
অনলাইন, মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬
মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ইতিহাসের অন্যতম দূরদর্শী ও সাহসী সামরিক নেতৃত্ব। তিনি ছিলেন ১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার; তাঁর সাহসিকতায় ১৯৭১ সালে চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও নোয়াখালীর বিস্তীর্ণ অঞ্চলে পাকিস্তানি হানাদারদের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠে দুর্ধর্ষ প্রতিরোধ।
২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী যখন নিরীহ মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার ছক কষছিল, রফিকুল ইসলাম ঠিক তখনই চালান এক দুঃসাহসিক অগ্রিম আক্রমণ (প্রি-এম্পটিভ অ্যাটাক)। তাঁর এই তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের ফলে নগরীতে হানাদারদের রক্তক্ষয়ী পরিকল্পনার গতি থমকে যায়। এরপর সীমিত সম্পদ নিয়েই তিনি টানা ৩৯ দিন চট্টগ্রাম ও এর আশেপাশের এলাকা শত্রুমুক্ত রাখতে লড়াই চালান। বীরত্বপূর্ণ ও কৌশলগত এই অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননা ‘বীর উত্তম’-এ ভূষিত করে।
রফিকুল ইসলামের জন্ম ১৯৪৩ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর, চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি উপজেলার নাওড়া গ্রামে। বাবা আশরাফ উল্লাহ ছিলেন স্কুল পরিদর্শক এবং মা রহিমা বেগম সামলাতেন সংসার। ছয় ভাই-বোনের পরিবারে রফিকুল ছিলেন সবার বড়। বাবার চাকরির কারণে দেশের নানা প্রান্তে তাঁর শৈশব কেটেছে।
শিক্ষাজীবনে তিনি কৃতিত্বের সাক্ষর রাখেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অন্নদা মডেল হাই স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক সম্পন্ন করেন। এরপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে। তবে অর্থনীতির পাঠ শেষ করার আগেই দেশের প্রতি দায়িত্ব ও সামরিক জীবনের টান তাঁকে টেনে নেয় পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে। ১৯৬৩ সালে তিনি সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ১৯৬৫ সালে কাকুল মিলিটারি একাডেমি থেকে বিএসসি ডিগ্রি অর্জনের পাশাপাশি ইঞ্জিনিয়ারিং কোরে কমিশন লাভ করেন। সামরিক পদে থেকেও তিনি লেখালেখি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন; কাজ করেছেন ইউপিপি (UPP) সংবাদসংস্থায়।
১৯৬৮ সালে লাহোর থেকে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে বদলি হয়ে আসার পর রফিকুল ইসলাম যশোর সেনানিবাসে রেজিমেন্ট অ্যাডজুট্যান্ট, পরবর্তীতে দিনাজপুরে ইপিআরের ৮ নম্বর উইংয়ের অ্যাসিসট্যান্ট উইং কমান্ডার এবং ১৯৭০ সালের শুরুতে চট্টগ্রাম সেক্টর ইপিআর হেডকোয়ার্টারে অ্যাডজুট্যান্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
১৯৭১ সালের শুরুতেই দেশের বাতাস ভারী হতে থাকে। ২৮ ফেব্রুয়ারি এমভি সোয়াত জাহাজে করে হাজার হাজার টন অস্ত্রশস্ত্র এবং বিমানে করে সৈন্য আসতে দেখলে তাঁর বুঝতে বাকি থাকে না যে একটি পরিকল্পিত গণহত্যার নীলকশ বাস্তবায়িত হতে চলেছে। তিনি দেরি না করে নিজের অধিনস্থ বাঙালি ইপিআর অফিসার ও সৈনিকদের মানসিকভাবে প্রস্তুত করতে থাকেন।
২৪ মার্চ রাতেই তিনি কার্যত বিদ্রোহের প্রস্তুতি চূড়ান্ত করেন এবং ২৫ মার্চ কালরাতে তা প্রকাশ্যে রূপ নেয়। হালিশহরে ইপিআর সদরদপ্তর নিয়ন্ত্রণে নিয়ে অবাঙালি সামরিক কর্মকর্তাদের আটক করার পাশাপাশি রেলওয়ে হিলে তৈরি করা হয় অস্থায়ী হেডকোয়ার্টার।
