
অনলাইন ১৭ জুলাই ২০২৬
“পালিয়ে যাওয়া” বয়ান কি সেনাপ্রধানসহ পুরো সামরিক বাহিনীর জন্যই বিপদ ডেকে আনছে না ?
শেখ হাসিনার ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ভারত যাওয়ার ঘটনাকে রাজনৈতিকভাবে “পালিয়ে যাওয়া” বলা খুব সহজ। কিন্তু তিনি কীভাবে বাংলাদেশ ত্যাগ করেছিলেন, সেই পুরো প্রক্রিয়াটি সামনে আনলে বিষয়টি আর শুধু একজন ব্যক্তির পলায়নের গল্প থাকে না। তখন রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত, সামরিক ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সম্পৃক্ততা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।
শেখ হাসিনা কোনো গোপন সীমান্তপথে ভারতে প্রবেশ করেননি। তাঁকে বহনকারী বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর সামরিক বিমান ভারতের হিন্দন বিমানঘাঁটিতে অবতরণ করেছিল। বিদেশি রাষ্ট্রের আকাশসীমায় একটি সামরিক বিমান প্রবেশ এবং সামরিক ঘাঁটিতে অবতরণ করতে হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি ও সমন্বয় প্রয়োজন হয়। এ ধরনের যাত্রা একজন ব্যক্তির একক সিদ্ধান্তে সম্পন্ন হয়না।
ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদীও বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটের সময় বাংলাদেশের সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সঙ্গে কানেক্টেড থাকার কথা বলেছেন।
নিশ্চিতভাবে বলা যায়, সংকটের সেই সময় দুই দেশের সামরিক নেতৃত্বের মধ্যে যোগাযোগ ছিল এবং শেখ হাসিনার বিমান ভারতে যাওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অজানা ছিল না।
এখানেই মূল প্রশ্ন। শেখ হাসিনা যদি একজন সাধারণ পলাতকের মতো দেশ ছেড়ে থাকেন, তাহলে তিনি সামরিক বিমান পেলেন কীভাবে? ভারতের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতি কে চেয়েছিল? হিন্দন বিমানঘাঁটিতে অবতরণের ব্যবস্থা কে করেছিল? বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ও বিমানবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের অনুমোদন ছাড়া এমন একটি যাত্রা কি বাস্তবে সম্ভব ছিল?
একজন সাধারণ পলাতক ব্যক্তি রাষ্ট্রীয় সামরিক বিমান ব্যবহার করতে পারেন না। বিদেশি রাষ্ট্রের সামরিক বিমানঘাঁটিও তাঁর জন্য প্রস্তুত রাখা হয় না। দুই দেশের কর্তৃপক্ষের মধ্যে যোগাযোগ ও নিরাপত্তা সমন্বয়ও করা হয় না।
এসব ব্যবস্থা হয় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর জ্ঞাতসারে, তা অস্বীকার করা কঠিন।
কিন্তু রাজনৈতিকভাবে যদি বলা হয়, সেনাবাহিনী জেনেশুনে একজন “পলাতক আসামিকে” রাষ্ট্রীয় বিমানে করে বিদেশে পৌঁছে দিয়েছে, তাহলে সেই বক্তব্যের দায়ও নিতে হবে। তখন শুধু শেখ হাসিনাকে নয়, বিমান ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া কর্মকর্তা, নিরাপত্তা পরিকল্পনাকারী এবং সামরিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েও তদন্তের দাবি উঠবে।
আবার যদি বলা হয়, সে সময় শেখ হাসিনার জীবন তাৎক্ষণিক ঝুঁকির মধ্যে ছিল এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে তাঁকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল, তাহলে ঘটনাটিকে “পলায়ন” বলা সত্য নয়। সেটি রাজনৈতিক স্লোগান হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার বাস্তবতাকে ব্যাখ্যা করে না।
একজন সরকারপ্রধান ক্ষমতা হারিয়ে দেশত্যাগ করলে রাজনৈতিক অর্থে অনেকে সেটিকে পালিয়ে যাওয়া বলতে পারেন। কিন্তু রাজনৈতিক ভাষা এবং আইনি সত্য এক বিষয় নয়। রাজনৈতিকভাবে “পালানো” বলা গেলেও আইনগতভাবে তাঁকে একজন পলাতক আসামি প্রমাণ করতে হলে দেখাতে হবে, তিনি কোনো বৈধ গ্রেপ্তার বা বিচারপ্রক্রিয়া এড়াতে গোপনে দেশ ছেড়েছিলেন কিনা । সামরিক বিমান, সরকারি নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক অনুমতির মাধ্যমে দেশত্যাগের ঘটনা সেই সরল ব্যাখ্যাকে জটিল করে তোলে।
শেখ হাসিনার দেশত্যাগের প্রকৃতি নির্ধারণ করতে হলে শুধু যাত্রীকে নয়, যাত্রার ব্যবস্থা যাঁরা করেছিলেন তাঁদের ভূমিকাও দেখতে হবে।
তাই “শেখ হাসিনা পালিয়ে গেছেন” কথাটি যতবার বলা হবে, ততবারই পাল্টা প্রশ্ন উঠবে তাঁকে সামরিক বিমান দিল কে? ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ করল কে? নিরাপত্তার ব্যবস্থা করল কে এবং পুরো সিদ্ধান্তটির অনুমোদন দিয়েছিল কারা?
এই কারণেই “পালিয়ে যাওয়া” বয়ানটি শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার চেয়ে সেনাপ্রধান ও সংশ্লিষ্ট সামরিক কর্মকর্তাদের জন্য বেশি অস্বস্তিকর । আর তাঁরা যদি শেখ হাসিনাকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে সরিয়ে দিয়ে থাকেন, তাহলে এটি কোন ভাবেই পলায়ন ছিল না। আর যদি তাঁরা জেনেশুনে একজন পলাতক আসামিকে বিদেশে পৌঁছে দিয়ে থাকেন, তাহলে তাঁদের ভূমিকাও জবাবদিহির বাইরে থাকতে পারে না।
সুতরাং ঘটনাটি নিয়ে এসব রাজনৈতিক স্টান্ডবাজি বয়ান বাদ দিন। এটি ব্যক্তিগত পলায়ন ছিলনা, এটি ছিল রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত নিরাপদ স্থানান্তর !!
প্রজন্ম একাত্তর’s Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।





















