, মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১০ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

স্মরণে কাদের সরকার

  • প্রকাশের সময় : ০৪:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬
  • ২৪ পড়া হয়েছে

অনলাইন : ১৫ জুলাই, ২০২৬
স্মরণে
গুরু কাদের সরকার
রাকসুর সাবেক প্রো-ভিপি, এক অসমাপ্ত রাজনৈতিক স্বপ্নের নাম
আজ কাদের সরকার ভাইয়ের ২৬তম মৃত্যুবার্ষিকী।
পঁচিশ বছর—একটি প্রজন্মের সমান দীর্ঘ সময়। কিন্তু কিছু মানুষের চলে যাওয়া সময়ের ক্যালেন্ডারে পুরোনো হয় না। তাঁদের স্মৃতি, তাঁদের হাসি, তাঁদের স্বপ্ন আর তাঁদের অসমাপ্ত পথচলা প্রতিদিন নতুন করে হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়ে। কাদের সরকার ভাই আমার কাছে তেমনই একজন মানুষ।
দলীয় রাজনীতির কঠিন বিভাজনের সময়েও ভিন্ন সংগঠনের যে অল্প কয়েকজন ছাত্রনেতার সঙ্গে আমার গভীর আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, কাদের সরকার ভাই ছিলেন তাঁদের অন্যতম। রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন অনেক বড়। সহজ, আন্তরিক, উদার এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী একজন মানুষ।
আমরা একই হলে থাকতাম। কত সন্ধ্যা, কত রাত, কত গল্প, কত তর্ক, কত স্বপ্ন—আজও যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। অনেক রাত একই কক্ষে কাটিয়েছি। ছাত্ররাজনীতি, দেশ, সমাজ, মানুষের ভবিষ্যৎ—সবকিছু নিয়েই চলত আমাদের অন্তহীন আলাপ। স্নেহ, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা মিলিয়ে আমি তাঁকে একটি নাম দিয়েছিলাম—”গুরু”। সেই নামেই তাঁকে ডাকতাম। আজও মনে হয়, কোথাও থেকে তিনি হয়তো সেই ডাক শুনে মৃদু হেসে বলছেন, “কিরে, কী খবর?”
রাকসুতে আমরা সহকর্মী ছিলাম। সংগ্রাম পরিষদের প্যানেল থেকে নির্বাচিত হয়ে একসঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি। নেতৃত্ব তাঁর কাছে ছিল না ক্ষমতার সিঁড়ি; ছিল মানুষের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার এক মহান অঙ্গীকার। তাই তিনি ছিলেন সবার প্রিয়, সবার আপন।
কাদের সরকারকে নিয়ে লিখতে বসলে কয়েকটি অনুচ্ছেদে তা শেষ করা যায় না। তাঁর ঘনিষ্ঠ যে কেউ কলম ধরলে কর্ণফুলীর প্রবাহের মতো স্মৃতির পর স্মৃতি বয়ে যাবে। তিনি ছিলেন সম্ভাবনাময় এক রাজনৈতিক স্ফুলিঙ্গ—যার দীপ্তি আরও বহুদূর ছড়িয়ে পড়ার আগেই নির্মম মৃত্যু তাকে থামিয়ে দিয়েছিল। তাঁর চলে যাওয়ায় শুধু একজন ছাত্রনেতাই হারিয়ে যাননি; হারিয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের রাজনীতির এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা।
বগুড়া থেকে জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার নিভৃত গ্রাম টাকাহুতে তাঁর শেষ শযির কাছে আমি একাধিকবার গিয়েছি। প্রতিবারই তাঁর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব করেছি। বিশাল এক বটগাছ নীরবে ছায়া দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে—মনে হয় যেন প্রকৃতিও তার প্রিয় সন্তানকে বুকে আগলে রেখেছে। সেই ছায়ায় দাঁড়িয়ে মনে হয়েছে, মানুষ চলে যায়, কিন্তু আদর্শ, ভালোবাসা আর স্মৃতিরা কখনো মরে না।
গুরু, আপনি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকুন।
আমরা এখনো জেগে আছি। তবে যে স্বপ্ন নিয়ে আমরা একদিন রাজনীতি করেছিলাম, সেই স্বপ্ন আজ বড়ই আহত। আদর্শের জায়গাগুলো ক্রমশ নষ্টদের দখলে চলে যাচ্ছে। তবু আমরা বিশ্বাস হারাইনি। কারণ আপনাদের মতো মানুষের জীবন আমাদের শিখিয়েছে—অন্ধকার যত গভীরই হোক, একটি প্রদীপের আলো কখনো বৃথা যায় না।
আপনি হয়তো আজ পৃথিবীর কোনো কোলাহল শুনতে পান না। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আপনাকে যারা ভালোবেসেছিল, তাদের হৃদয়ে আপনি আজও বেঁচে আছেন। আপনার স্মৃতি আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়, আমাদের সাহস জোগায়, আমাদের লজ্জিতও করে—যখন দেখি আদর্শের জায়গায় আপস, সততার জায়গায় স্বার্থ, আর রাজনীতির জায়গায় কেবল ক্ষমতার প্রতিযোগিতা।
গুরু, যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন।
এপারের এই অস্থির, নিষ্ঠুর পৃথিবীর চেয়ে ওপারের অনন্ত শান্তির ভুবন নিশ্চয়ই অনেক বেশি নির্মল, অনেক বেশি মানবিক।
আপনার প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা, অশেষ ভালোবাসা এবং এক আজীবন বহন করে চলা শূন্যতার নীরব ছালাম।
বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Abm Zakirul Hoque Titon 

