, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬, ২৭ আশ্বিন ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম :
গণভবনের ভিডিও ধারণসহ রেকিকরা হয় শাইখ সিরাজের নেতৃত্বে রাহুল-মমতারা মিছিল করে যাবেন সুপ্রিম কোর্টে,মিছিলে গোটা ভারত হাঁটবে। সোমবার দিল্লি পুলিশ পরীক্ষায় রোটন তাঁর বাবার চেহলাম আয়োজনে ও বাধা ফজলে করিম চৌধুরী! আমাদের বিড়ি টানা,হাতাকাটা জামা পরার উপর যতক্ষণ না আক্রমণ আসবে ততোক্ষণ ? এই মানুষ এভাবে পচে গেল কেন? অবশেষে ডিপ স্টেট এবং ইউনূস ও খলিল সাহেবদের সাকসেস! রোটন ভাইয়ের জানাজা পড়তে যাওয়া মুসল্লীদের মসজিদ থেকে বের করে, নির্মম নির্যাতন করেছে বিএনপির ক্যাডাররা!! জাতীয় কংগ্রেসের প্রথম মুসলিম সভাপতি — বদরুদ্দীন তৈয়বজী পাকিস্তানপন্থী খাঁটি মুসলমান ইনকিলাব মঞ্চ বাবা-মায়ের কাছ থেকে যা শিখেছি ত্রপা মজুমদার

ড: মাহবুব উল হকের প্রয়াণ দিবস

  • প্রকাশের সময় : ০৮:৩৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬
  • ৯১ পড়া হয়েছে

