
অনলাইন ১৭ জুলাই ২০২৬
অনলাইন ১৭ জুলাই ২০২৬
জীবনের মুখগুলি ১৪৫
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী
বুদ্ধিজীবীদের মাঝে একদল থাকে রাষ্ট্রযন্ত্রের পক্ষে, অপরদল বিপক্ষে। বেশিরভাগ রাষ্ট্রযন্ত্রই যেহেতু নিপীড়নযন্ত্র, তাই যে সকল বুদ্ধিজীবী রাষ্ট্রযন্ত্রের তাবেদার হন তারা আপোষকামী হতে বাধ্য। অপরদিকে রাষ্ট্রযন্ত্রের নিপীড়নমূলক ভূমিকার বিরুদ্ধে সোচ্চার বুদ্ধিজীবীগণ হন আপোষহীন। এই শেষোক্ত দল হয়ে ওঠে নির্যাতিত মানুষের কণ্ঠস্বর, জাতির বিবেক। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী হলেন এমনি একজন বুদ্ধিজীবী যিনি শাসকগোষ্ঠীর সাথে কখনো আপোষ করেননি, জাতির বিবেক হয়ে থেকেছেন। এরকম মানুষ দুর্দিনে আশার আলো দেখান, অন্ধকার সমুদ্রে জাহাজকে যেমন পথ দেখায় বাতিঘর। তিনি আমাদের কালের, দুঃসময়ের, এক উজ্জ্বল বাতিঘর।
এই তো সেদিন তিনি নব্বই বছরে পা দিলেন। বাঙালির গড় আয়ু বিবেচনায় তিনি দীর্ঘজীবন পেয়েছেন। একজন প্রতিভাবান, সৃষ্টিশীল মানুষ দীর্ঘজীবন পেলে তা কেবল ব্যক্তির জন্য নয়, সমাজ ও জাতির জন্য হয়ে ওঠে সৌভাগ্যসূচক। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর দীর্ঘজীবন বাংলাদেশের জন্যই সৌভাগ্যসূচক। সত্য কথা বলার সৎসাহস না থাকলে, অন্যায়ের বিপক্ষে না দাঁড়ালে একজন প্রতিভাবান মানুষের সৃষ্টিশীলতাও প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। অবরুদ্ধ সময়ে, পশ্চাৎগামী সমাজে অন্যায়কে রুখে দাঁড়াবার, পশ্চাদপদতাকে অগ্রগামী করার মানুষরা হলেন আলোকবর্তিকা, কেবল যুগের নন, শতাব্দীর। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর প্রায় শতাব্দীব্যাপী জীবন বাঙালি জাতির জন্য সত্যানুসন্ধানের, শুভপ্রয়াসের নিরলস সাধনার উদাহরণ।
এখন তাঁর প্রতিটি জন্মোৎসব হয়ে ওঠে প্রগতিশীল চিন্তাধারার মানুষদের এক মিলোনৎসব। জন্মোৎসবের দর্শক-শ্রোতার একটি বড়ো অংশ তাঁর সরাসরি ছাত্ররা, আছেন তাঁর বিপুল গ্রন্থরাজির বিমুগ্ধ পাঠককুল, আর আছেন বাম রাজনীতিতে সম্পৃক্ত নেতা ও কর্মীগণ। যারা পুস্পস্তবক অর্পণ করলেন তাদের ভেতর অনেকগুলো বামপন্থী রাজনৈতিক দল ও ছাত্রসংগঠন রয়েছে। নিছক শিল্পের জন্য শিল্পে বিশ্বাস করেন না অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, তিনি সাহিত্যকে দেখেন সমাজ বদলের হাতিয়ার হিসেবে, মার্কসবাদে তাঁর গভীর আস্থা, তিনি নিপীড়িত মানুষের মুক্তির স্বপ্ন দেখেন। এসবই মিলে যায় বামপন্থি দলগুলোর মতাদর্শের সাথে। ফলে সরাসরি রাজনীতি না করলেও অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তাদের মতাদর্শের এক বড়ো সমর্থন ও আশ্রয়স্থল।
আমি তার সরাসরি ছাত্র হতে পারিনি, সে সৌভাগ্য আমার হয়নি। তাঁর প্রতি মুগ্ধতা জমতে শুরু করে তাঁর লেখা প্রবন্ধ পাঠ করে। আর এতে অনুপ্রেরণা জোগান আমার মেধাবী বন্ধু ড. আজফার হোসেন, যিনি অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কেবল সরাসরি ছাত্র নন, তাঁর একনিষ্ঠ ভক্ত। এই মুগ্ধতার কারণ কেবল পাণ্ডিত্য বা বিদগ্ধতা নয়, মতাদর্শের মিল। তারা দুজনেই মার্কসবাদে আস্থাশীল, শোষিত মানুষের মুক্তি, শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা তাদের দুজনেরই আরাধ্য। এটা আমার সাথে মিলে যায়।তিনি আমাকে চেনেন আজফার হোসেনের বন্ধু হিসেবে।
