
অনলাইন বুধবার, ২৯ জুলাই, ২০২৬
রাষ্ট্রপতি শাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ নিয়ে এত হইচই কেন
আজ সকালে হাটতে গিয়ে এক প্রতিবেশী জিজ্ঞেস করলেন এ সম্পর্কে আপনার অভিমত কি এবং পরবর্তী রাষ্ট্রপতি কে হচ্ছেন?
বললাম, এ নিয়ে আমার কোন মতামত নেই এবং কে নতুন রাষ্ট্রপতি হবেন সেটা নিয়েও আমার বিন্দুমাত্র কোন আগ্রহ নেই। তারপরও গত দু-তিনদিন থেকে দেখতে পাচ্ছি মেইনস্ট্রিম সংবাদ মাধ্যম এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় এটা নিয়ে অনেক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে। কেন হচ্ছে তার একটা কারণ বোধহয় দেশের অধিকাংশ সাংবাদিকরা ন্যারেটিভ জার্নালিজম কি সেটা এখনো বোঝেনা বা বোঝার চেষ্টাও করে না।
কে না জানে যে এদেশের রাষ্ট্রপতির কোন ক্ষমতা নেই।
পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসিতে সেটার কোন বিধানও নেই। কিছু ফরমাল দায়িত্ব পালন ছাড়া তার তেমন কোন কাজ নেই। তাকে মূলত ক্ষমতাসীন সরকারের কথামতো চলতে হয়।
সদ্য বিদায় নেওয়া শাহাবুদ্দিন চুপ্পুর ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য। তবে পতিত আওয়ামিলীগ সরকারের মনোনীত হওয়ায় তার বিরুদ্ধে জনমনে ক্ষোভ ছিল এবং অনেকে আশা করেছিলে যে হাসিনার পতনের পর তাকেও বিদায় নিতে হবে। কিন্তু সেই সময়কার বড় বিরোধী দল বিএনপি’র সম্মতি না থাকায় সেটা সম্ভব হয়নি। তিনি যে প্রায় দু বছর বঙ্গভবনে ছিলেন সেটাও সম্ভব হয়েছে বিএনপির কারণেই। তবে বঙ্গভবনে থাকলেও তার অবস্থা ছিল খুবই নাযুক, বিশেষ করে অন্তরবর্তী সরকারের সময়। তার যদি নূন্যতম আত্মমর্যাদা থাকতো তবে হাসিনার পতন হওয়ার পরপরই তিনি চলে যেতেন স্বেচ্ছায়।
দুর্ভাগ্যজনক ভাবে বাংলাদেশের কনটেক্সটে শক্ত মেরুদন্ড বা আত্মমর্যাদা সম্পন্ন কোন ব্যক্তির পক্ষে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা প্রায় অসম্ভব। আর শাসকদলও চায়না কোন ব্যক্তিত্বসম্পন্ন লোক এ পদে আসুক। তারা চায় গৃহভত্য যিনি কোন প্রশ্ন ছাড়া সরকারের সঠিক, বেঠিক সব কাজকেই বৈধতা দেবে। গত ৫৪ বছরে একই ব্যাপার লক্ষ্য করছি। তবে এর মধ্যে দুজন ছিলেন ব্যতিক্রম– বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী এবং বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ।
১৯৭২ সালে ১০ জানুয়ারি জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাধীন দেশে ফিরে আসার পর পরই বিচারপতি চৌধুরীকে রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করা হয়। তবে বছরখানেকের মধ্যেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী গণতন্ত্রের পথে না হেঁটে স্বৈরাচারী হয়ে ওঠেন। আর এটা রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরীর পক্ষে হজম করা কঠিন ছিল।
এই তথ্যটি জানলাম মাহবুব তালুকদারের বই ‘বঙ্গভবনে পাঁচ বছর’ পড়ার পর। রাষ্ট্রপতি চৌধুরীর বিশেষ সরকারি এবং ঘনিষ্ঠ মাহবুব তালুকদারের কাছে তিনি প্রায়ই এ ব্যাপারে তার ক্ষোভের কথা বলতেন। বেশ কয়েকবার পদত্যাগ করার কথাও প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছিলেন। তবে তখনকার পরিস্থিতির বিবেচনায় এবং শেখ মুজিবের প্রতি তার ব্যক্তিগত শ্রদ্ধার কারণে তিনি তখনকার সরকারের
বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কোন অবস্থান নিতে পারেননি।
১৯৭৩ সালের প্রথম দিক থেকে পরিস্থিতি যখন অসহনীয় হয়ে ওঠে, বিশেষ করে প্রেসিডেন্সিয়াল অর্ডার ৯ য়ের (PO-9) মাধ্যমে যখন একের পর এক সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করা হয়। রাষ্ট্রপতি তখন বলেছিলেন, একজন বিচারক হিসেবে কাউকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে এ ধরনের আদেশে সই করা তার জন্য প্রায় অসম্ভব। যাহোক এরপর তিনি পদত্যাগ করেন।
আর দ্বিতীয় ব্যক্তি আমাদের পরম শ্রদ্ধেয় বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আহমেদ। ১৯৯০ সালে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি জেনারেল এরশাদের পতনের পর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন। তার অধীনেই তখন নির্বাচন হয় এবং বেগম খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসেন। তার শর্ত অনুযায়ী বিচারপতি শাহাবুদ্দিন আবার প্রধান বিচারপতির পদে ফিরে যান। এরপর ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসলে বিচারপতি শাহাবুদ্দিনকে আবারও রাষ্ট্রপতি নিয়োগ করা হয়।
হাসিনা ক্ষমতায় আসার পরপরই নানা অন্যায় এবং অপকর্ম শুরু করে। ফলশ্রুতিতে ২০০১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তার পরাজয় ঘটে। এই পরাজয় হাসিনা মেনে নিতে অস্বীকার করে। তখন তিনি এবং তার ছোট বোন শেখ রেহানা বঙ্গভবনে যেয়ে বিচারপতি শাহাবুদ্দিনের উপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করে তাকে ওই নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করতে বলেন। একজন বিবেকবান মানুষের পক্ষে সেটা ছিল অসম্ভব। স্বভাবতই তিনি হাসিনা-রেহানার এই প্রস্তাবে সায় দেননি এবং তার অপরগতা প্রকাশ করেন।
রাগান্বিত হয়ে দুই বোন তখন তাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে তাকে বিশ্বাসঘাতক এবং জাতীয় মুনাফিক বলে। কিন্তু বিচারপতি শাহাবুদ্দিন তার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন এবং নির্বাচনের ফল অনুযায়ী বেগম খালেদা জিয়াকে দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ পড়ান।
এই দৃষ্টান্ত মনে হয় শাসকদলের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। এজন্যই যখন যে ক্ষমতায় আসে তারা তাদের আজ্ঞাবহ গৃহভৃত্যদেরই দেশের সর্বোচ্চ পদে নিয়োগ দেয়। অদূর ভবিষ্যতে এর কোন পরিবর্তন হবে বলে মনে হয় না। আর এই কারণেই কে রাষ্ট্রপতি হবে এ নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র কোন মাথা ব্যাথা নেই।
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।





















