
অলাইন শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কি আইন ও বিচারের উর্ধ্বে ?
প্রশ্ন হচ্ছে : বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে এই অধিকার কে দিয়েছে ?
সেনাবাহিনী আইন 1952 অনুসারে , এটা সম্পূর্ণ বেআইনি । আজকে যদি সেনাবাহিনীর কোন মেজর অপহরণ হয় , তবে সেনাবাহিনী কারো বাড়িতে হামলা চালাতে পারবে?
পৃথিবীর কোথাও এটা সম্ভব না হলেও বাংলাদেশে সম্ভব। সেনাবাহিনীর কোন বিচার নেই। বিচার করলে আপনি খারাপ!
এজন্য মেজর ডালিম , মেজর নূর চৌধুরী সহ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তাকে সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত ও বদলি করা হয়। এই কাজটি করেছিলেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল শফিউল্লাহ।
১ বেঙ্গল লান্সার্স এই নামটি মনে রাখুন। এরাই কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যায় অংশ নিয়েছে।এই কমান্ডের অধিনায়ক ( কমান্ডার ) ছিলেন কর্ণেল মোমেন। তাকে না জানিয়ে এবং সেনাবাহিনীর প্রধান ও উপপ্রধানকে না জানিয়ে , সেনাবাহিনীর অস্ত্রাগার লুট করে সেনাবাহিনীর এসব উচ্ছৃঙ্খল কর্মকর্তাকে বেসামরিক এলাকায় হামলা ও ভাংচুরের অনুমতি কে দিয়েছে?
এদের এত ক্ষমতার উৎস কোথায় 
মজার বিষয় হচ্ছে – এই ইস্ট বেঙ্গল ল্যান্সার্স এর সেকেন্ড ইন্ড কমান্ড ছিলেন মেজর সৈয়দ ফারুক রহমান। বঙ্গবন্ধু হত্যার খুনীদের অন্যতম।এই ব্যাটালিয়নটি সম্পূর্ণ গঠিত হয়েছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ” ২৯ ক্যাভালরি” রেজিমেন্টে কর্মরত বাঙালি সেনাসদস্যদের নিয়ে। মিশরের প্রেসিডেন্ট ও সোভিয়েত রাশিয়া থেকে পাওয়া ৩০ টি টি -৫৪ ট্যাংক ছিল এদের শক্তি। এটিই ছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া কোর।এই বেঙ্গল লান্সার্স এর অধিকাংশ সেনাবাহিনী ছিলো ১৯৭৪ সালে পাকিস্তান ফেরত সেনাবাহিনী। এই ১৯৭৪ সালের ২২ জুন ” মেজর ডালিমের বউ ধর্ষণ ” নাটক।এই রেজিমেন্টের বঙ্গবন্ধুর দুই খুনি কর্ণেল ফারুক রহমান ও খন্দকার আব্দুর রশিদ দু’জনেই ছিলেন পাকিস্তান ফেরত কর্মকর্তা। এই পুরো ক্যান্টনমেন্ট ক্রু দের বড় একটা অংশই ছিল মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ না করা পাকিস্তান সেনাবাহিনী। এরাই বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ ও নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে।
গাজী গোলাম মোস্তফা সেই বিয়ের অনুষ্ঠানে যাননি। এটা ডালিমের বইতেও স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে। সেই বিয়েতে গিয়েছিলো গাজী গোলাম মোস্তফার স্ত্রী ও কিশোর সন্তান। সেখানে উপস্থিত অধিকাংশ ছিলেন সেনাবাহিনীর লোকজন। সামান্য এই চুল টানাটানির ঘটনা নিয়ে গাজী গোলাম মোস্তফাকে কেন সেখানে অস্ত্র সহ বডিগার্ড নিয়ে ডালিম ও তার বউকে তুলে আনতে হয়েছিল। তার মানে ” ডাল ম্যা কুচ তো কালা হ্যায়” ।
এরা গাজী গোলাম মোস্তফার বাড়িতে সেনাবাহিনীর কার অনুমতি নিয়ে গিয়েছিল?
