
অনলাইন সোমবার,১২ অক্টোবর ২০২৬
চ্যানেল আইয়ের গণভবন প্রবেশাধিকার, মিডিয়া প্রোপাগান্ডা এবং রাজনৈতিক নিরাপত্তার অন্তরায়
রাজনীতি কেবল ক্ষমতার পালাবদল বা দৃশ্যমান সংঘাত নয়; এটি কৌশল, বিশ্বাস অর্জন এবং দীর্ঘমেয়াদী মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবের এক জটিল সমীকরণ। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গণমাধ্যম ও রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে সম্প্রতি যে আলোচনাগুলো সামনে এসেছে, তা আমাদের রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে এক গভীর চিন্তার খোরাক জোগায়। বিশেষ করে, একটি প্রভাবশালী গণমাধ্যম হিসেবে চ্যানেল আইয়ের ভূমিকা এবং নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে গণভবনের অন্দরমহলে প্রবেশের ঘটনাগুলো এই সমীকরণের একটি বড় উদাহরণ।
বিশ্বাসের দীর্ঘ পথ ও আদর্শিক বলয় তৈরি
যেকোনো রাষ্ট্রে বা সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে বিশেষ সুবিধা পেতে হলে বছরের পর বছর ধরে একটি নির্দিষ্ট ভাবমূর্তি বা আস্থার জায়গা তৈরি করতে হয়।
চ্যানেল আই দীর্ঘ সময় ধরে নিজেদের একটি নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক কাঠামোর মধ্যে সাজিয়েছিল।
বঙ্গবন্ধু, রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে নির্মলেন্দু গুণের জন্মদিনের জমকালো আয়োজন এবং জয় বাংলা পন্থী বুদ্ধিজীবী ও লেখকদের নিয়ে একটি শক্তিশালী ঘরানা বা পরিবার তৈরি করা হয়েছিল।
এই ধারাবাহিক বিশ্বাস অর্জনের ফলেই শেখ হাসিনার মতো শীর্ষ নেতৃত্ব অন্য কোনো গণমাধ্যমকে যেখানে এতটা অন্দরমহলে প্রবেশের সুযোগ দেননি, চ্যানেল আইকে সেই বিশেষ বিশ্বাস বা একচ্ছত্র সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।
রাজনীতিতে শেষ পর্যন্ত এই আস্থার আড়ালে একটি বড় ধরনের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ বজায় থাকে, যা অনেক সময় রাষ্ট্রের ভেতরের সংবেদনশীল নিরাপত্তাকেও ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়।
সিকিউরিটি ব্রিচ এবং গণভবনের ভেতরের নকশা
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সুরক্ষিত স্থানগুলোর নিরাপত্তা প্রটোকল অত্যন্ত কঠোর হয়। হোয়াইট হাউস বা বাকিংহাম প্যালেসের মতো বিশ্বখ্যাত ভবনগুলোর ভেতরের লেআউট, কোথায় কী আছে বা নিরাপত্তার নকশা কেমন—তা কখনোই সাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয় না।
কিন্তু শাইখ সিরাজের মাধ্যমে চ্যানেল আই গণভবনে প্রবেশ করে শেখ হাসিনার বাগান, মাছ চাষ, হাঁস-মুরগি পালন এবং তাঁর আটপৌরে জীবনযাপনের ওপর নিয়মিত অনুষ্ঠান তৈরি করেছিল। ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের সময় কথিত ছাত্র-জনতার যেভাবে গণভবনের ভেতরে সাবলীলভাবে প্রবেশ করার দৃশ্য দেখা গেছে, তা থেকে স্পষ্ট যে—ভবনের ভেতরের পুরো নকশা ও অভ্যন্তরীণ বিন্যাস আগে থেকে জানা না থাকলে অত সহজে তা সম্ভব ছিল না। এর পেছনে ভেতর থেকে কোনো ভিডিও বা ব্লু-প্রিন্ট সরবরাহ করার যোগসূত্র বা দুয়ে দুয়ে চার মেলানোর সুযোগ রয়েছে।
টকশো সংস্কৃতি ও মনস্তাত্ত্বিক প্রোপাগান্ডা
মিডিয়ার কাজ কেবল তথ্য জানানো নয়, অনেক সময় জনমতকে সুনির্দিষ্ট একটি দিকে প্রবাহিত করাও এর অন্যতম হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।
টকশোর পর্দার পেছনের ঘটনা এবং সুনির্দিষ্ট ফাঁদ পাতার অভিযোগগুলো রাজনীতিতে মিডিয়ার মনস্তাত্ত্বিক কারসাজির বিষয়টি স্পষ্ট করে।
বিচারপতি মানিকের মতো ব্যক্তিত্বকে ক্যামেরার সামনে একটি নির্দিষ্ট আবেগী বা প্ররোচনামূলক পরিস্থিতির মুখে ফেলে এমন একটি প্রতিক্রিয়া আদায় করা হয়েছিল, যা পরে ভাইরাল করে দেওয়া হয়।
এই ধরনের ক্লিপ বা ভিডিওগুলো জুলাইয়ের উত্তাল সময়ে সাধারণ মানুষের মনে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে থাকা শক্তি এবং তাদের অবদানকে সাময়িকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ও বিরক্তিকর করে তোলার ক্ষেত্রে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল।
উপসংহার
রাজনীতিতে সব সময় একটি স্বাস্থ্যকর দূরত্ব এবং অবিশ্বাস জারি রাখতেই হয়। রাষ্ট্রের মৌলিক নিরাপত্তা এবং ক্ষমতার সংবেদনশীল জায়গাগুলোতে কোনো না কোনো পর্যায়ে ‘প্রবেশ নিষেধ’ বা রেড লাইন টানাই বুদ্ধিমানের কাজ। বিশেষ করে যে রাষ্ট্রে স্বাধীনতার পক্ষে ও বিপক্ষে দুটি বিপরীত ও সংঘাতময় রাজনৈতিক শক্তি যুগ যুগ ধরে বিরাজমান, সেখানে মিডিয়ার অতি-ঘনিষ্ঠতা এবং অন্ধ আস্থার সুযোগ রাষ্ট্রকে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলতে পারে, চ্যানেল আইয়ের এই পুরো ঘটনাপ্রবাহ তার একটি জ্বলন্ত শিক্ষা।
পরিশেষে আওয়ামী লীগের নেতাদের একটি কথা বলতে চাই কখনো যদি ক্ষমতায় আপনারা ক্ষমতায় আসেন তাহলে
বিচারপতি মানিক ও চ্যানেল আইয়ের দীপ্তি চৌধুরীর সেদিন ক্যামেরার পেছনের সেই ঘটনা নিয়ে জনমনে অনেক প্রশ্ন রয়েছে। ভবিষ্যতে দেশে নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত করে পর্দার আড়ালের আসল সত্য কী ছিল!
তা সঠিক তদন্ত করে বিচার করা। আর শায়েখ সিরাজের কর্মকাণ্ড ও যেন তদন্ত করা হয়।
সত্য কখনো চাপা থাকে না, সময়ই তার উত্তর দেয়।
সত্য জানার জন্য অপেক্ষা রয়েছে দেশবাসী।
Rubel Miah’s Post
মতামতঃ লেখকের নিজস্ব। এ লেখার কোন দায় ডিজিটাল পত্রিকার কতৃপক্ষ দায়ী নন।




















