
অনলাইন সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬
চাকরিজীবনের সমাপ্তি টানার ১৪ বছর পর আজ প্রথমবার লিখছি কেউ জানে না….জীবনে মোট ৬টি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেছি, ৬ টি চাকরিই আমি নিজে ছেড়ে এসেছি। আর সত্যি বলতে, কোনো ছেড়ে আসাই খুব সুন্দর ছিল না ||
২০০৮ সালের কথা…..
২০০৮ সালে ৫৫ হাজার টাকা বেতন, একবার চিন্তা করেন!
পরে চেয়ারম্যান স্যার, সিইও স্যার পর্যন্ত আমার বাসায় এসেছেন। আমার হাজবেন্ডকে তাঁরা খুব ভালোভাবে চিনতেন। তাঁর কাছেও অনুরোধ করেছেন। আমার হাজবেন্ডও আমাকে বারবার বুঝিয়েছে।
আমি আর যাইনি।
ব্যাস!
বিনা নোটিশে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম। সেখানেও আমাকে ফেরানোর জন্য দফায় দফায় চেষ্টা হয়েছে। আমার হাজবেন্ডের সঙ্গে পর্যন্ত দেখা করেছেন।
যাইনি।
এগুলো বলছি এটা বোঝানোর জন্য না যে আমি খুব বড় কেউ ছিলাম, আমার খুব হেডাম ছিল।
বরং আমার কিছু সমস্যা আছে। এবং সমস্যাগুলো আমি খুব ভালো করেই জানি।
প্রথম সমস্যা……আমি কথা নিতে পারি না। কথা আমি ভুলতেও পারিনা!!
আমাকে সুন্দর করে বুঝিয়ে বলেন, আমি আপনার জন্য সারাদিন কাজ করব। একটা কাজ ১৪ বার ভুল ধরিয়ে দিলে ১৫তম বার আবার করব। দরকার হলে নিজের নির্ধারিত সময়ের বাইরেও কাজ করব, এমনকি অনেক কিছু বিনা পারিশ্রমিকেও করে দেব।
দ্বিতীয় সমস্যা আরও বড়।
আপনার প্রতিষ্ঠানে চাকরি করব ঠিক আছে, কিন্তু আমার কাজটুকু আমাকে আমার মতো করে করতে দিতে হবে।
আপনি আমাকে লক্ষ্য বুঝিয়ে দিন।
ভুল ধরিয়ে দিন।
ফলাফল চান।
কিন্তু আপনার মতো করে আমাকে লিখতে হবে, আপনার মতো করে বলতে হবে, আপনার ছকে পড়েই আমাকে কাজ করতে হবে, এই জায়গায় এসে আমার সঙ্গে সবচেয়ে বড় সংঘর্ষটা বাধে।
আমাকে ছকের মধ্যে ফেলে আমার কাছ থেকে ভালো কাজ বের করা খুব কঠিন।
আমি স্বাধীনচেতা মানুষ।
স্বাধীনভাবে ভাবি।
স্বাধীনভাবে লিখি।
নিজের মতো করে কাজ করতে ভালোবাসি।
এটা সব প্রতিষ্ঠানের জন্য সুবিধাজনক বৈশিষ্ট্য না, সেটাও এখন বুঝি।
আর একটা সত্যও স্বীকার করি। প্রতিটা চাকরি আমি নিজে ছেড়ে এসেছি, কিন্তু কোনো চাকরি ছেড়ে আসার স্মৃতিই আমার সুন্দর না।
কিছু মুহূর্ত এখনো মনে পড়লে কষ্ট লাগে।
কিন্তু জীবনের মজাটা অন্য জায়গায়।
যেসব বস আমাকে একসময় মারাত্মক ভুল বুঝেছেন, যাঁদের সঙ্গে অভিমান নিয়ে প্রতিষ্ঠান ছেড়ে এসেছি, সময়ের ব্যবধানে তাঁরাই আবার আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।
প্রিয়াঙ্কা গ্রুপের চেয়ারম্যান-সিইও স্যার থেকে শুরু করে আমার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাবেক বসদের অফিসে আমি আবার গিয়েছি। বসে গল্প করেছি। সময় কাটিয়েছি।
আজও অনেকের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ আছে।
এখনো আমার কোনো অর্জন দেখলে তাঁদের কেউ কেউ ইনবক্সে মেসেজ দেন। অভিনন্দন জানান।
আর এই জায়গায় এসে ১৪ বছর পরে একটা জিনিস খুব পরিষ্কার বুঝি……একটা সম্পর্কের কোনো একটা সময় খুব খারাপ গেছে মানেই পুরো সম্পর্কটা খারাপ ছিল না।
একটা সময় তাঁরা আমাকে ভুল বুঝেছেন।
একটা সময় আমিও হয়তো তাঁদের বুঝতে পারিনি।
আমারও ভুল ছিল।
তাঁদেরও হয়তো ছিল।
কিন্তু সময় চলে যাওয়ার পরে যখন রাগটা থাকে না, পদ-পদবি থাকে না, প্রতিদিনের সংঘর্ষটা থাকে না, তখন মানুষটার ভালো দিকগুলো আবার চোখে পড়ে।
তাই আজ আমার কোনো প্রাক্তন বসের প্রতি অভিযোগ নেই। বরং কৃতজ্ঞতা আছে।
তাঁদের সঙ্গে সংঘর্ষগুলোও আমাকে তৈরি করেছে। তাঁদের কাছ থেকে শেখাগুলোও আমাকে তৈরি করেছে।
আর সম্ভবত সেই ৬ টা চাকরি করতে গিয়েই সবচেয়ে বড় জিনিসটা বুঝেছিলাম :-
আমি চাকরি করার জন্য খুব সুবিধার মানুষ না।
আমি নিজের মতো করে কিছু তৈরি করার মানুষ।
হয়তো সেই কারণেই চাকরির প্রতিটা দরজা নিজে বন্ধ করে বেরিয়ে আসার পরও জীবন শেষ পর্যন্ত আমাকে এমন একটা দরজার সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে…..”যেটার চাবিটা এখন আমার নিজের হাতেই।”
(আর চাকরিজীবনের সেই অভিজ্ঞতাগুলোই আজ আমার ৩৩ সদস্যের টিম সামলানোর সময় সবচেয়ে বেশি মনে রাখি….তাদের আমার ছকে ফেলি না, নিজের মতো করে কাজ করার স্বাধীনতা দিই।
আর যত রাগই করি, একটা জায়গায় খুব সচেতন থাকি, কাজের ভুল ধরিয়ে দেওয়া যায়, কিন্তু কারও আত্মসম্মানে আঘাত দিয়ে কথা বলার অধিকার আমার নেই।)
Zarin Hannan
BRAND AMBASSADOR
Zarin Hannan’s Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।





