প্রিয় শিক্ষকের ভূমিকা দিতে গিয়ে আজফার অনেকগুলো বিশেষণ ব্যবহার করেন, যেমন, ‘দুর্মর প্রাণশক্তিসম্পন্ন’, ‘উচ্ছ্বল আবেগসম্পন্ন’, ‘অমিত প্রতিভাবান’, ‘নিরলস অধ্যবসায়ী’ ইত্যাদি। এর সবগুলোই তাঁর সম্পর্কে যুক্তিযুক্ত। কেউ যদি ‘জাতীয়তাবাদ, সাম্প্রদায়িকতা ও জনগণের মুক্তি’ গ্রন্থটি পাঠ করেন তবে টের পাবেন অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর জ্ঞানের গভীরতা, অর্ন্তদৃষ্টি, বিশ্লেষণের ক্ষমতা ও স্বচ্ছ মতাদর্শ। ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ থেকে ১৯৪৭ সালের দেশভাগ পর্যন্ত ভারতের রাজনীতির মহাগুরুত্বপূর্ণ সময়ের অমূল্য দলিল এই বিশ্লেষণধর্মী বইটিকে আমার কাছে মনে হয় কয়েকটি পিএইচডির সমতুল্য। এর প্রতিটি ছত্রে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মার্কসবাদী ও সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি দেশবিভাগের নায়ক ও ভিলেন প্রত্যককে নির্মোহ দৃষ্টিতে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন।তাঁর রচিত প্রতিটি গ্রন্থই পিএইচডি থিসিসের মতো বা অধিক মূল্যবান।
আজফার হোসেন যখন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সম্পর্কে কথা বলেন তখন তার কণ্ঠস্বর থাকে উদ্দীপ্ত ও উচ্চকিত, চোখ দ্যুতিময়, আর হাত নাড়ানো দর্শনীয়। ‘এক জীবন্ত বিপ্লবী’, ‘আজীবন লড়াকু’ ‘প্রতিভাবান শিক্ষাগুরু’ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর কীর্তিময় জীবনের অংশ হতে পেরে আজফার হোসেন ধন্য। একশ গ্রন্থের জনক, যার জীবন বিপুল অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ, তিনি কিন্তু আজতক কোনো আত্মজৈবনিক রচনা লেখেননি। তাই সেদিন শ্রোতৃকূলে বিপুল আগ্রহ ছিল কীর্তিমান মানুষটির জীবন অভিজ্ঞতা, মূল্যায়ন ও উপলব্ধিসমূহ শোনার।
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী শুরু করলেন জীবনের পটভূমি দিয়ে। বিক্রমপুরের বাড়ইখালি গ্রামে তাঁর জন্ম, আঁড়িয়াল বিল সংলগ্ন প্রত্যন্ত এলাকায় সে গ্রাম। দরিদ্র ও নিচু এলাকাটি। বিক্রমপুর একটি খ্যাতিমান অঞ্চল, অনেক বিখ্যাত মানুষ জন্ম নিয়েছে বিক্রমপুরে। সারা পৃথিবীতেই তারা ছড়িয়ে আছে। এর কারণটি অর্থনৈতিক। নিচু এলাকা, বর্ষার পানিতে ডুবে যায়। জন্ম গ্রামে হলেও তিনি গ্রামে থাকেননি, পিতার কর্মসূত্রে বিভিন্ন এলাকায় কাটিয়েছেন। বাড়ইখালি গ্রামটি ছিল কলেরা আর ম্যালেরিয়ার ডিপো, পুরুষরা বেশিদিন বাঁচত না। তার পিতার জন্মের আগে দাদা মারা গিয়েছিলেন। পিতা বড়ো হয়েছেন তার চাচীর কাছে। পড়াশোনায় ভালো ছিলেন, শ্রীনাথ ইনস্টিটিউট থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাশ করেছিলেন। তিনিই প্রথম। কলেজে পড়তে পারেননি, কলেজ ছিল শহরে, সেখানে গিয়ে পড়ার আর্থিক সঙ্গতি ছিল না। চাকরির খোঁজে তখন চলে যান কলকাতায়।
কলকাতায় তাঁর পিতার পরিচয় হয়েছিল স্টেটসম্যান পত্রিকার একজন সাব-এডিটরের সাথে। তিনি তাঁর পিতার জন্য দারোগার চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। কিন্তু পিতার মা নিষেধ করলেন পুলিশের চাকরি করতে। নিজ পিতা সম্পর্কে এটুকু বলে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী টেনে আনলেন বাড়ইখালি গ্রামে চৌধুরীরা কী করে এলো সে প্রসঙ্গ। তারা এ এলাকার লোক নন। তাদের এক পূর্বপুরুষ জহিরউদ্দিন চৌধুরী সূর্যাস্ত আইনে জমিদারী হারিয়েছিলেন। সে জমিদারী নীলামে কিনে নেয় তারই বন্ধু শ্রীনাথ রায়। অপমানে জমিদারী ছেড়ে চলে এসে বাড়ইখালি গ্রামে ঠাঁই নেন। তখন জমিদাররা বেশিরভাগ ছিল হিন্দু আর প্রজারা ছিলো মুসলমান। শ্রেণিঘৃণা থেকে জন্ম নিল সাম্প্রদায়িকতা। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত এবং ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ সাম্প্রদায়িকতা উসকে দিল আরও। তিনি বললেন, ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ আমাদের ইতিহাসের দুর্ঘটনা, আর ‘৪৭-এর দেশবিভাগ হলো ইতিহাসের সবচেয়ে বড়ো দুর্ঘটনা।
তিনি জন্মগ্রহণ করেছেন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলে ১৯৩৬ সালে, কিশোরবয়সে দেখেছেন ৪৭ এর দেশভাগ, তাঁর শিক্ষাজীবনের পুরোটা ও কর্মজীবনের শুরুটা কেটেছে আরেক ঔপনিবেশিক পাকিস্তান আমলে, আর কর্মময় জীবনের সিংহভাগ স্বাধীন বাংলাদেশে। তিনি বললেন, বড়ো রাষ্ট্র ছোটো হয়েছে, কিন্তু রাষ্ট্রের চরিত্রের মৌলিক পরিবর্তন ঘটেনি। ১৯৪৩ সালের মন্বন্তরে ৩০ লক্ষ লোক মারা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে, জাপানীরা কলকাতায় বোমা ফেলছে। সেসময় একজন মানুষের আত্মহত্যা তাকে আলোড়িত করে, আজো তাড়া করে ফিরে। ১৯৪৬ সালে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী পরিবারের সাথে কলকাতায় ছিলেন। তারা থাকতেন খিদিরপুর, যেখানে একসময় বাস করেছেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত, রঙ্গলাল সেন, হেমচন্দ্র সেন। পরের বছর ১৯৪৭ সালে ভারত ভাগ হয়ে গেলে তারা ফিরে এসেছেন ঢাকা, এসে নেমেছেন ফুলবাড়িয়া স্টেশন। গোধূলিলগ্ন সেটা, চারিদিক অন্ধকার। আলোকিত শিয়ালদহ ছেড়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন ফুলবাড়িয়ায় এসে তাদের মন বিষন্ন হয়ে গিয়েছিল। তারা স্টেশন থেকে নাজির বাজারে যে আত্মীয়ের বাড়ি গিয়ে উঠেছিলেন সেখানে বিদ্যুৎ ও পানি ছিল না। নাজির বাজার থেকে গিয়েছিলনে বেগম বাজারে আরেক আত্মীয়ের বাড়িতে। সেখানেও বিদ্যুৎ ছিল না। এরপরে ৫০০ পরিবারের সাথে যখন আজিমপুর কলোনিতে ঠাঁই মিলল তখন বিদ্যুৎ ও পানি পেলেন।
তখন শিয়ালদহ থেকে ট্রেনে করে গোয়ালন্দ, গোয়ালন্দ থেকে স্টিমারে করে বিক্রমপুরের ভাগ্যকূলে আসা যেত। কলকাতায় বেসরকারি চাকরি করতেন তাঁর বাবা, ঢাকা এসে বেকার হয়ে গেলেন। ভাগ্যকূলে এসে দেখেন দেশভাগে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ শোকস্তব্ধ, তাদের প্রাণে কোনো আনন্দ নেই। ১৯৫০ সালে তিনি ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন, তার হিন্দু সহপাঠী সুবিমল, সুধাংশু, পরিমল- ভালো ছাত্র সকলেই, কেউ আসেনি পরীক্ষা দিতে, তারা কলকাতায় চলে গেছে। পরিমল এসেছিল শুধু পরীক্ষাটা দিতে, দিয়েই চলে গিয়েছিল সীমান্তের ওপাড়ে। স্যারের পরিচিত এক বড়ো ভাই, ভালো ছাত্র ছিলেন, দেশভাগের পর হয়ে গেলেন বইয়ের ফেরিঅলা, স্টিমারে বই ফেরি করতেন। কলকাতার ডেন্টাল সার্জন ঢাকায় এসে বেকার হলেন। কলকাতায় Crafts নামের জনপ্রিয় দর্জি দোকান ছিল যে লোকটির সে ঢাকায় এসে দোকান খোলার জায়গা পাচ্ছিল না। এ হলো দেশভাগের ঘটনা। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এম এ পাশ করে সদ্য হরগঙ্গা কলেজে প্রভাষক হয়ে যোগ দিয়েছেন তার পরিচিত নৌকার মাঝি জোয়াদ আলী এসেছিল দেখা করতে। গাঁয়ের ছেলে কলেজের প্রফেসর হয়েছে ― তার দেখার শখ হয়েছিল। জোয়াদ আলী তখন ফেরারী, ডাকাতি মামলার আসামী।