল্ডিংয়ে প্রক্সিদের পরিচালক বানিয়ে মূল লাভটা গোপন সুবিধাভোগী হিসেবে পাচারকারীই পকেটে তোলেন।
অডিট ও ফোরেন্সিকের মাধ্যমে এই সম্পদ চিহ্নিত করা সম্ভব।
অনেকে মনে করেন বেনামে সম্পদ কিনলে তা ধরা অসম্ভব। বাস্তবে আইনি ও আর্থিক অডিটের মাধ্যমে খুব সহজেই এদের সনাক্ত যায়।
প্রথমেই আসে বেনিফিশিয়াল ওনারশিপ অডিট।
আইন অনুযায়ী যে ব্যক্তির নামে জমি/শেয়ার আছে তার ট্যাক্স ফাইল ও আয়ের উৎস পরীক্ষা করা হয়।
দেখা গেলো, ১ লাখ টাকা বেতন পাওয়া কোনো কর্মচারীর নামে ৫০ একর জমি কিংবা ২০ কোটি টাকার কমার্শিয়াল স্পেস আছে। সেখানেই প্রাথমিক অপরাধের প্রমাণ মেলে।
ডিজিটাল ব্যাংকিং ট্রেইল ও ল্যান্ড রেকর্ড ম্যাপিং।
জমি বা ফ্ল্যাট কেনাবেচার সময় ব্যাংক ট্রান্সফার বা ক্যাশ ডিপোজিটের যে ট্রেইল তৈরি হয়েছিল তা BFIU এর ডেটাবেজ দিয়ে ফিল্টার করলেই বের হয়ে আসবে আসল টাকা কার অ্যাকাউন্ট থেকে প্রক্সির অ্যাকাউন্টে ঢুকেছিল।
ভূমির ই নামজারি ও ডিজিটাল খতিয়ান অ্যানালাইসিস করে নির্দিষ্ট প্রক্সি নেটওয়ার্কের নামে থাকা সব জমির ম্যাপ তৈরি করা যায়।
লাইফস্টাইল ও ইনকাম মিসম্যাচ ধরা পড়ে।
প্রক্সির দৃশ্যমান আয়ের সাথে তার নামে থাকা সম্পদের বিশাল তফাত থাকলেই আইনি ভাষায় তাকে সন্দেহভাজন সম্পদ হিসেবে ফ্ল্যাগ করা যায়।
এসব কিছুর প্রমাণ মিললেই অবিলম্বে সরকারি হেফাজতে নিতে হবে। রিসিভার নিয়োগের মেকানিজম আসবে এই ধাপে।
বিদেশের ট্রাইব্যুনালের মতো দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ায় না গিয়ে দেশীয় দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনের মাধ্যমে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
দুদক ও ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম প্রাথমিক অডিট রিপোর্ট আদালতের সামনে উপস্থাপন করবে।সম্পত্তিটি সাময়িকভাবে ক্রোক/জব্দ করার আদেশ নিবে। তখন রিসিভার অর্থাৎ Court appointed Receiver নিয়োগ করা হবে। সম্পদ জব্দ করার পর তা যেন নষ্ট না হয় এবং বেহাত না হয় সেজন্য এটা করা হবে। আদালত একজন সরকারি কর্মকর্তা বা সংস্থাকে রিসিভার হিসেবে দায়িত্ব দিবেন।
ধরুন, একটি ১০০ কোটি টাকার কমার্শিয়াল স্পেস বা রিসোর্ট প্রক্সির নামে আছে। রিসিভার নিয়োগের পর থেকে সেই রিসোর্টের ভাড়া বা আয় সরাসরি সরকারি কোষাগারে জমা হবে। আসল অপরাধী ও তার প্রক্সি আর সেই সম্পদের এক পয়সাও ভোগ করতে পারবে না।
ফৌজদারি মামলায় প্রমাণের দীর্ঘসূত্রতা এড়াতে সিভিল ফরফিচার বা দেওয়ানি বাজেয়াপ্তকরণ ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হবে। এখানে সম্পদের মালিক ও প্রক্সিকে আদালতে প্রমাণ করতে হবে, সম্পদটি বৈধ আয়ে কেনা। প্রমাণ করতে ব্যর্থ হলেই সম্পত্তিটি স্থায়ীভাবে রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত হয়ে যাবে।