তাঁর পরিকল্পনা ছিল ইপিআর, ৮ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট এবং সেনানিবাসের সব বাঙালি সৈন্যকে এক ছাতার নিচে এনে চট্টগ্রাম বন্দর ও এয়ারফিল্ড পুরোপুরি নিজেদের দখলে নেওয়া। তবে তৎকালীন কিছু নেতৃত্বের সমন্বয়হীনতা এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তের অভাবে পরিকল্পনাটি কিছুটা ধাক্কা খায়। মেজর জিয়াউর রহমান বাহিনী নিয়ে কালুরঘাটের দিকে সরে গেলে পাকিস্তানি বালুচ রেজিমেন্ট সেনানিবাসে অবস্থানরত সহস্রাধিক বাঙালি সদস্যকে নির্বিচারে হত্যা করে। তবে রফিকুল ইসলাম হতোদ্যম না হয়ে অল্প সৈন্য নিয়েই শহরের প্রতিরোধ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন।
৩৯ দিনের অসম লড়াই ও ১ নম্বর সেক্টর
২৫ মার্চ থেকে ২ মে—টানা ৩৯ দিন রফিকুল ইসলামের কৌশলী নেতৃত্বে বীর বাঙালি সেনারা পাকিস্তানি বাহিনীর নাকাল দশা তৈরি করে। বিশেষ করে কুমিল্লা থেকে আসা ব্রিগেডিয়ার ইকবাল শফির শক্তিশালী বহরকে কুমিরার অ্যামবুশে প্রতিহত করার ঘটনাটি মুক্তিযুদ্ধে চিরস্মরণীয় হয়ে আছে। ঐ একটি যুদ্ধেই ৭২ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হয়, যার ফলে পাক সেনারা শহরজুড়ে তাৎক্ষণিক গণহত্যা চালানোর সাহস হারিয়ে ফেলে। রফিকুল ইসলাম পরবর্তী সময়ে সঠিকভাবেই পর্যবেক্ষণ করেছিলেন, “সেদিন যদি আমরা আগেই আঘাত না হানতাম, তবে আমাদের কাউকেই তারা বাঁচিয়ে রাখত না।”
মে মাসের শুরুতে রসদ ও গোলাবারুদের সংকটে বাধ্য হয়ে তিনি রামগড় সীমান্ত দিয়ে ভারতের সাব্রুমে অবস্থান নেন, যা পরবর্তীতে ১ নম্বর সেক্টরের সদরদপ্তর (হরিনা) হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৭১ সালের মে থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি ১ নম্বর সেক্টর কমান্ডার হিসেবে মেধা ও যোগ্যতার পরিচয় দেন। অবশেষে ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর, রফিকুল ইসলামের উপস্থিতিতেই চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা ওড়ানো হয়।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালে তিনি সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন। সামরিক পোশাক খুলে আবার কলম তুলে নেন; ইংরেজি দৈনিক ‘দি পিপলস ভিউ’-এর সহযোগী সম্পাদক পদে কাজ শুরু করার পাশাপাশি দেশের প্রধান প্রধান পত্রিকায় কলাম লিখতে থাকেন। ১৯৮১ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ঐতিহ্যবাহী হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল থেকে সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রাম সম্পন্ন করেন।
১৯৯০ সালে এরশাদবিরোধী আন্দোলনের পর গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারে তিনি উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) হিসেবে নৌ-পরিবহন এবং বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় পরিচালনা করেন। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগে যোগ দিয়ে চাঁদপুর-৫ আসন থেকে বারবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনীতির পাশাপাশি তাঁর সাহিত্যচর্চাও পাঠকপ্রিয়। তাঁর লিখিত বিখ্যাত গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে:
* এ টেল অফ মিলিয়ন্স (১৯৭৪)
* লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে (১৯৮১)
* মুক্তির সোপান তলে (২০০১)
গবেষণা ও সাহিত্যে অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৯ সালে তাঁকে ‘বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার’-এ ভূষিত করা হয়। একজন অকুতোভয় রণনেতা থেকে শুরু করে সফল রাষ্ট্রনায়ক ও লেখক—রফিকুল ইসলামের জীবনের প্রতিটি অধ্যায় বাংলাদেশের ইতিহাসে সোনাঝরা হরফে লেখা থাকবে।
Chowdhury Rupon’s Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।





