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বাবার খুব আগ্রহ ছিল ছেলেকে মিশনারী স্কুলে পড়াবেন। সে আগ্রহেই তাঁর সেন্ট গ্রেগরিজ স্কুল ও কলেজে পড়াশোনা। তিনি ছিলেন স্কুলটির দ্বিতীয় ব্যাচের ছাত্র। সে স্কুলে পেয়েছিলেন অজিত কুমার গুহকে। অসাধারন শিক্ষক, কবিতা আবৃত্তি যে কত মাধুর্যময় হতে পারে তা তাঁর আবৃত্তি শুনে বুঝেছিলেন। ভাষা আন্দোলনের সমাবেশ হতো বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায়, অজিত স্যার সেখানে যেতেন। কলেজের ভাইস প্রিন্সিপ্যাল ছিলেন ৩০ বছর বয়সী আমেরিকান যাজক ফাদার মার্টিন। বয়স কম, কিন্তু তিনিই কলেজটি চালান। একদিন ছাত্রদের জানালেন অজিত গুহ একজন কমিউনিস্ট। কমিউনিজমকে অপছন্দ করতেন ফাদার মার্টিন। শেক্সপীয়রের টেম্পেস্ট নাটক মঞ্চস্থ হবে, নারী চরিত্রে অভিনয় করার নারী পাওয়া গেল না। একজন ছেলেকে নারী সাজানো হলো। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী সে নাটকে ক্যালিভানের চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন।
তাঁর বাবা চেয়েছিলেন ছেলে বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি শাস্ত্র পড়বে, পড়ে সিভিল সার্ভিসে যোগ দিবে। তিনি ইকোনোমিক্সের বই খুলে দেখেন তা অংক আর পরিসংখ্যানে ভরা। এ দুই বিষয়ে তিনি স্বচ্ছন্দ নন, তার প্রিয় হলো সাহিত্য। বাবাকে সাহস করে বাংলা বলতে পারলেন না, বললেন ইংরেজি। তার বাবা ছিলেন আশাবাদী মানুষ, মা ছিলেন বাস্তববাদী। তখন ঢাকা শহরের উন্নয়ন ঘটছিল উত্তর দিকে, মা জমি কিনলেন দক্ষিণে, নবাবপুরে তৈরি হলো তাদের বাড়ি, নাম Shelter। আজিমপুর থেকে তারা নবাবপুরে চলে গেলেন। তাঁর জীবনে বাবার চেয়ে মায়ের প্রভাব বেশি। মায়ের মেরুদণ্ড ছিল ভারি শক্ত। বাবার মৃত্যুর পরে চৌত্রিশ বছর তাঁর মা একাকী ছিলেন, কিন্তু কোনো সন্তানের সাথে থাকেননি, নিজের স্বাধীনতা ও স্বকীয়তা উপভোগ করতেন। মায়ের বাস্তববাদী দৃষ্টিকোণ তিনি পাননি, কিন্তু মেরুদণ্ড সোজা রাখার শিক্ষা পেয়েছেন। তিনি ছিলেন কিছুটা লাজুক প্রকৃতির। ওই সলজ্জভাব নিয়েই নাটকে অভিনয় করতেন। মা বলতেন, দেখিস বাপু, পা যেন না কাঁপে।
তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা সিভিল সার্ভিসে চলে যেত। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ সিভিল সার্ভিসে চলে গেলে তার শূন্যস্থানে যোগ দিয়েছিলেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। আবুল খায়ের মুসলেহউদ্দিন পুলিশে যোগ দিলেন। রাষ্ট্র মেধাবীদের টেনে নিয়ে যেত প্রশাসনে। বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বাচন করলে প্রতিদ্বন্দ্বীদের ইংরেজিতে বক্তৃতা করতে হতো। তখন ঢাকায় সাংস্কৃতিক বিকাশ ঘটছিল। আজিমপুরে গড়ে উঠেছে সৈনিক, দ্যুতি― বিবিধ সাংস্কৃতিক সংগঠন। তমুদ্দিন মজলিশ রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন শুরু করেছে। তমুদ্দিন মজলিশ সমাজতান্ত্রিক চেতনায় বিশ্বাসী ছিল, কিন্তু ছিল কমিউনিজম বিরোধী।
