
অলাইন শনিবার, ২২ আগস্ট ২০২৬
দীপু মনি, তৌফিক নেওয়াজ ও ‘টিপুনগর’: ক্ষমতার রাজনীতির আরেক অধ্যায়
একসময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে বেশ প্রভাবশালী নাম ছিলেন ডা. দীপু মনি। তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী—দুই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন তিনি।
তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও নানা আলোচনা আছে। তাঁর স্বামী ব্যারিস্টার তৌফিক নেওয়াজ একজন আইনজীবী এবং বাঁশিবাদক হিসেবেও পরিচিত। তবে তাঁর মৃত্যুর খবর ১৮ আগস্ট ২০২৬ তারিখে ঘটেছে—এমন তথ্য এই মুহূর্তে নির্ভরযোগ্য সংবাদসূত্রে নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। বরং চলতি বছরের ২৬ এপ্রিল তাঁকে অসুস্থ অবস্থায় হুইলচেয়ারে করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দীপু মনির সঙ্গে দেখা করতে দেখা গিয়েছিল।
তবে দীপু মনির পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাব ও সম্পদ নিয়ে যে প্রশ্নগুলো উঠেছিল, তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়েছে তাঁর বড় ভাই ডা. জাওয়াদুর রহিম ওয়াদুদ—যিনি টিপু নামে পরিচিত।
চাঁদপুরের ‘টিপুনগর’ প্রসঙ্গ
দীপু মনি যখন শিক্ষামন্ত্রী ছিলেন, তখন চাঁদপুরে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য চাঁদপুর সদর উপজেলার লক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের একটি এলাকা প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত হলে সেখানে জমি কেনাবেচা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।
সংবাদপ্রতিবেদন অনুযায়ী, দীপু মনির ভাই জাওয়াদুর রহিম ওয়াদুদের নামে ওই এলাকায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমি কেনা হয়েছিল। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদনে তাঁর নামে ৫৬৮ শতাংশ বা ৫.৬৮ একর জমির দলিল হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়।
পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা তৈরি হলে জাওয়াদুর রহিম জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি অধিগ্রহণের আগে তিনি জমিগুলো হস্তান্তর করেছেন। তাঁর বক্তব্য ছিল—সরকার জমি অধিগ্রহণ করলে তিনি আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন এমন ধারণা তৈরি হোক, সেটা তিনি চাননি।
অর্থাৎ এই ঘটনাকে একপক্ষ যেখানে স্বার্থের সংঘাত হিসেবে দেখেছে, অন্যপক্ষ সেখানে জমি বৈধভাবে কেনা ও পরে হস্তান্তরের ব্যাখ্যা দিয়েছে।
এরপর আসে ‘টিপুনগর’
চাঁদপুরের হাইমচরের নীলকমল ইউনিয়নের বাহেরচর এলাকায় আরও বড় অভিযোগ সামনে আসে।
বিভিন্ন সংবাদপ্রতিবেদন অনুযায়ী, সেখানে নদীতে জেগে ওঠা সরকারি খাসজমির প্রায় ৪৮.৫২৫ একর জমি জাওয়াদুর রহিম টিপুসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে জাল দলিলের মাধ্যমে নিজেদের দখলে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
এ ঘটনায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়েছিল। মামলায় জাওয়াদুর রহিম টিপুসহ ২৫ জনকে আসামি করা হয় বলে সংবাদে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরে ২০২৫ সালে তাঁর বিরুদ্ধে ওই জমি নিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের অনুসন্ধানের খবরও প্রকাশিত হয়। আজকের পত্রিকার প্রতিবেদনে অভিযোগের পরিমাণ ৪৮.৫২৫ একর বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই এলাকাতেই গড়ে ওঠে কথিত ‘টিপুনগর’—যেখানে মাছের ঘের, গবাদিপশুর খামার ও সবজি বাগান গড়ে তোলার কথা বিভিন্ন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
খাসজমি নিয়ে মূল প্রশ্নটা কী?
এখানেই বিষয়টির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গা।
সরকারি খাসজমি ব্যক্তিগত মালিকানায় চলে যেতে পারে কি না—এটা আইনের প্রশ্ন। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে ভূমি কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তির নামে ‘জমাবন্দী’ থাকলেও সেটি জমির মালিকানা প্রতিষ্ঠা করে না; জমিটি সরকারি খাসজমিই থেকে যায়।
অন্যদিকে সংশ্লিষ্ট পক্ষ দাবি করেছে, তারা ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি কিনেছে এবং কোনো সরকারি জমি দখল করেনি। দীপু মনি নিজেও অতীতে তাঁর ভাইয়ের জমি ব্যক্তিমালিকানাধীন বলে দাবি করেছিলেন।
সুতরাং এখানে অভিযোগ, পাল্টা বক্তব্য এবং প্রশাসনিক তদন্ত—তিনটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি।
ক্ষমতার ছায়ায় পরিবারের উত্থান?
দীপু মনি দীর্ঘদিন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকায় তাঁর পরিবারের সদস্যদের সম্পদ ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ড স্বাভাবিকভাবেই জনআলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছিল।
বিশেষ করে চাঁদপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য জমি অধিগ্রহণ এবং হাইমচরের খাসজমি—এই দুই ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশ্ন উঠেছে, রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে কেউ ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হয়েছিল কি না।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া আর অভিযোগ ওঠা এক কথা নয়। কারও বিরুদ্ধে মামলা, তদন্ত বা সংবাদপ্রতিবেদন থাকা মানেই আদালতে অপরাধ প্রমাণিত হয়ে যাওয়া নয়।
তবে অভিযোগগুলো এতটাই গুরুতর যে সেগুলোর পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং সরকারি জমির প্রকৃত মালিকানা ও লেনদেনের স্বচ্ছ হিসাব জনগণের সামনে আসা জরুরি।
শেষ কথা
একসময় ক্ষমতার কেন্দ্রের খুব কাছাকাছি থাকা মানুষদের চারপাশে তখন অনেক আলো ছিল। মন্ত্রী, রাষ্ট্রীয় সফর, রাজনৈতিক প্রভাব—সব মিলিয়ে জীবন ছিল একেবারেই অন্যরকম।
কিন্তু ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়।
সময় বদলায়, সরকার বদলায়, রাজনৈতিক অবস্থান বদলায়। তখন পুরোনো দিনের জমি, সম্পদ, ক্ষমতার ব্যবহার এবং রাজনৈতিক প্রভাবের গল্পগুলোই নতুন করে সামনে আসে।
দীপু মনি ও তাঁর পরিবারের ক্ষেত্রেও এখন মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত—
কোন সম্পদ বৈধভাবে অর্জিত, কোন জমি ব্যক্তিমালিকানাধীন, কোনটি সরকারি খাসজমি, কোথায় আইন ভাঙার অভিযোগ আছে এবং কোন অভিযোগ আদালত বা তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে?
রাজনৈতিক পছন্দ-অপছন্দের বাইরে গিয়ে এই প্রশ্নগুলোর উত্তর যদি নথি ও প্রমাণের ভিত্তিতে বেরিয়ে আসে, তাহলেই প্রকৃত ইতিহাসটা পরিষ্কার হবে।
আর তৌফিক নেওয়াজের মৃত্যুর খবরটি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সেটিকে নিশ্চিত ঘটনা হিসেবে প্রচার না করাই দায়িত্বশীলতার পরিচয়।
আঞ্জুমান আরা খান কলি
𝒦𝑜𝓁𝒾 | কলি
কলি বিবি’s Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।





















