, মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

আমি কি অন্ধ হয়ে গিয়েছি মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলে যাবে, মুক্তিযোদ্ধার তালিকা করবে

  • প্রকাশের সময় : ১০:০৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬
  • ৩৫ পড়া হয়েছে

অনলাইন শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬

আমি কি অন্ধ হয়ে গিয়েছি, নাকি চোখ থেকেও চোখ দিয়ে দেখছি না? আমি কি স্মৃতি থেকে হারিয়ে গিয়েছি, নাকি স্মৃতিতে থেকেও বিস্মৃতিকে মেনে নিয়েছি? কিন্তু চোখতো এখনো দেখতে পাচ্ছে; রণাঙ্গনের একজন মুক্তিযোদ্ধার দিকে সে তাকিয়ে আছে। স্মৃতি-তো এখনো জাগ্রত আছে; আগুন আলোর উন্মাতাল সেই দিনগুলোর কথা সে স্মরণে রেখেছে। তাহলে কেন এমনতর প্রশ্নের সদুত্তর পাচ্ছি না? তবে কি রাজনীতি আজ অন্ধ হয়ে গিয়েছে, নাকি চোখ থেকেও সেই রাজনীতি থেকে সরে গিয়েছে তার স্মৃতি, তার সত্তা কিংবা তার ভবিষ্যত! সম্ভবত আমার দেশ তার সত্তা হারিয়ে ফেলেছে অথবা বিকিয়ে দিয়েছে এবং সেকারণে তার কোনো অতীত নেই, ভবিষ্যত-ও নেই। তাই যদি না হবে, তবে কেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলে যাবে, মুক্তিযোদ্ধার তালিকা প্রণয়নে তারা সহযোগীতার হাত প্রসারিত করবে! আর আমাদের মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী মহোদয়ও কেনই-বা তার সাথে সরবে কিংবা নিরবে সন্মতি জানাবে? বাংলা ট্রিবিউনের খবর অনুয়ায়ী যেহেতু মাননীয় মন্ত্রী সরাসরি বিষয়টিকে উড়িয়ে দেননি, অসন্মতির বিষয়টিকেও সেক্ষেত্রে উড়িয়ে দেয়া যায় নি। এক্ষণে ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ সিনেমার গানটির কথা মনে পড়ছেঃ হায়রে কপাল মন্দ, চোখ থাকিতে অন্ধ! এ জীবন জ্বইলা পুঁইড়া শেষ তো হইলো না। হ্যাঁ, চোখ থাকিতেও আমাদের রাজনীতি হয়তোবা অন্ধ হয়ে গিয়েছে কিন্তু এ জীবন এখনো যেহেতু জ্বইলা পুইড়া শেষ হয়ে যাই নি, তাই একথাও বলতে আমরা দ্বিধা করবো না যে, আমাদের দেখা রণাঙ্গনের বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা মাসুদ হোসেন আলমগীর তালিকাভুক্ত একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং নতুন করে তাঁকে তালিকাভুক্ত করতে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে সপ্তম নৌবহর পাঠিয়ে দেয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কোন সহযোগীতার প্রয়োজন পড়বে না। আমাদের তালিকায় হয়তোবা কিছু ভুলভ্রান্তি আছে কিন্তু সেটা এমন কিছু নয় যে, আমরা নিজেরা তা ঠিক করতে পারবো না। আমরা চাইলেই পারবো। তবে তাদের সহয়োগীতার এই আশ্বাসের মধ্য থেকে যেটা বুঝবো, সেটা অন্য কিছু নয়, আমাদের জাতিগত উত্থানের সবচাইতে মহৎ এই অর্জন- মুক্তিযুদ্ধ আজ জাতিবিরোধী বাস্তবিক অর্থে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির কাছে হুমকির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের বিভেদের ফাঁক গলে আড়াআড়ি থেকে উঠে এসে খাড়াখাড়ি দাঁড়ানো এমন তমসাচ্ছন্ন সময়ে নিজেদেরকে নতুন করে চিনে নেয়ার সময় এসেছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা নোবেলভাইয়ের জন্মদিনকে সামনে রেখে আমরা নতুন করে আমাদের জাতিসত্তাকে চিনে নেবো এবং চিনে নেবার সাথে সাথে দেশমাতৃকার বিষন্ন বদনে যেমন কাঁদবো, কান্নার সেই শোককে শক্তিতে পরিণত করে নতুন করে আবারো সংকল্পবদ্ধ হবো।
