, মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

উৎপল দত্ত

  • প্রকাশের সময় : ০৬:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬
  • ১১ পড়া হয়েছে

অঅলাইন শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬
উৎপল দত্ত
মেয়ে বিষ্ণুপ্রিয়াকে তিনি একবার বলেছিলেন – “আমি শিল্পী নই। নাট্যকার বা অন্য যে কোনো আখ্যা লোকে আমাকে দিতে পারে। তবে আমি মনে করি আমি প্রপাগান্ডিস্ট। এটাই আমার মূল পরিচয়।”
উৎপল দত্তের বর্ণময় প্রতিভা নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। নাট্যকার, পরিচালক, অভিনেতা, আচার্য – এই চতুর্মুখ সৃজনে উৎপল বারবার সৃষ্টিকর্তাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে গেছেন। বাংলা থিয়েটারের ইতিহাস বিচার করলে উৎপলের নাট্যসৃষ্টির ব্যাপ্তি বিস্ময়কর। উৎপল দত্ত রচিত মৌলিক পূর্ণাঙ্গ ও একাঙ্ক নাটক, অনুবাদনাট্য, যাত্রাপালা ও পথনাটক বহু মৌলিক গ্রন্থের রচয়িতা। একাধারে তিনি কবি ও ছোটগল্প লেখক।
পুরো নাম উৎপলরঞ্জন দত্ত। জন্ম ১৯২৯ সালের ২৯শে মার্চ, বাংলাদেশের বরিশাল জেলার কীর্তনখোলায়। যদিও তাঁর পরিবারের আদি বাসস্থান ছিল কুমিল্লা জেলায়। কিন্তু তিনি নিজে তাঁর জন্মস্থান শিলংয়ে তাঁর মামার বাড়িতে বলে উল্লেখ করে গিয়েছেন। উৎপলের বাবা গিরিজারঞ্জন দত্ত ও মা শৈলবালা রায়ের (দত্ত) পাঁচ পুত্র, তিন কন্যার মধ্যে উৎপল ছিলেন চতুর্থ সন্তান। পারিবারিক ডাকনাম ছিল শঙ্কর। বাবা গিরিজারঞ্জন ছিলেন পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত পরাধীন ভারতে ব্রিটিশ প্রভাবিত সমাজের উচ্চশ্রেণির মানুষ। তিনি পরবর্তী কালে জেলার হিসেবে ইংরেজ কারাগারের ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক (কমান্ড্যান্ট) নিযুক্ত হন। উৎপলের স্কুলজীবন শুরু হয়েছিল শিলং শহরের সেন্ট এডমন্ডস স্কুলে। পরে গিরিজাশঙ্কর বদলি হয়ে আসেন বহরমপুর শহরে। এখানেই উৎপলের ছেলেবেলার দিনগুলো কেটেছিল। ছোট ভাই নীলিন ও তিনি বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র ছিলেন।
মেজদা মিহিররঞ্জন কিশোর উৎপলকে শেক্সপিয়রের নাটকের গল্প পড়ে শোনাতেন। বাড়িতে রেকর্ড চালিয়ে নাটক শোনার চল ছিল। উৎপল সে সব নাটক মন দিয়ে শুনতেন। তাই তিনি মাত্র ছ’বছর বয়সেই শেক্সপিয়রের নাটকের সংলাপ মুখস্থ বলতে পারতেন। পরে কলকাতায় সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়ার সময়ে পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীতের সংস্পর্শে আসেন। তিনি চেয়েছিলেন কনসার্ট পিয়ানিস্ট হতে। ১৯৩৯ সালে গিরিজাশঙ্কর কলকাতায় বদলি হলে দত্ত পরিবার দক্ষিণ কলকাতার রয় স্ট্রিটে থাকতে শুরু করেন। কলকাতায় আসার পরেই উৎপল বাবা-মায়ের সঙ্গে কলকাতার পেশাদার থিয়েটার দেখতে শুরু করেন।
