
অনলাইন ১২ জুলাই, ২০২
মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের সাবেক স্পীকার, আ’লীগের সাবেক উপদেষ্টা, বৃহত্তর সিলেটের কৃতি সন্তান হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর মৃত্যুবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি।
সফল কুটনীতিক, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনের সভাপতি হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী ছিলেন একজন আলোকিত মানুষ। বহু ভাষাবিদ, মেধাবী ও প্রজ্ঞাবান ব্যক্তিত্ব।
আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে ও সমৃদ্ধ জাতি গঠনে অনন্য অবদানের জন্য তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
সিলেটবাসী চিরদিন যাদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে তাদের মধ্যে অন্যতম একজন হুমায়ূন রশীদ চৌধুরী। আধুুনিক সিলেটের রূপকার বললে অত্যুক্তি হবে না। সিলেটকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অভিযাত্রায় তিনি ছিলেন অগ্রপথিক। দেশ গড়ায় এবং দেশের অগ্রতিতেও হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর অবদান কোনো অংশেই কম নয়।
১৯৯৬-২০০১ সালে তিনি জাতীয় সংসদের স্পীকারের দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর নেতৃত্বে সিলেটে ব্যাপক উন্নয়ন হয়। সিলেটকে পূর্ণাঙ্গ বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়া, সিলেট শিক্ষা বোর্ড, সিলেট টিচার্স ট্রেনিং কলেজ প্রতিষ্ঠা, আধুনিক রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণ, সিলেট ওসমানী বিমান বন্দরকে আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে রূপান্তরিতকরণ, বন্ধ হয়ে যাওয়া সিলেটের টেক্সটাইল মিল পুনরায় চালু, অবহেলিত কোম্পানীগঞ্জের সাথে সিলেটের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের লক্ষ্যে সালুটিকর, কাটাখাল ব্রীজ ও রাস্তা নির্মাণ, সদর উপজেলার টুকেরবাজারে সুরমা নদীর উপর শাহজালাল ব্রীজ-৩, বাদাঘাট সিংগারখাল নদীর উপর বাদাঘাট ব্রীজ নির্মাণসহ সিলেট নগরী ও নগরীর বাইরে অসংখ্য ব্রীজ-কালভার্ট নির্মান, গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণসহ এ অঞ্চলের বৈপ্লবিক উন্নয়ন সাধিত হয় তার তত্বাবধানে।
সিলেটের সুরমা নদীর উপর একটি ঝুলন্ত সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা ছিলো হুমায়ূন রশীদ চৌধুরীর। এছাড়া সে সময় তার ঐকান্তিকতায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়ককে চার লেনে রূপান্তরিত করার একটি প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তীতে সেই প্রকল্পকে চার লেনের পরিবর্তে দুই লেন করা হয়।
বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর তাঁর জীবিত দুই কন্যার পাশে এসে দাঁড়ানোর জন্যে কোন প্রবাসী বাঙ্গালী এগিয়ে আসেনি, মুহুর্তেই সবাই যেন পর হয়ে যায়, অনেকে ডিপ্লম্যাট চাকরী বাঁচাতে বঙ্গবন্ধু কন্যাদের এড়িয়ে চলা শুরু করে। তখন যিনি সব ভয়কে তুচ্ছ করে এগিয়েছিলেন তিনি মরহুম হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। যিনি মুক্তিযোদ্ধা, যিনি মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতে তৎকালিন বাংলাদেশ মিশনের প্রধান ছিলেন, যিনি বঙ্গবন্ধুর বিশ্বস্ত সহচরদের একজন ছিলেন তিনি হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী।
আমাদের সিলেটের কৃতি সন্তান, সাবেক স্বনামধন্য কুটনীতিক, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী, বাংলাদেশের মহান জাতীয় সংসদের সাবেক স্পীকার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা, তাঁর স্বামী ড. ওয়াজেদ মিয়া ও আদরের ছোট বোন শেখ রেহানা ছিলেন বেলজিয়ামের ব্রাসেলসে। বেলজিয়ামের বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সানাউল হক বঙ্গবন্ধু হত্যার খবর শোনার সাথে সাথে বঙ্গবন্ধু পরিবারের জীবিত সদস্য যারা ভিআইপি প্রটোকলে ব্রাসেলসে ছিলেন তাঁদেরকে ন্যায্য সহযোগিতা এমন কি মানবিক বিবেচনায় হলেও কোন সাহায্য করতে অস্বীকৃতি জানায়। অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় এই যে বদলে যাওয়া সানাউল হককে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান খুব স্নেহ করতেন এবং নিজ পছন্দে তাকে বেলজিয়ামের রাষ্ট্রদূত নিযুক্ত করেছিলেন !
হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী তখন জার্মানীর রাষ্ট্রদূত। ব্রাসেলসের ঘটনা সম্পর্কে অবহিত হওয়ার সাথে সাথে তিনি বঙ্গবন্ধু কণ্যাদ্বয় ও ড. ওয়াজেদ মিয়াকে আনার জন্যে সূদুর জার্মানী থেকে গাড়ি পাঠিয়ে তাঁর বাসভবনে নিয়ে আসেন। জনাব রশীদ একটি বারের জন্যেও চিন্তা করেননি এর জন্যে হয়তো তাঁকে জীবনে কঠিন মুল্য দিতে হতে পারে, তিনি নিজের জীবনের নিরাপত্তার কথা একবারও ভাবেননি, তিনি নিজের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন হতে এক মুহুর্তের জন্যেও পিছপা হননি।
বঙ্গবন্ধুর ঘাতক খন্দকার মোশতাক হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর উপর ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁকে চাকরিচ্যুত করেন। মোশতাকের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবু সাঈদ চৌধুরী, হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীকে ফোন করে বাংলাদেশে না আসার অনুরোধ জানান, কারন দেশে আসলেই তাঁকে ভয়াবহ পরিনতি ভোগ করতে হতো।
বাংলাদেশের যে সকল ব্যক্তি বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে সম্মানের সাথে উপস্থাপন করেছেন তাঁদের মধ্যে অগ্রপ্রতিক হলেন মরহুম হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী। প্রবাসী সরকারের বাংলাদেশ মিশনের প্রধান থাকা অবস্থায় এই সফল কুটনীতিক ৪০টিরও বেশি দেশে কুটনৈতিক তৎপরতা চালিয়েছিলেন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার জন্যে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁকে শান্তিতে রাখুন, জান্নাতে রাখুন। মৃত্যুর পরেও তিনি অমর হয়ে আছেন, আমাদের হৃদয়ে শ্রদ্ধার সাথে আছেন মানবতার জন্যে তাঁর অসাধারণ কর্মের জন্যে।
Shahidullah Osmani’s Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।




