শোনা যাক তবে সেইসব কথকথা, ইতিহাস-সাহিত্যের পরিক্রমায় যার সাথে জড়িয়ে রয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধা নোবেলভাইদের বীরত্বগাঁথা।
জাতীয়তাবাদী রাজনীতির একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তার একটা সুনিদিষ্ট প্রতিপক্ষ থাকতে হবে। সেই প্রতিপক্ষের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জাতীয় বীরদেরকে নিরাপোষ লড়াই করতে হবে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ এবং বিকাশের প্রক্রিয়ায় দেখা যায়, ইংরেজ শাসনের সুবিধা নিয়ে গড়ে উঠা এখানকার বাঙালি জাতীয়তাবাদ সুনিদিষ্টভাবে ইংরেজকে শত্রু জ্ঞান করলেও সুবিধা হারানোর ভয়ে সেখান থেকে তারা সরে এসে প্রাগৈতিহাসিক কালের বীরদেরকে সামনে এনে দৃশ্যের বাইরের পরাভূত ‘যবন’দেরকে চিন্হিত শত্রুতে পরিনত করেছে। বাংলা সাহিত্যের সম্রাট হিসেবে অভিহিত বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায় জাতীয়তাবাদী অনুপ্রেরণা থেকে যে “আনন্দমঠ” উপন্যাসটি লিখেছিলেন, সেটা যখন তাঁর সুযোগ্য সম্পাদনায় বঙ্গদর্শন পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল, সেখানে তখন ইংরেজকেই সরাসরি শত্রু হিসেবে চিন্হিত করা হলেও পরবর্তিতে যখন বই আকারে প্রকাশিত হলো, ইংরেজের জায়গায় সেখানে “মার মার যবন মার” গ্রন্থিত হতে দেখা গেল। ফলে ইংরেজবিরোধী বাঙালী জাতীয়তাবাদ সাম্প্রদায়িকতার নষ্ট নিগড়ে আবদ্ধ হয়ে পড়লো। ওদিকে আবার জাতীয়তাবাদের পক্ষে বীর খুঁজতে গিয়ে আশেপাশে কিংবা নিকটেও কাউকে না পেয়ে বাঙলাসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য ‘মেঘনাদ বধ’এর রচয়িতা মাইকেল মধুসূদন দত্ত চলে গেলেন লঙ্কার রাক্ষসপুরীতে। অপরদিকে আরেক মহাকাব্যের ‘পদ্মিনী উপাখ্যান’এ রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাঙলা-বিহার-উড়িষ্যা ছাড়িয়ে রাজস্হানে যেতে হলো। সেখানে রাজপুতদের কাছেও যা ছিল পাঠান-রাজপুত দ্বন্দ্ব, রঙ্গলালের হাতে পড়ে সেটাই হিন্দু-মুসলমানদের সংঘর্ষে রূপায়িত হলো। লক্ষনীয় বিষয় যে, যে সময়ে রঙ্গলালের এই মহাকাব্য প্রকাশিত হলো, সেই ১৮৫৭ সালেেই ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম ব’লে বিবেচিত “সিপাহী বিদ্রোহ” সংগঠিত হতে দেখা গেল। সিপাহীর পোশাক পড়ে কৃষকের বিদ্রোহসম ঐতিহাসিক সেই অসাম্প্রদায়িক বিদ্রোহে তৎকালীন বাঙালি বিকশিত শ্রেনীর তেমন কোন ভূমিকা ছিল না। এই না থাকার পেছনে বীরত্বের যে অভাব প্রতিয়মান হয়েছে, তারই প্রতিভাসে ঘটনার তিনবছর পরে প্রকাশিত মধুসূদনের মেঘনাদ বধে বীর খুঁজতে কবিকে যেতে হলো রাবণের কাছে। এভাবেই বীরহীন স্বদেশের বুকে ইংরেজের বিপরীতে অদৃশ্যের যবনের কল্পিত ত্রাসে শেষপর্যন্ত বাঙালির জাতীয়তাবাদ হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বে রূপ নিয়ে সাতচল্লিশে এসে দেশটাকেই বিভক্ত করে ফেললো।
বিভক্ত সেই দেশের এদেশের আমরা ইংরেজের অবর্তমানে যে পাকিস্তানীদের অংশী হলাম, জন্মের পাঁচবছরের মাথায় এসে আবার সেই আমরাই বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অকৃত্রিম এবং অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হলাম। চিন্হিত শত্রু হিসেবে পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রকে চিন্হিত করলাম এবং বীর বাঙালির নেতা হিসেবে মওলানা ভাসানী আর শেখ মুজিবুর রহমানকে বরমাল্য পড়ালাম। পরবর্তিতে উগ্রপন্হী কম্যুনিষ্টদের ছত্রছায়ায় মওলানা ভাসানী জাতীয় মুক্তির বিষয়টিকে পাশ কাটিয়ে গেলে শেখ মুজিবুর রহমান বঙ্গবন্ধু’র মুকুট প’ড়ে একাই অনেককে সাথে ক’রে সে দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে কাঁটাবিছানো পথ মাড়িয়ে-এগিয়ে গোটা জাতিকে স্বাধীনতার স্বর্ণদুয়ারে পৌছে দিলেন। সেখানের রক্ত আর অশ্রুর সাগরভেদী প্রতিজ্ঞা নিয়ে অনেক-অজস্র যেসব জাতীয় বীর বেড়িয়ে এলেন, মাসুদ হোসেন আলমগীর নোবেল’ তাদেরই অন্যতম একজন ছিলেন।