এই মুহূর্তে আমজনতার জন্য এটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অন্যতম কারণ এই পক্রিয়ায় তাৎক্ষণিক বিচার ও দৃশ্যমান ফলাফল লাভ। বিদেশের ব্যাংক থেকে টাকা ফেরত আনা দীর্ঘমেয়াদী কাজ। যা সাধারণ মানুষ সহজে দেখতেও পায় না। কিন্তু চোখের সামনে থাকা লুটেরাদের রিসোর্ট, ফ্ল্যাট, জমি দেওয়াল তুলে সরকারি হেফাজতে নেওয়া হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আস্থার সঞ্চার হবে।
অপরাধের সুফল বন্ধ হবে। অপরাধী জেলে থাকলেও তার পরিবার ও প্রক্সিরা দেশের মাটিতে বসে সেই সম্পদের আয় দিয়ে বিলাসবহুল জীবন কাটালে সমাজে অন্যায়ের বিচার অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। প্রক্সি অ্যাসেট বাজেয়াপ্ত করলে অপরাধের মূল সুফলটাই বন্ধ হয়ে যায়।
জাতীয় রাজস্বে তাৎক্ষণিক আয় যোগ হবে। বাজেয়াপ্ত করা কমার্শিয়াল স্পেস ও প্রপার্টি নিলামে বিক্রি করতে হবে। সেখান থেকে প্রাপ্ত টাকা রাষ্ট্রের খাতায় যোগ হবে। একইভাবে রিসিভারের মাধ্যমে চালনা করে প্রাপ্ত আয় সরাসরি রাষ্ট্রের কোষাগারে যুক্ত হয়ে দেশের ক্ষতিপূরণে সাহায্য করবে।
বিদেশের মাটিতে পাচার হওয়া কোটি কোটি ডলার উদ্ধারের আইনি লড়াই চলুক তার নিজ গতিতে। কিন্তু দেশের ভেতরের প্রক্সি সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দিতে কোনো আন্তর্জাতিক অনুমতির প্রয়োজন নেই!
প্রয়োজন শুধু একটি স্বাধীন ও প্রযুক্তিভিত্তিক ন্যাশনাল অ্যাসেট ট্র্যাকিং অ্যান্ড রিকভারি কমিশন। যারা দ্রুত অডিটের মাধ্যমে প্রক্সিদের চিহ্নিত করবে। আদালতে রিসিভার নিয়োগের মাধ্যমে সম্পদ রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে নেবে। অপরাধীদের বুঝিয়ে দেবে দেশের মাটিতে বসে অপরাধের ফল ভোগ করার দিন শেষ!
Bipasha Chakraborty’s Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।
তাত্বিকভাবে ভালো চিন্তা। এদেশে একটি সুনির্দিষ্ট অর্থনৈতিক কাঠামো আছে। এই অর্থনীতির মূল বৈশিষ্ট্য হলো, অনুতপাদনশীল “উন্নয়ন”, যাবতীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে সর্বোচ্চ কর আদায়,বিদেশ নির্ভরতা, অর্থনৈতিক লুট এবং পাচার। এই কাঠামো টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রের যাবতীয় প্রতিষ্ঠান একযোগে কাজ করে। জবাবদিহিহীন ক্ষমতা কাঠামো , নির্বাহী বিভাগের অধীনস্থ বিচার বিভাগ এবং সকল সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান।
যদি বিচার বিভাগ স্বাধীন হতো, রুলড বেইজড পুলিশ এবং প্রশাসন হতো তাহলে আপনি যেভাবে বলছেন সেভাবে টাকা বাজেয়াপ্ত হতো। তবে এ ধরনের অপরাধের বিচারের জন্য বিশেষায়িত আদালত লাগবে। আপনি লিখে যান, লেখাগুলো গুরুত্বপূর্ণ। সাথে আছি।





