১৯৫৯ সনে প্রথম যখন ইংল্যান্ডে গেলেন পোস্ট গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা করতে বিপুল গ্রন্থভাণ্ডারের দেখা পেলেন। গ্রামে যেখানে তা্র শৈশব কেটেছে সেখানে বইপত্র ছিল না, পাঠোৎসাহী মানুষটির সামনে জ্ঞানের বিপুল জগৎ খুলে গেল। ১৯৬৫ সালে ফের ওই ইংল্যান্ডেই গেলেন পিএইচডি করতে, তখনো পেলেন গ্রন্থভাণ্ডারের দেখা। পুঁজিবাদের সূতিকাগার ইংল্যান্ডে তিনি পুঁজিবাদ বিরোধী বিক্ষোভ দেখেছেন সেই ষাটের দশকেই। সেই রাগী যুবকদের বলা হতো Angry Young Men। তারা পুঁজিবাদ বিরোধী হলেও সমাজতন্ত্রী ছিলেন না। ষাটের দশকে দেশেও রাগী ছোকরাদের দল ছিল, এদের পালের গোদা ছিলেন আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, যিনি ‘কণ্ঠস্বর’ পত্রিকা সম্পাদনা করতেন। সেই জেনারেশনকে বলা হতো Sad Generation। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী পূবালী পত্রিকায় এই রাগী ছোকরাদের ব্যঙ্গ বিদ্রুপ করে কলাম লিখতেন ‘ঢাকায় থাকি’ সিরিজে। তার ভাষ্য ছিল এই রাগ বা বিষন্নতা আসল নয়, এগুলো নকল। বহুবছর পরে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ ‘ভালোবাসার সাম্পান’ নামে একটি বই সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে উৎসর্গ করে নিজের নামের শেষে বিশেষণ লিখেছেন ‘পালের গোদা।’
১৯৬৫ সালে তিনি যখন কমনওয়েলথ স্কলারশিপ নিয়ে ইংল্যান্ডের লেস্টার ইউনিভার্সিটিতে ইংরেজি সাহিত্যে পিএইচডি করতে যাবেন, তখন মুহম্মদ আব্দুল হাই, মুনীর চৌধুরী প্রমুখ বাংলা বিভাগের শিক্ষকগণ সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে বললেন, তুমি আমাদের বিভাগে চলে এসো। তাঁরও আগ্রহ ছিল, বাধ সাধলেন তাঁর পিএইচডি থিসিস গাইড জি এস ফ্রেজার। তিনি বললেন ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে গবেষণা করো। তাঁর অভিসন্দর্ভের বিষয় ইংরেজি ভাষার তিন জাদরেল ঔপন্যাসিক জোশেফ কনরাড, ই এম ফরস্টার ও ডি এইচ লরেন্স। সুপারভাইজার বললেন এঁদের সব লেখা পড়ে ফেলতে এবং তাঁদের লেখায় Evil খুঁজে বের করতে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর পিএইচডি থিসিসের শিরোনাম হল – The Enemy Territory : Evil in Conrad, Forster and Lawrence. সমাজতন্ত্রের পক্ষে দাঁড়ানোর জন্য তিনি সর্বদাই ছিলেন শাষকবর্গের বিপরীতে, তাঁর সুপারভাইজার ঠাট্টা করে বলেছিলেন তুমি চিরকাল ‘শত্রু অঞ্চলে’ই থেকে গেলে, পুঁজিবাদের মিত্র হলে না।
তা তিনি হননি, হবেনও না। পুঁজিবাদের বিপক্ষে তাঁর অবস্থান সুস্পষ্ট। তিনি বলেন, আগে এ দেশ ছিল ব্রিটিশ উপনিবেশ, মাঝে পাকিস্তানি উপনিবেশ, এখন বাঙালি ধনীদের উপনিবেশ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার লগ্নে, ১৬ই ডিসেম্বর হানাদার পাকিস্তানি সৈন্যরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভল্টে আগুন লাগিয়ে দেয়, তাতে প্রচুর টাকা পুড়ে যায়, কিছু টাকা আধপোড়া, কিছু অক্ষত থেকে যায়। এক লোক এসে দেখে প্রচুর টাকা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, সে সাধ্যমতো কুড়োতে লাগল, কিন্তু অত টাকা বয়ে নেবার মতো থলে বা বস্তা নেই। কী করে? সে লোক নিজের পরনের লুঙ্গি খুলে তার ভেতর টাকাগুলো ভরে টাকার বস্তা মাথায় তুলে দৌড় দিয়েছিল। লুটেরা ধনীদের কথা মনে এলে তার ওই টাকার বস্তা মাথায় নিয়ে দৌঁড়ানো উলঙ্গ লোকটির কথা মনে পড়ে। তাঁর বর্ণনা ও দৃশ্যটির কল্পনায় শ্রোতৃমহলে এক হাস্যরোল পড়ে গিয়েছিল।