না, তিনি কোন উত্তম, বিক্রম কিংবা প্রতিকী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। লক্ষাধিক যোদ্ধার ভেতর থেকে ক’জনারই বা সেরকমের গেজেটেড-অমূল্য জোটে। তাছাড়া স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতারের ঘোষণার পরেও স্বাধীন স্বদেশ যেখানে সিলেটের প্রবাদপ্রতিম-মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি দাসকে বীরশ্রেষ্ঠ’র সন্মান দেয়নি, নিরবধি বয়ে চলা নানাকষ্টের সেইসব ডালপালা নিয়ে বেঁচে থাকা তাহাদের মাঝে একজন নোবেলের কাছেও রণাঙ্গনের এমন কিছু কিছু জীবনবাজী আছে; শিহরণে-আতংকে, উত্তেজনা আর আক্রোশে সেগুলি বিশ্বসেরা সিনেমার একেকটি এটিসোডের কাছাকাছি। সবে তারুণ্যের তিমিরবিনাশী রোদ্দুরে ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারের এই তুমুল তরুণ সাত-নং সেক্টরের বিখ্যাত অধিনায়ক মেজর নাজমুল হকের প্রশিক্ষণে কেবলই গেরিলা কায়দায় শত্রুহনন আর সমুখের অগ্রায়ণে কখনো পাকিস্তানী হায়েনাদের নিশ্ছিদ্র মৃত্যুগুহা থেকে ভারী অস্ত্রকাঁধে বেড়িয়ে আসা বীর, কখনো আবার একাই একশ’র বেশে পিশাচ হননের তীব্র তির। শত্রুর জীপে গ্রেনেড ছুড়িয়ে কোথাও তিনি নির্ঘাৎ বাজপাখী, রাতের নির্জন গহীনে কোথাও আবার রশি ছিঁড়ে বেড়িয়ে আসার তুমুল তুর্কি। স্বপ্ন-সাধনা আর আকাঙ্খা-বাসনায় ভরপুর কোন এক মাক্সিম গোর্কির এইসব দিগবিজয়ী প্রেষণী নিয়ে নিশ্চয় রচিত হতে পারতো সেইসব আখ্যানের অমরাবতী, যার পঠনে দৃঢ় আর মজবুত হতো বাঙালির প্রস্ফুটিত জাতীয়তাবাদী। তুলনাহীন এই ইহজাগতিক গীতি উপমহাদেশের প্রথম ভাষাভিত্তিক আধুনিক জাতিরাষ্ট্র হিসেবে সম্ভাবনার যে দুয়ার মেলে দিয়েছিল, সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের আত্মসন্তুষ্টি আর অহমিকার সাথে ধর্মীয় রাজনীতির রসায়িত মিশেলে আবারো পরাভূত সেখানে যেন’বা শুনিতে পাইঃ
“বাঙ্গলার ইতিহাস চাই, নহিলে বাঙ্গলার ভরসা নাই”।
লক্ষ-লক্ষ মানুষের রক্ত আর অশ্রুর সাগর ডিঙ্গিয়ে মহত্তম ইতিহাস বুকে নিয়ে মুখে আসা এমনি এই বিহবলতায় তবুও যখন একজন দেদীপ্যমান মুক্তিযোদ্ধার জন্মদিন সামনে এসে দাঁড়ায়, আবারো লিখিতে ইচ্ছা হয়, সেইসব আলোময়; শ্রেণি আর সময়ের প্রেক্ষিত পরাধীনতায় যেগুলি পাওয়া যায়- বাঙলাভাষার প্রথম যথার্থ ঔপন্যাসিক বঙ্কিম চন্দ্র চট্রোপাধ্যায়ের দোরগড়ায়ঃ
তুমি লিখিবে, আমি লিখিব, সকলেই লিখিবে। যে বাঙ্গালী তাহাকেই লিখিতে হইবে। মা যদি মরিয়া যান, তবে মা’র গল্প করিতে কত আনন্দ। এই আমাদিগের সর্বসাধারণের মা জন্মভূমি বাঙ্গলাদেশ, ইহার গল্প করিতে কি আমাদের আনন্দ নাই?
আছে, অবশ্যই আনন্দ আছে। আর আছে বলেই মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে নানান বাজে কথার ভীড়ে নোবেলভাইয়ের জন্মদিনের এই প্রফুল্ল প্রহরে আমাদের শত-সহস্র শুভেচ্ছারা ছুটে ছুটে গিয়ে বলে আসুক তাঁরেঃ
উদয়ের পথে শুনি কার বাণী
ভয় নাই ওরে ভয় নাই,
নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান

ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।

Fida Hasan Rislu’s Post

 মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।
জনপ্রিয়

আমি কি অন্ধ হয়ে গিয়েছি মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলে যাবে, মুক্তিযোদ্ধার তালিকা করবে

প্রকাশের সময় : ১০:০৩ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ৩১ জুলাই ২০২৬

অনলাইন শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬

আমি কি অন্ধ হয়ে গিয়েছি, নাকি চোখ থেকেও চোখ দিয়ে দেখছি না? আমি কি স্মৃতি থেকে হারিয়ে গিয়েছি, নাকি স্মৃতিতে থেকেও বিস্মৃতিকে মেনে নিয়েছি? কিন্তু চোখতো এখনো দেখতে পাচ্ছে; রণাঙ্গনের একজন মুক্তিযোদ্ধার দিকে সে তাকিয়ে আছে। স্মৃতি-তো এখনো জাগ্রত আছে; আগুন আলোর উন্মাতাল সেই দিনগুলোর কথা সে স্মরণে রেখেছে। তাহলে কেন এমনতর প্রশ্নের সদুত্তর পাচ্ছি না? তবে কি রাজনীতি আজ অন্ধ হয়ে গিয়েছে, নাকি চোখ থেকেও সেই রাজনীতি থেকে সরে গিয়েছে তার স্মৃতি, তার সত্তা কিংবা তার ভবিষ্যত! সম্ভবত আমার দেশ তার সত্তা হারিয়ে ফেলেছে অথবা বিকিয়ে দিয়েছে এবং সেকারণে তার কোনো অতীত নেই, ভবিষ্যত-ও নেই। তাই যদি না হবে, তবে কেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলে যাবে, মুক্তিযোদ্ধার তালিকা প্রণয়নে তারা সহযোগীতার হাত প্রসারিত করবে! আর আমাদের মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রী মহোদয়ও কেনই-বা তার সাথে সরবে কিংবা নিরবে সন্মতি জানাবে? বাংলা ট্রিবিউনের খবর অনুয়ায়ী যেহেতু মাননীয় মন্ত্রী সরাসরি বিষয়টিকে উড়িয়ে দেননি, অসন্মতির বিষয়টিকেও সেক্ষেত্রে উড়িয়ে দেয়া যায় নি। এক্ষণে ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’ সিনেমার গানটির কথা মনে পড়ছেঃ হায়রে কপাল মন্দ, চোখ থাকিতে অন্ধ! এ জীবন জ্বইলা পুঁইড়া শেষ তো হইলো না। হ্যাঁ, চোখ থাকিতেও আমাদের রাজনীতি হয়তোবা অন্ধ হয়ে গিয়েছে কিন্তু এ জীবন এখনো যেহেতু জ্বইলা পুইড়া শেষ হয়ে যাই নি, তাই একথাও বলতে আমরা দ্বিধা করবো না যে, আমাদের দেখা রণাঙ্গনের বিখ্যাত মুক্তিযোদ্ধা মাসুদ হোসেন আলমগীর তালিকাভুক্ত একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং নতুন করে তাঁকে তালিকাভুক্ত করতে মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে সপ্তম নৌবহর পাঠিয়ে দেয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে কোন সহযোগীতার প্রয়োজন পড়বে না। আমাদের তালিকায় হয়তোবা কিছু ভুলভ্রান্তি আছে কিন্তু সেটা এমন কিছু নয় যে, আমরা নিজেরা তা ঠিক করতে