কিংবদন্তি অভিনেতা শ্রী রবি ঘোষের মতে, উৎপল দত্তর জীবন জুড়ে আছে আরও এক বিশেষ অধ্যায়, তাঁর রাজনৈতিক যাত্রাপালা। ১৯৬৮ থেকে ১৯৮৮ অবধি সফল পালাকার ও পরিচালক উৎপল দত্ত ছিলেন চিৎপুরের যাত্রাপাড়ার একচ্ছত্র অধিপতি। ‘‘নাটক ও যাত্রা আমাকে সৃষ্টির আনন্দ দিলেও চলচ্চিত্র দিয়েছিল বেঁচে থাকার রসদ, মানে টাকা। হিন্দি চলচ্চিত্র আমাকে সর্বভারতীয় অভিনেতা হয়ে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছিল।” মধু বসুর ‘মাইকেল’ ছবিতে মাইকেল মধুসূদনের ভূমিকায় অভিনয়ের মধ্য দিয়ে উৎপল দত্তর চলচ্চিত্র জীবনের সূচনা।
তিনি একজন বড় কৌতুকাভিনেতা, তার পরিচয় ছড়িয়ে আছে কিছু ছবিতে। আবার মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক, গৌতম ঘোষের ছবিতে তাঁর অভিনয় একেবারে অন্য গোত্রের। মৃণাল সেনের ‘ভুবন সোম’ তাঁকে চলচ্চিত্র অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল। ‘পথের পাঁচালি’ বা ‘জন অরণ্য’ দেখে সত্যজিৎকে লেখা তাঁর আবেগরুদ্ধ চিঠি রয়েছে। সত্যজিৎকে তিনি ডাকতেন ‘স্যর’ বলে। সত্যজিৎও মুগ্ধ ছিলেন উৎপলের প্রতিভায়। বলেছিলেন, ‘উৎপল যদি রাজি না হত, তবে হয়তো আমি ‘আগন্তুক’ বানাতামই না।’
বাংলা নাটকে যেমন মাইকেলকে নতুন ভাবে এনেছিলেন গিরীশ ঘোষ, তেমনই বার্টোল্ড ব্রেখটকে যুক্ত করেছিলেন উৎপল দত্ত।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতে, সিনেমা নয়, তাঁর আসল জাত চিনিয়েছে নাটক। উৎপল দত্তের সঙ্গে নাটকে কাজ করতে চেয়ে তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন সৌমিত্র। আন্তন শেফারের ‘স্লিউথ’ নাটকটি তাঁকে অনুবাদ করতে দেন উৎপল। কথা ছিল, ওই নাটকে দু’জনে অভিনয় করবেন। কিন্তু তা আর হয়নি। উৎপল দত্তের সঙ্গে কাজ করার স্মৃতি আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে নাটক, চলচ্চিত্র ও যাত্রার অনেক অভিনেতা ও পরিচালকের মনে। কন্যা বিষ্ণুপ্রিয়ার মনে হত, “মহলার সময় বাবা যেন এক যুদ্ধের সেনানায়ক।” তরুণ মজুমদার একবার তাঁর স্মৃতিচারণে জানিয়েছিলেন, “ওঁর ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’ ছবির রায় সাহেবের চরিত্রটা এত পছন্দ হয়েছিল যে, এগ্রিমেন্ট পেপারে সই করে পারিশ্রমিকের জায়গাটা ফাঁকা রেখে ফেরত পাঠিয়েছিলেন। ফ্লোরে মেকআপ নিয়ে পাঁচ মিনিট আগেই উপস্থিত হতেন। হাতে থাকত মোটা মোটা বই। শটের ফাঁকে পড়তেন। ডাক পড়লেই উঠে দাঁড়িয়ে বলতেন, ‘ইয়েস স্যর’।”
১৯৯৩ সালের ১৯শে আগস্ট ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে মাত্র ৬৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। উৎপল দত্ত চলচ্চিত্রের ও মঞ্চের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন তাঁর সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে।
তথ্যসুত্র: গুগল।