জনপ্রিয়

স্মরণে কাদের সরকার

প্রকাশের সময় : ০৪:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১৫ জুলাই ২০২৬

অনলাইন : ১৫ জুলাই, ২০২৬
স্মরণে
গুরু কাদের সরকার
রাকসুর সাবেক প্রো-ভিপি, এক অসমাপ্ত রাজনৈতিক স্বপ্নের নাম
আজ কাদের সরকার ভাইয়ের ২৬তম মৃত্যুবার্ষিকী।
পঁচিশ বছর—একটি প্রজন্মের সমান দীর্ঘ সময়। কিন্তু কিছু মানুষের চলে যাওয়া সময়ের ক্যালেন্ডারে পুরোনো হয় না। তাঁদের স্মৃতি, তাঁদের হাসি, তাঁদের স্বপ্ন আর তাঁদের অসমাপ্ত পথচলা প্রতিদিন নতুন করে হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়ে। কাদের সরকার ভাই আমার কাছে তেমনই একজন মানুষ।
দলীয় রাজনীতির কঠিন বিভাজনের সময়েও ভিন্ন সংগঠনের যে অল্প কয়েকজন ছাত্রনেতার সঙ্গে আমার গভীর আত্মিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, কাদের সরকার ভাই ছিলেন তাঁদের অন্যতম। রাজনৈতিক পরিচয়ের চেয়ে মানুষ হিসেবে তিনি ছিলেন অনেক বড়। সহজ, আন্তরিক, উদার এবং অসাধারণ ব্যক্তিত্বের অধিকারী একজন মানুষ।
আমরা একই হলে থাকতাম। কত সন্ধ্যা, কত রাত, কত গল্প, কত তর্ক, কত স্বপ্ন—আজও যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে। অনেক রাত একই কক্ষে কাটিয়েছি। ছাত্ররাজনীতি, দেশ, সমাজ, মানুষের ভবিষ্যৎ—সবকিছু নিয়েই চলত আমাদের অন্তহীন আলাপ। স্নেহ, শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা মিলিয়ে আমি তাঁকে একটি নাম দিয়েছিলাম—”গুরু”। সেই নামেই তাঁকে ডাকতাম। আজও মনে হয়, কোথাও থেকে তিনি হয়তো সেই ডাক শুনে মৃদু হেসে বলছেন, “কিরে, কী খবর?”
রাকসুতে আমরা সহকর্মী ছিলাম। সংগ্রাম পরিষদের প্যানেল থেকে নির্বাচিত হয়ে একসঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছি। নেতৃত্ব তাঁর কাছে ছিল না ক্ষমতার সিঁড়ি; ছিল মানুষের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করার এক মহান অঙ্গীকার। তাই তিনি ছিলেন সবার প্রিয়, সবার আপন।