পারবো না। আমরা চাইলেই পারবো। তবে তাদের সহয়োগীতার এই আশ্বাসের মধ্য থেকে যেটা বুঝবো, সেটা অন্য কিছু নয়, আমাদের জাতিগত উত্থানের সবচাইতে মহৎ এই অর্জন- মুক্তিযুদ্ধ আজ জাতিবিরোধী বাস্তবিক অর্থে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির কাছে হুমকির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের বিভেদের ফাঁক গলে আড়াআড়ি থেকে উঠে এসে খাড়াখাড়ি দাঁড়ানো এমন তমসাচ্ছন্ন সময়ে নিজেদেরকে নতুন করে চিনে নেয়ার সময় এসেছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা নোবেলভাইয়ের জন্মদিনকে সামনে রেখে আমরা নতুন করে আমাদের জাতিসত্তাকে চিনে নেবো এবং চিনে নেবার সাথে সাথে দেশমাতৃকার বিষন্ন বদনে যেমন কাঁদবো, কান্নার সেই শোককে শক্তিতে পরিণত করে নতুন করে আবারো সংকল্পবদ্ধ হবো।
শোনা যাক তবে সেইসব কথকথা, ইতিহাস-সাহিত্যের পরিক্রমায় যার সাথে জড়িয়ে রয়েছে বীর মুক্তিযোদ্ধা নোবেলভাইদের বীরত্বগাঁথা।
জাতীয়তাবাদী রাজনীতির একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, তার একটা সুনিদিষ্ট প্রতিপক্ষ থাকতে হবে। সেই প্রতিপক্ষের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জাতীয় বীরদেরকে নিরাপোষ লড়াই করতে হবে। বাঙালি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ এবং বিকাশের প্রক্রিয়ায় দেখা যায়, ইংরেজ শাসনের সুবিধা নিয়ে গড়ে উঠা এখানকার বাঙালি জাতীয়তাবাদ সুনিদিষ্টভাবে ইংরেজকে শত্রু জ্ঞান করলেও সুবিধা হারানোর ভয়ে সেখান থেকে তারা সরে এসে প্রাগৈতিহাসিক কালের বীরদেরকে সামনে এনে দৃশ্যের বাইরের পরাভূত ‘যবন’দেরকে চিন্হিত শত্রুতে পরিনত করেছে। বাংলা সাহিত্যের সম্রাট হিসেবে অভিহিত বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায় জাতীয়তাবাদী অনুপ্রেরণা থেকে যে “আনন্দমঠ” উপন্যাসটি লিখেছিলেন, সেটা যখন তাঁর সুযোগ্য সম্পাদনায় বঙ্গদর্শন পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হচ্ছিল, সেখানে তখন ইংরেজকেই সরাসরি শত্রু হিসেবে চিন্হিত করা হলেও পরবর্তিতে যখন বই আকারে প্রকাশিত হলো, ইংরেজের জায়গায় সেখানে “মার মার যবন মার” গ্রন্থিত হতে দেখা গেল। ফলে ইংরেজবিরোধী বাঙালী জাতীয়তাবাদ সাম্প্রদায়িকতার নষ্ট নিগড়ে আবদ্ধ হয়ে পড়লো। ওদিকে আবার জাতীয়তাবাদের পক্ষে বীর খুঁজতে গিয়ে আশেপাশে কিংবা নিকটেও কাউকে না পেয়ে বাঙলাসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ মহাকাব্য ‘মেঘনাদ বধ’এর রচয়িতা মাইকেল মধুসূদন দত্ত চলে গেলেন লঙ্কার রাক্ষসপুরীতে। অপরদিকে আরেক মহাকাব্যের ‘পদ্মিনী উপাখ্যান’এ রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়কে বাঙলা-বিহার-উড়িষ্যা ছাড়িয়ে রাজস্হানে যেতে হলো। সেখানে রাজপুতদের কাছেও যা ছিল পাঠান-রাজপুত দ্বন্দ্ব, রঙ্গলালের হাতে পড়ে সেটাই হিন্দু-মুসলমানদের সংঘর্ষে রূপায়িত হলো। লক্ষনীয় বিষয় যে, যে সময়ে রঙ্গলালের এই মহাকাব্য প্রকাশিত হলো, সেই ১৮৫৭ সালেেই ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম ব’লে বিবেচিত “সিপাহী বিদ্রোহ” সংগঠিত হতে দেখা গেল। সিপাহীর পোশাক পড়ে কৃষকের বিদ্রোহসম ঐতিহাসিক সেই অসাম্প্রদায়িক বিদ্রোহে তৎকালীন বাঙালি বিকশিত শ্রেনীর তেমন কোন ভূমিকা ছিল না। এই না থাকার পেছনে বীরত্বের যে অভাব প্রতিয়মান হয়েছে, তারই প্রতিভাসে ঘটনার তিনবছর পরে প্রকাশিত মধুসূদনের মেঘনাদ বধে বীর খুঁজতে কবিকে যেতে হলো রাবণের কাছে। এভাবেই বীরহীন স্বদেশের বুকে ইংরেজের বিপরীতে অদৃশ্যের যবনের কল্পিত ত্রাসে শেষপর্যন্ত বাঙালির জাতীয়তাবাদ হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্বে রূপ নিয়ে সাতচল্লিশে এসে দেশটাকেই বিভক্ত করে ফেললো।
বিভক্ত সেই দেশের এদেশের আমরা ইংরেজের অবর্তমানে যে পাকিস্তানীদের অংশী হলাম, জন্মের পাঁচবছরের মাথায় এসে আবার সেই আমরাই বায়ান্নোর ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অকৃত্রিম এবং অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হলাম। চিন্হিত শত্রু হিসেবে পাকিস্তানের সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্রকে চিন্হিত করলাম এবং বীর বাঙালির নেতা হিসেবে মওলানা ভাসানী আর শেখ মুজিবুর রহমানকে বরমাল্য পড়ালাম। পরবর্তিতে উগ্রপন্হী কম্যুনিষ্টদের ছত্রছায়ায় মওলানা ভাসানী জাতীয় মুক্তির বিষয়টিকে পাশ কাটিয়ে গেলে শেখ মুজিবুর রহমান বঙ্গবন্ধু’র মুকুট প’ড়ে একাই অনেককে সাথে ক’রে সে দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে কাঁটাবিছানো পথ মাড়িয়ে-এগিয়ে গোটা জাতিকে স্বাধীনতার স্বর্ণদুয়ারে পৌছে দিলেন। সেখানের রক্ত আর অশ্রুর সাগরভেদী প্রতিজ্ঞা নিয়ে অনেক-অজস্র যেসব জাতীয় বীর বেড়িয়ে এলেন, মাসুদ হোসেন আলমগীর নোবেল’ তাদেরই অন্যতম একজন ছিলেন।
না, তিনি কোন উত্তম, বিক্রম কিংবা প্রতিকী মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। লক্ষাধিক যোদ্ধার ভেতর থেকে ক’জনারই বা সেরকমের গেজেটেড-অমূল্য জোটে। তাছাড়া স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতারের ঘোষণার পরেও স্বাধীন স্বদেশ যেখানে সিলেটের প্রবাদপ্রতিম-মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি দাসকে বীরশ্রেষ্ঠ’র