, মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

ডা. লায়লা পারভীন বানুর মুক্তিযুদ্ধে প্রতিরোধ ও পুনর্গঠনের জীবনকথা

  • প্রকাশের সময় : ১১:৫৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬
  • ১৯ পড়া হয়েছে

Mahmudul Hasan Jahid’s Post

ডা. লায়লা পারভীন বানুর মুক্তিযুদ্ধে প্রতিরোধ ও পুনর্গঠনের জীবনকথা
১৯৭১ সালের উত্তাল দিনগুলোতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম কেবল সম্মুখ সমরের পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এতে যুক্ত ছিল মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ, প্রান্তিক চিকিৎসা সেবা এবং অদম্য আত্মত্যাগের বহুপ্রস্থ মাত্রা। এই সশস্ত্র ও মানবিক সংগ্রামের এক অনন্য সাধারণ প্রতিচ্ছবি অধ্যাপক ডা. লায়লা পারভীন বানু। ব্যক্তিগত নিদারুণ স্বজন হারানোর শোককে যিনি রূপান্তর করেছিলেন মুক্তিকামী মানুষের সুশ্রূষা ও জাতীয় পুনর্গঠনের হাতিয়ারে।
প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষার দিনগুলো
১৯৪৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়ার ধর্মদহ গ্রামের এক প্রগতিশীল মুসলিম পরিবারে লায়লা পারভীন বানুর জন্ম। বাবা আজিজুর রহমান ও মা আনোয়ারা রহমানের ছয় সন্তা‌নের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। পারিবারিক পরিমণ্ডলে উদারচিন্তা ও সামাজিক মূল্যবোধের চর্চায় বেড়ে ওঠা লায়লার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা ১৯৫৪ সালে বরিশালের ক্যাথলিক মিশনারি স্কুলে। পরবর্তীতে পরিবারের নানা চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে ১৯৬৭ সালে তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। যুদ্ধপূর্ববর্তী সময়ে একজন তরুণী হিসেবে একটি সমৃদ্ধ চিকিৎসাক্যারিয়ারের যে স্বপ্ন তিনি বুনছিলেন, তা অচিরেই জাতীয় সংকটের মুখোমুখি এসে থমকে দাঁড়ায়।
আঘাত, রূপান্তর ও গোবরা ক্যাম্পের প্রতিরোধ
১৯৭১ সালের মার্চে যুদ্ধ শুরু হলে রাজশাহী কিছুদিন মুক্তাঞ্চল হিসেবে টিকে থাকলেও, ১৪ এপ্রিলে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী তাঁর বাবা আজিজুর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যা করে। স্বজন হারানোর এই তীব্র সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক আঘাত তাঁর ভেতরের প্রতিরোধস্পৃহাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বাবাকে দাফন করতে না পারা, গ্রামের বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া এবং সমগ্র পরিবারের অনিশ্চয়তার অভিজ্ঞতা তাঁকে কেবল এক শোকাক্রান্ত সন্তানে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং একজন সক্রিয় বিপ্লবীতে রূপান্তরিত করে।
জুন মাসের প্রথম দিকে তিনি ভারতে পাড়ি জমান এবং কলকাতার ঐতিহাসিক ‘গোবরা ক্যাম্পে’ যুক্ত হন। তৎকালীন সময়ে এই ক্যাম্পটি নারীদের বহুমুখী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছিল। সেখানে সিভিল ডিফেন্স, প্রাথমিক চিকিৎসা, নার্সিংয়ের পাশাপাশি অস্ত্রচালনা, গেরিলা রণকৌশল ও আত্মরক্ষার কঠোর পাঠ নেন তিনি।
তবে লায়লা পারভীন বানুর ভূমিকা কেবল প্রশিক্ষণ গ্রহণেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তরুণ চিকিৎসক-শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি শরণার্থী, নির্যাতিত নারী ও আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। প্রয়োজনীয় সম্পদ ও চিকিৎসার সীমাবদ্ধতার মাঝেও সুশ্রূষা, খাদ্য ও পানীয় সংস্থানের মতো মৌলিক কাজগুলো পরিচালনায় তাঁর নেতৃত্ব ছিল প্রশংসনীয়।
যুদ্ধোত্তর সেবা ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়ন
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর লায়লা পারভীন বানু তাঁর অসম্পূর্ণ চিকিৎসা শিক্ষা সম্পন্ন করতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ফিরে আসেন। ডিগ্রি অর্জনের পর সেখানে শিক্ষকতায় যোগ দিয়ে গড়ে তোলেন নতুন প্রজন্মের চিকিৎসকদের। পরবর্তীতে তিনি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গ্রামীণ ও সামাজিক স্বাস্থ্য আন্দোলনে আত্মনিয়োগ করেন। কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন ও আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে নানা বৈশ্বিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন।
শিক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রতি তাঁর এই দূরদর্শী ভূমিকা পূর্ণতা পায় পরবর্তী জীবনে, যখন তিনি গণবিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা থেকে সর্বোচ্চ অ্যাকাডেমিক পদে আসীন হওয়ার এই পথচলা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও স্বাস্থ্যাধিকার আন্দোলনে এক বিরল উদাহরণ।
ঐতিহাসিক তাৎপর্য
মুক্তিযুদ্ধে নারীর ভূমিকাকে প্রায়শই কেবল নিষ্ক্রিয় সহমর্মী বা ‘সংগঠক’ হিসেবে দেখার একটা প্রবণতা ইতিহাসে পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু ডা. লায়লা পারভীন বানুর জীবনপ্রবাহ প্রমাণ করে যে, যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানা কেবল বন্দুকযুদ্ধের পরিখা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল না; বরং রণাঙ্গনের পেছনের রসদ, চিকিৎসা, মনস্তাত্ত্বিক পুনর্বাসন ও রণকৌশলগত প্রস্তুতিতেও নারীরা সমানভাবে ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৭১-এর সশস্ত্র প্রতিরোধ থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষা ও প্রশাসনিক নেতৃত্ব—সবক্ষেত্রেই তাঁর অবদান প্রমাণ করে কীভাবে ব্যক্তি ট্র্যাজেডি জাতীয় সাহসিকতায় রূপান্তরিত হতে পারে।