কাদের সরকারকে নিয়ে লিখতে বসলে কয়েকটি অনুচ্ছেদে তা শেষ করা যায় না। তাঁর ঘনিষ্ঠ যে কেউ কলম ধরলে কর্ণফুলীর প্রবাহের মতো স্মৃতির পর স্মৃতি বয়ে যাবে। তিনি ছিলেন সম্ভাবনাময় এক রাজনৈতিক স্ফুলিঙ্গ—যার দীপ্তি আরও বহুদূর ছড়িয়ে পড়ার আগেই নির্মম মৃত্যু তাকে থামিয়ে দিয়েছিল। তাঁর চলে যাওয়ায় শুধু একজন ছাত্রনেতাই হারিয়ে যাননি; হারিয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশের রাজনীতির এক উজ্জ্বল সম্ভাবনা।
বগুড়া থেকে জয়পুরহাটের কালাই উপজেলার নিভৃত গ্রাম টাকাহুতে তাঁর শেষ শযির কাছে আমি একাধিকবার গিয়েছি। প্রতিবারই তাঁর কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বুকের ভেতর এক অদ্ভুত শূন্যতা অনুভব করেছি। বিশাল এক বটগাছ নীরবে ছায়া দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে—মনে হয় যেন প্রকৃতিও তার প্রিয় সন্তানকে বুকে আগলে রেখেছে। সেই ছায়ায় দাঁড়িয়ে মনে হয়েছে, মানুষ চলে যায়, কিন্তু আদর্শ, ভালোবাসা আর স্মৃতিরা কখনো মরে না।
গুরু, আপনি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে থাকুন।
আমরা এখনো জেগে আছি। তবে যে স্বপ্ন নিয়ে আমরা একদিন রাজনীতি করেছিলাম, সেই স্বপ্ন আজ বড়ই আহত। আদর্শের জায়গাগুলো ক্রমশ নষ্টদের দখলে চলে যাচ্ছে। তবু আমরা বিশ্বাস হারাইনি। কারণ আপনাদের মতো মানুষের জীবন আমাদের শিখিয়েছে—অন্ধকার যত গভীরই হোক, একটি প্রদীপের আলো কখনো বৃথা যায় না।
আপনি হয়তো আজ পৃথিবীর কোনো কোলাহল শুনতে পান না। কিন্তু বিশ্বাস করুন, আপনাকে যারা ভালোবেসেছিল, তাদের হৃদয়ে আপনি আজও বেঁচে আছেন। আপনার স্মৃতি আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়, আমাদের সাহস জোগায়, আমাদের লজ্জিতও করে—যখন দেখি আদর্শের জায়গায় আপস, সততার জায়গায় স্বার্থ, আর রাজনীতির জায়গায় কেবল ক্ষমতার প্রতিযোগিতা।
গুরু, যেখানেই থাকুন, ভালো থাকুন।
এপারের এই অস্থির, নিষ্ঠুর পৃথিবীর চেয়ে ওপারের অনন্ত শান্তির ভুবন নিশ্চয়ই অনেক বেশি নির্মল, অনেক বেশি মানবিক।
আপনার প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা, অশেষ ভালোবাসা এবং এক আজীবন বহন করে চলা শূন্যতার নীরব ছালাম।
বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি।

Abm Zakirul Hoque Titon