সন্মান দেয়নি, নিরবধি বয়ে চলা নানাকষ্টের সেইসব ডালপালা নিয়ে বেঁচে থাকা তাহাদের মাঝে একজন নোবেলের কাছেও রণাঙ্গনের এমন কিছু কিছু জীবনবাজী আছে; শিহরণে-আতংকে, উত্তেজনা আর আক্রোশে সেগুলি বিশ্বসেরা সিনেমার একেকটি এটিসোডের কাছাকাছি। সবে তারুণ্যের তিমিরবিনাশী রোদ্দুরে ইন্টারমিডিয়েট সেকেন্ড ইয়ারের এই তুমুল তরুণ সাত-নং সেক্টরের বিখ্যাত অধিনায়ক মেজর নাজমুল হকের প্রশিক্ষণে কেবলই গেরিলা কায়দায় শত্রুহনন আর সমুখের অগ্রায়ণে কখনো পাকিস্তানী হায়েনাদের নিশ্ছিদ্র মৃত্যুগুহা থেকে ভারী অস্ত্রকাঁধে বেড়িয়ে আসা বীর, কখনো আবার একাই একশ’র বেশে পিশাচ হননের তীব্র তির। শত্রুর জীপে গ্রেনেড ছুড়িয়ে কোথাও তিনি নির্ঘাৎ বাজপাখী, রাতের নির্জন গহীনে কোথাও আবার রশি ছিঁড়ে বেড়িয়ে আসার তুমুল তুর্কি। স্বপ্ন-সাধনা আর আকাঙ্খা-বাসনায় ভরপুর কোন এক মাক্সিম গোর্কির এইসব দিগবিজয়ী প্রেষণী নিয়ে নিশ্চয় রচিত হতে পারতো সেইসব আখ্যানের অমরাবতী, যার পঠনে দৃঢ় আর মজবুত হতো বাঙালির প্রস্ফুটিত জাতীয়তাবাদী। তুলনাহীন এই ইহজাগতিক গীতি উপমহাদেশের প্রথম ভাষাভিত্তিক আধুনিক জাতিরাষ্ট্র হিসেবে সম্ভাবনার যে দুয়ার মেলে দিয়েছিল, সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদের আত্মসন্তুষ্টি আর অহমিকার সাথে ধর্মীয় রাজনীতির রসায়িত মিশেলে আবারো পরাভূত সেখানে যেন’বা শুনিতে পাইঃ
“বাঙ্গলার ইতিহাস চাই, নহিলে বাঙ্গলার ভরসা নাই”।
লক্ষ-লক্ষ মানুষের রক্ত আর অশ্রুর সাগর ডিঙ্গিয়ে মহত্তম ইতিহাস বুকে নিয়ে মুখে আসা এমনি এই বিহবলতায় তবুও যখন একজন দেদীপ্যমান মুক্তিযোদ্ধার জন্মদিন সামনে এসে দাঁড়ায়, আবারো লিখিতে ইচ্ছা হয়, সেইসব আলোময়; শ্রেণি আর সময়ের প্রেক্ষিত পরাধীনতায় যেগুলি পাওয়া যায়- বাঙলাভাষার প্রথম যথার্থ ঔপন্যাসিক বঙ্কিম চন্দ্র চট্রোপাধ্যায়ের দোরগড়ায়ঃ
তুমি লিখিবে, আমি লিখিব, সকলেই লিখিবে। যে বাঙ্গালী তাহাকেই লিখিতে হইবে। মা যদি মরিয়া যান, তবে মা’র গল্প করিতে কত আনন্দ। এই আমাদিগের সর্বসাধারণের মা জন্মভূমি বাঙ্গলাদেশ, ইহার গল্প করিতে কি আমাদের আনন্দ নাই?
আছে, অবশ্যই আনন্দ আছে। আর আছে বলেই মুক্তিযুদ্ধ আর মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে নানান বাজে কথার ভীড়ে নোবেলভাইয়ের জন্মদিনের এই প্রফুল্ল প্রহরে আমাদের শত-সহস্র শুভেচ্ছারা ছুটে ছুটে গিয়ে বলে আসুক তাঁরেঃ
উদয়ের পথে শুনি কার বাণী
ভয় নাই ওরে ভয় নাই,
নিঃশেষে প্রাণ যে করিবে দান

ক্ষয় নাই তার ক্ষয় নাই।

Fida Hasan Rislu’s Post

 মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।