তাঁর পিএইচডি থিসিস বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে ইংল্যান্ডে। প্রসঙ্গক্রমে জানালেন প্রখ্যাত প্যালেস্টাইনী বুদ্ধিজীবী বিশ্বখ্যাত এডওয়ার্ড সাঈদও জোশেফ কনরাডের উপন্যাস নিয়ে পিএইচডি করেছেন, তাঁর বিষয় অবশ্য ভিন্ন ছিল। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ফোকাস ছিল সাহিত্য, এডওয়ার্ড সাঈদের ফোকাস ছিল রাজনীতি (Politics in Conrad’s Novels)। কোনোপ্রকার তুলনায় না গিয়ে, সেটা সম্ভবও নয়, সাঈদের কাজ একজন ঔপন্যাসিকের কাজ নিয়ে, তাঁর কাজ তিনজন ঔপন্যাসিকের কাজ নিয়ে। কেন তিনি তিনজনকে বেছে নিয়েছিলেন তার ব্যাখ্যা দিলেন। খান সারওয়ার মুরশিদ কাজ করছিলেন ডাব্লিউ বি ইয়েটসের কবিতায় ভারতীয় উপাদান নিয়ে। ৬ মাস পরে জানলেন এটা নিয়ে গবেষণা হয়ে গেছে। তখন ইন্টারনেট ছিল না, জানা কঠিন ছিল পৃথিবীর কোন প্রান্তে কে কোন গবেষণা করছে। ঝুঁকি এড়াতেই তাঁর একের বদলে তিনজনকে বেছে নেওয়া, তাতে একাডেমিক চাপ তিনগুণ হয়েছে, কিন্তু ঝুঁকি এড়ানো গেছে।
সাহিত্যে বিষয় ও আঙ্গিকের চিরকালীন বিতর্ক প্রসঙ্গে বললেন, বিষয় অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। বিষয় ঠিক করে দিবে আঙ্গিক কী হবে। দার্শনিকতা ছাড়া মহৎ সাহিত্য সৃষ্টি হয় না- এর স্বপক্ষে ইংরেজ কবি স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজ এর একটি উক্তি উদ্বৃত করলেন। কোলরিজ বলেছিলেন, পৃথিবীতে এমন কোনো মহৎ সাহিত্যিক জন্মাননি যিনি মহৎ দার্শনিক নন। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আমাদের জানালেন তিনি তিনজন সাহিত্যিকের গদ্য পছন্দ করেন। তাঁর লেখায় তাদের প্রভাব দুর্নিরীক্ষ্য নয়। এই তিন সাহিত্যিক হলেন বুদ্ধদেব বসু, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও শিবরাম চক্রবর্তী। শেষোক্তজন মস্কো বনাম পণ্ডিচেরি বিতর্কে মস্কোর পক্ষ নিয়েছিলেন এই বলে যে ভারতীয় সাম্যবাদের চেয়ে রাশিয়ান সমাজনতন্ত্র শ্রেয়তর। কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো মাত্র ৩০ পৃষ্ঠার পুস্তক, কিন্তু দুনিয়া কাঁপিয়ে দিয়েছে। মার্কস ও এঙ্গেলস যখন কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো রচনা করেন তখন মার্কসের বয়স ৩০, এঙ্গেলসের ২৮। তিনি বললেন আমাদের দেশে সমাজতন্ত্রীরা নেতৃত্ব দিতে পারেনি, ব্যর্থ হয়েছে। জাতি সমস্যার সমাধান না হলে শ্রেণি সমস্যার সমাধান হবে না।
মুক্তিযুদ্ধে যে গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল তা ছিল কল্পনার বাইরে। ২৩ শে মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক জোহার হত্যাকাণ্ড ছিল নৃশংস। জগন্নাথ হলে ২৫ মার্চ রাতে যে নৃশংস হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তা দেয়ালের এপাশ থেকে দেখেছিলেন বিনীতা ওয়াজেদ। দেখে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছিলেন, নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেননি। ২৭ মার্চ কার্ফু্ শিথিল হলে পরিবারের সবাই বেরিয়ে পড়েছিলেন পথে। হেঁটে পাড়ি দিয়েছিলেন সড়কের পর সড়ক। গন্তব্য নিরাপদ আশ্রয়।