, মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

একজীবনে মানুষ অনেক কষ্ট করে, অনেক!

  • প্রকাশের সময় : ০৬:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬
  • ১১ পড়া হয়েছে

অনলাইন সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬

তখন মেডিকেলে নতুন নতুন। গিয়েই ধুম করে উত্তুঙ্গ পড়াশোনা শুরু! পড়াশোনার চাপে আমাদের প্রাণ আঁইঢাঁই করে। আমরা ডিসেকশন হলের সোঁদা সোঁদা অন্ধকার কোনায় বসে ঘ্যানঘ্যান করে লিভারের এনাটমিক্যাল পজিশন পড়ি। পাশেই হাত পা এলিয়ে শুয়ে থাকে ফরমালিনে ডোবানো শুকিয়ে খটখটে হয়ে যাওয়া নিষ্প্রাণ মনুষ্য দেহ। প্রায়ই দেখা যায় স্যারেদের রুমের সামনে শুকনো মুখে গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুর করে আইটেমের পড়া আলোচনা করি আর অপেক্ষা করি কখন ডাক পড়বে। ভারী অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে এই সংকটময় পরিস্থিতিতেও আমাদের মনে খুশীর মেঘেরা ভেসে বেড়ায়। ফুরসত পেলেই কাঁচভাঙা হাসিতে গড়িয়ে পড়ি। সিনিয়র ভাইয়াদের দেখলে মনটা কেমন জানি উদাস হয়ে যায়। পেটের ভেতর খুশীর পোকাগুলো বুড়বুড়ি কাটতে থাকে। একে তাকে ভালো লাগতে থাকে, লাগতেই থাকে। কখনো কখনো কারোকে একেবারে তুমুল ভালো থাকে। মজার ব্যাপার হচ্ছে যাকে ভালো লাগায় আক্রান্ত হই, সেই ভালো লাগায় সবাই একেবারে সংক্রামক রোগের মতো দলবেঁধে আক্রান্ত হই। তাকে দেখলে আমাদের চোখ জুলজুল করে, বুকের ভেতরটা কেমন জানি লাগতে থাকে মনে হয় কে যেন বরফ হিম ঠান্ডা হাতে আঙুল বুলিয়ে গেলো! একেবারে উৎপটাং প্রেমে পড়া যাকে বলে! এই যে দুম করে ভালো লেগে যাওয়া, প্রেমে পড়ে যাওয়া , আমরা বলি ‘ ফলেন হওয়া!’ এভাবে অনেকের প্রতি ফলেন হই, হতেই থাকি!
কিন্তু অবাক কান্ড হচ্ছে এই থরোথরো ভাব বেশিদিন থাকেনা। কিছুদিন পরেই ভালোবাসা ফরমালিনের মতোই উবে যায়! কয়দিন আগের কুসুম কুসুম ভালোবাসা চলে গিয়ে কেমন একটা নিরাসক্তি চলে আসে। কখনো কখনো বিরক্তিও যে আসেনা, তা নয়। আমরা সদলবলে প্রেম থেকে উঠে যাই এবং এর নাম দেই ‘ উঠেন হওয়া!’ আমরা শুধু উপর্যুপরি ফলেন আর উঠেনের চক্রে আবর্তিত হতে থাকি! আমাদের আড্ডায় বসে মাঝে মাঝেই বেশ চিন্তায় পড়ি, আলোচনা করি, এভাবে যদি ফলেন থেকে উঠেন হতে থাকি, তাহলে ভবিষ্যতে আমাদের কি হবে! দীর্ঘ দীর্ঘ দিন ধরে একজনাতেই মজে না থাকলে, কিছু সময়ের পরেই এভাবে বিরক্তি উৎপাদন হলে পরে জীবনে সংসারপাতি কিভাবে করবো, এ নিয়ে আমরা খানিকটা চিন্তাযুক্ত হই মাঝে মাঝেই। একবার আমাদের দস্যু রাণী ফুলন ( এটা তার মেডিকেলিয় নাম!) বন্ধে বাড়ি গিয়ে তার মাকে জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা, আম্মা, এতোদিন ধরে আব্বার সাথে আছেন, আপনার বিরক্ত লাগেনা???
যাই হোক, তারপর তো কত্তো কত্তো সময় গেলো! আমরা আমাদের ফলেন উঠেন এর দিনগুলো পেরিয়ে এসেছি কত্তো আগে! প্রায় সবাই বেশ মন লাগিয়ে সংসার করছি। এখন ভাবি, এই সংসার, এই সম্পর্ক, এইসব বড়ো অদ্ভুত ব্যাপার। সবসময় যে ভালোবাসায় ডুবে থেকে একসাথে থাকা হয়, তা কিন্তু নয়। কখনো কখনো সম্পর্ক অভ্যাস হয়ে যায়, কখনো কখনো হয় দায়। কখনো কখনো শুধুই পাশাপাশি থাকা। এখানে ফট করে উঠেন হওয়ার উপায় নেই। তবুও কখনো কখনো কেউ কেউ একেবারেই উঠেন হয়ে যান। দুজনে একসাথে হলে তাও চলে, কিন্তু একজনা যদি ভাবেন, এবার তবে যাই! তাহলে বড়ো সমস্যা। আরেকজন হয়তো ফলেন হয়েই আছে, মানুষটাকে নিয়ে জীবনের পথ পাড়ি দেবে বলে আকুল হয়ে আছে। সম্পর্ক তো একটা দুচাকার গাড়ি। একটা চাকা গেলেই চিত্তির!
কেউ ছেড়ে চলে গেলে পাশের মানুষটার বড়ো বেদনা হয়, ভীষণ অভিমান হয়। এসবের চাইতেও বেশি হয় অবিশ্বাস! কেন এমন হলো, এই প্রশ্ন মাথা কুটতে থাকে মনের ভেতর। এর সাথে যোগ হয় অসম্ভব অপমান বোধ। সময়ের সাথে মানুষটাকে হয়তো ভোলা যায়, কিন্তু ওই অপমানবোধটা দেয়ালের পলেস্তারার মতো লেগে থাকে মনের ভেতর। মানুষটাকে অগ্রাহ্য করেও করা হয়না যেন। ওই অপমান ভুলতে অবুঝের মতো নিজেকে নিজের কাছে প্রমাণ করতে শুরু করে মানুষ। আর চলে যাওয়া মানুষটা চলে গিয়েও অপমান আর অভিমানে কেমন করে যেন আটকে থাকে, রয়ে যায় মনের কোথায় যেন, ক্ষত হয়ে, বেদনার উৎস হয়ে। সম্পর্ক যেমন শুরু করতে জানা জরুরি, তেমন শেষ করতে জানাও সমান জরুরী। কখন বুঝবেন কারোকে আপনি পুরোপুরি বাদ দিতে পেরেছেন? যখন সেই মানুষটা আপনার অপমান, অভিমান, দুঃখ, শোক বা রাগ, কোনকিছুতেই থাকবেনা, কোনকিছুতেই না। শুধু এই কাজটা পুরোপুরি করতে পারেনা বলে, ভালোভাবে উঠেন হতে পারেনা বলে একজীবনে মানুষ অনেক কষ্ট করে, অনেক!

