
অনলাইন মঙ্গলবার,২৫আগস্ট ২০২৬
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপিয়ে দেওয়া বাণিজ্যযুদ্ধের জবাবে এবার কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছে কানাডা। অন্টারিও প্রদেশের সরকারপ্রধান ডগ ফোর্ড যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুৎ ও অতিপ্রয়োজনীয় খনিজ সম্পদ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন। কানাডীয় নেতার এমন বক্তব্যে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
আগামী ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কানাডায় তৈরি গাড়ি, ট্রাক, মোটর পার্টস বা গাড়ির যন্ত্রাংশ ও ইস্পাতের ওপর শুল্ক বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার ঘোষণা দেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। এ ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানেই ডগ ফোর্ডের এমন হুঁশিয়ারি এল।
ট্রাম্প যদি কানাডার উৎপাদনশিল্প ধ্বংস করার চেষ্টা চালিয়ে যান, তবে ‘তাঁকে একগাদা ব্যাটারি সঙ্গে রাখতে হবে’ বলেও হুঁশিয়ারি দেন কানাডার এই নেতা।
অন্টারিও প্রদেশ যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুৎ রপ্তানির মূল্য বাড়িয়ে দিতে পারে কিংবা সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে পারে বলে জানান তিনি। ফোর্ড বলেন, ‘আমরা যুক্তরাষ্ট্রের ১৫ লাখ বাড়িঘর ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ জোগাই।’ ট্রাম্প যদি কানাডার উৎপাদনশিল্প ধ্বংস করার চেষ্টা চালিয়ে যান, তবে তাঁকে ‘একগাদা ব্যাটারি সঙ্গে রাখতে হবে’ বলেও হুঁশিয়ারি দেন তিনি।
ফোর্ডের এ মন্তব্যের কড়া জবাব দিয়েছেন ট্রাম্প। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে ফোর্ডের বক্তব্যকে ‘ফাঁকা বুলি’ বলে উড়িয়ে দেন তিনি। অন্টারিওর এই সরকারপ্রধানকে ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করার পাশাপাশি কানাডার নেতাদের ‘সোজা লাইনে’ আসারও (অবাধ্য না হওয়ার) তাগিদ দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ট্রাম্প লিখেছেন, ‘কারও উচিত এ ভাঁড়গুলোকে ‘‘সোজা লাইনে’’ নিয়ে আসা, অন্যথায় কানাডার জন্য এর পরিণাম আরও ভয়াবহ হবে!’ পোস্টে তিনি কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিকে আবারও ‘গভর্নর কার্নি’ বলে সম্বোধন করেন।
যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অনেক বড়, ধনী ও শক্তিশালী’ দাবি করে ট্রাম্প বলেন, দক্ষিণের এ প্রতিবেশী রাষ্ট্রটিকে ছাড়া কানাডা ‘টিকতেই পারবে না’।
কারও উচিত এ ভাঁড়গুলোকে (কানাডার নেতাদের) ‘সোজা লাইনে’ নিয়ে আসা, অন্যথায় কানাডার জন্য এর পরিণাম আরও ভয়াবহ হবে!