এদের কেউই সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলো না। তাহলে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ভঙ্গের এই দুঃসাহস ওরা কোথায় পেলো 
মেজর ডালিমের অপহৃত হওয়ার খবর প্রথম পেয়েছেন মেজর নূর চৌধুরী।নূর চৌধুরী সেই বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলো না। সে তখন ছিল সেনানিবাসে। মেজর ডালিম তার বইয়ে লিখেছেন , উপস্থিত সেনা কর্মকর্তারা নুর চৌধুরীকে এই বিষয়ে জানিয়েছেন। মজার বিষয় হচ্ছে – যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে এই মেজর নূর চৌধুরী ও মেজর ডালিম দু’জনেই একসাথে পাকিস্তান থেকে পালিয়ে ভারতে এসেছিলেন। এদের সাথে আরও এসেছিলেন লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান ও নুরুল ইসলাম শিশু!
এই সেই নুরুল ইসলাম শিশু , যে ১৯৭৩ সালেই লিবিয়ার বঙ্গবন্ধুর হত্যার পরিকল্পনা করেছিল জামায়াতের গোলাম আযমের সাথে মিলে।এই নুরুল ইসলাম শিশু হচ্ছেন জিয়াউর রহমানের বিশ্বস্ত সঙ্গী। জিয়াউর রহমান তাকে বঙ্গবন্ধু হত্যার পুরস্কার হিসেবে বন ও কৃষিমন্ত্রী বানিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর খুনিদের ভিআইপি মর্যাদা দিয়ে বরণ করেছিল লিবিয়ার গাদ্দাফি। নর্দমার ভেতর লুকিয়েও তার শেষ রক্ষা হয়নি
।
এইবার আরেকটি মজার বিষয় শুনোন
ডালিমের একদল আহম্মক ভক্ত ডালিমের বউ ধর্ষণ ও অপহরণের জন্য বঙ্গবন্ধুর পুরো পরিবার হত্যা করা হয়েছে এই নাটক দীর্ঘ ২৩ টি বছর বাংলাদেশে ভয়াবহ গুজব আকারে চালিয়েছিল। কিন্তু সেই গুজবের পর্দা ফাঁস করে দিয়েছিলো লন্ডনের টিভিতে বিশ্ববিখ্যাত সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাস ও বঙ্গবন্ধুর দুই খুনি কর্ণেল রশিদ ও ফারুক রহমানের একটি লাইভ সাক্ষাৎকার। ১৯৭৬ সালে বিশ্বের কয়েকশ কোটি দর্শকের সামনে বঙ্গবন্ধুর খুনি কর্ণেল রশিদ লন্ডনের আইটিভি তে স্বীকার করেছে –
“১৯৭৩ সালের শেষদিকেই বঙ্গবন্ধুর সরকারকে উৎখাত করার জন্য তারা এক তৈরি করছিলেন।১৯৭৩ সাল থেকেই বঙ্গবন্ধুর সরকার উৎখাতের জন্য খন্দকার মোশতাক ঢাকা সেনানিবাসের বঙ্গবন্ধুর খুনি রশিদ , ফারুক ও ডালিম এবং জিয়াউর রহমানের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। তাদের এই যোগাযোগের সেতু তৈরি করে দিয়েছিলো তৎকালীন মার্কিন দূতাবাস।”
১৯৭৩ সালে পাকিস্তান থেকে যখন সেনা সদস্য ও কর্মকর্তারা বাংলাদেশে আসা শুরু করেন তখনি মেজর ফারুক রহমান মার্কিন দূতাবাসের কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করে গোপনে বঙ্গবন্ধু হত্যার জন্য অস্ত্র ক্রয়ের চেষ্টা করছিলেন। মার্কিন সিআইএ এর গোপন নথিতে ১৯৭৩ সালের শুরুর দিকে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্য মেজর ফারুক রহমান গোপনে অস্ত্র কেনার জন্য মার্কিন দূতাবাসের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ করছিলেন।