ভারতের প্রভাবশালী অনলাইন সংবাদমাধ্যম দ্য প্রিন্ট গতকাল বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) শেখ হাসিনার সম্ভাব্য বাংলাদেশ প্রত্যাবর্তন নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী কলাম প্রকাশ করেছে। কলামটির শিরোনাম ‘শেখ হাসিনাস বাংলাদেশ রিটার্ন ক্যান বি হার লাস্ট পলিটিক্যাল গ্যাম্বল। শি মাস্ট প্ল্যান ইট ওয়েল’। এর লেখক ভারতীয় সাংবাদিক ও লেখক দীপ হালদার।
কলামে তিনি যুক্তি দিয়েছেন, বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা যদি বাস্তবে রূপ নেয়, তবে সেটিই হবে তার জীবনের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি। একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেছেন, এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের আগে অত্যন্ত সুচিন্তিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।
দীপ হালদার তার লেখার শুরুতেই বলেন, রাজনীতি অনেকটা পোকার খেলার মতো। এখানে নিজের কৌশল আগে থেকে প্রকাশ করা হয় না। সেই কারণেই শেখ হাসিনা কেন বারবার প্রকাশ্যে দেশে ফেরার পরিকল্পনার কথা বলছেন, তা তার কাছে স্পষ্ট নয়।
কলামে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। একই সময়ে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম দেশে নিষিদ্ধ। দলের শীর্ষ ও মধ্যম সারির অনেক নেতা বিদেশে অবস্থান করছেন। অনেকে কারাগারে। আবার অনেকে আত্মগোপনে আছেন। এমন পরিস্থিতিতে দেশে ফেরার পরিকল্পনা প্রকাশ্যে বারবার ঘোষণা করার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন লেখক।
দীপ হালদারের মতে, শেখ হাসিনা যদি সত্যিই দেশে ফেরেন, তাহলে ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ছাত্র-নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের পর সেটিই হবে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ঘটনা। কারণ সেই আন্দোলনের মধ্য দিয়েই তার সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল এবং তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পদক্ষেপের আগাম ঘোষণা দিয়ে তার চমক নষ্ট করা কতটা কৌশলগতভাবে সঠিক, সেটিও তিনি প্রশ্ন হিসেবে তুলেছেন।
লেখক আরও জানতে চেয়েছেন, শেখ হাসিনা কি কেবল রাজনৈতিক পরিস্থিতি যাচাই করছেন, নাকি বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজের জন্য আবার একটি জায়গা তৈরি করার চেষ্টা করছেন? কারণ গত দুই বছরে দেশের রাজনীতি অনেকটাই তাকে ছাড়া এগিয়েছে। কলামে দীপ হালদার তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, গত বছরের ৭ জুন তিনি ও তার সহলেখকেরা ‘ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশ: দ্য স্টোরি অব অ্যান আনফিনিশড রেভল্যুশন’ বইয়ের জন্য আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলার সুযোগ পান। শেখ হাসিনা তখন স্পষ্ট করে দেন, সেটি কোনো আনুষ্ঠানিক সাক্ষাৎকার নয়, বরং একটি আলাপচারিতা। সেই আলাপের তথ্য বইয়ে ব্যবহার করা যেতে পারে।
সেই আলোচনায় শেখ হাসিনা দাবি করেছিলেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের আন্দোলন কোনো স্বতঃস্ফূর্ত গণঅভ্যুত্থান ছিল না। তার ভাষায়, সেটি ছিল বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত সন্ত্রাসী হামলা। তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে যেসব ইসলামপন্থী শক্তিকে তিনি নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন, তার বিদায়ের পর তারাই দেশের নিয়ন্ত্রণ নিতে শুরু করেছে। তখন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ছিলেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সেই সময়ও শেখ হাসিনা বলেছিলেন, “ইনশাআল্লাহ, আমি ফিরে আসব।”
