
·অনলাইন : ১৫ জুলাই, ২০২৬
মুক্তিযুদ্ধের দুঃসাহসী সংগঠক
গিয়াসউদ্দিন আহমেদ চৌধুরী
নাসিরুদ্দিন চৌধুরী
৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে ছাত্র ইউনিয়নের জন্মলাভ করে এবং অচিরেই জাতীয় ও ছাত্র রাজনীতিতে একটি আপসহীন সংগ্রামী ছাত্র সংগঠন হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে| আইয়ুবের মার্শাল ল-এর পূর্বে চট্টগ্রামে ছাত্র ইউনিয়ন সাংগঠনিকভাবে খুব একটা সংগঠিত হয়ে উঠতে পারেনি| আবদুল্লাহ আল হারুন, আবদুল হাই, ডা. ক্সছয়দর রহমান চৌধুরী, মওলানা আহমদুর রহমান আজমীর হাত ধরে চট্টগ্রামে ছাত্র ইউনিয়নের যাত্রা শুরু হয়|অ্যডভোকেট শফিউল আলম পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে চট্টগ্রামে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে দৃপ্ত পদক্ষেপে এগিয়ে আসেন অ্যডভোকেট শফিউল আলম| কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ থাকায় পার্টির নির্দেশে অ্যাডভোকেট এ কে এম এমদাদুল ইসলাম কাজ করতেন ছাত্রলীগে| ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে কাগমারী সম্মেলনে মওলানা ভাসানী আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে ন্যাপ গঠন করার পর অ্যাডভোকেট এমদাদুল ইসলাম ছাত্রলীগ ছেড়ে ছাত্র ইউনিয়নে চলে আসেন| এই সময়ে আরও তিনজন ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দিলে সংগঠন বেশ শক্তিশালী হয়ে ওঠে| এই তিনজন ছাত্র হচ্ছেন-বাঁশখালীর বখতেয়ার নূর সিদ্দিকী, মিরসরাইর কাজী জাফরুল ইসলাম(পরবর্তীকালে সাংবাদিক) ও হাটহাজারীর নজরুল ইসলাম চে․ধুরী| আরও পরে অ্যাডভোকেট এমদাদুল
ইসলামের ভাই এ এম এম শহীদুল্লাহও ছাত্র ইউনিয়নে যোগদান করেন|
আইয়ুবের মার্শাল ল-এর মধ্যেই ১৯৬০-৬১ খ্রিস্টাব্দের দিকে ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রলীগ, ছাত্রশক্তি গোপনে
সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করে ৬২’র শিক্ষা আন্দোলনে আইয়ুব সরকারের বিরুদ্ধে শক্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হয়| তার
আগে ৬১-তে ২১ ফেব্রুয়ারি মুসলিম হলে সভা ও রাজপথে মিছিল করে ছাত্রশক্তির (তমদ্দুন মজলিশের ছাত্র
সংগঠন ছাত্রশক্তি নয়, এখানে ছাত্রশক্তি অর্থে ছাত্র সমাজের শক্তির কথা বলা হচ্ছে) আগমন বার্তা ঘোষণা করে|
আইয়ুব খানের শিক্ষক ও পাকিস্তানের শিক্ষা সচিব শরীফ সাহেবের শিক্ষা সংকোচন ও ক্সবষম্যমূলক শিক্ষা কমিশন
রিপোর্টের বিরুদ্ধে ডাকসুর আহ্বানে ১৭ সেপ্টে¤^র সারা দেশের ন্যায় চট্টগ্রামেও রক্তাক্ত শিক্ষাদিবস পালন করা
হয়| ৬২ থেকে ছাত্র ইউনিয়ন সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ ও ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রামের একটি বলিষ্ঠ আপসহীন
সংগঠন হিসেবে দেশবাসী ও ছাত্র সমাজের কাছে সমাদৃত হতে থাকে| ৬২-র ছাত্র আন্দোলন থেকে ছাত্র
ইউনিয়নে এক ঝাঁক তরুণের আগমন ঘটে এবং তরুণ রক্ত সঞ্চারিত হওয়ার ফলে ছাত্র ইউনিয়ন দুর্বার গতিতে
এগিয়ে যেতে থাকে| এই সময় চট্টগ্রামে ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতিতে কিছু নতুন মুখ দেখা দেন, যারা পরবর্তীকালে চট্টগ্রামের ছাত্র রাজনীতি এবং জাতীয় রাজনীতিতে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দিয়ে তাদের প্রতিভার ¯^াক্ষর
রাখেন| সীতাকুন্ডের নেজামে ইসলামী পার্টির নেতা প্রফেসর নুরুল আবছারের পুত্র পীরজাদা খায়রুল বশর (ড.
