
অনলাইন বৃহস্পতিবার ০৮ অক্টোবর ২০২৬
‘দৈনিক বাংলার বাণী’ দখলের নেপথ্যে প্রতিমন্ত্রী নুর! তাপসের পৈতৃক সম্পত্তি কেন দখল করতে হবে?
রাজপথে অন্যায়ের বিরুদ্ধে স্লোগান, আর মন্ত্রীর চেয়ারে বসেই নিজের বিরুদ্ধে ভবন দখলের অভিযোগ! ভিপি নুরের রাজনীতিতে এ কেমন পরিবর্তন?
অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে রাজনীতিতে উত্থান নুরুল হক নুরের। সেই নুর এখন প্রতিমন্ত্রী।
অথচ তাঁর বিরুদ্ধেই উঠেছে অন্যের পারিবারিক সম্পত্তি দখলে মদদ দেয়ার গুরুতর অভিযোগ।
ক্ষমতার পালাবদলে কি তবে দখলদারিত্বেরও নতুন সংস্করণ চালু হলো?
রাজধানীর ৮১ মতিঝিলের ঐতিহাসিক ‘বাংলার বাণী’ ভবনটি শেখ ফজলুল হক মণির পরিবারের সম্পত্তি হিসেবে পরিচিত। স্বাধীনতার পর এখানেই গড়ে ওঠে ‘বাংলার বাণী’ পত্রিকার কার্যালয় ও মধুমতি মুদ্রণালয়।
১৯৭৫ সালে শেখ মণি নিহত হওয়ার পর ভবনটি সরকারি নিয়ন্ত্রণে গেলেও ‘বাংলার বাণী’র প্রকাশনা অব্যাহত ছিল। ২০০৯ সালে তাঁর ছেলে ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস ভবনটির দখল ফিরে পান।
এই ভবনের সঙ্গে আমার নিজেরও অসংখ্য স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত দৈনিক ‘বাংলার বাণী’র চাঁদপুর প্রতিনিধি এবং এরপর ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দৈনিক ‘খবর’-এর চাঁদপুর জেলা প্রতিনিধি ছিলাম।
সেই সুবাদে মতিঝিলের ‘বাংলার বাণী’ ভবনে বহুবার গিয়েছি। আজ সেই স্মৃতিবিজড়িত ভবনটি দখলের অভিযোগে সংবাদের শিরোনাম—ভাবতেই কষ্ট হয়!
দৈনিক মানবজমিনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, ভবনটির অধিকাংশ অংশ এখন গণঅধিকার পরিষদের নেতাকর্মীদের কবজায়। এর নেপথ্যে নাম এসেছে খোদ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুরের।
অভিযোগ আরও গুরুতর। নুরের নির্দেশে ভবনের তৃতীয় ও চতুর্থ তলা তালাবদ্ধ রাখা হয়েছে। তাঁর আত্মীয় পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিরা ভবনটির নিয়ন্ত্রণ দেখভাল করছেন।
এমনকি প্রিমিয়ার ব্যাংকের ভাড়া দাবি ও ব্যাংক সরিয়ে দেয়ার হুমকির অভিযোগও উঠেছে।
বাহ্, ভিপি নুর!
একসময় অন্যায়ের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন, আর এখন নিজের নামেই দখলদারিত্বের অভিযোগ!
বিএনপি সরকার দখলবাজি ও চাঁদাবাজিমুক্ত দেশ গড়ার কথা বলছে। অথচ সেই সরকারেরই প্রতিমন্ত্রী ভিপি নুরের বিরুদ্ধে ভবন দখলে মদদ দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ!
অভিযোগ সত্য হলে শুধু নুরের নয়, বিএনপি সরকারের ভাবমূর্তিতেও বড় আঘাত।
নিজের মন্ত্রিসভার সদস্যের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের সুরাহা না করে সরকার দখলবাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের দাবি করবে কীভাবে?
শেখ ফজলে নূর তাপস আওয়ামী লীগের নেতা ছিলেন বলেই কি তাঁর পরিবারের সম্পত্তির অধিকার শেষ হয়ে গেছে? সরকার বদলালেই কি জমি-বাড়ির মালিকানাও বদলে যায়?
ভিপি নুর, রাজপথ থেকে মন্ত্রিসভায় পৌঁছেছেন, ভালো কথা। কিন্তু আপনার অনুসারীরা যদি অন্যের সম্পত্তিতেও পৌঁছে যান, তাহলে সেটাকে কি ‘গণঅধিকার’ বলা যাবে?
ক্ষমতা বদলায়, সরকার বদলায়, দখলদারের পরিচয়ও বদলায়। কিন্তু দখলদারিত্বের সংস্কৃতি বদলায় না কেন? এই দখলের রাজনীতি শেষ হবে কবে?
স্বাধীনতার আগে মতিঝিল থেকে প্রকাশ হত উর্দু পত্রিকা পাসবান। এর মালিক ছিলেন সাতচল্লিশে বিহার থেকে আসা মোহাজির সাংবাদিক মোস্তফা হাসান। তিনি ঢাকায় এসে পরের বছর থেকে পত্রিকা বের করেন। রাজনৈতিক মতভিন্নতা সত্বেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের খাতিরের লোক ছিলেন সুফি সাধক মোস্তফা হাসান।
একাত্তরে খোলাখুলি পাকিস্তানের পক্ষ নেয় পাসবান। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বরের পর অবাঙালি মালিকের প্রতিষ্ঠান হিসেবে পাসবান পত্রিকা, বিল্ডিং এবং ছাপাখানাকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। পরের মাসে ভবনটি দখল করেন শেখ মুজিবের ভাগ্নে শেখ মনি। পাসবান পত্রিকার নাম পাল্টে হয় বাংলার বাণী। আর ছাপাখানার নাম হয় মধুমতি।
যদিও পরিত্যক্ত সম্পত্তি হিসেবে মালিক ছিল গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ। কিন্তু শেখ মনি কখনও সরকারের কাছ থেকে ইজারা, বরাদ্দ নেননি। পচাত্তরে বাকশাল চালু হলে, বাংলার বাণী বন্ধ হয়ে যায়। ছিয়াত্তরে শেখ মনির ভাই শেখ সেলিম মতিঝিলের সেই ভবন থেকে ফের বাংলার বাণী প্রকাশ করেন। তাদের পরিবার মামলা করে ভবনটি নিজেদের দখলে রেখেছিলেন। ২০০৯ সালের পর শেখ মনির ছেলে শেখ তাপস ভবনটি দেখভাল করতেন। এখানে তার চেম্বার ছিল।
একাত্তরের স্বাধীনতা শেখ মনিকে সুযোগ দিয়েছিল অবাঙালির সম্পদ দখল নেওয়ার। আর চব্বিশের অভ্যুত্থান নুরকে সুযোগ দিয়েছে আওয়ামী লীগের দখল করা সম্পদ কব্জায় নেওয়ার।
শুধু তিনি নন, আরও অনেকে এই কাজ করেছেন। বায়তুল মোকাররমের উত্তর গেটের উল্টাপাশে পাকিস্তান আমলের একটা পরিত্যক্ত পাঁচতলা বিল্ডিং পানির দামে ‘কিনেছেন’ এক পীর সাহেব। ধানমন্ডি ১ নম্বরে প্লট তথাকথিত পুনর্দখল করেছেন গুমের এক ভিক্টিমের পরিবার।
Helal Uddin’s Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।





