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য ছিলেন এফ এম আবদুল হক। একদিন সীল করা খামে নির্দেশ এলো উপাচার্য ৬ জন শিক্ষককে ডেকে পাঠিয়েছেন। এই শিক্ষকগণ হলেন মুনীর চৌধুরী, নীলিমা ইব্রাহিম, মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান, এনামুল হক, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ও হাবিবুল্লাহ মিয়া। তারা শঙ্কিত হলেন, কারণ পাকিস্তানী সামরিক জান্তার খুব রাগ ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের উপর, বিশেষ করে শিক্ষক ক্লাবের উপর। মোহাম্মদ মনিরুজ্জামানের ৬ মাস জেল হলো কারণ সামরিক জান্তা তার লেখা গানকে পাকিস্তান বিরোধী মনে করত, অথচ তাঁর গানে ছিল বাংলার প্রকৃতির বন্দনা। এটাকেই দেশপ্রেমের উদাহরণ ধরে সামরিক জান্তা ভেবেছে তিনি পাকিস্তান বিরোধী। রাও ফরমান আলীর ডায়েরিতে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর নাম ছিল ৫ নম্বরে, ঠিকানা ছিল না। ঠিকানা না থাকার জন্যই ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড থেকে তিনি বেঁচে যান।
১৯৭১ এর ওই টালমাটাল অবরুদ্ধ সময়ে শিক্ষকরা নিজেদের জীবন নিয়ে শঙ্কিত ছিলেন। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর শুভাকাঙ্ক্ষী ছিলেন প্রফেসর আলী আশরাফ। তিনি সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে পাক হানাদারদের আক্রোশ থেকে বাঁচিয়ে দেওয়ার জন্য কোয়েটায় সদ্যস্থাপিত বেলুচিস্তান বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভাগীয় প্রধান করে পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। নিয়োগপত্র এলো। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ‘মায়ের অসুখ’ বলে সে আমন্ত্রণ ফিরিয়ে দিলেন। সত্যি কি মায়ের অসুখ হয়েছিল? না। এই মা হলেন মাতৃভূমি― যা তখন বিপর্যস্ত।
নীতি ও ন্যায়পরায়নতা এবং আপোষহীন ভূমিকার সাথে তাঁর চরিত্রে মিশেছে মাধুর্যমণ্ডিত বিনয়। এসব কারণেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাঝে তাঁর জনপ্রিয়তা আকাশচুম্বী। তিনি যতবার শিক্ষক সমিতির নির্বাচনে দাঁড়িয়েছেন ততবার নির্বাচিত হয়েছেন। দুবার সর্বোচ্চ ভোট পেয়েছেন। সর্বোচ্চ ভোট পেয়েও তাকে উপাচার্য নিয়োগ দিতে ভীত ছিল শাসকরা, তিনি নিজেও প্রত্যাখান করেছেন উপাচার্য হওয়ার প্রস্তাব। স্বৈরাচারী শাসক জেনারেল এরশাদ বিস্মিত হয়েছিলেন তাঁর অসম্মতিতে।
এই যে ৪ বার নির্বাচন করে তিনি ৩ বার নির্বাচিত হলেন, সর্বোচ্চ ভোট পেলেন, দুবার উপাচার্য হতে হতে হলেন না ― এ সবই প্রমাণ করে তিনি বিপুল জনপ্রিয়। এই জনপ্রিয়তা এসেছে তাঁর আপোষহীন ও দৃঢ় ভূমিকা থেকে, ব্যক্তিগত পদলাভের চেয়ে শিক্ষকদের সামষ্টিক স্বার্থ দেখার দৃষ্টান্ত থেকে। তাকে উপাচার্য করতে অস্বস্তি ছিল শাসক শ্রেণির আর তিনিও ছিলেন পদের প্রতি লোভহীন। উপাচার্য তো বিরাট বিষয়, সামান্য পদ পেতে যেরকম তদবীর চলে, আনুগত্য প্রকাশের যে দীর্ঘ সারি তৈরি হয়, তাতে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ওই প্রত্যাখান বিরল ও দৃষ্টান্তযোগ্য। কেবল উপাচার্য পদ নয়, তিনি প্রত্যাখান করেছেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য পদের প্রস্তাব। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একবার ডীন হয়েই বুঝেছি, ‘ওটা আমার কাজ নয়।’ পদে অধিষ্ঠান মানেই নীতির সাথে আপোষ, পদে অধিষ্ঠান মানেই শাসকদের অঙ্গুলিহেলনে চলা, তাদের অনৈতিক সুবিধা দেওয়া। তিনি যখন এরশাদের সাথে উপাচার্য হওয়া বিষয়ে দেখা করতে গেলেন তখন তাঁর স্ত্রীকে খবরটি জানালে নাজমা জেসমিন চৌধুরী বলেছিলেন, ‘আমি কিন্তু একজন লেকচারারকে বিয়ে করেছিলাম।’ অসাধারণ মানুষটির সহধর্মিণীও ছিলেন অসাধারণ। শুনে আমরা শ্রোতারা বিস্ময়স্তব্ধ!