রশীদ আল ফারুকী), মাহবুবুল আলম তারা (তিনি ছাত্রলীগে যাবেন প্রচার হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি ছাত্র
ইউনিয়নেই যোগদান করেন), বদরুল কামাল, আবুল কাশেম সন্দ্বীপ, আবু তাহের মাসুদ, মো: মুছা, শফিকুল
মওলা, খোরশেদুল ইসলাম, ড. মাহবুবুল হক, গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চে․ধুরী, তপন দত্ত, শাহ আলম, সুবীর দত্ত
(প্রয়াত), বালাগাত উল্লাহ, অলক দত্ত, শামসুজ্জামান হীরা, আবদুল্লাহ (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়) এবং ক্রমাš^য়ে ছাত্র
ইউনিয়নে তারকার মেলা বসে যায়|
উক্ত সময়ের ছাত্রনেতা, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের দুঃসাহসী সংগঠক গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চে․ধুরী ১৯৪৫
খ্রিস্টাব্দের ২০ জানুয়ারি মিরসরাই থানার ইছাখালী জমাদার গ্রাম-এর এক মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন|
তাঁর পিতা ডা. কামাল উদ্দিন চে․ধুরী (মৃত) এবং মাতার নাম অহিদুন নাহার বেগম| চার ভাই, চার বোনের মধ্যে
গিয়াস উদ্দিন চে․ধুরী ছিলেন সবার বড়|
গিয়াস উদ্দিনের ক্সশশব ও ক্সকশোর অতিবাহিত হয় তরঙ্গ-বিক্ষুব্ধ সাগরোপকূলে ফেনী নদীর মোহনা সংলগ্ন প্রত্যন্ত
পল্লীতে| সেখানকার আবু তোরাব উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তিনি মাধ্যমিক পরীক্ষা পাস করেন| উচ্চ মাধ্যমিক
পরীক্ষা পাস করেন কুমিল্লার বিখ্যাত ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে| অতঃপর তিনি চট্টগ্রাম সরকারি কলেজে বাংলা
বিভাগে স্নাতক সম্মান শ্রেণীতে ভর্তি হন|
¯‥ুলজীবনেই গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চে․ধুরী প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নে যোগদান
করেন| আপন মেধা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও আন্তরিক কর্মতৎপরতার গুণে তিনি শীঘ্রই চট্টগ্রাম কলেজে পূর্ব
পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের অন্যতম প্রধান সংগঠকে পরিণত হন| অচিরে তিনি শুধু চট্টগ্রাম কলেজে নন, পূর্ব
পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন চট্টগ্রাম জেলা শাখারও অন্যতম প্রধান সংগঠকের তালিকায় নিজের স্থান করে নেন|
১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন চট্টগ্রাম জেলা শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক নির্বাচিত হন|
ঊনসত্তরের ১১ দফা আন্দোলনে ছাত্রনেতা গিয়াস উদ্দিন বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন| এ আন্দোলনের অন্যতম
নেতা হিসেবে সে বছর জানুয়ারি মাসে গ্রেফতার হয়ে তিনি কারাবরণ করেন| ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে তিনি পূর্ব পাকিস্তান
ছাত্র ইউনিয়ন চট্টগ্রাম জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন| একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি ঐ পদে
বহাল ছিলেন এবং ন্যাপ, কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়নের যে․থ গেরিলা বাহিনীর চট্টগ্রাম অঞ্চলের অন্যতম
প্রধান সংগঠক ছিলেন| চট্টগ্রাম জেলার বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রশিক্ষণার্থীদের সংগঠিত করে প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য
ভারত পাঠানো এবং প্রশিক্ষিত মুক্তিযোদ্ধাদের শত্রু কবলিত বাংলাদেশে নিয়ে এসে যার যার নির্দিষ্ট জায়গায়
