, রবিবার, ১২ জুলাই ২০২৬, ২৮ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

শ হীদ মাগফার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী আজাদ।

  • প্রকাশের সময় : ২ ঘন্টা আগে
  • ০ পড়া হয়েছে

অনলাইন ১২ জুলাই, ২০২৬
জন্মদিনে স্মরণঃ শ হী দ আ জা দ
মাগফার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী আজাদ।
(১১ জুলাই, ১৯৪৬ – নিখোঁজ: ৩০ আগস্ট, ১৯৭১)
—————————————————–
যিনি শহীদ আজাদ নামেই পরিচিত।
বড়লোক বাবা–মার একমাত্র সন্তান ছিলেন আজাদ।
তার বাবা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ইউনুস আহমেদ চৌধুরী এবং মা মোসাম্মাৎ সাফিয়া বেগম। শৈশব কেটেছে নিউ ইস্কাটনের সুরম্য বাড়িতে। তবে পরবর্তীতে তার পিতার প্রতি ক্ষোভ নিয়ে মা সাফিয়া বেগম ফরাশগঞ্জের বাসায় চলে আসেন।
আজাদের বাবা ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার। কর্মরত ছিলেন টাটা কোম্পানিতে। চাকরিজীবনে কলকাতা-দিল্লী-কানপুর-মুম্বাই ঘুরে শেষ পর্যন্ত থিতু হন ঢাকায়। বিক্রমপুরের ছেলে ইউনূস চৌধুরি প্রচুর সম্পদের মালিক বনে যান।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর অতি দ্রুত ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। এদিকে তাঁর একমাত্র সন্তান আজাদও বেড়ে উঠতে থাকে স্বচ্ছলতার মধ্যে। আজাদদের শান-শওকতও ছিল চোখে পড়ার মতো। তাঁদের পারিবারিক আভিজাত্য ছিল ঈর্ষা করার মতো।
আজাদের বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করলে
মা মোসাম্মাৎ সাফিয়া বেগম ক্লাস সিক্স পড়ুয়া আজাদের হাত ধরে স্বামীকে ছেড়ে বের হয়ে যান।
একসময় আজাদ পড়তে যান করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে স্নাতক উত্তীর্ণ হন তিনি। স্কুল-কলেজের শিক্ষা শেষে আজাদ ভর্তি হন করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু ক্রমাগত বৈষম্য আর বাঙালি বিদ্বেষের দূষণীয় পরিবেশে আজাদ নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেননি। বিষিয়ে ওঠে মন।
করাচীর দম বন্ধ করা সেই পরিবেশ থেকে ঢাকায় ফিরে আজাদ ভর্তি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে। সময় তখন ১৯৬৯।
১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে এম.এ. পাশ করেন।
১৯৭১ –
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে তখন। আজাদের বন্ধু রুমী, বদি, জুয়েল এর সাথে আজাদও যুদ্ধে যোগ দেন। রুমি-বদি-আজাদ-জুয়েল-সামাদ- ফতেহ’রা যুদ্ধে যোগ দিতে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চলে যান ভারতের ত্রিপুরায়।
গেরিলা প্রশিক্ষণ নিয়ে ঢাকায় ফেরা এই যোদ্ধাদের ঢাকা শহরে কয়েকটি আস্তানা ছিল। যেগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল আজাদদের বড় মগবাজারের বাড়িটা। এই বাড়ি থেকেই যোদ্ধা বন্ধুদের সাথে ঢাকার বুকে পরিচালিত বেশ কিছু দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করেন আজাদ।
তাঁদের গ্রুপের নাম ছিলো ‘ক্র্যাক প্লাটুন’। স্বাধীনতা যুদ্ধের ২নং সেক্টরের বিখ্যাত আরবান গেরি লা দল ক্র্যাক প্লাটুন এর সদস্য ছিলেন আজাদ….!
২১ আগস্ট রুমী ও আজাদের ক্যাপ্টেন হায়দারের কাছে স্পেশাল ট্রেনিং পাওয়ার কথা-তাদের মিশন সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন ওড়ানোর জন্য। মুক্তিযোদ্ধারা শেল্টার নিয়েছেন তখন আজাদের বাসায়। লুকিয়ে রেখেছেন হাতিয়ার…..।
ফাঁস হয়ে যায় গোপনীয় তথ্য।
.
৩০শে আগস্ট ১৯৭১।
ঢাকা শহরের মুক্তিযোদ্ধা নিবাসে পরপর পাকিস্তানি সৈন্যরা অভিযান চালায়। রাতের বেলা আজাদদের মগবাজারের বাড়িও ঘিরে ফেলে।
একপর্যায়ে” টমাস মানের ম্যাজিক মাউন্টেইন ” বইটাতে গুলি লেগেছিলো।
ঐ দিন ধরা পড়ে আজাদ, জুয়েল, বাশার….গুলিবিদ্ধ হয় আজাদের খালাতো ভাই জায়েদ ।
ক্র্যাক প্লাটুনের ব ন্দি মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে আজাদ ছিলেন। তাঁকে রাখা হয় রমনা থানায়।
মা ছেলের সঙ্গে দেখা করতে যান। আজাদের মাকে জানানো হয়, আজাদ রাজ সাক্ষী হলে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে। আজাদ মা কে বলেছিলেন – “….. ভয় হচ্ছে কখন সব স্বীকার করে ফেলি।”
আজাদের মা ছেলেকে বলেছিলেন, “শক্ত হয়ে থেকো বাবা। কোনো কিছু স্বীকার করবে না।”
আজাদ মাকে পরের দিন ভাত নিয়ে আসার
” আবদার ” করেন!
পরের দিন, তার পরের দিন… আর কোনো দিন মায়ের সাথে দেখা হয় নি ছেলের।
.
রাজসাক্ষী হওয়ার লোভ উপেক্ষা করে ফাঁস করেননি একটাও গোপন তথ্য। পাক বাহিনীর ভয়ংকর অত্যা চার সহ্য করতে হয় তাঁকে।
আজাদ শহীদ হয়ে ছিলেন,তবে কবে, কোথায়, কীভাবে তাঁর মৃ ত্যু হয়, সেই খবর স্নেহময়ী মা জানতে পারেন নি।
১৯৮৫ সালের ৩০শে আগস্ট আজাদের মা মারা যান। ১৪টা বছর মা আর ভাত খান নি।
তিনি কোন বিছানায় ঘুমান নি।
ছেলেযে নাখালপাড়ার রমনা থানার এম.পি হোস্টেলের মিলিটারি টর্চার সেলে পায়নি কোনো বিছানা।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর
আজাদের
গুলিবিদ্ধ বইটা রাখা আছে আজও!
মাগফার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী আজাদ ।
১১ জুলাই, ১৯৪৬। এই দিনে ভারতের কানপুরে জন্মগ্রহণ করেন।
শহীদ আজাদের জন্মদিন।