Manik Biswas’s Post

মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।

জনপ্রিয়

উৎপল দত্ত

প্রকাশের সময় : ০৬:০৩ অপরাহ্ন, শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬

অঅলাইন শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬
উৎপল দত্ত
মেয়ে বিষ্ণুপ্রিয়াকে তিনি একবার বলেছিলেন – “আমি শিল্পী নই। নাট্যকার বা অন্য যে কোনো আখ্যা লোকে আমাকে দিতে পারে। তবে আমি মনে করি আমি প্রপাগান্ডিস্ট। এটাই আমার মূল পরিচয়।”
উৎপল দত্তের বর্ণময় প্রতিভা নিয়ে আলোচনার শেষ নেই। নাট্যকার, পরিচালক, অভিনেতা, আচার্য – এই চতুর্মুখ সৃজনে উৎপল বারবার সৃষ্টিকর্তাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে গেছেন। বাংলা থিয়েটারের ইতিহাস বিচার করলে উৎপলের নাট্যসৃষ্টির ব্যাপ্তি বিস্ময়কর। উৎপল দত্ত রচিত মৌলিক পূর্ণাঙ্গ ও একাঙ্ক নাটক, অনুবাদনাট্য, যাত্রাপালা ও পথনাটক বহু মৌলিক গ্রন্থের রচয়িতা। একাধারে তিনি কবি ও ছোটগল্প লেখক।
পুরো নাম উৎপলরঞ্জন দত্ত। জন্ম ১৯২৯ সালের ২৯শে মার্চ, বাংলাদেশের বরিশাল জেলার কীর্তনখোলায়। যদিও তাঁর পরিবারের আদি বাসস্থান ছিল কুমিল্লা জেলায়। কিন্তু তিনি নিজে তাঁর জন্মস্থান শিলংয়ে তাঁর মামার বাড়িতে বলে উল্লেখ করে গিয়েছেন। উৎপলের বাবা গিরিজারঞ্জন দত্ত ও মা শৈলবালা রায়ের (দত্ত) পাঁচ পুত্র, তিন কন্যার মধ্যে উৎপল ছিলেন চতুর্থ সন্তান। পারিবারিক ডাকনাম ছিল শঙ্কর। বাবা গিরিজারঞ্জন ছিলেন পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত পরাধীন ভারতে ব্রিটিশ প্রভাবিত সমাজের উচ্চশ্রেণির মানুষ। তিনি পরবর্তী কালে জেলার হিসেবে ইংরেজ কারাগারের ভারপ্রাপ্ত প্রশাসক (কমান্ড্যান্ট) নিযুক্ত হন। উৎপলের স্কুলজীবন শুরু হয়েছিল শিলং শহরের সেন্ট এডমন্ডস স্কুলে। পরে গিরিজাশঙ্কর বদলি হয়ে আসেন বহরমপুর শহরে। এখানেই উৎপলের ছেলেবেলার দিনগুলো কেটেছিল। ছোট ভাই নীলিন ও তিনি বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র ছিলেন।
মেজদা মিহিররঞ্জন কিশোর উৎপলকে শেক্সপিয়রের নাটকের গল্প পড়ে শোনাতেন। বাড়িতে রেকর্ড চালিয়ে নাটক শোনার চল ছিল। উৎপল সে সব নাটক মন দিয়ে শুনতেন। তাই তিনি মাত্র ছ’বছর বয়সেই শেক্সপিয়রের নাটকের সংলাপ মুখস্থ বলতে পারতেন। পরে কলকাতায় সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে পড়ার সময়ে পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সঙ্গীতের সংস্পর্শে আসেন। তিনি চেয়েছিলেন কনসার্ট পিয়ানিস্ট হতে। ১৯৩৯ সালে গিরিজাশঙ্কর কলকাতায় বদলি হলে দত্ত পরিবার দক্ষিণ কলকাতার রয় স্ট্রিটে থাকতে শুরু করেন। কলকাতায় আসার পরেই উৎপল বাবা-মায়ের সঙ্গে কলকাতার পেশাদার থিয়েটার দেখতে শুরু করেন।