অনলাইন ১৭ জুলাই ২০২৬

দিন গেল নীরবে
নাজিম হিকমতের ‘জেলখানার চিঠি’ কবিতাটির একটি চরণ হচ্ছে, ‘বিংশ শতাব্দীতে মানুষের শোকের আয়ু বড় জোর এক বছর’। অনুবাদ খুব সম্ভবত: কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের। আজ সকালে লাইনটি আবার নতুন করে মনে পড়ল।
আজ ১৬ জুলাই মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের স্রষ্টা ড: মাহবুব উল হকের প্রয়াণদিবস। বেঁচে থাকলে তাঁর বয়স হতো ৯২ বছর। হয়তো তাঁর অতি নিকটজন ভিন্ন আর কারো স্মরনে নেই, মনে রাখার প্রয়োজনও বোধ করেন নি কতজনা। যে মানুষটি একটি নতুন বিকল্প উন্নয়ন ধারনার জন্ম দিয়েছেন, তৈরী করেছেন উন্নয়ন ফলাফল পরিমাপের একটি মানুষের মঙ্গল-কেন্দ্রিক সূচক, উপহার দিয়েছেন মানব উন্নয়নের প্রতিবেদনের মতো একটি অনন্যসাধারন জিনিস, আজ তিনি বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেছেন।
আমার পরম সৌভাগ্য হয়েছিল এমন একটি প্রতিভার সহকর্মী হওয়ার এবং তাঁর বন্ধুত্ব লাভ করার। নমিত হই এটা ভেবে যে তাঁর স্থানটি পরবর্তী সময়ে আমি গ্রহন করে ছিলাম। অধ্যাপক অমর্ত্য সেন প্রায়ই বলতেন, ‘বেঁচে থাকলে ওঁর জায়গায় আজ তোমাকে দেখে মাহবুবই সবচেয়ে বেশী খুশী হত’। চেনা-অচেনা কতজন এমনটা বলেছেন।
তাঁর নামের সঙ্গে প্রথম পরিচয়, যখন ষাটের দশকের মাঝামাঝি তাঁর বিখ্যাত বই ‘উন্নয়নের কৌশল’ বেরোয়। আমরা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র। বইয়ের বিষয়বস্তুর চেয়েও তার উৎসর্গ পত্রটিই আমাদের মাতিয়ে দিল।
শেকসপীয়ারের ‘মার্চেন্ট অব ভেনিসের’ পোর্শিয়ার কথাটাই একটু ঘুরিয়ে লিখেছিলেন উৎসর্গ পত্রে, ‘বানীর জন্য, আমার যা আছে, তার আর্ধেক তোমার। কিন্তু আমার আর্ধেকও তোমার। সুতরাং আমার সবটাই তোমার’। তরুন বয়স আমাদের – আন্দোলিত হয়েছিলাম হৃদয়ে। পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে ঠাট্টা করতেও ছাড়িনি তাঁকে। হেসে বলতেন ‘বয়সটাই যে খারাপ’।
১৯৯২ সালে মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তরে যোগ দেয়ার পর কত দিন, কত ঘন্টা কেটেছে মাহবুবের সঙ্গে উত্তপ্ত বিতর্কে, লেখায়, নানান গল্পে। জীবনের বহু শিক্ষা – শুধু পেশাগত নয় – তো ওঁর কাছেই পাওয়া। গল্পও তো হয়েছে কত – পঞ্চাশের দশকে কেম্ব্রিজে তাঁর দুই সহপাঠী অধ‍্যাপক অমর্ত‍্য সেন এবং অধ‍্যাপক রেহমান সোবহানকে নিয়ে।
মানুষই যে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু এ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে মাহবুবের অবদান কম ছিল না। কেমন করে অনাবশ্যক থেকে আবশ্যককে আলাদা করতে হয়, কেমন করে কঠিন বিষয়কে সরল করতে হয়, কি করে রাজনৈতিক স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর জবাব দিতে হয় – এ সব তো তাঁর কাছ থেকেই শেখা। সর্ব অর্থেই মাহবুব ছিলেন আমার শিক্ষক, বন্ধু এবং সহমর্মী। ভারী স্নেহভরে আমাকে সম্বোধন করতেন ‘সবচেয়ে সুবেশ ভদ্রলোক’ বলে।
একটি কবি মন ছিল তাঁর। বন্ধু ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের কবিতার অনুবাদ করেছিলেন তিনি। মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের লেখায়ও সে কাব্যিকতা উঁকি-ঝুঁকি মারত। নির্দয়ভাবে কেটে দিতাম। ভারী দু:খ পেতেন – কিন্তু উপায় ছিল না। কত বই উপহার দিয়েছেন নাম লিখে, কত চিঠি জমা হয়ে আছে – তার প্রতিটাই তো স্মৃতি।
তাঁর টেবিলের ওপর একটি ফলক ছিল দীর্ঘদিন ধরে, যার মূল কথা ছিল, ‘আমার সঙ্গে একমত হওয়ার জন্য অনেক দেরী হয়ে গেছে, কারন আমি মত বদলে ফেলেছি’। ওটা দেখে আমার টেবিলে আমি একটা ফলক রেখেছিলাম এই বলে যে, ‘আমার সঙ্গে একমত হওয়ার সময় আসে নি, কারন এখনও আমি আমার মতামত চূড়ান্ত করিনি’। দু’টো ফলক দেখে অধ্যাপক অমর্ত্য সেনের সে কি অট্টহাসি।
শেষ দেখা ১৯৯৮ এর ১লা জুলাই। ৪ঠা জুলাইয়ের ছুটির আগটায়। সবাই চলে গেছে আগে আগে। অফিস ফাঁকা। আমার ঘরে অনেকক্ষন বসেছিলেন। এটা ওটা গল্পের ফাঁকে ফাঁকে তিনটে কথা বলেছিলেন। কোনদিন কোন সামরিক জান্তার জন্য কাজ কোর না। হয়তো নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই বলেছিলেন।
একটু উদাস হয়ে বলেছিলেন, ‘অমর্ত্য শিগগীরই নোবেল পাবে’।বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের দু’বন্ধু পরস্পর পরস্পরকে খুব ভালোবাসতেন। তারপর অনেকক্ষন আমার দিকে বললেন, ‘একদিন তুমি আমার জায়গাটা নেবে’।
অধ্যাপক অমর্ত্য সে বছরেই নোবেল পেয়েছেন মাহবুব চলে যাওয়ার কয়েক মাস পরেই। সময়ের সিঁড়ি বেয়ে আমিও মাহবুবের স্থলাভিষিক্ত হয়েছি। কিন্ত কোনটাই তিনি দেখে যেতে পারেন নি। ঐ জায়গাটিই আমাদের দু:খের ও বেদনার অভিন্নস্থল।
ড: মাহবুব উল হকের মেধা, প্রতিভা, দূরদৃষ্টি সর্বজনবিদিত। তাঁর লেখা, বলা, চিন্তাধারা কয়েক প্রজন্মকেও প্রভাবিত করেছে। কিন্তু আমরা যারা তাঁর কাছের মানুষ ছিলাম, তারা তো সবাই জানি, ‘মানুষের ছাপে, মাহবুবের মাপে, আমরা সবাই খর্বকায়’।
চিত্রতথ্য: ড: মাহবুবুল হক এবং তাঁর স্ত্রী খাদিজা হক (বানী)। ড: মাহবুবুল হক এবং ড: মনমোহন সিং।

Selim Jahan’s Post

মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।

জনপ্রিয়

গণভবনের ভিডিও ধারণসহ রেকিকরা হয় শাইখ সিরাজের নেতৃত্বে

ড: মাহবুব উল হকের প্রয়াণ দিবস

প্রকাশের সময় : ০৮:৩৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৭ জুলাই ২০২৬

অনলাইন ১৭ জুলাই ২০২৬

দিন গেল নীরবে
নাজিম হিকমতের ‘জেলখানার চিঠি’ কবিতাটির একটি চরণ হচ্ছে, ‘বিংশ শতাব্দীতে মানুষের শোকের আয়ু বড় জোর এক বছর’। অনুবাদ খুব সম্ভবত: কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের। আজ সকালে লাইনটি আবার নতুন করে মনে পড়ল।
আজ ১৬ জুলাই মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের স্রষ্টা ড: মাহবুব উল হকের প্রয়াণদিবস। বেঁচে থাকলে তাঁর বয়স হতো ৯২ বছর। হয়তো তাঁর অতি নিকটজন ভিন্ন আর কারো স্মরনে নেই, মনে রাখার প্রয়োজনও বোধ করেন নি কতজনা। যে মানুষটি একটি নতুন বিকল্প উন্নয়ন ধারনার জন্ম দিয়েছেন, তৈরী করেছেন উন্নয়ন ফলাফল পরিমাপের একটি মানুষের মঙ্গল-কেন্দ্রিক সূচক, উপহার দিয়েছেন মানব উন্নয়নের প্রতিবেদনের মতো একটি অনন্যসাধারন জিনিস, আজ তিনি বিস্মৃতির আড়ালে চলে গেছেন।
আমার পরম সৌভাগ্য হয়েছিল এমন একটি প্রতিভার সহকর্মী হওয়ার এবং তাঁর বন্ধুত্ব লাভ করার। নমিত হই এটা ভেবে যে তাঁর স্থানটি পরবর্তী সময়ে আমি গ্রহন করে ছিলাম। অধ্যাপক অমর্ত্য সেন প্রায়ই বলতেন, ‘বেঁচে থাকলে ওঁর জায়গায় আজ তোমাকে দেখে মাহবুবই সবচেয়ে বেশী খুশী হত’। চেনা-অচেনা কতজন এমনটা বলেছেন।
তাঁর নামের সঙ্গে প্রথম পরিচয়, যখন ষাটের দশকের মাঝামাঝি তাঁর বিখ্যাত বই ‘উন্নয়নের কৌশল’ বেরোয়। আমরা তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র। বইয়ের বিষয়বস্তুর চেয়েও তার উৎসর্গ পত্রটিই আমাদের মাতিয়ে দিল।
শেকসপীয়ারের ‘মার্চেন্ট অব ভেনিসের’ পোর্শিয়ার কথাটাই একটু ঘুরিয়ে লিখেছিলেন উৎসর্গ পত্রে, ‘বানীর জন্য, আমার যা আছে, তার আর্ধেক তোমার। কিন্তু আমার আর্ধেকও তোমার। সুতরাং আমার সবটাই তোমার’। তরুন বয়স আমাদের – আন্দোলিত হয়েছিলাম হৃদয়ে। পরবর্তী সময়ে এ নিয়ে ঠাট্টা করতেও ছাড়িনি তাঁকে। হেসে বলতেন ‘বয়সটাই যে খারাপ’।
১৯৯২ সালে মানব উন্নয়ন প্রতিবেদন দপ্তরে যোগ দেয়ার পর কত দিন, কত ঘন্টা কেটেছে মাহবুবের সঙ্গে উত্তপ্ত বিতর্কে, লেখায়, নানান গল্পে। জীবনের বহু শিক্ষা – শুধু পেশাগত নয় – তো ওঁর কাছেই পাওয়া। গল্পও তো হয়েছে কত – পঞ্চাশের দশকে কেম্ব্রিজে তাঁর দুই সহপাঠী অধ‍্যাপক অমর্ত‍্য সেন এবং অধ‍্যাপক রেহমান সোবহানকে নিয়ে।