তথ্য

Manik Biswas’s Post

মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।

জনপ্রিয়

শ হীদ মাগফার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী আজাদ।

প্রকাশের সময় : ২ ঘন্টা আগে

অনলাইন ১২ জুলাই, ২০২৬
জন্মদিনে স্মরণঃ শ হী দ আ জা দ
মাগফার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী আজাদ।
(১১ জুলাই, ১৯৪৬ – নিখোঁজ: ৩০ আগস্ট, ১৯৭১)
—————————————————–
যিনি শহীদ আজাদ নামেই পরিচিত।
বড়লোক বাবা–মার একমাত্র সন্তান ছিলেন আজাদ।
তার বাবা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী ইউনুস আহমেদ চৌধুরী এবং মা মোসাম্মাৎ সাফিয়া বেগম। শৈশব কেটেছে নিউ ইস্কাটনের সুরম্য বাড়িতে। তবে পরবর্তীতে তার পিতার প্রতি ক্ষোভ নিয়ে মা সাফিয়া বেগম ফরাশগঞ্জের বাসায় চলে আসেন।
আজাদের বাবা ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার। কর্মরত ছিলেন টাটা কোম্পানিতে। চাকরিজীবনে কলকাতা-দিল্লী-কানপুর-মুম্বাই ঘুরে শেষ পর্যন্ত থিতু হন ঢাকায়। বিক্রমপুরের ছেলে ইউনূস চৌধুরি প্রচুর সম্পদের মালিক বনে যান।
১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর অতি দ্রুত ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। এদিকে তাঁর একমাত্র সন্তান আজাদও বেড়ে উঠতে থাকে স্বচ্ছলতার মধ্যে। আজাদদের শান-শওকতও ছিল চোখে পড়ার মতো। তাঁদের পারিবারিক আভিজাত্য ছিল ঈর্ষা করার মতো।
আজাদের বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করলে
মা মোসাম্মাৎ সাফিয়া বেগম ক্লাস সিক্স পড়ুয়া আজাদের হাত ধরে স্বামীকে ছেড়ে বের হয়ে যান।
একসময় আজাদ পড়তে যান করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখান থেকে স্নাতক উত্তীর্ণ হন তিনি। স্কুল-কলেজের শিক্ষা শেষে আজাদ ভর্তি হন করাচি বিশ্ববিদ্যালয়ে। কিন্তু ক্রমাগত বৈষম্য আর বাঙালি বিদ্বেষের দূষণীয় পরিবেশে আজাদ নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেননি। বিষিয়ে ওঠে মন।
করাচীর দম বন্ধ করা সেই পরিবেশ থেকে ঢাকায় ফিরে আজাদ ভর্তি হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে। সময় তখন ১৯৬৯।
১৯৭০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ থেকে এম.এ. পাশ করেন।
১৯৭১ –
মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে তখন। আজাদের বন্ধু রুমী, বদি, জুয়েল এর সাথে আজাদও যুদ্ধে যোগ দেন। রুমি-বদি-আজাদ-জুয়েল-সামাদ- ফতেহ’রা যুদ্ধে যোগ দিতে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে চলে যান ভারতের ত্রিপুরায়।