দীপ হালদার লিখেছেন, এরপর ভারতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে শেখ হাসিনা একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে আসছেন। চলতি বছরের জুনে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভিকে দেওয়া ই-মেইল সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “সব বাধা ও ষড়যন্ত্র অতিক্রম করে আমি এ বছরই আমার দেশে ফিরব।”
এরপর ৯ জুলাই আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া টেলিফোন সাক্ষাৎকারেও শেখ হাসিনা একই অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, ডিসেম্বরের দিকে তিনি দলীয় সহকর্মীদের নিয়ে বাংলাদেশে ফিরে আত্মসমর্পণ করবেন। তার বক্তব্য ছিল, “ফিরে গেলে তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি হত্যা করতেও পারে। তবুও আমাকে ফিরতেই হবে।”
দ্য প্রিন্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বুধবার নয়াদিল্লির ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়াতে দুই বছর পর প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন শেখ হাসিনা। যদিও তিনি সরাসরি উপস্থিত ছিলেন না, অডিও মাধ্যমে বক্তব্য দেন। সেখানেও তিনি আগের মতোই বলেন, “তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে, এমনকি হত্যা করতেও পারে। তবুও আমাকে ফিরতেই হবে।”
দীপ হালদারের পর্যবেক্ষণ হলো, এই সংবাদ সম্মেলনে নতুন কোনো রাজনৈতিক বার্তা ছিল না। গত কয়েক মাসে ফেসবুক লাইভ, ই-মেইল সাক্ষাৎকার এবং টেলিফোন সাক্ষাৎকারে তিনি যে বক্তব্য দিয়ে আসছিলেন, সেদিনও প্রায় একই কথা পুনরাবৃত্তি করেন। তিনি আবারও দাবি করেন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ের ঘটনা শুধু ছাত্র আন্দোলন ছিল না, বরং বাংলাদেশ দখলের একটি বৃহত্তর ষড়যন্ত্র। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি বাংলাদেশের জনগণের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভার্চ্যুয়ালি যোগ দেন শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়। তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ভারতের পূর্ব সীমান্তে আরেকটি পাকিস্তানে পরিণত হয়েছে।”
দীপ হালদার মনে করিয়ে দেন, চলতি বছরের ২ ফেব্রুয়ারি কলকাতায় তার বই ‘ইনশাআল্লাহ বাংলাদেশ’-এর প্রকাশনা অনুষ্ঠানে ভিডিও বার্তার মাধ্যমে বক্তব্য দেন সজীব ওয়াজেদ জয়। সেখানেও তিনি বলেছিলেন, “ইসলামপন্থী রাজনৈতিক পরিবর্তন সন্ত্রাসবাদের জন্য অবাধ সুযোগ তৈরি করবে এবং পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলবে।”
কলামে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা প্রতিবারই ভারত ও বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমে বড় শিরোনাম হয়েছে। তবে এখন বাংলাদেশের একটি বড় অংশের গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা বিষয়টিকে আগের মতো গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন না। বরং অনেকেই এটিকে রসিকতার বিষয় হিসেবে নিচ্ছেন। লেখকের মতে, এটি শেখ হাসিনা বা তার রাজনৈতিক দলের প্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়া হওয়ার কথা নয়।
দীপ হালদার এ প্রসঙ্গে কয়েকটি সাম্প্রতিক ঘটনার উল্লেখ করেছেন। তিনি লিখেছেন, বুধবার এক পডকাস্টে নেত্র নিউজের সম্পাদক তাসনিম খলিল বলেন, তিনি এক লাখ টাকা বাজি ধরতে প্রস্তুত যে শেখ হাসিনা দেশে ফিরবেন না। পরে সেই পডকাস্টের লিংক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মোবারক হাসান লেখেন, তিনিও সেই বাজিতে আরও এক লাখ টাকা যোগ করতে প্রস্তুত।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত ছাত্রনেতা সাদিক কায়েম ঢাকার রাস্তায় শেখ হাসিনার প্রতীকী ফাঁসির মিছিল বের করেন। সেখানে অংশ নেওয়া মানুষের উল্লাসের কথাও উল্লেখ করেছেন লেখক।
