
Arpita Kabir’s Post
অনলাইন শুক্রবার, ৩১ জুলাই
বড় হয়ে আমি ডাক্তার-মুখোশ হবো
আমার জীবনের লক্ষ্য বড় হয়ে একজন ডাক্তার-মুখোশ হওয়া।
আমাদের স্কুলে প্রায় সবাই ডাক্তার কিংবা ইঞ্জিনিয়ার হতে চায়। কেউ কেউ স্থপতি, কৃষিবীদ, সেনা কর্তা, পাইলট, পুলিশ অফিসার ইত্যাদি। আমি অনেক ভেবেছি। আমি শুধু ডাক্তার হতে চাই না, আমি ডাক্তার-মুখোশ হতে চাই। আমার মনে হয়, শুধু ডাক্তার হওয়ার চেয়ে ডাক্তার-মুখোশ হওয়া আরো ভালো।
ডাক্তারদের সবাই খুব সম্মান করেন। অসুখ হলে সবাই তাদের কাছে যায়। তারা অনেক বড় বড় বই পড়েন, অনেক কঠিন পরীক্ষা দেন, অনেক বছর ধরে পড়াশোনা করেন। সরকারি ডাক্তারদের খুব পরিশ্রম করতে হয়। সপ্তাহে মাত্র একদিন ছুটি পান। এত মানুষের দেশে ডাক্তারও খুব বেশি নেই। তাই তাদের সব সময় কাজ করতে হয়। আমি এসব দেখে ভাবি, ডাক্তার-মুখোশ হলে নিশ্চয়ই আরো বড় দায়িত্ব থাকে।
ডাক্তাররা নাকি একটা শপথ নেন। সেই শপথের নাম হিপোক্রেটিক শপথ। শপথ নেওয়া খুব ভালো কাজ। আমি বড় হয়ে ডাক্তার-মুখোশ হলে আমিও সেই শপথ নেবো। তারপর আমি বুঝবো, আমি সত্যি একজন ডাক্তার-মুখোশ হয়েছি।
আমাদের দেশে নতুন নতুন বেসরকারি হাসপাতাল আর মেডিকেল কলেজ হচ্ছে। এত হাসপাতাল আর কলেজ যদি তৈরি হয়, তাহলে নিশ্চয়ই অনেক ডাক্তার-মুখোশের দরকার আছে। আমি বড় হয়ে তাদের একজন হতে চাই। বড় বড় ভবনের সামনে আমার নাম লেখা থাকবে। মানুষ দূর-দূরান্ত থেকে আমাকে দেখতে আসবে।
আমি শুনেছি, ডাক্তাররা অনেক সময় নতুন নতুন ওষুধ সম্পর্কে জানেন। ওষুধের কোম্পানির লোকেরাও তাদের সঙ্গে দেখা করেন। নিশ্চয়ই ভালো ওষুধ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য এত মানুষের একসঙ্গে কাজ করতে হয়। আমি বড় হয়ে ডাক্তার-মুখোশ হলে সব ওষুধের নাম জানবো। কোন ওষুধ বেশি ভালো, কোন ওষুধ নতুন, কোনটা বেশি লেখা হয়, এসবও শিখে নেবো।
ডাক্তার-মুখোশদের আরেকটি ভালো গুণ আছে। সবাই তাদের কথা মন দিয়ে শোনে। তারা যা লিখে দেন, মানুষ তাই কিনে আনে। আমি ছোটবেলায় ভাবতাম, এত জটিল, সাঙ্কেতিক হাতের লেখা কিভাবে শেখে! পরে দেখলাম, যতই জটিল হোক, ওষুধের দোকানের লোক ঠিক ঠিক বুঝে যায়। এখন অবশ্য বড় শহরের ক্লিনিকে সব কিছু কম্পিউটরে। আমাদের এদিকে এখনো হাতে লেখা প্রেসক্রিপশন। ডাক্তার-মুখোশে সাংকেতিক লেখাও খুব গুরুত্বপূর্ণ।
আমাদের দেশে প্রায় সব বড় রাজনৈতিক দলে ডাক্তার আছেন। এতে আমি খুব খুশি হই। কারণ ডাক্তার-মুখোশদের শুধু হাসপাতালে থাকলে চলে না। দেশের সব জায়গায় তাদের দরকার হয়। সভায়, মিছিলে, টেলিভিশনের আলোচনায়, নির্বাচনেও তাদের দেখা যায়। এত কাজ একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে করা সম্ভব নয়। কিন্তু ডাক্তার-মুখোশরা সবই পারেন।
অনেক সময় টেলিভিশনে দেখি, ডাক্তার-মুখোশরা একে অপরের সঙ্গে তর্ক করেন। কেউ বলেন এই সিদ্ধান্ত ভালো, কেউ বলেন ওই সিদ্ধান্ত ভালো। আমি বুঝতে পারি না কে ঠিক। তবে আমি বুঝি, বড় হলে এভাবে কথা বলতে জানতে হয়। তাই আমি এখন থেকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার অভ্যাস করি।
কত রকম ডাক্তার-মুখোশ। এক সময় বদরুদ্দোজা চৌধুরী নামে একজন বিখ্যাত ডাক্তার-মুখোশ ছিল। শেখ হাসিনার মেয়ে পুতুল না কি ডাক্তার-মুখোশ সার্টিফিকেট ছাড়া ডাক্তার-মুখোশ পরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরিচালক হয়ে গেছিলো। এখন আব্দুন নূর তুষার, জাহেদ উর রহমান বিখ্যাত ডাক্তার-মুখোশ। জামাতের নেতা শফিকুর রহমান না কি একাধারে ডাক্তার-মুখোশ এবং ব্যাঙ্কিং-মুখোশ।
আচ্ছা, জুবাইদা রহমান আপু, শামারুহ মির্জা আপু কি ডাক্তার-মুখোশ? তসলিমা নাসরিন কি ডাক্তার মুখোশ? নির্বাসনে পাঠালো কাকে, মুখ না কি মুখোশকে?