Mahmudul Hasan Jahid’s Post

মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।

জনপ্রিয়

ডা. লায়লা পারভীন বানুর মুক্তিযুদ্ধে প্রতিরোধ ও পুনর্গঠনের জীবনকথা

প্রকাশের সময় : ১১:৫৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৯ জুলাই ২০২৬

Mahmudul Hasan Jahid’s Post

ডা. লায়লা পারভীন বানুর মুক্তিযুদ্ধে প্রতিরোধ ও পুনর্গঠনের জীবনকথা
১৯৭১ সালের উত্তাল দিনগুলোতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম কেবল সম্মুখ সমরের পুরুষ মুক্তিযোদ্ধাদের যুদ্ধেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এতে যুক্ত ছিল মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ, প্রান্তিক চিকিৎসা সেবা এবং অদম্য আত্মত্যাগের বহুপ্রস্থ মাত্রা। এই সশস্ত্র ও মানবিক সংগ্রামের এক অনন্য সাধারণ প্রতিচ্ছবি অধ্যাপক ডা. লায়লা পারভীন বানু। ব্যক্তিগত নিদারুণ স্বজন হারানোর শোককে যিনি রূপান্তর করেছিলেন মুক্তিকামী মানুষের সুশ্রূষা ও জাতীয় পুনর্গঠনের হাতিয়ারে।
প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষার দিনগুলো
১৯৪৯ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর কুষ্টিয়ার ধর্মদহ গ্রামের এক প্রগতিশীল মুসলিম পরিবারে লায়লা পারভীন বানুর জন্ম। বাবা আজিজুর রহমান ও মা আনোয়ারা রহমানের ছয় সন্তা‌নের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। পারিবারিক পরিমণ্ডলে উদারচিন্তা ও সামাজিক মূল্যবোধের চর্চায় বেড়ে ওঠা লায়লার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সূচনা ১৯৫৪ সালে বরিশালের ক্যাথলিক মিশনারি স্কুলে। পরবর্তীতে পরিবারের নানা চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্য দিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে ১৯৬৭ সালে তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। যুদ্ধপূর্ববর্তী সময়ে একজন তরুণী হিসেবে একটি সমৃদ্ধ চিকিৎসাক্যারিয়ারের যে স্বপ্ন তিনি বুনছিলেন, তা অচিরেই জাতীয় সংকটের মুখোমুখি এসে থমকে দাঁড়ায়।
আঘাত, রূপান্তর ও গোবরা ক্যাম্পের প্রতিরোধ
১৯৭১ সালের মার্চে যুদ্ধ শুরু হলে রাজশাহী কিছুদিন মুক্তাঞ্চল হিসেবে টিকে থাকলেও, ১৪ এপ্রিলে নেমে আসে চরম বিপর্যয়। দখলদার পাকিস্তানি বাহিনী তাঁর বাবা আজিজুর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যা করে। স্বজন হারানোর এই তীব্র সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক আঘাত তাঁর ভেতরের প্রতিরোধস্পৃহাকে বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বাবাকে দাফন করতে না পারা, গ্রামের বাড়ি পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া এবং সমগ্র পরিবারের অনিশ্চয়তার অভিজ্ঞতা তাঁকে কেবল এক শোকাক্রান্ত সন্তানে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং একজন সক্রিয় বিপ্লবীতে রূপান্তরিত করে।