কিংবদন্তি অভিনেতা শ্রী রবি ঘোষের মতে, উৎপল দত্তর জীবন জুড়ে আছে আরও এক বিশেষ অধ্যায়, তাঁর রাজনৈতিক যাত্রাপালা। ১৯৬৮ থেকে ১৯৮৮ অবধি সফল পালাকার ও পরিচালক উৎপল দত্ত ছিলেন চিৎপুরের যাত্রাপাড়ার একচ্ছত্র অধিপতি। ‘‘নাটক ও যাত্রা আমাকে সৃষ্টির আনন্দ দিলেও চলচ্চিত্র দিয়েছিল বেঁচে থাকার রসদ, মানে টাকা। হিন্দি চলচ্চিত্র আমাকে সর্বভারতীয় অভিনেতা হয়ে ওঠার সুযোগ করে দিয়েছিল।” মধু বসুর ‘মাইকেল’ ছবিতে মাইকেল মধুসূদনের ভূমিকায় অভিনয়ের মধ্য দিয়ে উৎপল দত্তর চলচ্চিত্র জীবনের সূচনা।
তিনি একজন বড় কৌতুকাভিনেতা, তার পরিচয় ছড়িয়ে আছে কিছু ছবিতে। আবার মৃণাল সেন, ঋত্বিক ঘটক, গৌতম ঘোষের ছবিতে তাঁর অভিনয় একেবারে অন্য গোত্রের। মৃণাল সেনের ‘ভুবন সোম’ তাঁকে চলচ্চিত্র অভিনেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল। ‘পথের পাঁচালি’ বা ‘জন অরণ্য’ দেখে সত্যজিৎকে লেখা তাঁর আবেগরুদ্ধ চিঠি রয়েছে। সত্যজিৎকে তিনি ডাকতেন ‘স্যর’ বলে। সত্যজিৎও মুগ্ধ ছিলেন উৎপলের প্রতিভায়। বলেছিলেন, ‘উৎপল যদি রাজি না হত, তবে হয়তো আমি ‘আগন্তুক’ বানাতামই না।’
বাংলা নাটকে যেমন মাইকেলকে নতুন ভাবে এনেছিলেন গিরীশ ঘোষ, তেমনই বার্টোল্ড ব্রেখটকে যুক্ত করেছিলেন উৎপল দত্ত।
সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতে, সিনেমা নয়, তাঁর আসল জাত চিনিয়েছে নাটক। উৎপল দত্তের সঙ্গে নাটকে কাজ করতে চেয়ে তাঁকে অনুরোধ করেছিলেন সৌমিত্র। আন্তন শেফারের ‘স্লিউথ’ নাটকটি তাঁকে অনুবাদ করতে দেন উৎপল। কথা ছিল, ওই নাটকে দু’জনে অভিনয় করবেন। কিন্তু তা আর হয়নি। উৎপল দত্তের সঙ্গে কাজ করার স্মৃতি আজও উজ্জ্বল হয়ে আছে নাটক, চলচ্চিত্র ও যাত্রার অনেক অভিনেতা ও পরিচালকের মনে। কন্যা বিষ্ণুপ্রিয়ার মনে হত, “মহলার সময় বাবা যেন এক যুদ্ধের সেনানায়ক।” তরুণ মজুমদার একবার তাঁর স্মৃতিচারণে জানিয়েছিলেন, “ওঁর ‘শ্রীমান পৃথ্বীরাজ’ ছবির রায় সাহেবের চরিত্রটা এত পছন্দ হয়েছিল যে, এগ্রিমেন্ট পেপারে সই করে পারিশ্রমিকের জায়গাটা ফাঁকা রেখে ফেরত পাঠিয়েছিলেন। ফ্লোরে মেকআপ নিয়ে পাঁচ মিনিট আগেই উপস্থিত হতেন। হাতে থাকত মোটা মোটা বই। শটের ফাঁকে পড়তেন। ডাক পড়লেই উঠে দাঁড়িয়ে বলতেন, ‘ইয়েস স্যর’।”
১৯৯৩ সালের ১৯শে আগস্ট ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাকে মাত্র ৬৪ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। উৎপল দত্ত চলচ্চিত্রের ও মঞ্চের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন তাঁর সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে।
তথ্যসুত্র: গুগল।

Manik Biswas’s Post

মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।