
অনলাইন সোমবার, ২৪ আগস্ট ২০২৬
১৯৭২ সালের দিকে আজম খানের সঙ্গে পরিচয় হয় নূরা পাগলার। সে সময় আজম খান নতুন ধারার গান নিয়ে সবে শহরের সাউন্ডস্কেপে হাজির হতে শুরু করেছেন। তাঁর গানের কথায় তখন আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া স্পষ্ট।
সেই আধ্যাত্মিক ভাবনার উৎস ছিল হাইকোর্টের মাজারের সেই ‘ফকির’ নূরা পাগলা। ১৯৭৩ সালে আজম খান তাঁকে নিয়ে গানও বানান—
‘হাইকোর্টের মাজারে কত ফকির ঘোরে
কয়জনা আসল ফকির?’
১৯৭৩ সালের প্রকাশিত ‘বিচিত্রা’ য় নূরা পাগলায় বয়স লেখা হয়েছিল আশির ওপরে। তবে সত্তরের দশকে হাইকোর্টের মাজারে যাঁরা নূরা পাগলাকে দেখেছেন, তাঁদের মতে তখন তাঁর বয়স ছিল ৬০ বছরের আশেপাশে। বিচিত্রার ছবি ও বিদেশি এক ফটোগ্রাফারের তোলা নূরা পাগলার ছবিতে সেই বয়সের ছাপ পাওয়া যায়।
কবি সৈয়দ তারিকের ২০১৮ সালের লেখা থেকে জানা যায়, হাইকোর্ট পর্ব শেষে নূরা পাগলা থাকতেন ঢাকার রামপুরায়। রামপুরা এলাকার কয়েকজন বাসিন্দার ফেসবুক পোস্ট অনুসারে, রামপুরা টিভি সেন্টারের পেছনের দিকে নূরা পাগলার মাজার।
২.
কেমন ছিলেন হাইকোর্টের মাজারের সেই নূরা পাগলা
ঢাকার হাইকোর্টের মাজারের নূরা পাগলা ছিলেন অদ্ভুত চরিত্র। মাজারপাড়া ঘুরে বেড়ানো মানুষের কাছে তিনি খুবই পরিচিত ছিলেন। তাঁর শিষ্যদের সঙ্গে তিনি গাইতেন দেহতত্ত্বের গান, অনেকটা বাউল ধারার মতো। ঢোল আর দেশি বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে জমে যেত আসর। মাঝেমধ্যে জিকির করতে করতে হঠাৎ লাফিয়ে উঠতেন, কখনো গান গাইতে গাইতে সবকিছু ভুলে যেতেন।
নূরা পাগলা বলেছিলেন, ‘গান গাইবার সময় বুকের ভেতর কান্না জমতে থাকে।’ নূরা পাগলা ও তাঁর ‘সম্প্রদায়ের’গানে ছিল আলাদা মৌলিকত্ব। তা আজম খানও স্বীকার করেছেন। আজম খানের বাংলা ঝাঁকি (পড়ুন-রক) সংগীতে যে আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া পাওয়া যায়, তা কিছুটা নূরা পাগলার থেকেই এসেছে।
হাইকোর্টের মাজারে নূরা পাগলার প্রভাব সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায় ১৯৭৩ সালের ১০ আগস্ট প্রকাশিত সাপ্তাহিক বিচিত্রার।
বিচিত্রা লিখেছিল, ‘যাঁরা ঢাকায় থাকেন তাঁদের কাছে বৃহিস্পতিবারের হাইকোর্ট মাজার অচেনা কিছু নয়। একজন ফকিরের মাজারকে ঘিরে যেভাবে একটি মেলা ক্রমশ বিস্তৃত হয়েছে শহরবাসীদের অনেকেই তা সুনজরে দেখছেন না। যদিও মাজারে দর্শনার্থীদের গাড়ির লম্বা সারিতে একাধিক মার্সিডিজ, বিউইক, ফ্যালকন রয়েছে। মাজারে ঢোকার পথেই দর্শনার্থীরা নূরা পাগলার দর্শন লাভ করেন।’
১৯৭৩ সালে নূরা পাগলা দাবি করেছিলেন, সারা দেশে তাঁর ২৭ হাজার শিষ্য আছে। সন্তান কামনা কিংবা দুরারোগ্য রোগ—সব সমস্যার সমাধান মিলবে তাঁর কাছে, এমন বিশ্বাসে নূরা পাগলার কাছে ভিড় জমাতেন অসংখ্য মানুষ। শিষ্যরা তাঁর ব্যবহৃত জিনিসপত্র বিক্রি করত। এমনকি তিনি যে চটের বস্তায় বসতেন, সেটার সুতাও নাকি বিক্রি হতো চড়া দামে!
নূরা পাগলাকে ঘিরে নানা গল্প বাজারে প্রচলিত ছিল। বিভিন্ন সময়ে পত্র-পত্রিকায় শিরোনামও হয়েছেন। কেউ বলত গুপ্তচর, কেউ বলত আসল ফকির। অভিযোগ ছিল, তিনি ও তাঁর শিষ্যরা মাজারে গাঁজার আসর বসান। তবে নূরা পাগলার জবাব ছিল স্পষ্ট, ‘আমি গাঁজা খাই না, পীরের নিষেধ আছে।’
নোয়াখালীতে জন্ম নেওয়া নূরা পাগলা পড়াশোনা কতদূর করেছিলেন জানা যায়নি। তবে কথার মধ্যে প্রচুর ইংরেজি বলতেন। ফকিরিতে আসার আগে তাঁর পেশা নিয়ে বিচিত্রা সঠিক কিছু বলতে পারেনি। দুটি জনশ্রুতির কথা বিচিত্রা লিখেছিল, তিনি প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ আর্মিতে চাকরি করেছিলেন। আবার শিষ্যরা অনেকে বলতেন, তিনি একসময় পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর ছিলেন।
ভারতে আজমিরের খাজা বাবার দরগায় গিয়ে এক ফকিরের শিষ্যত্ব নিয়েছিলেন নূরা পাগলা। তিনি দাবি করতেন, চিকিৎসার সময় সেই ফকির তাঁর ভেতর ভর করতেন। বিচিত্রার প্রতিবেদন থেকে তাঁর চিকিৎসার ধরন সম্পর্কেও জানা যায়। রোগীকে পাটিতে শুইয়ে তাঁর বুকের ওপর বসতেন। হাতজোড় করে মাজারের দিকে মুখ করে আবার উঠে পড়তেন। এরপর আবার বসতেন, আবার উঠতেন।
(লেখাটি বছরখানেক আগে লিখেছিলাম। বাংলাস্ট্রিমে প্রকাশিত। এখানে একাংশ দিলাম)
Gowtam K Shuvo : গৌতম কে শুভ’s Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।





