জুন মাসের প্রথম দিকে তিনি ভারতে পাড়ি জমান এবং কলকাতার ঐতিহাসিক ‘গোবরা ক্যাম্পে’ যুক্ত হন। তৎকালীন সময়ে এই ক্যাম্পটি নারীদের বহুমুখী প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করছিল। সেখানে সিভিল ডিফেন্স, প্রাথমিক চিকিৎসা, নার্সিংয়ের পাশাপাশি অস্ত্রচালনা, গেরিলা রণকৌশল ও আত্মরক্ষার কঠোর পাঠ নেন তিনি।
তবে লায়লা পারভীন বানুর ভূমিকা কেবল প্রশিক্ষণ গ্রহণেই সীমাবদ্ধ ছিল না। তরুণ চিকিৎসক-শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি শরণার্থী, নির্যাতিত নারী ও আহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। প্রয়োজনীয় সম্পদ ও চিকিৎসার সীমাবদ্ধতার মাঝেও সুশ্রূষা, খাদ্য ও পানীয় সংস্থানের মতো মৌলিক কাজগুলো পরিচালনায় তাঁর নেতৃত্ব ছিল প্রশংসনীয়।
যুদ্ধোত্তর সেবা ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপায়ন
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর লায়লা পারভীন বানু তাঁর অসম্পূর্ণ চিকিৎসা শিক্ষা সম্পন্ন করতে রাজশাহী মেডিকেল কলেজে ফিরে আসেন। ডিগ্রি অর্জনের পর সেখানে শিক্ষকতায় যোগ দিয়ে গড়ে তোলেন নতুন প্রজন্মের চিকিৎসকদের। পরবর্তীতে তিনি গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গ্রামীণ ও সামাজিক স্বাস্থ্য আন্দোলনে আত্মনিয়োগ করেন। কাজের অভিজ্ঞতা অর্জন ও আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে নানা বৈশ্বিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন।
শিক্ষায় প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রতি তাঁর এই দূরদর্শী ভূমিকা পূর্ণতা পায় পরবর্তী জীবনে, যখন তিনি গণবিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা থেকে সর্বোচ্চ অ্যাকাডেমিক পদে আসীন হওয়ার এই পথচলা বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও স্বাস্থ্যাধিকার আন্দোলনে এক বিরল উদাহরণ।
ঐতিহাসিক তাৎপর্য
মুক্তিযুদ্ধে নারীর ভূমিকাকে প্রায়শই কেবল নিষ্ক্রিয় সহমর্মী বা ‘সংগঠক’ হিসেবে দেখার একটা প্রবণতা ইতিহাসে পরিলক্ষিত হয়। কিন্তু ডা. লায়লা পারভীন বানুর জীবনপ্রবাহ প্রমাণ করে যে, যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানা কেবল বন্দুকযুদ্ধের পরিখা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল না; বরং রণাঙ্গনের পেছনের রসদ, চিকিৎসা, মনস্তাত্ত্বিক পুনর্বাসন ও রণকৌশলগত প্রস্তুতিতেও নারীরা সমানভাবে ভূমিকা রেখেছেন। ১৯৭১-এর সশস্ত্র প্রতিরোধ থেকে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশের শিক্ষা ও প্রশাসনিক নেতৃত্ব—সবক্ষেত্রেই তাঁর অবদান প্রমাণ করে কীভাবে ব্যক্তি ট্র্যাজেডি জাতীয় সাহসিকতায় রূপান্তরিত হতে পারে।

Mahmudul Hasan Jahid’s Post

মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।