
অনলাইন বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মিডিয়া ওয়াচ
তারেক রহমানকে ট্রাম্পের চিঠি: কিছু কথা
গতকাল বিকেলের দিকে খবরটা আমি প্রথম দেখি ফেসবুকে। এরপর সন্ধ্যায় চ্যানেল ২৪ নিউজে দেখলাম এটা হেডলাইন। আজ সকালে প্রথম আলো সহ কয়েকটা দৈনিকেও এটা ছিল শীর্ষ সংবাদ।
এগুলো দেখার পর আমার কয়েকটা প্রশ্ন মনে আসছে এবং সেটাই আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করছি। তার আগে বলে নেই, আমেরিকায় আমি সাংবাদিক হিসেবে কাজ করার সময় হোয়াইট হাউস, স্টেট ডিপার্টমেন্ট সহ অন্যান্য বড় বড় সরকারি ডিপার্টমেন্ট কাভার করেছি। কথাটা এজন্যই বললাম যে তার ফলে আমার আমেরিকান সিস্টেম কিভাবে ওয়ার্ক করে সেটা জানার সুযোগ হয়েছে প্রত্যক্ষভাবে।
সেই অভিজ্ঞতার আলোকে প্রথমেই বলি, আমি মোটামুটি নিশ্চিত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই চিঠি সরাসরি লেখেননি। লেখার কোন কারণও নেই। তিনি হয়তো তারেক রহমানের নামও জানেন না। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট যে নিজে অধিকাংশ চিঠির জবাব দেন না তার একটা মাত্র কারণ তিনি প্রতিদিন হাজার হাজার চিঠি পান। ফলে তার পক্ষে এগুলো পড়া সম্ভব না। এ কারণে Office of Presidential Correspondence বলে একটা ডিপার্টমেন্ট আছে হোয়াইট হাউসে। এটা একটা বড় অফিস এবং কয়েকশো লোক এখানে কাজ করে। যাদের মধ্যে পার্মানেন্ট স্টাফ, হোয়াইট হাউস ইন্টার্ন এবং ভলান্টিয়াররা আছে। তারা এগুলো যাচাই-বাছাই করে এবং শুধুমাত্র মুষ্টিমেয় কয়েকটা চিঠি যেটা প্রেসিডেন্টের নজরে আনা জরুরী সেটাই প্রেসিডেন্টের দপ্তরে পাঠানো হয়। সেখান থেকে ভেটিং করে তার কাছে পাঠানো হয়। খুব গুরুত্বপূর্ণ চিঠি ছাড়া প্রেসিডেন্ট নিজে কখনো কোনো চিঠি পড়েন না, বা তার উত্তর দেন না। প্রেসিডেন্ট ওবামা সাধারণত সপ্তাহে ৫ থেকে ৭ টা চিঠির জবাব দিতেন।
এখন প্রশ্ন করতে পারেন তাহলে তারেক রহমানকে দেওয়া চিঠিটা কে স্বাক্ষর করলো? হ্যাঁ, ওটা ট্রাম্পের সিগনেচার এবং এই হাজার হাজার চিঠিতে দেখবেন একই রকম সই। আর সেটা করে অটো পেন। আর সেটা দিয়ে প্রেসিডেন্টের স্বাক্ষর সহ পাঠানো হয় বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে। ট্রাম্প যে এটা লেখেননি তার আরেকটা উদাহরণ হল, দ্বিতীয় দফায় বোয়িং কেনার ব্যাপারটা প্রথমে আমরা জানলাম ভারতে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত সারজিও গোরের এক্স হ্যান্ডেলের মাধ্যমে। ট্রাম্প যদি জিনিসটাকে এত গুরুত্ব দিতেন তাহলে তার নিজের ট্রুথ সোসালে সেটা উল্লেখ করতেন। এজন্যই বললাম এই চিঠি সম্পর্কে ট্রাম্প হয়তো কিছুই জানেনা। আমার অভিজ্ঞতায় বলে এটা সম্পূর্ণভাবে হ্যান্ডেল করেছে boeing কোম্পানি এবং তাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তারা। যার মধ্যে গোর একজন। ট্রাম্পের বিশেষ দূত হিসেবে কয়েক মাস আগে ঢাকায় এসে তিনি নতুন সরকারের কাছ থেকে এই প্রতিশ্রুতিটা আদায় করে নিয়ে গেছেন।
তবে চিঠির একটা ক্রুশিয়াল ব্যাপার আমার চোখে পড়ল। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট লিখছেন যে, তিনি এই বোয়িং কেনার কথা জানতে পেরে খুব খুশি হয়েছেন এবং তিনি আশা করেন বোয়িং কোম্পানি বাংলাদেশকে হতাশ করবে না। (Hope Boeing will not let you down, and I’ll not forget)। আমি বুঝতে পারিনা আমেরিকার প্রেসিডেন্ট একটা প্রাইভেট কোম্পানির পক্ষে কিভাবে এ ধরণের কথা বলে।
অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে আমাদের সংবাদ মাধ্যম যেভাবে খবরটা প্রচার করেছে তাতে মনে হয় আমাদের সম্পাদক এবং সাংবাদিকরা প্রেস রিলিজ লিখতে বা ছাপতেই বেশি পারদর্শী। কোনরকম যাচাই-বাছাই না করেই তারা এই খবরটা গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করেছে। সাংবাদিকতার মূল যে ব্যাপারটা অর্থাৎ কোন জিনিস লেখা বা রিপোর্ট করার আগে সেটা নিয়ে প্রশ্ন করা। সেটা কোন সংবাদমাধ্যম করেনি।
এ প্রসঙ্গে আরও বলি যে, চিঠিতে ট্রাম্প উল্লেখ করেছেন অচিরেই হয়তো বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তার দেখা-সাক্ষাৎ হবে। এখানে বলে রাখি যে, আগামী ২১ তারিখে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্ক যাবেন। ওখানকার নিয়ম অনুযায়ী হোস্ট কান্ট্রি হিসেবে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট একটা লাঞ্চের ব্যবস্থা করেন অন্যান্য সরকার এবং রাষ্ট্রপ্রধানদের জন্য। সেখানে যেহেতু অনেকে থাকে সেজন্য শুধু হাই-হ্যালো ছাড়া সাবসন্টটিভ কোন বিষয় নিয়ে আলোচনার স্কোপ থাকে না। কিন্তু আমাদের দেশের নেতা-নেত্রীরা সব সময় ওই একটা হ্যান্ডসেকের ছবি দিয়ে আমাদের মত আবাল দেশবাসীকে জানায় যে, দেখো আমেরিকার প্রেসিডেন্ট আমার কত ঘনিষ্ঠ। আর এই আবাল সাংবাদিকরা এটা নিয়ে কোন প্রশ্ন না করে ফলাও করে প্রচার করে।
নতুন করে বোয়িং কিনতে কি পরিমান টাকা খরচ হবে তার কোন হিসাব সরকার থেকে দেয়নি। এ প্রসঙ্গে বলে রাখি, ইউনূসের করা দেশবিরোধী চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ ২৫ টি বোয়িং কিনবে ৪৫ হাজার কোটি টাকা দিয়ে। আর নতুন করে যেটা জানতে পারলাম চৌদ্দটি বোয়িং কেনা হবে ৩৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে। এর আগে খবর এসেছে চীন থেকে যুদ্ধ বিমান কেনা হবে ২৮ হাজার ৩২৪ কোটি টাকায়।
এখানে উল্লেখ করি ২০২৫-২৬ সালে আমাদের সামরিক বাহিনীর জন্য বাজেট ছিল ৪২ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা। ইতিমধ্যে জানেন যে দেশ এখন এক মহা আর্থিক সংকটে পড়েছে। রাষ্ট্রীয় ব্যয় মেটাতে সরকার ছয় মাসেই ব্যাংক থেকে দেড় লক্ষ কোটি টাকা ধার করেছে। নতুন বেতন কাঠামোতে খরচ হবে এক লক্ষ ছয় হাজার কোটি টাকা। আদানির কাছে বকেয়া প্রায় তিন লক্ষ কোটি টাকা।
এরকম একটা অবস্থার মধ্যে আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না, নানা মেগা প্রকল্প যেমন তিস্তা মহা পরিকল্পনা; গঙ্গা ব্যারেজ; মেট্রোরেল 1-5; বরিশাল- ভোলা সেতু; খালখনন, নানা জাতের কার্ড সব করতে কত লক্ষ কোটি টাকা লাগবে এবং এই অর্থের যোগান কিভাবে হবে? ফেসবুক বন্ধু মঞ্জুরে খোদা তরিকের একটা পোস্টে এসব তথ্য পেয়েছি।
প্রশ্ন হল এরকম একটা ভীতিকর পরিস্থিতির মধ্যে বোয়িং কেনা কিভাবে অগ্রাধিকার পেতে পারে? এখন মনে হচ্ছে ইউনুসের লাইনেই চলছেন তারেক রহমান। আরও স্পষ্ট করে বললে বলতে হয় আমেরিকা যেটা চাচ্ছে সেটাই সরকার করবে। মাঝে মাঝে ভাবি আমাদের একটা বিরোধী দল আছে সংসদে এন্ড they’re quite vocal। কিন্তু এসব নিয়ে তাদের কোন কথা বলতে শুনি না। দেশে যে হামে এ পর্যন্ত প্রায় ৯০০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে যার জন্য মূলত দায়ী ছিল ইউনুস সরকার, তাদের বিরুদ্ধেও এই বিরোধীদল টু শব্দ করছে না। এসব দেখেশুনে প্রায়ই মনে হয় যে এত রক্তের বিনিময়ে যে সরকার আমরা পেয়েছি সেটা হলো আতাতের সরকার। দেশ বা জনগণের স্বার্থ তাদের কাছে মুখ্য না। ইউনূসের কাছেও দেশের স্বার্থ প্রাধান্য পায়নি।
এসব ছাড়াও আরো কয়েকটা বিষয় নিয়ে আলাপ করেছি মাসুদ কামালের সঙ্গে। সময় পেলে ভিডিওটা দেখতে পারেন। লিংক কমেন্টে।
Arshad Mahmud’s Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।





