১৯৭৩ সালেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্য সিআইএ স্টেশন চিফ ফিলিপ চেরি এর সাথে খন্দকার মোশতাক ও সেনাবাহিনীর এসব উচ্ছৃঙ্খল কর্মকর্তা বৈঠক করেছেন , তা মার্কিন গোপন নথিতে উঠে এসেছে। মার্কিন কুটনৈতিক ইউজেন বুস্টারের সাথেও ডালিমরা ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্য কয়েক দফা বৈঠক করেছেন। ১৯৭৬ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় ডেমোক্রেটিক প্রার্থী জিমি কার্টার ১৯৭৫ সালের বঙ্গবন্ধু হত্যা ও চিলির সালভাদর হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার জন্য মার্কিন সিআইএ এর কঠোর সমালোচনা করেছিলেন।
পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কর্মরত থাকার সময় জিয়াউর রহমানের সাথে পরিচয় ছিল মেজর ডালিমের। দু’জনেই তখন বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্য কোরআন ছুঁয়ে শপথ করেছেন।১৯৬৯ সালের ২৯ শে ডিসেম্বর মার্কিন কনস্যুলেটে থেকে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক বার্তায় মুজিবকে হত্যার ষড়যন্ত্রের কথা স্পট উল্লেখ ছিল।
এই গল্পের মোড দিলেন ” ডালিমের বউ ধর্ষণ ও অপহরণ” । মাত্র কয়েক ঘন্টায় সেনাবাহিনী গাজী গোলাম মোস্তফার বাড়িতে হাজির। তার বউ ও সন্তানকে আটকে রেখে তার বাড়ি ভাংচুর হয়। সেনাপ্রধান শফিউল্লাহ ফোন দিলে গাজী গোলাম মোস্তফার বাড়িতে সেই কলটি রিসিভ করেছিলেন বঙ্গবন্ধুর খুনি মেজর মমিন।তারা আগে থেকেই সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল।
বঙ্গবন্ধু ১৯৭৩ সালের আরব – ইসরায়েল যুদ্ধে মিশরকে সমর্থন ও সাহায্য পাঠানোয় মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত বঙ্গবন্ধু সরকারকে ৩২ টি টি -৫৪ ট্যাঙ্ক উপহার দিয়েছিলেন, যা ১৯৭৪ সালের জুন মাসেই ইস্ট বেঙ্গল ল্যান্সার্স এর মেজর ডালিম , মেজর ফারুক ও রশিদের হাতে আসে।এই জুন মাসের ২২ তারিখ সামান্য চুল টানাটানির ঘটনা নিয়ে ডালিমের বউ ধর্ষণ নাটক। এই নাটকের ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা আরও বহু আগেই হয়েছিল। শুধু বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্য ট্যাঙ্ক ছিলো না। ট্যাঙ্ক হাতে আসার সেদিন বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরিকল্পনা ও ধানমন্ডি বত্রিশ নাম্বার আক্রমণের প্রস্তুতি ছিল মেজর ফারুক ও খুনি রশিদের। কিন্তু ডালিম ও ডালিমের বউ আটক থাকার কারণে সেদিনের সেই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা মাঠে মারা যায়। সেদিন বঙ্গবন্ধুর খুনীরা ট্যাঙ্ক নিয়ে গাজী গোলাম মোস্তফার বাড়ি আক্রমন করেছিল। বুঝতেই পারছেন, একজন গাজী গোলাম মোস্তফার বাড়ি আক্রমণের জন্য ট্যাঙ্কের কোন প্রয়োজন হয় না। ওদের সেদিনের উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধুকে হত্যা। এটাই সত্য।
সেনাবাহিনীর রাজনীতি – পর্ব:০২
সত্য সবসময় সুন্দর।
৬ ভাদ্র , ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২১ আগষ্ট , ২০২৬
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।





