১০০টি গ্রন্থের রচয়িতা অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী প্রবন্ধ সাহিত্যে মৌলিক অবদানের জন্য ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯৬ সালে পান একুশে পদক। অলক্ত সাহিত্য পুরস্কার, গীতাঞ্জলী পুরস্কার, নজরুল পদক, শহীদ আলতাফ হোসেন পুরস্কারসহ অনেকগুলো পুরস্কার তাঁর মননশীল সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি বহন করে। তিনি অনেকগুলো প্রগতিশীল সাহিত্য সংগঠনের প্রতিষ্ঠার সাথে যুক্ত। ১৯৭৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ লেখক শিবির। ১৯৮৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর মানববিদ্যা গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা তাঁর একটি উল্লেখযোগ্য অবদান। ওসমানী উদ্যান, লালনের আখড়া, আঁড়িয়াল বিল রক্ষার আন্দোলনে নিজের ভূমিকা প্রসঙ্গে বললেন এসব আন্দোলনে আমি সম্পৃক্ত হয়েছি পরিবেশবাদী হিসেবে নয়, অধিকার রক্ষার জন্য। লালনের আখড়া রক্ষা করতে পারেননি, আঁড়িয়ল বিল রক্ষা পেয়েছে, ওসমানী উদ্যান আংশিক।
কুড়ি বছর ধরে ‘নতুন দিগন্ত’ পত্রিকা সম্পাদনা প্রসঙ্গে বললেন কৈশোরে হাতে লেখা দেয়াল পত্রিকা প্রকাশ করেছেন, জীবনে প্রচুর পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। তিনি ‘উচ্চতর মানববিদ্যা গবেষণা কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করেছেন, ‘সমাজ রূপান্তর গবেষণা কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করেছেন সমাজ রূপান্তরের মহৎ লক্ষ্যে। তিনি বললেন, সমাজতান্ত্রিক ভাবধারায় বিশ্বাসী লেখক বুদ্ধিজীবীদের সংঘ গড়ে তোলা দরকার। আমাদের সমস্ত অর্জন এক ক্রান্তিকালে এসে দাঁড়িয়েছে। স্বপ্ন ভেঙে গেছে। আমরা ধ্বংসের দিকে যাব নাকি সৃষ্টির দিকে সে প্রশ্নের মীমাংসা জরুরি। সম্পদ ব্যক্তি মালিকানা থেকে সামাজিক মালিকানায় নিতে হবে, নইলে পুঁজিবাদের নৃশংসতা ও বীভৎসতা দেখে যেতে হবে। বিদ্রোহকে সামনে আনতে না পারলে জনতার মুক্তি ঘটবে না।
৯০ বছর বয়সে পৌঁছে যাওয়া মানুষটির মনোবল ও প্রাণশক্তি বিস্ময়কর। সুনন্দ, সুস্পষ্ট তাঁর উচ্চারণ, দ্বিধা ও ভয়শূন্য তার কণ্ঠস্বর। তিনি যখন কথা বলেন তখন মনে হয় একটি সুলিখিত প্রবন্ধ পাঠ করছেন, অথচ কোনো লিখিত কাগজের দিকে তিনি তাকাননি, পুরোটাই উপস্থিত বক্তৃতা। তাঁর চিন্তার যে স্বচ্ছতা, যুক্তির যে পারম্পর্য, জ্ঞানের যে গভীরতা তা হীরকদ্যুতিসম্পন্ন। কী লেখায়, কী বলায় তিনি অতুলনীয় ক্ষুরধার। আমাদের কালের এক বিপুল মহীরুহ তিনি। তাকে বিপ্লবী অভিবাদন!
Kamrul Hassan’s Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।





