গেরিলা প্রশিক্ষণ নিয়ে ঢাকায় ফেরা এই যোদ্ধাদের ঢাকা শহরে কয়েকটি আস্তানা ছিল। যেগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল আজাদদের বড় মগবাজারের বাড়িটা। এই বাড়ি থেকেই যোদ্ধা বন্ধুদের সাথে ঢাকার বুকে পরিচালিত বেশ কিছু দুঃসাহসিক অভিযান পরিচালনা করেন আজাদ।
তাঁদের গ্রুপের নাম ছিলো ‘ক্র্যাক প্লাটুন’। স্বাধীনতা যুদ্ধের ২নং সেক্টরের বিখ্যাত আরবান গেরি লা দল ক্র্যাক প্লাটুন এর সদস্য ছিলেন আজাদ….!
২১ আগস্ট রুমী ও আজাদের ক্যাপ্টেন হায়দারের কাছে স্পেশাল ট্রেনিং পাওয়ার কথা-তাদের মিশন সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন ওড়ানোর জন্য। মুক্তিযোদ্ধারা শেল্টার নিয়েছেন তখন আজাদের বাসায়। লুকিয়ে রেখেছেন হাতিয়ার…..।
ফাঁস হয়ে যায় গোপনীয় তথ্য।
.
৩০শে আগস্ট ১৯৭১।
ঢাকা শহরের মুক্তিযোদ্ধা নিবাসে পরপর পাকিস্তানি সৈন্যরা অভিযান চালায়। রাতের বেলা আজাদদের মগবাজারের বাড়িও ঘিরে ফেলে।
একপর্যায়ে” টমাস মানের ম্যাজিক মাউন্টেইন ” বইটাতে গুলি লেগেছিলো।
ঐ দিন ধরা পড়ে আজাদ, জুয়েল, বাশার….গুলিবিদ্ধ হয় আজাদের খালাতো ভাই জায়েদ ।
ক্র্যাক প্লাটুনের ব ন্দি মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে আজাদ ছিলেন। তাঁকে রাখা হয় রমনা থানায়।
মা ছেলের সঙ্গে দেখা করতে যান। আজাদের মাকে জানানো হয়, আজাদ রাজ সাক্ষী হলে তাকে ছেড়ে দেয়া হবে। আজাদ মা কে বলেছিলেন – “….. ভয় হচ্ছে কখন সব স্বীকার করে ফেলি।”
আজাদের মা ছেলেকে বলেছিলেন, “শক্ত হয়ে থেকো বাবা। কোনো কিছু স্বীকার করবে না।”
আজাদ মাকে পরের দিন ভাত নিয়ে আসার
” আবদার ” করেন!
পরের দিন, তার পরের দিন… আর কোনো দিন মায়ের সাথে দেখা হয় নি ছেলের।
.
রাজসাক্ষী হওয়ার লোভ উপেক্ষা করে ফাঁস করেননি একটাও গোপন তথ্য। পাক বাহিনীর ভয়ংকর অত্যা চার সহ্য করতে হয় তাঁকে।
আজাদ শহীদ হয়ে ছিলেন,তবে কবে, কোথায়, কীভাবে তাঁর মৃ ত্যু হয়, সেই খবর স্নেহময়ী মা জানতে পারেন নি।
১৯৮৫ সালের ৩০শে আগস্ট আজাদের মা মারা যান। ১৪টা বছর মা আর ভাত খান নি।
তিনি কোন বিছানায় ঘুমান নি।
ছেলেযে নাখালপাড়ার রমনা থানার এম.পি হোস্টেলের মিলিটারি টর্চার সেলে পায়নি কোনো বিছানা।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর
আজাদের
গুলিবিদ্ধ বইটা রাখা আছে আজও!
মাগফার উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী আজাদ ।
১১ জুলাই, ১৯৪৬। এই দিনে ভারতের কানপুরে জন্মগ্রহণ করেন।
শহীদ আজাদের জন্মদিন।

তথ্য

Manik Biswas’s Post

মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।