, মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

১৯৭১ সালের‘চার খলিফা’ :আ স ম আবদুর রব, শাহজাহান সিরাজ, নুরে আলম সিদ্দিকী ও আবদুল কুদ্দুস মাখন।

  • প্রকাশের সময় : ১০:২৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬
  • ৩০ পড়া হয়েছে

 অনলাইন সোমবার ১৩ জুলাই, ২০২৬
১৯৭১ সালের উত্তাল জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ। বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে ঘিরে চারজন ছাত্রনেতা ছিলেন লাইমলাইটে। ছাত্র-জনতার কাছে তারা পরিচিত ছিলেন ‘চার খলিফা’ নামে। এই চার নেতা হলেন, আ স ম আবদুর রব, শাহজাহান সিরাজ, নুরে আলম সিদ্দিকী ও আবদুল কুদ্দুস মাখন।
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দিকনির্দেশনায় সেই সময় আরও চারজন ছিলেন, সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ।
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মুক্তিসংগ্রামকে বেগবান করতে চার খলিফার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সময়ে সময়ে বৈঠক করা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ও ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত পতাকা উত্তোলন, স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ, বঙ্গবন্ধুকে সশস্ত্র সালাম প্রদান এবং মুক্তিসংগ্রামের প্রস্তুতিতে তারা বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন।
স্বাধীনতার পর আ স ম আবদুর রব ও শাহজাহান সিরাজ জাসদে যোগ দেন। নুরে আলম সিদ্দিকী ও আবদুল কুদ্দুস মাখন থেকে যান আওয়ামী লীগে।
পেশাগত জীবনে এই চার নেতার সঙ্গেই আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। বিশেষ করে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনকারী আ স ম রবের সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি। উত্তরায় রব ভাইয়ের পাশের বাড়িতে থাকার সুবাদে আমাদের সম্পর্ক পারিবারিক হয়ে ওঠে। রব ভাই ও ভাবি সব সময় খোঁজখবর নিতেন।আমাদের যাওয়া আসা ছিলো।রব ভাই চমৎকার মানুষ। ভাবী এখন রাজনীতি করছেন। ভাবী ভালো গানও করেন। পথ চলায় আ স ম রবের কাছে শুনেছি, যেভাবে দেশ পেয়েছি সেই সব ইতিহাস।
মুক্তি সংগ্রামের গল্প।
শাহজাহান সিরাজের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো ছিলো। তিনি এরশাদ আমলে রামপুরা রোডের মালিবাগ রেলগেট পার হয়ে বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। সেই বাড়িতে বহুবার গিয়েছি। তাঁর অসংখ্য সাক্ষাৎকার নিয়েছি। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের অফিসেও নিয়মিত যেতাম। তিনি মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলতেন, দেশের কথা বলতেন। পরে জাসদ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিলেও কোনো দিন তাঁকে বঙ্গবন্ধুর প্রতি অসম্মান করতে দেখিনি। এক সময় তাঁর স্ত্রী রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। শুনেছিলাম, তাঁর ছেলেও রাজনীতিতে আসবেন।
সাহসী নেতা ও অনলবর্ষী বক্তা নুরে আলম সিদ্দিকী স্বাধীনতার পর বাকশালের বিরোধিতা করেছিলেন। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করলেও বিজয়ী হতে পারেননি। এরপর ধীরে ধীরে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে যান এবং ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।
তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে আজীবন গনতন্ত্র, মুক্ত চিন্তা ও বিবেকবান ছিলেন। ভুলকে বলতেন ভুল। ১৪ ও ১৮ সালের ভোটের ভয়াবহতার সমালোচনা করতেন সাহস নিয়ে। কঠোর সমালোচনা করতেন আওয়ামী লীগ সরকারের নেতিবাচক দিকগুলোর। যা প্রকাশ করতাম আমি। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৫ বছরে তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিন ও মানবজমিনে নিয়মিত কলাম লিখতেন। তাঁর সাহসী লেখা প্রকাশের কারণে অনেক সময় ফোন আসত। আমি হেসে বলতাম, “সিদ্দিকী ভাই লিখেছেন, আমার করার কী আছে?” তাঁর বাসায় গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশের নানা অজানা গল্প শুনতাম।
আমাকে আমিনুল হক বাদশা একদিন বলেছিলেন, সিরাজুল আলম খানের সঙ্গে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক থাকাকালে তিনি পাবনায় গিয়েছিলেন। পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলনে নুরে আলম সিদ্দিকীর বক্তৃতা শুনে তিনি মুগ্ধ হন। ঢাকায় ফিরে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে তিনি সুপারিশ করেন, “নুরে আলম সিদ্দিকীর মতো একজন ছাত্রনেতাকে কেন্দ্রে আনা উচিত।”
ছাত্রনেতা হিসেবে নুরে আলম সিদ্দিকী খদ্দরের পাজামা-পাঞ্জাবি ও স্যান্ডেল পরতেন। তবে জীবনের শেষ দিকে পোশাক, পরিচ্ছদে তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরিপাটি ও সচেতন।
আমিনুল হক বাদশা ছাত্ররাজনীতির পাশাপাশি দৈনিক আজাদ পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে তাঁর কক্ষে উঠেছিলেন আবদুল কুদ্দুস মাখন। বাদশা ভাইয়ের হাত ধরেই মাখন আজাদে কাজ শুরু করেন। একদিকে সাংবাদিকতা, অন্যদিকে ছাত্ররাজনীতি দুই পথেই সমান দক্ষতার সঙ্গে এগিয়ে যান তিনি।
স্বাধীনতার সংগ্রামের এই নেতার সঙ্গে আমার শেষ দীর্ঘ আড্ডা হয় ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর, লঞ্চে করে ভোলা যাওয়ার পথে। মুক্তিযুদ্ধ, রাজনীতি, সাংবাদিকতা, কত গল্প! তিনি জানতেন বাদশা ভাইয়ের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতার কথা। ১৯৯৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো স্মৃতিগুলো যেন আরও বেশি ফিরে আসে। বারবার মনে হয়, এই মানুষগুলো শুধু রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা, একটি জাতির ইতিহাস নির্মাণের কারিগর। তাঁদের নিয়ে নতুন প্রজন্মের আরও বেশি জানা উচিত।
নঈম নিজাম
১৩.০৭,২০২৬