আমার বাবা বলেন, ডাক্তার হতে খুব কষ্ট, ডাক্তার-মুখোশ হওয়া আরো কষ্টকর। মা বলেন, মানুষের জীবন নিয়ে কাজ করতে হয় বলে খুব দায়িত্বও। আমি মনে করি, ডাক্তার-মুখোশদের দায়িত্ব আরও বেশি। কারণ তাদের শুধু রোগী দেখলে হয় না, সবাই যেন তাদের সব সময় ডাক্তার-মুখোশ বলে চিনতে পারে, সেটাও দেখতে হয়।
আমি যখন বড় হবো, তখন আমারও একটা সাদা কোট থাকবে। গলায় স্টেথোস্কোপ থাকবে। আমার চেম্বারের সামনে অনেক মানুষ বসে থাকবে। দেয়ালে অনেক সার্টিফিকেট ঝুলবে। টেবিলের ওপর অনেক ওষুধ কোম্পানির ক্যালেন্ডার, কলম আর প্যাড থাকবে। আমার সঙ্গে অনেকে ছবি তুলতে চাইবে। সবাই আমাকে ‘স্যার’ বলে ডাকবে। আমি তখন বুঝবো, আমি সত্যিই একজন ডাক্তার-মুখোশ হয়েছি।
তাই আমি আর ডাক্তার হতে চাই না। আমি বড় হয়ে একজন ডাক্তার-মুখোশ হতে চাই। এটাই আমার জীবনের লক্ষ্য।
শেষে একটা কথা বলবো। সবাই ভাবে, ডাক্তার-মুখোশ হওয়ার সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো অনেক পড়াশোনা করা। আমার কিন্তু তা মনে হয় না। আমার মনে হয়, সবচেয়ে কঠিন কাজ হলো মুখোশের যত্ন নেওয়া।
মুখোশে যদি একটু দাগ পড়ে, সবাই তা দেখতে পায়। মুখোশ যদি একটু ফেটে যায়, সবাই প্রশ্ন করতে শুরু করে। তাই ডাক্তার-মুখোশের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো তার মুখোশটাকে সব সময় ঠিকঠাক রাখা। আমি এখন থেকে সেই অভ্যাস করছি।
প্রতিদিন সকালে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আমি আমার মুখটা দেখি। আগে ভাবতাম এটা আমার মুখ। এখন আর তা মনে হয় না। এখন মনে হয়, এটাও একটা ছোট্ট মুখোশ। বড় হলে এটা আরো বড় হবে। একদিন এটা পুরোপুরি ডাক্তার-মুখোশ হয়ে যাবে।
তাই আমি খুব যত্ন করে মুখ ধুই, চুল আঁচড়াই, জামাকাপড় পরিষ্কার রাখি। কেউ যদি বলে, “এটা তো তোমার মুখ,” আমি মনে মনে হাসি। তারা এখনো বুঝতে পারেনি।
এটা আমার মুখ নয়। এটাই আমার প্রথম মুখোশ।
আর আমি বড় হয়ে শুধু একজন ডাক্তার হবো না। আমি একজন সত্যিকারের ডাক্তার-মুখোশ হবো।
অর্পিতক কবি রArpita Kabir’s Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।





