মানুষই যে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দু এ দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে মাহবুবের অবদান কম ছিল না। কেমন করে অনাবশ্যক থেকে আবশ্যককে আলাদা করতে হয়, কেমন করে কঠিন বিষয়কে সরল করতে হয়, কি করে রাজনৈতিক স্পর্শকাতর বিষয়গুলোর জবাব দিতে হয় – এ সব তো তাঁর কাছ থেকেই শেখা। সর্ব অর্থেই মাহবুব ছিলেন আমার শিক্ষক, বন্ধু এবং সহমর্মী। ভারী স্নেহভরে আমাকে সম্বোধন করতেন ‘সবচেয়ে সুবেশ ভদ্রলোক’ বলে।
একটি কবি মন ছিল তাঁর। বন্ধু ফয়েজ আহমেদ ফয়েজের কবিতার অনুবাদ করেছিলেন তিনি। মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের লেখায়ও সে কাব্যিকতা উঁকি-ঝুঁকি মারত। নির্দয়ভাবে কেটে দিতাম। ভারী দু:খ পেতেন – কিন্তু উপায় ছিল না। কত বই উপহার দিয়েছেন নাম লিখে, কত চিঠি জমা হয়ে আছে – তার প্রতিটাই তো স্মৃতি।
তাঁর টেবিলের ওপর একটি ফলক ছিল দীর্ঘদিন ধরে, যার মূল কথা ছিল, ‘আমার সঙ্গে একমত হওয়ার জন্য অনেক দেরী হয়ে গেছে, কারন আমি মত বদলে ফেলেছি’। ওটা দেখে আমার টেবিলে আমি একটা ফলক রেখেছিলাম এই বলে যে, ‘আমার সঙ্গে একমত হওয়ার সময় আসে নি, কারন এখনও আমি আমার মতামত চূড়ান্ত করিনি’। দু’টো ফলক দেখে অধ্যাপক অমর্ত্য সেনের সে কি অট্টহাসি।
শেষ দেখা ১৯৯৮ এর ১লা জুলাই। ৪ঠা জুলাইয়ের ছুটির আগটায়। সবাই চলে গেছে আগে আগে। অফিস ফাঁকা। আমার ঘরে অনেকক্ষন বসেছিলেন। এটা ওটা গল্পের ফাঁকে ফাঁকে তিনটে কথা বলেছিলেন। কোনদিন কোন সামরিক জান্তার জন্য কাজ কোর না। হয়তো নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই বলেছিলেন।
একটু উদাস হয়ে বলেছিলেন, ‘অমর্ত্য শিগগীরই নোবেল পাবে’।বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের দু’বন্ধু পরস্পর পরস্পরকে খুব ভালোবাসতেন। তারপর অনেকক্ষন আমার দিকে বললেন, ‘একদিন তুমি আমার জায়গাটা নেবে’।
অধ্যাপক অমর্ত্য সে বছরেই নোবেল পেয়েছেন মাহবুব চলে যাওয়ার কয়েক মাস পরেই। সময়ের সিঁড়ি বেয়ে আমিও মাহবুবের স্থলাভিষিক্ত হয়েছি। কিন্ত কোনটাই তিনি দেখে যেতে পারেন নি। ঐ জায়গাটিই আমাদের দু:খের ও বেদনার অভিন্নস্থল।
ড: মাহবুব উল হকের মেধা, প্রতিভা, দূরদৃষ্টি সর্বজনবিদিত। তাঁর লেখা, বলা, চিন্তাধারা কয়েক প্রজন্মকেও প্রভাবিত করেছে। কিন্তু আমরা যারা তাঁর কাছের মানুষ ছিলাম, তারা তো সবাই জানি, ‘মানুষের ছাপে, মাহবুবের মাপে, আমরা সবাই খর্বকায়’।
চিত্রতথ্য: ড: মাহবুবুল হক এবং তাঁর স্ত্রী খাদিজা হক (বানী)। ড: মাহবুবুল হক এবং ড: মনমোহন সিং।

Selim Jahan’s Post

মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।