
অনলাইন শুক্রবার ২১ আগস্ট, ২০২৬
সুবোধ তুই ফিরে আয়
২০১৭ সালে ঢাকার দেয়ালে হঠাৎ দেখা গেল এক অদ্ভুত এক গ্রাফিতি – রুগ্ন, দাড়িওয়ালা এক যুবক দৌড়ে পালাচ্ছে, হাতে একটি খাঁচা; খাঁচার ভেতর বন্দি সূর্য । পাশে লেখা —
‘সুবোধ, তুই পালিয়ে যা – এখন সময় খারাপ ।’
কে এই সুবোধ, কে আঁকে – কেউ জানত না । তবু অচেনা সুবোধ হয়ে উঠল মানুষের বিবেকের প্রতীক – একজন ভালো মানুষ, প্রতিবাদী তরুণ, কিংবা সেই সাধারণ নাগরিক, যার ভেতরে এখনো ন্যায়-অন্যায়ের বোধটুকু বেঁচে আছে ।
কোথাও লেখা —
‘সুবোধ, তুই পালিয়ে যা, মানুষ ভালোবাসতে ভুলে গেছে ।’
কোথাও—‘সুবোধ, ভোর হবে কবে ?’
খাঁচার বন্দি সূর্য যেন হয়ে উঠল আলো, আশা ও মুক্তির প্রতীক ।
তারপর ২০২৪-এর পাঁচ আগস্টের পরিবর্তনের পর বদলে গেল শহরের দেয়াল, মুছে গেল পুরোনো স্লোগান, এলো নতুন প্রত্যাশা । দেয়ালে দেয়ালে প্রতিবাদ, স্বপ্ন, বিদ্রূপ, ব্যঙ্গচিত্রের বন্যা বয়ে গেল ।
মনে হলো – সময় বদলাবে । এবার হয়তো সুবোধ ফিরে আসবে এবং সুবোধ থেকে যাবে ।
কিন্তু সত্যিই কি সময় বদলেছে ?
গতকাল দেখলাম, বাবার কফিন সামনে, মা কারাগারে – এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে একটি মেয়ে ছুটে বেড়াচ্ছে । তার চোখে কোনো রাজনীতি নেই, কোনো দল নেই, কোনো মতাদর্শ নেই; আছে শুধু বাবা হারানোর শোক আর বন্দি মাকে মৃত বাবার মুখটি একবার দেখানোর আকুতি ।
অথচ সেই শোকের মুহূর্তেও কিছু মানুষ মেয়েটির শরীর নিয়ে কুৎসিত মন্তব্য করতে দ্বিধা করছে না ।
কি লজ্জা ! কিলজ্জা !
তারা বেমালুম ভুলে গেল – যে মেয়েটিকে তারা পর্দার আড়াল থেকে অপমান করছে, সেও কারও সন্তান, কারও বোন, কারও প্রিয় মানুষ । তার শরীর নিয়ে মন্তব্য করার আগে একবারও কি তাদের মনে হলো না, আজ যদি সেই মেয়েটি তাদের নিজের ঘরের সন্তান হতো ? তার বোন হতো ?
ধর্মের পোশাক পরলেই মানুষ হওয়া যায় না । ধর্মের কথা মুখে আনার আগে মানুষের কষ্ট বুঝতে হয়, বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়, শোকাহত মানুষকে অন্তত নীরবতার সম্মানটুকু দিতে হয় ।
রাজনীতি যার যার বিশ্বাস । কিন্তু মানবিকতা কোনো দলের সম্পত্তি নয় ।
আজ একটি মেয়ে বাবাকে হারিয়েছে । তার মা স্বামীর শেষ বিদায়ে পাশে থাকতে চেয়েছেন । এই মুহূর্তে তাদের রাজনৈতিক পরিচয় নয় – তাদের মানুষ হিসেবে দেখাই আমাদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ।
মনে রাখা প্রয়োজন, আপনার লেখা প্রতিটি কুৎসিত শব্দ শুধু অন্য কাউকে অপমান করে না – আপনার পারিবারিক শিক্ষা, রুচি এবং নিজের চরিত্রটাকেই মানুষের সামনে উন্মুক্ত করে দেয় ।
শোকের ঘরে দাঁড়িয়ে যারা অন্যের শরীর খোঁজে, তাদের কাছে প্রশ্ন –
“আপনার ঘরে এমন শোক নেমে এলে, আপনি কি চান – মানুষ আপনার প্রিয়জনের কান্না দেখুক, নাকি তার শরীর নিয়ে হাসাহাসি করুক ?”
মানুষ হওয়া কঠিন নয় ।
মানুষ হতে হলে, অন্যের শোকের মুহূর্তে মানুষ হয়ে দাঁড়াতে হয় ।
পাঁচ আগস্টের পরিবর্তনের আগে শহরের দেয়ালে, ফ্লাইওভারের পিলারে, পার্কের ধূসর দেয়ালে লেখা ছিল —
‘সুবোধ, তুই পালিয়ে যা- এখন সময় খারাপ ।’
সময় বদলেছে । ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে । দেয়ালের রং বদলেছে । গ্রাফিতি বলদলেছে । কিন্তু মানুষের ভেতরের অন্ধকার কি গুচেছে ?
যে সমাজে – একজন সদ্য পিতৃহারা কন্যার শোকের মধ্যেও তার শরীর নিয়ে কুৎসিত মন্তব্য করার মানুষ থাকে, সেখানে ‘সুবোধ’ পালিয়ে যাবে কোথায় ?
সুবোধ যদি পালিয়েই যায়, তবে মানুষ হয়ে দাঁড়াবে কে ?
তাই আজ সেই পুরোনো দেয়াললিখনের দিকে ফিরে তাকানোর সময় এসেছে । ‘সময় খারাপ’ – তাই সুবোধ পালিয়ে যাবে না; বরং ফিরে এসে দাঁড়াবে অন্ধকারের সামনে, প্রতিবাদ করবে অন্যায় ও অসভ্যতার বিরুদ্ধে ।
রাজনীতি বদলাতে পারে, সরকার বদলাতে পারে, দেয়াললিখনও মুছে যেতে পারে – কিন্তু মানুষের ভেতরের বিবেক জেগে থাকলে পরিবর্তন কখনো থেমে থাকে না ।
তাই আজ সময়ের দাবি-
Mostafa Khan’s Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।





