Naem Nizam’s Post

মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।

জনপ্রিয়

১৯৭১ সালের‘চার খলিফা’ :আ স ম আবদুর রব, শাহজাহান সিরাজ, নুরে আলম সিদ্দিকী ও আবদুল কুদ্দুস মাখন।

প্রকাশের সময় : ১০:২৮ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

 অনলাইন সোমবার ১৩ জুলাই, ২০২৬
১৯৭১ সালের উত্তাল জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও মার্চ। বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামকে ঘিরে চারজন ছাত্রনেতা ছিলেন লাইমলাইটে। ছাত্র-জনতার কাছে তারা পরিচিত ছিলেন ‘চার খলিফা’ নামে। এই চার নেতা হলেন, আ স ম আবদুর রব, শাহজাহান সিরাজ, নুরে আলম সিদ্দিকী ও আবদুল কুদ্দুস মাখন।
বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক দিকনির্দেশনায় সেই সময় আরও চারজন ছিলেন, সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ।
বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে মুক্তিসংগ্রামকে বেগবান করতে চার খলিফার ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সময়ে সময়ে বৈঠক করা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ও ধানমন্ডির ৩২ নম্বরে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত পতাকা উত্তোলন, স্বাধীনতার ইশতেহার পাঠ, বঙ্গবন্ধুকে সশস্ত্র সালাম প্রদান এবং মুক্তিসংগ্রামের প্রস্তুতিতে তারা বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন।
স্বাধীনতার পর আ স ম আবদুর রব ও শাহজাহান সিরাজ জাসদে যোগ দেন। নুরে আলম সিদ্দিকী ও আবদুল কুদ্দুস মাখন থেকে যান আওয়ামী লীগে।
পেশাগত জীবনে এই চার নেতার সঙ্গেই আমার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। বিশেষ করে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলনকারী আ স ম রবের সঙ্গে আমার অনেক স্মৃতি। উত্তরায় রব ভাইয়ের পাশের বাড়িতে থাকার সুবাদে আমাদের সম্পর্ক পারিবারিক হয়ে ওঠে। রব ভাই ও ভাবি সব সময় খোঁজখবর নিতেন।আমাদের যাওয়া আসা ছিলো।রব ভাই চমৎকার মানুষ। ভাবী এখন রাজনীতি করছেন। ভাবী ভালো গানও করেন। পথ চলায় আ স ম রবের কাছে শুনেছি, যেভাবে দেশ পেয়েছি সেই সব ইতিহাস।
মুক্তি সংগ্রামের গল্প।
শাহজাহান সিরাজের সঙ্গে আমার সম্পর্ক ভালো ছিলো। তিনি এরশাদ আমলে রামপুরা রোডের মালিবাগ রেলগেট পার হয়ে বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। সেই বাড়িতে বহুবার গিয়েছি। তাঁর অসংখ্য সাক্ষাৎকার নিয়েছি। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ের অফিসেও নিয়মিত যেতাম। তিনি মুক্তিযুদ্ধের গল্প বলতেন, দেশের কথা বলতেন। পরে জাসদ ছেড়ে বিএনপিতে যোগ দিলেও কোনো দিন তাঁকে বঙ্গবন্ধুর প্রতি অসম্মান করতে দেখিনি। এক সময় তাঁর স্ত্রী রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। শুনেছিলাম, তাঁর ছেলেও রাজনীতিতে আসবেন।