Shahnoor Sarmin’s Post

 মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।
জনপ্রিয়

একজীবনে মানুষ অনেক কষ্ট করে, অনেক!

প্রকাশের সময় : ০৬:১৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬

অনলাইন সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬

তখন মেডিকেলে নতুন নতুন। গিয়েই ধুম করে উত্তুঙ্গ পড়াশোনা শুরু! পড়াশোনার চাপে আমাদের প্রাণ আঁইঢাঁই করে। আমরা ডিসেকশন হলের সোঁদা সোঁদা অন্ধকার কোনায় বসে ঘ্যানঘ্যান করে লিভারের এনাটমিক্যাল পজিশন পড়ি। পাশেই হাত পা এলিয়ে শুয়ে থাকে ফরমালিনে ডোবানো শুকিয়ে খটখটে হয়ে যাওয়া নিষ্প্রাণ মনুষ্য দেহ। প্রায়ই দেখা যায় স্যারেদের রুমের সামনে শুকনো মুখে গুজুরগুজুর ফুসুরফুসুর করে আইটেমের পড়া আলোচনা করি আর অপেক্ষা করি কখন ডাক পড়বে। ভারী অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে এই সংকটময় পরিস্থিতিতেও আমাদের মনে খুশীর মেঘেরা ভেসে বেড়ায়। ফুরসত পেলেই কাঁচভাঙা হাসিতে গড়িয়ে পড়ি। সিনিয়র ভাইয়াদের দেখলে মনটা কেমন জানি উদাস হয়ে যায়। পেটের ভেতর খুশীর পোকাগুলো বুড়বুড়ি কাটতে থাকে। একে তাকে ভালো লাগতে থাকে, লাগতেই থাকে। কখনো কখনো কারোকে একেবারে তুমুল ভালো থাকে। মজার ব্যাপার হচ্ছে যাকে ভালো লাগায় আক্রান্ত হই, সেই ভালো লাগায় সবাই একেবারে সংক্রামক রোগের মতো দলবেঁধে আক্রান্ত হই। তাকে দেখলে আমাদের চোখ জুলজুল করে, বুকের ভেতরটা কেমন জানি লাগতে থাকে মনে হয় কে যেন বরফ হিম ঠান্ডা হাতে আঙুল বুলিয়ে গেলো! একেবারে উৎপটাং প্রেমে পড়া যাকে বলে! এই যে দুম করে ভালো লেগে যাওয়া, প্রেমে পড়ে যাওয়া , আমরা বলি ‘ ফলেন হওয়া!’ এভাবে অনেকের প্রতি ফলেন হই, হতেই থাকি!
কিন্তু অবাক কান্ড হচ্ছে এই থরোথরো ভাব বেশিদিন থাকেনা। কিছুদিন পরেই ভালোবাসা ফরমালিনের মতোই উবে যায়! কয়দিন আগের কুসুম কুসুম ভালোবাসা চলে গিয়ে কেমন একটা নিরাসক্তি চলে আসে। কখনো কখনো বিরক্তিও যে আসেনা, তা নয়। আমরা সদলবলে প্রেম থেকে উঠে যাই এবং এর নাম দেই ‘ উঠেন হওয়া!’ আমরা শুধু উপর্যুপরি ফলেন আর উঠেনের চক্রে আবর্তিত হতে থাকি! আমাদের আড্ডায় বসে মাঝে মাঝেই বেশ চিন্তায় পড়ি, আলোচনা করি, এভাবে যদি ফলেন থেকে উঠেন হতে থাকি, তাহলে ভবিষ্যতে আমাদের কি হবে! দীর্ঘ দীর্ঘ দিন ধরে একজনাতেই মজে না থাকলে, কিছু সময়ের পরেই এভাবে বিরক্তি উৎপাদন হলে পরে জীবনে সংসারপাতি কিভাবে করবো, এ নিয়ে আমরা খানিকটা চিন্তাযুক্ত হই মাঝে মাঝেই। একবার আমাদের দস্যু রাণী ফুলন ( এটা তার মেডিকেলিয় নাম!) বন্ধে বাড়ি গিয়ে তার মাকে জিজ্ঞেস করলো, আচ্ছা, আম্মা, এতোদিন ধরে আব্বার সাথে আছেন, আপনার বিরক্ত লাগেনা???
যাই হোক, তারপর তো কত্তো কত্তো সময় গেলো! আমরা আমাদের ফলেন উঠেন এর দিনগুলো পেরিয়ে এসেছি কত্তো আগে! প্রায় সবাই বেশ মন লাগিয়ে সংসার করছি। এখন ভাবি, এই সংসার, এই সম্পর্ক, এইসব বড়ো অদ্ভুত ব্যাপার। সবসময় যে ভালোবাসায় ডুবে থেকে একসাথে থাকা হয়, তা কিন্তু নয়। কখনো কখনো সম্পর্ক অভ্যাস হয়ে যায়, কখনো কখনো হয় দায়। কখনো কখনো শুধুই পাশাপাশি থাকা। এখানে ফট করে উঠেন হওয়ার উপায় নেই। তবুও কখনো কখনো কেউ কেউ একেবারেই উঠেন হয়ে যান। দুজনে একসাথে হলে তাও চলে, কিন্তু একজনা যদি ভাবেন, এবার তবে যাই! তাহলে বড়ো সমস্যা। আরেকজন হয়তো ফলেন হয়েই আছে, মানুষটাকে নিয়ে জীবনের পথ পাড়ি দেবে বলে আকুল হয়ে আছে। সম্পর্ক তো একটা দুচাকার গাড়ি। একটা চাকা গেলেই চিত্তির!
কেউ ছেড়ে চলে গেলে পাশের মানুষটার বড়ো বেদনা হয়, ভীষণ অভিমান হয়। এসবের চাইতেও বেশি হয় অবিশ্বাস! কেন এমন হলো, এই প্রশ্ন মাথা কুটতে থাকে মনের ভেতর। এর সাথে যোগ হয় অসম্ভব অপমান বোধ। সময়ের সাথে মানুষটাকে হয়তো ভোলা যায়, কিন্তু ওই অপমানবোধটা দেয়ালের পলেস্তারার মতো লেগে থাকে মনের ভেতর। মানুষটাকে অগ্রাহ্য করেও করা হয়না যেন। ওই অপমান ভুলতে অবুঝের মতো নিজেকে নিজের কাছে প্রমাণ করতে শুরু করে মানুষ। আর চলে যাওয়া মানুষটা চলে গিয়েও অপমান আর অভিমানে কেমন করে যেন আটকে থাকে, রয়ে যায় মনের কোথায় যেন, ক্ষত হয়ে, বেদনার উৎস হয়ে। সম্পর্ক যেমন শুরু করতে জানা জরুরি, তেমন শেষ করতে জানাও সমান জরুরী। কখন বুঝবেন কারোকে আপনি পুরোপুরি বাদ দিতে পেরেছেন? যখন সেই মানুষটা আপনার অপমান, অভিমান, দুঃখ, শোক বা রাগ, কোনকিছুতেই থাকবেনা, কোনকিছুতেই না। শুধু এই কাজটা পুরোপুরি করতে পারেনা বলে, ভালোভাবে উঠেন হতে পারেনা বলে একজীবনে মানুষ অনেক কষ্ট করে, অনেক!

Shahnoor Sarmin’s Post

 মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।