মোতায়েন করার অতি ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব তিনি সাহসিকতা ও দক্ষতার সাথে পালন করেন| এ দায়িত্ব পালন করতে
গিয়ে তাঁকে বহুবার জীবনের ঝুঁকি নিতে হয়েছিল|
ছাত্র রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকা অবস্থাতেই গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চে․ধুরী মার্ক্সীয় দর্শন তথা সমাজতন্ত্রের
আদর্শে উদ্বুদ্ধ হন| ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির সভ্যপদ লাভ করেন|
¯^াধীনতা-উত্তরকালে গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চে․ধুরী ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন চট্টগ্রাম জেলা
শাখার সভাপতি নির্বাচিত হন| ঐ বছরই তিনি ছাত্র ইউনিয়ন কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন এবং
যুগপৎ ছাত্র ইউনিয়নের চট্টগ্রাম জেলা ও কেন্দ্রীয় কমিটির উভয় দায়িত্ব পালন করে যান| ১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে তিনি
বার্লিনে অনুষ্ঠিত ছাত্র-যুব উৎসবে বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের অন্যতম প্রতিনিধিরূপে যোগদান করেন|
ছাত্র রাজনীতি শেষে গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চে․ধুরী বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সার্বক্ষণিক সংগঠকের দায়িত্বে
নিয়োজিত হন এবং চট্টগ্রাম মহানগর কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক নির্বাচিত হন| ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটি পরিচালিত ইনস্টিটিউট অব সোশ্যাল
সায়েন্স-এ উচ্চ রাজ‣নতিক শিক্ষা গ্রহণের জন্য ম¯ে‥া যান| ১৯৭৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন
চট্টগ্রাম জেলা শাখার যুগ্ম আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করেন|
১৯৮৬ খ্রিস্টাব্দে গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চে․ধুরীর পিতা ডা. কামাল উদ্দিন চে․ধুরী মৃত্যুবরণ করার পর তাঁকে
সার্বক্ষণিক রাজনীতি থেকে সরে আসতে হয়, কিন্তু তিনি কখনও মার্কসীয় দর্শন তথা সমাজতন্ত্রের আদর্শকে
পরিত্যাগ করেননি| পার্টি এবং পার্টির বন্ধু-বান্ধবদের সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখতেন| একসময় তিনি উচ্চ
রক্তচাপ ও হৃদরোগে আক্রান্ত হন| এ পর্যায়ে তাঁর পরিশ্রম করার ও স্নায়বিক চাপ গ্রহণের ক্ষমতা একেবারে
সীমিত হয়ে আসে| ধীরে ধীরে তিনি সম্পূর্ণ পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে পড়েন| এভাবে তিনি দীর্ঘকাল একেবারে
শয্যাশায়ী থাকেন| পরে তাঁর মস্তি®ে‥ টিউমার ধরা পড়ে| অপারেশনের পর কিছুটা সুস্থও হয়েছিলেন| বিছানা
থেকে নিজে নিজে উঠে বসতে, বাথরুমে যেতে এবং ধরে ধরে ঘরের ভিতর এক-আধটুক হাঁটতেও পারতেন|
কিন্তু সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ওঠা তাঁর আর হয়নি| সেই জীবনও এক সময় ফুরিয়ে আসে, ২০০৯ খ্রিস্টাব্দের ১৬
সেপ্টে¤^র চট্টগ্রামের রাজনীতির এই তারকাকে জীবন থেকেও চির বিদায় নিতে হয় |
গিয়াস উদ্দিন আহমেদ চে․ধুরী ছিলেন দুই কন্যা সন্তানের জনক| বড়মেয়েকে বিয়ে দিয়েছেন| জামাতা অনেকটা
পুত্রের ভূমিকা পালন করেন| ছোটমেয়ে আইইউবি থেকে এম বি এ করেছেন| তাঁর স্ত্রী দেল আফরোজ বেগম
চট্টগ্রাম অঙ্কুর সোসাইটি ¯‥ুলে শিক্ষকতা করেন|
Nasir Uddin’s Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।





