সাহসী নেতা ও অনলবর্ষী বক্তা নুরে আলম সিদ্দিকী স্বাধীনতার পর বাকশালের বিরোধিতা করেছিলেন। ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করলেও বিজয়ী হতে পারেননি। এরপর ধীরে ধীরে সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে যান এবং ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকেন।
তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে আজীবন গনতন্ত্র, মুক্ত চিন্তা ও বিবেকবান ছিলেন। ভুলকে বলতেন ভুল। ১৪ ও ১৮ সালের ভোটের ভয়াবহতার সমালোচনা করতেন সাহস নিয়ে। কঠোর সমালোচনা করতেন আওয়ামী লীগ সরকারের নেতিবাচক দিকগুলোর। যা প্রকাশ করতাম আমি। আওয়ামী লীগ সরকারের টানা ১৫ বছরে তিনি বাংলাদেশ প্রতিদিন ও মানবজমিনে নিয়মিত কলাম লিখতেন। তাঁর সাহসী লেখা প্রকাশের কারণে অনেক সময় ফোন আসত। আমি হেসে বলতাম, “সিদ্দিকী ভাই লিখেছেন, আমার করার কী আছে?” তাঁর বাসায় গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু এবং বাংলাদেশের নানা অজানা গল্প শুনতাম।
আমাকে আমিনুল হক বাদশা একদিন বলেছিলেন, সিরাজুল আলম খানের সঙ্গে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক থাকাকালে তিনি পাবনায় গিয়েছিলেন। পাবনা জেলা ছাত্রলীগের সম্মেলনে নুরে আলম সিদ্দিকীর বক্তৃতা শুনে তিনি মুগ্ধ হন। ঢাকায় ফিরে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে তিনি সুপারিশ করেন, “নুরে আলম সিদ্দিকীর মতো একজন ছাত্রনেতাকে কেন্দ্রে আনা উচিত।”
ছাত্রনেতা হিসেবে নুরে আলম সিদ্দিকী খদ্দরের পাজামা-পাঞ্জাবি ও স্যান্ডেল পরতেন। তবে জীবনের শেষ দিকে পোশাক, পরিচ্ছদে তিনি ছিলেন অত্যন্ত পরিপাটি ও সচেতন।
আমিনুল হক বাদশা ছাত্ররাজনীতির পাশাপাশি দৈনিক আজাদ পত্রিকায় সাংবাদিকতা শুরু করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলে তাঁর কক্ষে উঠেছিলেন আবদুল কুদ্দুস মাখন। বাদশা ভাইয়ের হাত ধরেই মাখন আজাদে কাজ শুরু করেন। একদিকে সাংবাদিকতা, অন্যদিকে ছাত্ররাজনীতি দুই পথেই সমান দক্ষতার সঙ্গে এগিয়ে যান তিনি।
স্বাধীনতার সংগ্রামের এই নেতার সঙ্গে আমার শেষ দীর্ঘ আড্ডা হয় ১৯৯১ সালের নির্বাচনের পর, লঞ্চে করে ভোলা যাওয়ার পথে। মুক্তিযুদ্ধ, রাজনীতি, সাংবাদিকতা, কত গল্প! তিনি জানতেন বাদশা ভাইয়ের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতার কথা। ১৯৯৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি চলে গেলেন না ফেরার দেশে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো স্মৃতিগুলো যেন আরও বেশি ফিরে আসে। বারবার মনে হয়, এই মানুষগুলো শুধু রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্নদ্রষ্টা, একটি জাতির ইতিহাস নির্মাণের কারিগর। তাঁদের নিয়ে নতুন প্রজন্মের আরও বেশি জানা উচিত।
নঈম নিজাম
১৩.০৭,২০২৬

Naem Nizam’s Post

মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার  কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।