ডোনাল্ড ট্রাম্প, মার্কিন প্রেসিডেন্ট
তবে ট্রাম্পের এ ব্যক্তিগত আক্রমণের জবাবে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে ডগ ফোর্ডও বেশ চড়া ভাষা ব্যবহার করেন। ফোর্ড বলেন, ট্রাম্প যতই হুমকি দিন না কেন, তিনি তাঁকে বা তাঁর হুমকিকে বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করেন না এবং তাঁর সামনে মাথা নত করবেন না।
ডগ ফোর্ড মনে করেন, অটোয়ার (কানাডার কেন্দ্রীয় সরকার) উচিত, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে আরও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। এর মধ্যে জ্বালানি তেল, পটাশ ও কৌশলগত খনিজ সম্পদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
এদিকে হাইড্রো-ইলেক্ট্রিসিটি বা জলবিদ্যুতের অন্যতম বড় সরবরাহকারী প্রদেশ কুইবেকের সরকারপ্রধান ক্রিস্টিন ফ্রেচেট জানান, তিনি এ মুহূর্তে ফোর্ডের মতো কঠোর নীতিতে যাচ্ছেন না। তবে কানাডা যেহেতু (যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে) বিরোধের একটি ‘নতুন ধাপে’ প্রবেশ করছে, তাই এ সম্ভাবনাকে (দেশটিতে বিদ্যুৎ ও খনিজ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া) তিনি একেবারে উড়িয়েও দিচ্ছেন না।
যুক্তরাষ্ট্রে বিদ্যুৎ সরবরাহের ক্ষেত্রে কানাডাই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় বিদেশি উৎস। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় চাহিদার তুলনায় এ নির্ভরতা বেশ সীমিত। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র সে বছর কানাডা থেকে প্রায় ২৪ দশমিক ৫ টেরাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ আমদানি করেছে। বিপরীতে রপ্তানি করেছে ১৬ টেরাওয়াট-ঘণ্টা। নিজেদের মোট বিদ্যুৎ ব্যবহারের মাত্র শূন্য দশমিক ২ শতাংশের জন্য যুক্তরাষ্ট্র কানাডার ওপর নির্ভরশীল।
ডগ ফোর্ড মনে করেন, অটোয়ার (কানাডার কেন্দ্রীয় সরকার) উচিত, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পর্যায়ক্রমে আরও কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া। এর মধ্যে জ্বালানি তেল, পটাশ ও কৌশলগত খনিজ সম্পদের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
তবে কানাডার সীমান্ত সংলগ্ন নিউইয়র্ক, মিশিগান ও মিনেসোটার মতো মার্কিন অঙ্গরাজ্যগুলোতে এ বিদ্যুতের নির্ভরতা অনেক বেশি। বিশেষ করে যখন বিদ্যুতের চাহিদা সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছায়, তখন রাজ্যগুলোর জন্য কানাডা থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এর মধ্যে আবার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অভাবনীয় প্রসারের কারণে স্থানীয় পাওয়ার গ্রিড বা বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। কারণ, প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানগুলো দ্রুত বিশাল ও বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎগ্রাসী ‘হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টার’ তৈরি করার প্রতিযোগিতায় নেমেছে।
এ পরিস্থিতিতে গ্রিডের স্থিতিশীলতা ও গ্রাহকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে নতুন নিয়ম তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে নিউইয়র্ক প্রশাসন। ফলে গত জুলাই মাসে অঙ্গরাজ্যটি নতুন হাইপারস্কেল ডেটা সেন্টারের পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়ার ওপর এক বছরের স্থগিতাদেশ জারি করেছে।
বিদ্যুৎ বন্ধের এ হুমকি অবশ্য অন্টারিও এবারই প্রথম দিল না। এর আগে ২০২৫ সালের মার্চে এই ৩ অঙ্গরাজ্যে বিদ্যুৎ রপ্তানির ওপর ২৫ শতাংশ সারচার্জ বা বাড়তি ফি আরোপ করেন ফোর্ড। তবে কানাডার ইস্পাত ও অ্যালুমিনিয়ামের ওপর ট্রাম্প শুল্ক দ্বিগুণ করার হুমকি দেওয়ার পর সেই সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয়।
সর্বশেষ শুল্ক আরোপের মার্কিন হুমকির বিষয়ে গতকাল কথা বলেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি নিজেও। ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে কানাডার অটোমোবাইল বা গাড়িশিল্পকে ধ্বংস করার চেষ্টার অভিযোগ তোলেন তিনি।
কার্নি জানান, আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এমন কিছু শর্ত দিয়েছিল, যা অটোয়ার পক্ষে মেনে নেওয়া অসম্ভব ছিল। গত শুক্রবার গভীর রাতে কানাডা আলোচনা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পর কার্নি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘চেয়েছে অনেক বেশি, কিন্তু দিতে চেয়েছে খুব কম’।





