দ্য প্রিন্টের কলামে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিক্রিয়াও তুলে ধরা হয়েছে। ৫ আগস্ট দেওয়া এক বিবৃতিতে শেখ হাসিনাকে “পলাতক, দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী” হিসেবে উল্লেখ করে সরকার জানায়, এমন একটি অনুষ্ঠানের অনুমতি দেওয়ায় তারা গভীর দুঃখপ্রকাশ করছে। বিবৃতিতে বলা হয়, ভারত সরকারকে আগেই জানানো হয়েছিল যে এ ধরনের আয়োজন দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। শেখ হাসিনাকে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম দেওয়া বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক উন্নয়নের জন্যও সহায়ক নয়।
সাংবাদিক নজমুল আহসানের মন্তব্যও উদ্ধৃত করেছেন দীপ হালদার। তার মতে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো বিদেশি দেশের উদ্দেশে সাম্প্রতিক সময়ে এটিই সবচেয়ে কঠোর ভাষার প্রতিক্রিয়া। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, শেখ হাসিনার এই উপস্থিতি দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়ার সম্ভাবনাকে আরও কমিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে বিএনপির নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরও অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। এরপর লেখক প্রশ্ন তুলেছেন, এত আলোচনা ও বিতর্কের পর বুধবারের সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনা
এই প্রশ্নের উত্তরে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রির বক্তব্য বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে দ্য প্রিন্ট। তিনি বলেছেন, চলতি বছরের ডিসেম্বরে দেশে ফেরার পরিকল্পনা শেখ হাসিনার শেষ রাজনৈতিক বাজি হতে পারে। তবে তিনি এটিকে সাহসী সিদ্ধান্ত বলেই মনে করেন। তার ভাষায়, শেখ হাসিনা হয়তো বাংলাদেশের জনমতের পরিবর্তন বুঝেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বীণা সিক্রি আরও বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মানুষ অসন্তুষ্ট। তার মূল্যায়নে, তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারও মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের তুলনায় ভালো অবস্থানে নেই। তিনি দাবি করেন, বর্তমান সরকারের প্রভাবাধীন গণমাধ্যমে জনগণের প্রকৃত মনোভাব পুরোপুরি প্রতিফলিত হচ্ছে না।
তবে আওয়ামী লীগের বিদেশে অবস্থানরত এক জ্যেষ্ঠ নেতা ভিন্ন মূল্যায়ন দিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি দ্য প্রিন্টকে বলেন, শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ একটি মহল তাকে বিশ্বাস করানোর চেষ্টা করছে যে তিনি দেশে ফিরলেই তারেক রহমানের সরকার ভেঙে পড়বে। কিন্তু বাস্তবে এমন সম্ভাবনা খুবই কম।
ওই নেতা বলেন, “আমাদের নেত্রী অস্থির হয়ে উঠেছেন। তিনি টানা দুই বছর ভারতে আছেন। আওয়ামী লীগ ছাড়া দেশে নির্বাচন হয়েছে। একটি নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব পালন করছে। আর আমাদের দলের সদস্যরা হয় কারাগারে, নয়তো ফেসবুকে বসে ১৯৭১ সালের মতো আরেকটি বিপ্লবের আহ্বান জানাচ্ছেন। কঠিন সত্য হলো, নেত্রীর দেশে ফেরার জন্য আমাদের কোনো সুস্পষ্ট পরিকল্পনা নেই। আমরা কেবল পরিস্থিতি যাচাই করছি।”
দীপ হালদার তার বিশ্লেষণের শেষ অংশে লিখেছেন, শেখ হাসিনা যখনই বাংলাদেশে ফিরবেন, সেটি শুধু ভারতীয় উপমহাদেশ নয়, আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেরও প্রধান খবর হবে। তাই এমন প্রত্যাবর্তনের পরিকল্পনা অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে করা প্রয়োজন। তার মতে, যদি এই ঘোষণা কেবল রাজনৈতিক প্রচারণা বা কৌশলগত আলোচনার বিষয় হয়ে থাকে, তাহলে সেটি শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার পুনর্গঠনের শেষ সুযোগকেই দুর্বল করে দিতে পারে।
সে কারণেই তিনি মন্তব্য করেন, শেখ হাসিনার সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনই হতে পারে তার জীবনের শেষ রাজনৈতিক বাজি। আর সেই বাজি খেলতে হলে প্রতিটি পদক্ষেপ অত্যন্ত হিসাব করে নেওয়া উচিত।
দ্য প্রিন্টে
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।






















